রাইটেনহাসলাখের দুর্গে ১
শেয়ার করুন
ফলো করুন


জরুরি রকমের পা চালিয়ে হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনেটা পেরোচ্ছিলাম। বাস বুঝি ছুটে যায় আজকে। লেট-লতিফকে অবলীলায় ফেলে চলে যাওয়ার জার্মান রীতিটা খুব জানা।
‘ইশ্, দেরি হয়ে গেল। ওরা চলে গেল না তো আবার?’
হতাশ কণ্ঠটা শুনে তাকিয়ে দেখি আমাদের প্যাথলজি ইনস্টিটিউটের চেয়ারম্যান প্রফেসর ওয়াইশার্ট। তীক্ষ্ণ ফলার মতো একই গন্তব্যে ছুটছেন।
কিছুটা অনুযোগের সুরে বলেই চললেন, ‘কী করব বলো, মেডিকেল বোর্ডের মিটিং শেষ হলো মাত্রই।’

প্রফেসরের হাঁটার ঝোড়ো গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে অভয় দিয়ে বললাম, ‘ওই যে বাস ঠায় দাঁড়িয়ে।’ অভয়টা আসলে নিজেকে দেওয়া। প্রফেসর গোছের কেউ সঙ্গে থাকলে ঘুমকাতুরে পোস্টডকের দেরি করে পৌঁছানোর সাত খুন মাফ হয়ে যায়। একধরনের চিকন বাঙালি বুদ্ধি আর কি। এ যাত্রায় লেট-লতিফের তকমা থেকে বেঁচে গেলাম বোধ হয়।

বিজ্ঞাপন

দিন দুয়েকের জন্য পুরো রিসার্চ ইনস্টিটিউট ঝেঁটিয়ে সবাই রওনা দিচ্ছি শহর থেকে অনেক দূরে, রাইটেনহাসলাখ বলে একটা জায়গায়। সে যে কোন মুলুকে, কী তার বিবরণ, কিছু জানি না। শুধু জানি সেখানে বড় করে রিট্রিট হবে। নামে রিট্রিট হলেও যে কাগজটা হাতে ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে, সেটা দেখি লেকচারের লম্বা লিস্টি। মানে, এ নিছক ভ্রমণ নয়। খাবদাব আর বিশ্ববিদ্যালয়ের পয়সায় ফুর্তি করব, তা হবে না। রীতিমতো চোখ খুলে হাঁ করে একের পর এক সায়েন্টিফিক প্রেজেন্টেশন শুনতে হবে।
তারপরও দমে গেলাম না। শুনলামই বা কতকটা জ্ঞানের কথা। তবু তো ঘুরে আসা বলে কথা। তা ছাড়া কাল নাকি নিয়ে যাবে মধ্যযুগের এক দুর্গে। রাইটেনহাসলাখের দুর্গে।

মঠের পাশেই বয়ে গেছে নদী জালজাখ
মঠের পাশেই বয়ে গেছে নদী জালজাখ

মধ্যদুপুরে মধ্যযুগের এক দুর্গে হেঁটে বেড়াব। তার দেয়ালে কান পাতলে শোনা যাবে প্রাচীন সব অচিন গল্প। ভাবতেই শিরশিরে রোমাঞ্চ যেন আলতো নিশ্বাস ফেলল কাঁধের ব্যাকপ্যাকে। নাহ্, বাইরেটা একেবারে শুষ্কং কাষ্ঠং মনে হলেও এবারের রিট্রিট আসলে রোদে শুকানো আমসত্ত্ব। স্বাদ একেবারে টক-মিষ্টিতে টইটম্বুর। অথবা এই হাবাগোবা বাঙাল শর্মা সে রকমই ভাবছে আপাতত।

