রাইটেনহাসলাখের দুর্গে ২
শেয়ার করুন
ফলো করুন


গির্জার সামনে ছড়িয়ে–ছিটিয়ে জটলা করে খুচরা গল্প হচ্ছে। দুপাশ থেকে চায়নিজ আর কাজাখস্তানের দুই সহকর্মী অনুরোধের সুরে বললেন, ‘ট্যুর গাইড ইংরেজি না বললে বিপদ। তখন কিন্তু তুমিই সহায়। জোরে হেঁটে আবার এড়িয়ে যেয়ো না কিন্তু।’
হেঁ হেঁ করে দেঁতো হাসি হেসে অভয় দিলাম। অথচ আমার জার্মান ভাষাবিদ্যার দৌড় এক ঢিল ছুড়লে যদ্দূর যায়, ঠিক তদ্দুর। সুতরাং গাইড মুখ খুললেই চিনা কন্যা আর কাজাখ তরুণীর কাছ থেকে ক্রমেই সরে যেতে হবে। কোন জটলার ভেতর হারালে তারা আর এই দোভাষীকে খুঁজে পাবে না, তা–ই ভাবছি।

দূর্গের একাংশ
দূর্গের একাংশ

কে যেন চেঁচিয়ে আমাদের সবাইকে সমান দুই দলে ভাগ হয়ে দাঁড়াতে বললেন। বাঁয়ের দলে জার্মান চলবে আর ডানের দলে ইংরেজি। খুশিমনে দাঁড়িয়ে পড়লাম। মুশকিল হলো, আমাদের এই ডানপন্থী দলে ইন্টারন্যাশনাল বলতে সেই দুই সহকর্মী আর এই অধম। গাইড হিসেবে এক ষাট ছুঁই ছুঁই সফেদ চুলের ভদ্রমহিলা উদয় হলেন। চটজলদি চোখ বুলিয়ে আশ্বস্ত করলেন, ‘আমি ক্যাথরিন। কোনো চিন্তা নেই। আমি চমৎকার টকাশ টকাশ করে ইংরেজি বলি।’ তারপর জোরে একটা দম নিয়ে ইংরেজির পিন্ডি চটকে বিশুদ্ধ জার্মানে শুরু করলেন, ‘আলজো, দান ফাঙ্গেন ভিয়া আন।’ মানে, ‘আচ্ছা, তবে শুরু করা যাক।’

বিজ্ঞাপন

আমরা চকিতে মুখ চাওয়াচাওয়ি করে বুঝে গেলাম, হয়েছে কাজ। দুর্গের ইতিহাস আজ পাতিহাঁস আর বেলেহাঁস হয়ে ডানা ঝাপটে মাথার ওপর দিয়ে উড়ে যাবে। কী আর করা, হতাশ ঘাড় ঝুলিয়ে যে যার মতো ভদ্রমহিলার অং বং জার্মান ধারাভাষ্যের পিছু নিলাম। মিস গাইড আজ আমাদের খুব মিসগাইড করছেন।

 দূর্গের প্রবেশপথ
দূর্গের প্রবেশপথ

যা হোক, এত তথ্য জেনে কী হবে, এই ভেবে সান্ত্বনা খুঁজে আশপাশটা দেখতে মজে গেলাম। ভাঙা ভাঙা যেটুকু বোঝা যাচ্ছে, একেবারে খারাপ নয়। এই বুর্গহাউজেন নাকি বিশ্বের দীর্ঘতম দুর্গ। এ মাথা থেকে ও মাথা প্রায় এক কিলোমিটার। পুরোনো নথিপত্রে লেখা আছে যে ১০২৫ সালের আগেই দুর্গ তৈরি হয়েছিল। তারপর কালে কালে কত রাজারাজড়ার হাতবদল হয়েছে। আর দুর্গকে দুর্গম করে রাখাই ছিল তাদের বড় এক কাজ। এই যেমন দুর্গের চারপাশটা ঘেরা পাথুরে প্রাচীর দিয়ে। টানা দেয়াল না তুলে প্রাচীরটা এঁকেবেঁকে জিগজ্যাগ হয়ে চলছে। আমাদের মিস গাইড, মিস ক্যাথরিন জানালেন, ইচ্ছা করেই এমন করা হয়েছে। সরলরেখায় চলা প্রাচীর দুর্বল হয় গড়নে। গোলার আঘাতে সহজে গুঁড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। কিন্তু বাঁকাচোরা হলে গোলাবারুদের বনামে বেশ টেকসই আর মজবুত হয়। সেই কত শত বছর আগের স্থাপত্যের তারিফ করতেই হলো।

