সোনার পাহাড় কাঞ্চনজঙ্ঘা সহজে দেয় না দেখা
শেয়ার করুন
ফলো করুন

যখন খুব ছোট, তখন পাকিস্তানের নয়নাভিরাম পর্যটনস্থল মারীর কথা শুনতাম আম্মার কাছে। পাহাড়ে বাড়িগুলোতে নাকি মেঘ এক জানালা দিয়ে ঢুকে অন্য জানালা দিয়ে বের হয়। আর ঘরের ভেতরের সবকিছু ভিজিয়ে দিয়ে যায়। ক্লাস ফোরের বাংলা বইয়ে তেনজিং নোরগে শেরপা আর স্যার এডমন্ড পার্সিভাল হিলারির এভারেস্ট বিজয়ের গল্পটা পড়ার পর হিমালয়, নেপাল কবে যাব ভাবতাম।

আব্বার সঙ্গে কলকাতা গেলাম। তখন সবাই দার্জিলিংয়ের পাহাড়ের গল্প করত। কিন্তু সে সময় দার্জিলিং যাওয়া নিষিদ্ধ ছিল। কাঞ্চনজঙ্ঘার গল্প তখন থেকেই শুনি মামার বন্ধুদের কাছে আর আব্বার কলিগ, চাচাদের কাছে। শুনে শুনে পাহাড়ে বেড়ানোর স্বপ্ন লালন শুরু তখন থেকেই। সত্যজিৎ রায়ের ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’ মুভি দেখার পর ইচ্ছাটা প্রবল থেকে প্রবলতর হলো। কিন্তু তখনো দার্জিলিং যাওয়া যায় না। তবে বাড়িতে দার্জিলিংয়ের চা ঠিকই চলছিল।

বিজ্ঞাপন

যখন অঞ্জন দত্তের ‘কাঞ্চন জানা কাঞ্চন ঘর/ কাঞ্চনজংঘা কাঞ্চন মন/ তুমি যাকে বলো সোনা/ আমি তাকে বলি কাঞ্চন’—এ গানটি শুনলাম, আবারও ইচ্ছাটা ঘনীভূত হলো সেখানে যাওয়ার। সে সময় দার্জিলিংয়ে যাওয়ার নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু আমার আর যাওয়া হয় না। মৈত্রেয়ী দেবীর মংপুতে রবীন্দ্রনাথ পড়লাম। আবারও মন কেমন করতে লাগল সোনার পাহাড় দেখার জন্য। এ বইটা বাড়িতেই ছিল। আমার পড়তে দেরি হয়েছে এই যা। সেদিন কোথায় যেন পড়লাম, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর চারবার মংপু গিয়েছেন, সেখানে বসেই নাকি ‘মংপু পাহাড়ে’ কবিতাটা লিখেছিলেন। আরেক জায়গায় দেখলাম, ‘ক্যামেলিয়া’ কবিতাও নাকি ওখানেই রচিত। আমার যতদূর মনে পড়ে, বলধা গার্ডেনে একটা দ্বিতল কক্ষ আছে, যেখানে বসে রবিঠাকুর ‘ক্যামেলিয়া’ রচনা করেছিলেন, একটা বড় বোর্ডে সে কথা লেখা রয়েছে। যা–ই হোক, অবশেষে আমার দার্জিলিং যাওয়ার দিনক্ষণ ঠিক হলো। আমাদের বন্ধুদের একটা দল আছে। আমরা মাঝেমধ্যেই বেড়াতে বের হই। সেবার ঠিক হলো আমরা সড়কপথে ভুটান যাব, ফেরার পথে দার্জিলিং। আমি তো মনে মনে গুনগুন করছি অঞ্জন দত্তের গান— ‘খাদের ধারের রেলিংটা/ সেই দুষ্টু দোদো সিরিংটা/ আমার শৈশবের দার্জিলিংটা’
আর কোথায়, কোথায়, কোথায় আমার মুঠোর ভেতর আমার দার্জিলিং
শুধু গানেই থেকে গেছে আমার পাহাড়ি গান।

ভুটান থেকে কালিম্পং। মাঝে তিস্তা ভিউ পয়েন্ট হয়ে শিলিগুড়ি। সেখান থেকেই দার্জিলিং যেতে হবে। সন্ধ্যা হয়ে গেল। সন্ধ্যায় পাহাড়ি আঁকাবাঁকা রাস্তা ধরে যাত্রাটা কিছুটা রোমাঞ্চকর বলতে হয়। ভুটানের রাস্তা এতটা আঁকাবাঁকা নয়, যতটা দার্জিলিংয়ের। পথের দুই পাশে বসতবাড়ির সঙ্গেই নেপালিদের দোকান। চাইলে মোমো আর চা খাওয়া যেতে পারে।

বিজ্ঞাপন

রাত ৯টা হবে যখন আমরা গন্তব্যে পৌঁছালাম। পরদিন ঘুম থেকে উঠে সুয্যি মামার টিকির দেখা মিলল না। আমরা এক দিনই থাকব, তাই সোনার পাহাড় দেখার আশায় গুড়ে বালি। সকাল থেকে রাত অবধি কুয়াশায় ঘেরা চারদিক। টপ টপ করে মাথায় কুয়াশা ঝরছে। কিছুই করার নেই। আবহাওয়া পরিস্থিতি তো আমাদের হাতে নেই। তাই টাইগার হিলেও যাওয়া হলো না। সেবার অদেখা রয়ে গেল স্বপ্নের কাঞ্চনজঙ্ঘা। ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’ মুভির ছবি বিশ্বাসের মতো উচ্ছ্বসিত হওয়া হলো না। যদিও সে সময় দাম্ভিক ব্যক্তিটির পাশে সে দৃশ্য উপভোগ করার কেউ ছিল না। তবে কুয়াশার চাদরে ঢাকা দার্জিলিংয়ের সৌন্দর্যও নজরকাড়া।


ফেব্রুয়ারি ২০২০–এ আমি আর আমার বোন ঠিক করলাম দার্জিলিংয়ে যাব। এর মধ্যে সোনার পাহাড় আর ‘সোয়েটার’ মুভি দেখে ইচ্ছাটা আরও বাড়ল। যাওয়ার পথে কার্শিয়াংয়ে মার্গারেট ডেকে চায়ের বিরতি নিলাম। সেবার দার্জিলিংয়ে কঠিন কুয়াশা ছিল না। কিন্তু মেঘে ঢাকা ছিল পুরোটা সময়। তবে মেঘেদের দলে দলে গা ছুঁয়ে যাওয়াও একটা দারুণ অভিজ্ঞতা। মনে হলো মেঘের বাড়িতে বেড়াতে এসেছি। আমি যেন মেঘবালিকার বন্ধু। হাত বাড়ালেই ছুঁতে পারি হিমশীতল মেঘ। ঠিক কেয়ার বিয়ারস কার্টুন শোর খুদে ভালুকগুলোর মেঘের রাজ্যে আনন্দ করার মতো। সে যাত্রায়ও কাঞ্চনজঙ্ঘার দেখা মিলল না। শুনেছি রবিঠাকুর তাঁর জীবদ্দশায় চারবার গিয়েও দেখতে পাননি এই অধরা সোনার পাহাড়। সেটা ভেবে নিজের মনকে প্রবোধ দিলাম। হয়তো পরেরবার স্বপ্নের দেখা মিলবে। স্বপ্নটা খুব দূরে মনে হচ্ছিল না আর।

ছবি: লেখক

প্রকাশ: ২৪ নভেম্বর ২০২৩, ১৬: ০০
বিজ্ঞাপন