বিজ্ঞাপন

ঘড়ির কাঁটার হুকুম মেনে ঠিক নয়টায় ছাড়ল আমাদের বাস। প্রতিদিনের কাজের রুটিন ভেঙে টেকনিশিয়ান-পিএইচডি-পোস্টডক-প্রফেসর সমেত বিশাল দলটা রওনা দিলাম আমরা। প্যাথলজি বিভাগের চত্বর ছেড়ে রাজপথে চাকা গড়াতেই চেহারা থেকে বিজ্ঞানটিজ্ঞান সরে গিয়ে আমাদের দেখতে লাগল উৎসুক একপাল স্কুলছাত্রের মতো। ঝলমলে রোদের আঁচড়ে কালো গম্ভীর বাসটাও যেন এক লহমায় ঝাঁ–চকচকে পিকনিক বাসে বদলে গেল।

পাখির চোখে রাইটেনহাসলাখ
পাখির চোখে রাইটেনহাসলাখ

মিউনিখ শহরের হট্টগোল পেরিয়ে দ্রুত চলে এলাম হাইওয়েতে। সারি সারি অফিস-আদালতের ধূসর সরে গিয়ে এবার সঙ্গী হলো চোখজুড়ানো বাভারিয়ান আল্পসের সবুজ। আজকে জানালার বাইরে হাসপাতালের কেবিন আর অ্যাম্বুলেন্সের আনাগোনার বদলে মাইলের পর মাইল খেতখামার, এঁকেবেঁকে বয়ে চলা নদী আর উদাস দাঁড়িয়ে থাকা উইন্ডমিলগুলো দেখে বিচিত্র খটকা লাগছে। তবে আনন্দ মেশানো খটকা। কোল থেকে নামিয়ে ব্যাগ ঠেলে পায়ের কাছে পাঠিয়ে আরাম করে বসলাম। রাইটেনহাসলাখ, হিয়ার উই কাম!


দোতলা সমান ধাতব মূর্তিটা দেখে ধন্ধে পড়ে গেলাম। পরিচিত পরিচিত লাগছে। দুহাত দুদিকে ছড়িয়ে এমনভাবে ‘হ্যালো, মাই ফ্রেন্ড’ ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে যে ফিরতি একটা কোলাকুলি আপনা থেকেই চলে আসে। কৌতূহলী পায়ে এগিয়ে এলাম। ওদিকে বাস থেকে যে যার মতো বোঁচকা-বুঁচকি নামাতে ব্যস্ত। কেউ খেয়াল করল না যে তাদের একজন অতিকায় এক মূর্তি জাপটে ধরতে মন্ত্রমুগ্ধের মতো এগিয়ে যাচ্ছে। তবে কাছে আসতেই একঝলকে মনে পড়ে গেল। আরে, এটা তো স্টিভেন স্পিলবার্গের সেই বিখ্যাত ইটি সিনেমার ইটি।

ভিনগ্রহ থেকে ইটি তার দলের সঙ্গে পৃথিবীতে আসে গাছপালার নমুনা সংগ্রহের জন্য। কিন্তু ঘাসপাতা ঝোলায় পোরার চেয়ে দূরে জোনাক পোকার মতো জ্বলতে থাকা রাতের শহর বেশি ভালো লেগে যায় তার। ঘোর লাগা চোখে সেই বরাবর চলতে গিয়ে কখন যে সে হারিয়ে গেল, নিজেও জানে না। ওদিকে ইটিকে হন্যে হয়ে খুঁজে না পেয়ে নিজ গ্রহে ফিরে যায় দলের বাকিরা। আর এদিকে পথ ভুলে, লোকের তাড়া খেয়ে দৌড়ে পালিয়ে এক বাড়ির গ্যারেজে ঢুকে পড়ে সে। সে রাতে বেসবল নিয়ে খেলতে গিয়ে তাকে আবিষ্কার করে ১০ বছরের কিশোর এলিয়েট।তারপর ঘটনার বেসবল গড়িয়ে যায় কীভাবে এলিয়েট আর তার বন্ধুরা মিলে ইটিকে তার গ্রহে ফেরত পাঠায়, তাই নিয়ে।

গুরুগম্ভীর ক্যাথলিক মঠে বেখাপ্পা দাঁড়িয়ে স্পিলবার্গের ই.টি.
গুরুগম্ভীর ক্যাথলিক মঠে বেখাপ্পা দাঁড়িয়ে স্পিলবার্গের ই.টি.