বিজ্ঞাপন


দেখতে দেখতে দুর্গের প্রথম উঠানে এসে পড়লাম। বিরাট এক সূর্যঘড়ি আঁকা ওয়াচটাওয়ার দাঁড়িয়ে আছে। টাওয়ারের চেহারার সঙ্গে মসজিদের মিনারের খুব মিল। সূর্যঘড়ির সঙ্গে হাতঘড়িটা মিলিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতেই বাকি দলটা দ্রুত হেঁটে সামনে চলে গেল। অগত্যা গতির সঙ্গে তাল মেলাতে হলো। দুই ধারে বাড়িগুলোর সংস্কার করা হয়েছে। তবে সেই কাজ খুব সূক্ষ্ম। রংচং, চুনকাম করে টাইলস লাগিয়ে হুলুস্থুল করা হয়নি। বরং মধ্যযুগীয় চলটা ওঠা, জংধরা ভাবটা খুব জ্যান্ত।

সুউচ্চ প্রাচীর
সুউচ্চ প্রাচীর

আস্তাবলের সামনের জায়গাটায় থেমে মিস ক্যাথরিন নাটকীয় ভঙ্গিতে বললেন, ওয়াচটাওয়ারের পর এবার দেখব উইচটাওয়ার। কথা শুনে আমরা নড়েচড়ে বসলাম। ক্যাথরিনের আঙুলবরাবর তাকাতেই দেখি, টানা বারান্দা দেওয়া ছোট ছোট ঘরের সারি। তার একপাশটা ভীষণ চোখা এক ফলা হয়ে উঠে গেছে আকাশে। ঠিক যেন ডাইনি বুড়ির চোঙা টুপি। গথিক চেহারার উইচটাওয়ারের গা বেয়ে সত্যি ডাকিনী-ফ্লেভার চুইয়ে পড়ছে। ক্যাথরিন বলে চললেন, খুব সরগরম অংশ ছিল এটা দুর্গের। কালো জাদুর চর্চা চালাতেন পেশাদার সব ওঝা।

আমরা চোখ গোল গোল করে শুনছি। ক্যাথরিন বলছেন, কালো জাদুকরেরা সেকালে ছিলেন দারুণ ক্ষমতাবান। নিরীহ সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে ঘাঘু অপরাধীর ওপর যা খুশি তা–ই একটা রায় চাপিয়ে দিতেন সকাল-বিকাল। ডাইনি সন্দেহে ছোট ছোট মেয়েদের এনে আটকে রাখা হতো। চলত বেদম ঝাড়ফুঁক। বিশেষ করে মহিলাদের ঘাড় থেকে ভূত নামানো ছিল তাঁদের খুব প্রিয় কাজ। কত যে কিশোরী-তরুণীকে ডাইনি তকমা দিয়ে জ্যান্ত পুড়িয়ে মেরেছেন তাঁরা, ইয়ত্তা নেই। একবার যে গেছে এই দালানে, তাকে আর ফিরতে দেখা যায়নি।

পান্না-সবুজ ওয়ারজি লেক
পান্না-সবুজ ওয়ারজি লেক

এইখানে মিস ক্যাথরিন উদাস গলায় বললেন, ‘ভাগ্যিস, আপনারা সে যুগে জন্মাননি।’ আমাদের নারীপ্রধান দলটা একসঙ্গে শিউরে উঠলাম। শুধু দলের একমাত্র পুরুষ সদস্য, নিউরোপ্যাথলজি বিভাগের অধ্যাপক শ্লেগেল একান-ওকান মুচকি হাসলেন। ডাইনি সন্দেহে জ্যান্ত পুড়ে মরার কাল্পনিক শাস্তি তাঁকে পেতে হলো না। তবে তাঁর হাসি উবে যেতে সময় লাগল না। উইচটাওয়ারের কোনাকুনি দালানটা দেখিয়ে আমাদের গাইড জানালেন, আর এই হলো টর্চার হাউস। সেকালের জেলখানা। ছোটখাটো মামুলি দোষে কান কেটে নেওয়া, হাতের আঙুল ফেলে দেওয়া তখন ডালভাত ছিল একরকম।

কান একটা-দুটো কম থাকলে কিংবা কয়টা আঙুল নেই, তা দেখে লোকে আন্দাজ করে নিত কে কবে ছিঁচকে চোর ছিল আর কে ছিল পুকুরচোর। যদিও পুকুরচুরি করে কেউ আঙুল আর কান খুইয়েই ছাড়া পেত না। বড় দোষের শাস্তি ছিল গর্দান নিয়ে মাথা লটকে রাখা। ওই দেখো, ওই উঁচু জায়গাটায় কাটা মুন্ডু ঝুলিয়ে রাখা হতো প্রায়ই। লোকে বাজার করে আলুটা–মুলোটা কিনে ফেরার পথে দেখে যেত, কার ধড়ে আজ মাথা নেই। এ পর্যন্ত শুনে প্রফেসর শ্লেগেল প্রবল বেগে তাঁর টেকো মাথায় হাত বোলাতে লাগলেন। মিস ক্যাথরিনের নির্বিকার অথচ রোমহর্ষক বয়ান শুনে তাঁর উসখুস লাগছে কিছুটা।


