
৭
সেকালে যা হতো আরকি। জার্মান ডিউকপুত্র গিওর্গ আর অস্ট্রিয়ার রাজকন্যা হেডউইগের বিয়েটা যত না আন্তরিক, তার চেয়ে বেশি রাজনৈতিক। এতে দুই পক্ষেরই লাভ। তুর্কি-অটোমানরা সে সময় খুব জ্বালাচ্ছিল। দুই হাত এক হওয়ার কারণে অটোমানদের বনামে যে জার্মানরা মৈত্রী শক্তি বাড়িয়ে নিল। সে সুযোগে হেডউইগের বাবাও খুব দাঁও মেরেছিলেন। একালের টাকায় প্রায় সাড়ে ৬ মিলিয়ন ইউরো পকেটে পুরেছিলেন মেয়ের জন্য যৌতুক নিয়ে। ওদিকে বেচারা হেডউইগের হয়তো খুব একটা মত ছিল না। তা ছাড়া দুই মাস ধরে বহু গাঁও-গেরাম আর নানা শহর-নগরের কাঁচা-পাকা পথ ডিঙিয়ে অষ্টাদশী হেডউইগকে যখন জার্মানির ল্যান্ডশ্যুটের বিয়েবাড়িতে আনা হলো, তখন সে হদ্দ ক্লান্ত। সেই ১৪৭৫ সালে তো আর রেলগাড়ি, মোটরগাড়ির বিলাসিতা ছিল না।

তা যাহোক, বিয়েবাড়ির মেঝে অবধি লম্বা মেনুটা শুনে আমাদের চোখ কপালে। কল্পনায় থালাকে থালা মুরগির রান, ল্যাম্ব রোস্ট আর বিফ স্টেক ভেসে উঠে খিদে পাইয়ে দিল ভুরুভুর বাসনা ছড়িয়ে। প্রায় পাঁচ শ গরু, তিন শ ষাঁড়, আট শ শূকর, হাজার তিনেক ভেড়া আর প্রায় হাজার পঞ্চাশ হাঁস-মুরগিসহ এলাহি আয়োজন হয়েছিল সেদিন। অথচ এই বিপুল রান্নার জোগাড় দিয়েছিল কিনা মাত্র দেড় শ জন বাবুর্চি। মনে মনে সব কটা পশুপাখি যোগ দিয়ে দেড় শ দিয়ে ভাগ দেওয়ার চেষ্টা করলাম। একেকজন রাঁধুনির ভাগ্যে সাড়ে তিন শর মতো আইটেম পড়ে রাঁধার জন্য। এও কি সম্ভব! যেভাবে ‘ধরো তক্তা, মারো পেরেক’ কায়দায় দ্রুত হাত চালিয়ে এত কিছু রাঁধতে হয়েছিল তাদের, তাতে হালের ‘মাস্টারশেফ’ জাতীয় রিয়েলিটি শো একদম ফুঁ।
কেউ বলে দশ, কেউ বলে বিশ হাজার। এত্ত লোককে ঠেসে খাইয়ে-দাইয়ে, আমোদ-ফুর্তি করে আর যথেচ্ছ নাচ-গানজুড়ে সেদিন যে আসর বসেছিল, লোকে তাকে আজও ‘ল্যান্ডশ্যুটার হকজাইট’ বা ল্যান্ডশ্যুটের বিয়ে বলে মনে রেখেছে। চার বছর পরপর তারা মেলা বসিয়ে, গান গেয়ে আর মধ্যযুগের মতো বেশবাস ধরে উৎসবে মাতে। প্রতি গ্রীষ্মের এই উৎসব রীতিমতো এ দেশের কালচারাল হেরিটেজ। যদিও ল্যান্ডশ্যুট জায়গাটা বুর্গহাউজেন থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার দূরে, তবু দুইখানেই নিয়ম করে এই মেলা বসে। আরেকটা কারণ, হেডউইগ যে একটা বড় সময়ে এই দুর্গবাড়িতেই ছিল।

৮
