
ডায়াবেটিস আজ বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে দ্রুত বাড়তে থাকা দীর্ঘমেয়াদি রোগগুলোর একটি। বিশেষ করে টাইপ-২ ডায়াবেটিক রোগীর সংখ্যা প্রতিদিনই বাড়ছে। ওষুধ ও খাদ্য নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি নিয়মিত শরীরচর্চা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে আনার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হিসেবে প্রমাণিত। কারণ, শরীরচর্চা রক্তে শর্করার মাত্রা কমায়, ইনসুলিনের কার্যকারিতা বাড়ায়, ওজন নিয়ন্ত্রণ করে এবং হার্টকে সুস্থ রাখে। এখন প্রশ্ন হলো—কোন ধরনের শরীরচর্চা ডায়াবেটিক রোগীদের জন্য বেশি উপকারী—হাঁটা নাকি জগিং? আমেরিকান ডায়াবেটিস অ্যাসোসিয়েশন, মায়ো ক্লিনিক এবং বিভিন্ন স্টাডির ভিত্তিতে এ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।

হাঁটা পৃথিবীর সবচেয়ে সহজ ব্যায়াম। এর জন্য আলাদা কোনো সরঞ্জাম লাগে না, খরচও নেই। শুধু ইচ্ছাশক্তি থাকলেই যেকোনো জায়গায়, যেকোনো সময়ে হাঁটা সম্ভব।
ডায়াবেটিক রোগীদের জন্য হাঁটা কেন এত কার্যকর?
রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ: নিয়মিত হাঁটলে HbA1c গড়ে প্রায় ০.৫১% কমে।
ইনসুলিনের কার্যকারিতা বাড়ায়: হাঁটার প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী—২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা পর্যন্ত ইনসুলিন সেনসিটিভিটি ভালো থাকে।
হার্ট সুরক্ষা: গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত হাঁটা কার্ডিওভাসকুলার ঝুঁকি ১৫–২০% পর্যন্ত কমায়।
খাবারের পর উপকারিতা: মিলের পর ৩০ মিনিট হাঁটা রক্তে শর্করার হঠাৎ বেড়ে যাওয়া ঠেকায়।
ওজন নিয়ন্ত্রণ: হাঁটা অতিরিক্ত ক্যালরি পোড়ায়, দীর্ঘ মেয়াদে ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখে।
মানসিক স্বাস্থ্য: হাঁটা মন ভালো রাখে, স্ট্রেস কমায় এবং ঘুমের মান উন্নত করে।
হাঁটার ঝুঁকি: তুলনামূলকভাবে হাঁটার ঝুঁকি খুবই কম। তবে যাঁরা ইনসুলিন বা সালফোনিলিউরিয়া ধরনের ওষুধ নেন, তাঁদের হাইপোগ্লাইসেমিয়ার ঝুঁকি থাকে। এ ছাড়া যাঁদের নিউরোপ্যাথি আছে, তাঁদের পায়ের যত্ন নেওয়া জরুরি।

হাঁটার তুলনায় জগিং বা দৌড়ানো অনেক বেশি তীব্র ব্যায়াম। তাই এর উপকারও দ্রুত দেখা যায়।
ডায়াবেটিক রোগীদের জন্য জগিংয়ের উপকারিতা:
বেশি ক্যালরি খরচ: ৩০ মিনিট জগিং হাঁটার দ্বিগুণ ক্যালরি পোড়ায় (প্রায় ৩০০–৪০০ কিলোক্যালরি)।
রক্তে শর্করা দ্রুত কমায়: HbA1c প্রায় ০.৭–১.২% পর্যন্ত হ্রাস করতে পারে।
ওজন কমাতে কার্যকর: অতিরিক্ত ওজন কমাতে জগিং দ্রুত ফল দেয়।
হার্ট ও ফুসফুস শক্তিশালী করে: কার্ডিওভাসকুলার ফাংশন উন্নত হয়।