মধ্যযুগীয় বর্বরতার গল্প শুনে প্রাণ আমাদের পেটে সেঁধিয়ে গেছে। এবার খোলা হাওয়ায় এসে বাঁচলাম। এ হাওয়া জলের হাওয়া। বুর্গহাউজেন দুর্গের দুই পাশে বয়ে গেছে দুই স্রোত। হাতের বাঁয়ে পড়েছে জালজাখ আর ডানে ওয়ারজি লেক। এরা যেন দুর্গের অতন্দ্রপ্রহরী। তাদের টপকে বুর্গহাউজেনে আঘাত হানে কোন শত্রুপক্ষ! জালজাখের জল ঘোলাটে মেটে। পাহাড় থেকে ডালবাকল ধুয়ে নেমে এসেছে বলে তার অমন শ্যামা মেয়ের মতো শ্যামলা রূপ। আর ওয়ারজি লেকের পানি পান্না সবুজ। রাজকীয় তার পরিপাটি আভিজাত্য। তবে কেন যেন সাদামাটা এলোমেলো জালজাখকেই বেশি আপন লাগল। তার ভেতর একটা ‘ডাউন টু আর্থ গার্ল নেক্সট ডোর’ ভাব আছে।

জালজাখ নদী, যার পথ বেয়ে আসত লবণের চালান
জালজাখ নদী, যার পথ বেয়ে আসত লবণের চালান

জালজাখের ওপারেই অস্ট্রিয়ার সীমানা। সেখান থেকে জাহাজ বোঝাই করে লবণ আনা হতো এই নদীপথে। অন্য জার্মান শহরে যেত সেই লবণের চালান। বুর্গহাউজেন ছিল খাজনা আদায়ের কেন্দ্র। দুর্গের ভেতর তাই খাজনা ভবন, কাছারির অংশটা বেশ বড়। তার সামনে দাঁড়িয়ে গতকালের এক রহস্যের জবাব পেয়ে গেলাম। ডিনারের সুপ, সেদ্ধ মাছ আর সবজির পাস্তা—সবকিছুতেই বেজায় লবণ ছিল। খেতে গিয়ে হিমশিম অবস্থা। ধরেই নিয়েছিলাম যে বাবুর্চি বেচারা মনের ভুলে ডবল ডোজ দিয়ে ফেলেছে। আসলে ডবল নুন খাওয়ার অভ্যাস যে এই এলাকার লোকের বহু পুরোনো, এক্ষণে তা পরিষ্কার হলো। আজ রাতের খাবারের কথা ভাবতে গিয়ে এক রকম আতঙ্ক হলো। নুন খাইয়ে মেরে না ফেললেই হয়।

ক্যাথরিন হাতের ইশারায় সবাইকে গোল হয়ে দাঁড়াতে বললেন। তারপর নাটকীয় ভঙ্গিতে নিচু স্বরে জিগ্যেস করলেন, ‘বুর্গহাউজেনের ভূতের গল্পটা কেউ জানেন? এই দুর্গের কোনো একটা দেয়ালে সে থাকে। লোকে প্রায়ই দাবি করে, তারা নাকি সেই ভূতের কান্নার শব্দ শুনতে পায়।’ এই ভরদুপুরে গাইড ক্যাথরিনের ভৌতিক গল্পের অবতারণায় আমরা কেউ ঘাবড়ালাম না। তা ছাড়া, বিজ্ঞানী আর ডাক্তারকে ভূতের ভয় দেখানো কঠিন। তারা ফুত করে বায়োলজিক্যালি প্রমাণ করে ছাড়বে যে ভূত বলে কিছু নেই। অবশ্য দুপুর না হয়ে নিশুতি রাত হলে অন্য কথা। তবুও গল্পটা শোনার জন্যে একটা শিশুতোষ কৌতূহল কাজ করছে। আর আগ্রহী শ্রোতা পেয়ে ক্যাথরিনও মেলে ধরলেন তাঁর গল্পের ঝাঁপি।

দূর্গ বুর্গহাইজেন
দূর্গ বুর্গহাইজেন

‘আচ্ছা, বলি তাহলে। সে অনেক আগের কথা। বুর্গহাউজেন দুর্গ তখন বাভারিয়া-লান্ডশুট রাজ্যের ডিউক নবম লুইসের হাতে। তাঁর ছেলে, ক্রাউন প্রিন্স গিওর্গের বউ হয়ে দুর্গে এসেছেন পরমাসুন্দরী অস্ট্রিয়ান রাজকুমারী হেডউইগ। সেই বিয়েতে অতিথি আসে হাজারে হাজারে, খানাদানা হয় বেশুমার। বাদ্য বাজে কানে তালা দিয়ে। আর বিয়ারের পিপে থেকে শরাব গড়াতে থাকে জালজাখ নদীর স্রোতের মতো...।’ ক্যাথরিন বলেই চলেন।

আর আমি ভাবছি, বিয়েবাড়ির এত হাঁকডাকে ভূতটা ঢুকবে কোন ফুটো দিয়ে। (চলবে)
লেখক: গবেষক, ইনস্টিটিউট অব প্যাথলজি, টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি মিউনিখ, জার্মানি।

ছবি: লেখক

প্রকাশ: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১১: ৩৮
বিজ্ঞাপন