কিন্তু ইটি মিয়া দেখছি তার দেশে যায়নি। উল্টো, জার্মান দেশের বাভারিয়া মুলুকের বহু পুরোনো, ভীষণ সিরিয়াস এক ক্যাথলিক মঠের বিরাট উঠোনে দিব্যি স্টাইল করে চেগিয়েবেগিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কলিগদের সুধালাম, এ লোক এখানে কেন, কী তার পেছনের কাহিনি। ঠোঁট উল্টে জবাব এল, কী জানি বাপু। বলেই ইটির ধাতব ঠ্যাঙ জড়িয়ে সেলফি খিঁচতে ব্যস্ত হয়ে গেল কজন। সুতরাং ব্যাকগ্রাউন্ড স্টোরি জানতে ক্ষান্ত দিতে হলো। মুঠো ফোনে ইটি আর রাইটেনহাসলাখ লিখে সার্চ দেব, তা–ও হলো না। কনফারেন্স হলে ডাক পড়েছে সবার। তড়িঘড়ি করে সেদিকেই দৌড়াতে হলো।


পেটচুক্তি রকমের বিরাট এক লাঞ্চের শুরু হলো রিসার্চ প্রেজেন্টেশন নামের রোলার কোস্টার। যেহেতু পেটে খেলে পিঠে সয়, তাই বিজ্ঞানের এই অত্যাচার বিনা বাক্যব্যয়ে মেনে নিলাম। কোন রিসার্চ দলের গবেষণা কদ্দূর এগিয়েছে, কটা পেপার কোন নামকরা হামবড়া জার্নালে ছাপা হয়েছে, এই নিয়ে চলল ব্যাপক ফ্লেক্সিং, মানে বড়াই আর কি। বড়াই করার ক্ষমতা না থাকলে এ লাইনে সুবিধা করা মুশকিল। এই হামহুম বড়াইটা ঠিকমতো আসে না। নইলে গত তিন বছরের পোস্টডক জীবনে গোটা আষ্টেক পেপার বেরিয়েছে, তার ভেতর গোটা দুই ফার্স্ট অথরশিপ আছে, সঙ্গে একটা থিসিস স্টুডেন্ট আছে আর সবকিছুর সমান্তরালে চার-পাঁচটা প্রজেক্ট চলছে, ইত্যাদি ফলাও করে বললে কাজের ফর্দটা নেহাত ছোট্ট হতো না। তা না করে ঝিম ধরে বসে বাকিদের ফ্লেক্সিং শুনছি। এমন লোকের একাডেমিক ভবিষ্যৎ ঠন ঠন।

হোয়াইট মঙ্ক বা বার্নাডিন্সরা সবুজে ঘেরা শান্ত পরিবেশ ভালবাসতেন
হোয়াইট মঙ্ক বা বার্নাডিন্সরা সবুজে ঘেরা শান্ত পরিবেশ ভালবাসতেন

যাহোক, কফি ব্রেকগুলোতে খুচরা সময় মিলল মঠের চারপাশটা ঘুরে দেখার।

কনফারেন্স হলের করিডরে ছোট ছোট প্ল্যাকার্ডে টুকটাক তথ্য লেখা আছে। চট করে পড়ে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। সেই ৭৮৮ সালে রাইটেনহাসলাখ এলাকাটার প্রথম বিবরণ পাওয়া যায় প্রাচীন নথিপত্রে। পাশ দিয়ে বয়ে গেছে জালজাখ নামের নদী। জায়গাটা নিরিবিলি আর সবুজে ঘেরা বলে ১১৪৬ সালের দিকে এখানে গড়ে ওঠে বিশাল এই আশ্রম। সিস্টারসিয়ান ভিক্ষুদের বাস এখানে। রোমান ক্যাথলিকদের একটা ধারায় বিশ্বাসী তাঁরা। সেন্ট বেনেডিক্টের ভাবশিষ্য বলা যায়। তাই তাঁদের ডাকনাম বার্নাডিন্স।