ফিট ব্যক্তিদের জন্য HIIT-এর বিকল্প: তরুণ এবং শারীরিকভাবে ফিট ডায়াবেটিক রোগীদের জন্য জগিং অনেকটা হাই-ইনটেন্সিটি ইন্টারভাল ট্রেনিং (HIIT)-এর মতো কাজ করে।
জগিংয়ের ঝুঁকি: তবে জগিংয়ের ঝুঁকি হাঁটার চেয়ে অনেক বেশি। কারণ,
জয়েন্ট ও হাড়ে প্রচুর চাপ পড়ে, ফলে ইনজুরির ঝুঁকি থাকে।
ইনসুলিন ব্যবহারকারীদের হাইপোগ্লাইসেমিয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
যাঁদের আগে থেকেই হার্টের সমস্যা আছে, তাঁদের জন্য জগিং বিপজ্জনক হতে পারে।
গবেষণায় দেখা গেছে, ৫০ বছরের বেশি বয়সীদের জন্য জগিংয়ে ইনজুরির ঝুঁকি হাঁটার তুলনায় ২৩ গুণ বেশি।
দুই ধরনের ব্যায়ামের তুলনা করলে বিষয়টা আরও পরিষ্কার হয়।
তীব্রতা: হাঁটা মাঝারি (৪–৬ METs), জগিং উচ্চ তীব্রতার (৭–৯ METs)।
ক্যালরি বার্ন: হাঁটায় ১৫০–২০০ ক্যালরি, জগিংয়ে ৩০০–৪০০ ক্যালরি (৬০ কেজি ওজনের মানুষের জন্য, ৩০ মিনিটে)।
গ্লাইসেমিক কন্ট্রোল: হাঁটা HbA1c ০.৫১% কমায়, জগিং ০.৭–১.২% পর্যন্ত কমায়।
ইনসুলিন সেনসিটিভিটি: হাঁটার প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী (২৪–৪৮ ঘণ্টা), জগিংয়ে ফল দ্রুত আসে কিন্তু স্বল্পমেয়াদি।
ঝুঁকি: হাঁটার ঝুঁকি কম, জগিংয়ের ঝুঁকি বেশি।
উপযোগিতা: হাঁটা প্রায় সবার জন্য, জগিং শুধু তরুণ ও ফিট রোগীদের জন্য।
ডায়াবেটিক রোগীদের শরীরচর্চায় কিছু নিয়ম মেনে চলা জরুরি—
শুরু করুন হাঁটা দিয়ে। দিনে ৩০ মিনিট, সপ্তাহে অন্তত ৫ দিন হাঁটুন।
ফিটনেস বাড়লে ধীরে ধীরে জগিং যোগ করতে পারেন।
শরীরচর্চার আগে ও পরে ব্লাড সুগার চেক করুন।
রক্তে শর্করা ৯০ mg/dL-এর নিচে হলে স্ন্যাকস খান; ২৭০ mg/dL-এর ওপরে হলে ব্যায়াম এড়িয়ে চলুন।
ইনসুলিন বা ওষুধ ব্যবহারকারীরা সব সময় স্ন্যাকস সঙ্গে রাখুন।
ব্যায়াম সব সময় মিলের পর করুন, খালি পেটে নয়।
জুতা সব সময় আরামদায়ক হতে হবে এবং নিয়মিত পায়ের যত্ন নিতে হবে।
নতুনভাবে জগিং শুরু করার আগে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিন।
ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে হাঁটা ও জগিং—উভয়ই কার্যকর। তবে হাঁটা সবার জন্য সবচেয়ে নিরাপদ এবং সহজ ব্যায়াম। এটি ঝুঁকিহীন, টেকসই এবং দীর্ঘ মেয়াদে উপকার দেয়। অন্যদিকে জগিং দ্রুত ফল দেয় বটে, কিন্তু ঝুঁকি বেশি। তাই জগিং কেবল তরুণ, ফিট এবং চিকিৎসকের অনুমোদন পাওয়া রোগীদের জন্য উপযুক্ত।
ডায়াবেটিস ম্যানেজমেন্টে ওষুধের পাশাপাশি সঠিক শরীরচর্চা জীবন বদলে দিতে পারে। নিয়মিত হাঁটা বা জগিং শুধু রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণেই সাহায্য করে না বরং একটি সক্রিয়, প্রাণবন্ত ও সুস্থ জীবনের দিকেও নিয়ে যায়।
লেখক: খাদ্য ও পথ্য বিশেষজ্ঞ; প্রধান নির্বাহী, প্রাকৃতিক নিরাময় কেন্দ্র
ছবি: পেকজেলসডটকম