আর এই দুর্গবাড়ি ঘিরেই চালু আছে এক গা শিরশির করা ভয়ংকর শীতল গল্প। নতুন নতুন ডিউক হয়ে গিওর্গের তখন মহাব্যস্ততা। তার দেখা মেলা ভার। আবার কেউ বলে গিওর্গের বোতলবাজির স্বভাব ছিল। রঙিন পানি গিলে এদিক-সেদিক টাল হয়ে পড়ে থাকত। কোনটা যে সত্য, বলা মুশকিল। ইতিহাসের কেঁচো খুঁড়লে একটা-দুটো সাপ বেরিয়ে পড়ে বৈকি! মাঝখান দিয়ে ডাচেস হেডউইগ বেচারা বড্ড নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ল। ঠিক তখনই দিতরিশ নামের এক চরিত্রের আবির্ভাব। সে ছিল বুর্গহাউজেন হেঁশেলের শেফ। কী করে যেন খুব ভাব জমে গিয়েছিল তার সঙ্গে হেডউইগের। নিশ্চয়ই তাকে ডবল ডোজ লবণ দিয়ে জম্পেশ (!) এক মেন্যু খাইয়েছিল দিতরিশ। কিন্তু সে সৌভাগ্য বেশি দিন টেকেনি। শিগগিরই পাঁচ কান হয়ে গিওর্গের কাছে পৌঁছাল হেডউইগ আর দিত্রিশের খবরটা।
তারপর এক সকালে বুর্গহাউজেনবাসী দেখল বীভৎস এক বর্বরতা। টেনেহিঁচড়ে দিতরিশকে দুর্গের কোনো এক গহিন কোণে নিয়ে যাওয়া হলো। দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড় করিয়ে ইটের পর ইট গেঁথে তার সামনে তুলে দেওয়া হলো আরেক প্রস্থ দেয়াল। চোখের সামনে দুই দেয়ালের মাঝে দাঁড়িয়ে ধীরে ধীরে জীবন্ত সিলগালা হয়ে গেল তরুণ দিতরিশ। যার অসহায় চোখে সাদা আতঙ্ক দেখে শিউরে উঠেছিল লোকে সেদিন। জমাটবাঁধা ভয়ে শিউরে উঠলাম আমরাও।

আজ অবধি এই কাহিনি লোকের মুখে মুখে ঘুরে বেড়ায়। সাদা উর্দি পরে সুদর্শন এক যুবককে রাতবিরাতে হনহন করে হেঁটে অন্ধকারে মিলিয়ে যেতে দেখা যায়। কেউবা বলে দুর্গের দেয়ালে কান পাতলে দিতরিশের চাপা আর্তনাদ শোনা যায়। ভরা পূর্ণিমা আর ঘোর অমাবস্যায় তার নাকি সুরের কান্নাকাটিতে টেকা দায়। রাতের আঁধারে দুর্গের ভেতরে কেন, বাইরের নিরিবিলি রাস্তাটাও তাই এড়িয়ে চলে লোকজন।
‘...আর হেডউইগের ভাগ্যে কী ঘটেছিল?’ আমাদের মাঝ থেকে কেউ প্রশ্ন ছুড়ল। হতাশ করে দিয়ে মিস ক্যাথরিন জানালেন, ‘তা অবশ্য ঠিক ঠিক জানা যায়নি। তবে হেডউইগের শেষ ঠিকানা রাইটেনহাসলাখের মঠ। সেখানেই সে ঘুমিয়ে আছে। এর বেশি কিছু আমারও যে জানা নেই।’