অবশ্য তাঁদের লোকে হোয়াইট মঙ্ক নামেও ডাকে। গির্জার কাজকর্মগুলো তাঁরা সাদা গাউন পেঁচিয়ে করে থাকে বলেই এই নাম। কাছেই একটা অতিকায় আস্তাবল দেখলাম। মঠের ভিক্ষুরা নিজেরাই গরু-ঘোড়া পেলে, খেতখামার করে, ফলমূল-ফসল ফলিয়ে জীবন চালাতেন। অন্য ধারার নান-যাজকদের মতো বিলাসী জীবনে আগ্রহ ছিলেন না তেমন। বেশ ইন্টারেস্টিং লাগল ব্যাপারটা।

রাইটেনহাসলাখ মঠ
রাইটেনহাসলাখ মঠ

তবে ধর্মকর্মের দিন গেছে। কয়েক দফা মেরামতের পর এই মনাস্টারি এখন আর সেই মনাস্টারি নেই। বাইবেল লুকিয়ে বেমালুম বনে গেছে বিজ্ঞানের আড্ডাখানায়। যদিও গির্জাটা এখনো সচল আছে। আর বাকি একটা বড় অংশে প্রায় এক হাজার বর্গমিটারজুড়ে বড় বড় কংগ্রেস কি কনফারেন্সের আসর বসে। এর মালিকানা আমাদের টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি মিউনিখের নামে। তাই মঠের বাইরে বিশ্ববিদ্যালয়ের লোগো সগৌরবে উড়ছে পতাকা হয়ে। মাঝেসাঝে আর কোনো প্রতিষ্ঠানকে এই ভবন ভাড়া দিয়ে টু-পাইসও আসে ইউনিভার্সিটির পকেটে।

দিন শেষে পাততাড়ি গুটিয়ে সন্ধ্যা নাগাদ রওনা দিলাম সবাই হোটেলের উদ্দেশে। আরেক দফা উদরপূর্তি খানাপিনা করে ইউনিভার্সিটির টু-পাইস খসিয়ে বেজায় তৃপ্তি পেলাম। কলিগরা সব মোহিতো আর মার্টিনি হাতে হালকা গানের তালে পা মেলাতে উঠে যাচ্ছে ডিনার টেবিল ছেড়ে। রাত ভোর করে আড্ডায় মজে থাকলে সকালে দুর্গ দেখা ছুটে যাবে নির্ঘাত। তাই ইচ্ছা করেই ককটেল পার্টি থেকে সটকে পড়লাম।
পরের দিন সকাল নয়টা। কটকটে হলুদ ফতুয়া পরে হোটেলের সামনে দাঁড়িয়ে আছি।

দূর্গ জয়ে চলছে সবাই
দূর্গ জয়ে চলছে সবাই

লোকজন ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাচ্ছে। তাতে আমার বয়েই গেল। যাহোক, গত রাতে অনেককেই দেখা যাচ্ছে না। ঘুমের কাছে দুর্গ সমর্পণ করে তারা বালিশের আশ্রয়ে আছে আপাতত। বাকিরা অবশ্য জম্পেশ এক ব্রেকফাস্ট ব্যুফে সাবড়ে হেলেদুলে হাজির দুর্গ জয়ের জন্য। এমন ভরপেট, আমুদে সৈন্যদল দেখলে যেকোনো সেনাপতি ভ্যাক কান্নাপূর্বক রণে ভঙ্গ দিত নিশ্চয়ই।

তো প্রায় সবাই উপস্থিত। এখান থেকে হাঁটাপথ। রাইটেনহাসলাখের দুর্গের পোশাকি নাম বুর্গহাউজেন। জালজাখ নদীর পাশ ঘেঁষে অটল দাঁড়িয়ে বুর্গহাউজেন। ভাবতেই রোমাঞ্চ লাগছে। দলের সঙ্গে পা মিলিয়ে রওনা দিলাম জালজাখ নদীটা বাঁয়ে রেখে। (চলবে)

লেখক: গবেষক, ইনস্টিটিউট অব প্যাথলজি, টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি মিউনিখ, জার্মানি।

ছবি: লেখক

প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২২, ০৮: ১২
বিজ্ঞাপন