মিস ক্যাথরিন এরপর আমাদের ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে আরও কতগুলো দালানকোঠা দেখালেন। গোলাবারুদ তুজ করে রাখার বারুদঘর, বল্লম-বর্শা আর ঢাল-তলোয়ার বানানোর অস্ত্রাগার, অতিকায় শস্যের গুদাম, হেডউইগের নিজস্ব একটা ছোট চ্যাপেল, আরও কত কী। সব ছাপিয়ে মন পড়ে থাকল দুর্গের পাষাণ দেয়ালের আড়ালে অধোবদনে দাঁড়িয়ে থাকা দিতরিশের কাছে।

সকাল গড়ানো সূর্যটা মাঝদুপুরে এসে ঠেকেছে। বিকল ঘড়ির স্থির পেন্ডুলাম হয়ে মাথার ওপর ঝুলছে যেন ইচ্ছে করেই। তড়িঘড়ি পা চালালেও এ-মাথা ও-মাথা এক কিলোমিটার পথটা নেহাত কম নয়। তার ওপর আজ কি একটা কনসার্টের আয়োজন আছে দুর্গের বড় উঠানটায়। মঞ্চ খাটিয়ে, যন্ত্রপাতি বসিয়ে তোড়জোড় চলছে পুরোদমে। এক সহকর্মী জানাল মিউনিখ থেকে ব্যান্ডদল ‘স্পাইডার মারফি গ্যাং’ আসবে। দারুণ নামকরা বহু পুরোনো দল। ব্যান্ডের একেকজনের বয়স নাকি সত্তর-আশির কোঠায়। কিন্তু ইলেকট্রিক গিটার আর বেজ ড্রামের কাঠিতে হাত ছোঁয়ানোর সঙ্গে সঙ্গে নাকি তাদের বয়স কমে বিশ-তিরিশে নেমে আসে। সে এক দেখার মতো দৃশ্য। বুর্গহাউজেন আর রাইটেনহাসলাখের বাসিন্দা সব ঝেঁটিয়ে আসবে কনসার্ট দেখতে। সহকর্মীর কাছে গল্প শুনে আফসোস হতে লাগল। একবার দেখে যেতে পারলে মন্দ হতো না।
৯
অবশেষে হোটেলের সামনে বাসের দেখা পেয়ে বাঁচলাম। মিস ক্যাথরিনের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে মিনিট দশেক বাদে আবার সেই রাইটেনহাসলাখ। তবে এবার ইতিউতি চাইলাম হেডউইগের খোঁজে। অদ্ভুত বেদনা নিয়ে এই সুবিশাল মঠের কোনো নিভৃতে সে লুকিয়ে আছে কি না, জানতে ইচ্ছে হলো খুব। সুযোগ আর মিলল কই। বাকিদের সঙ্গে নাকে-মুখে লাঞ্চ সেরে কনফারেন্স হলে ছুটতে হলো। বার্লিনের শারিটে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নিউরোলজির ডাকসাইটে অধ্যাপক উলরিখ আসবেন ইনভাইটেড স্পিকার হয়ে।
‘বিজ্ঞান প্রকাশনার নবযুগ’—এই শিরোনামে ঘণ্টা দেড়েকের দীর্ঘ বক্তব্য দেবেন অধ্যাপক। হালে পাইকারি হারে যেসব সায়েন্টিফিক পেপার বেরোচ্ছে, তার ৯০ শতাংশই যে রদ্দিমার্কা কাজ আর তস্য রদ্দিমার্কা জার্নালগুলো যে তা লুফে নিয়ে ছাপাচ্ছে, তাতে বিজ্ঞান গবেষণার সূর্য আজ অস্তগামী। কী করে এই অধঃপতন ঠেকিয়ে নবযুগ ঘটানো যায়, এই হলো আলোচনার প্রতিপাদ্য। লিখে দিতে পারি, আগামী দেড় ঘণ্টায় দাঁতভাঙা ইন্টেলেকচুয়াল বাতচিত শুনে দেয়ালচাপা পড়া ছাড়াই জ্যান্ত মমি হয়ে যাব। তা ছাড়া মধ্যযুগের রেশ কাটতে না কাটতেই নবযুগের তালাশ করতে খুব একটা মন চাইছে না। বরং হলের ছাদের দিকে চোখ চলে যাচ্ছে বারবার।

ছাদজোড়া রঙিন ফ্রেস্কো আঁকা। কোথাও ফসল মাড়াই চলছে, কোথাও-বা হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগল চরাচ্ছে লোকে। কেউ বসে নেই। খুব যেন ব্যস্ততা। ফ্রেস্কোর এক কোণে বড় করে লেখা, ‘stant cuncta labore’। ল্যাটিন হবে ভেবে চট করে মুঠোফোনের ট্রান্সলেটরে চাপ দিলাম। ভেসে উঠল অনুবাদ, ‘Everything stands with labor’— ‘কাজের পায়ে ভর দিয়েই দাঁড়িয়ে সব’। সিলিংয়ে ছবির মানুষগুলো হাত চালিয়ে খেতখামারি করছে, আর ছাদের নিচে অধ্যাপকও রগ ফুলিয়ে বেদম বক্তৃতা দিয়ে চলেছেন। কাজ করতে ইচ্ছে করছে না শুধু আমারই।
কফিবিরতিতে পালিয়ে এলাম খোলা বাতাসে। পোরসেলিনের কাপে ক্যাফেইনের টাটকা স্বাদ। ছোট ছোট আয়েশি চুমুকে দৃষ্টি ছুড়লাম যদ্দুর যায়। উত্তরে গির্জার সামনেটায় জটলামতো। ক্রিম হোয়াইট ঘেরওয়ালা গাউন আর কালো স্ট্রাইপ স্যুটে ব্রাইড অ্যান্ড গ্রুম দাঁড়িয়ে। বেগুনি ফ্রক পরা কতগুলো বাচ্চা মেয়ে ফুলের ডালি নিয়ে দুপাশে। সবাই মনোযোগ দিয়ে শুনছে পাদরি সাহেবের বিড়বিড় করে আওড়ানো বাইবেল। ট্রাম্পেট আর ড্রাম নিয়ে বাজনাবাদ্যের ছোট্ট একটা দলও আছে সঙ্গে। এই বুঝি দিল প্যাঁও করে ভেঁপু বাজিয়ে। ক্যালেন্ডারের পাতা থেকে উঠে আসা ছবির মতো দৃশ্য। তার মানে, রাইটেনহাসলাখে শুধু আমাদের মতো গোমড়ামুখো বিজ্ঞানীদের আড্ডা বসে না, একটা-দুটো ক্ল্যাসিক বিয়েশাদির মতো আনন্দের ব্যাপারও ঘটে।

কফির পেয়ালা ফুরিয়ে এল। টুং টুং ঘণ্টার শব্দ কানে আসছে। কনফারেন্স হলে ফিরে যাওয়ার সংকেত। গ্যাসট্রিক ক্যানসারের মলিকুলার সাবটাইপের ওপর লেকচার হবে এখন। আরেক দফা কফি হাতে তৈরি হয়ে নিলাম। নইলে ঘর্ঘর করে নাক ডেকে ঘুমিয়ে পড়তে পারি। ঘুমের ঘোরে আরেকবার রাইটেনহাসলাখের দুর্গে ঘুরে আসব নাকি। নাহ্, সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে যদি দিতরিশের ভূত দেয়াল ফুঁড়ে ঘাড় মটকে দেয় পটাং? কিংবা যদি ডবল লবণ দিয়ে বিস্বাদ এক বাটি স্যুপ বানিয়ে আনে আর তারিফ শোনার জন্য গালে হাত দিয়ে বসে থাকে? তার চেয়ে গ্যাসট্রিক ক্যানসার শোনাই নিরাপদ মনে হলো। ভারী পাল্লা ঠেলে ফ্রেস্কো আঁকা বিশাল হলঘরে হারালাম। (শেষ)
লেখক: গবেষক, মিউনিখ, জার্মানি।