গিলপিনের তীরে, নীল নীরবতার দেশে
শেয়ার করুন
ফলো করুন

ইয়র্ক আমাদের আরও অনেক কিছু দেখার অপেক্ষায় রেখে গেল। প্রাচীন সিটি ওয়ালসের ওপর দিয়ে হাঁটা হলো না, ভাইকিং ইয়র্কের জীবন্ত স্মৃতি ইয়োরভিকে ফিরে দেখা হলো না, ক্লিফোর্ডস টাওয়ারের মাথা থেকে শহরের বিস্তৃত আকাশরেখাও দেখা হলো না। বাকি থেকে গেল ইয়র্কশায়ার মিউজিয়ামের রোমান নিদর্শন, আউস নদীর বুকে নৌভ্রমণ, মার্চেন্ট অ্যাডভেঞ্চারস হলের মধ্যযুগীয় গল্প আর ন্যাশনাল রেলওয়ে মিউজিয়ামের ইস্পাতের ইতিহাস জানা। এক রাতের ইয়র্ক তাই শেষ পর্যন্ত হয়ে রইল এক অসমাপ্ত পাণ্ডুলিপি, যার পরের অধ্যায়টি হয়তো কোনো এক দিন আবার খুলে বসতে হবে।

পাহাড় থেকে জল এসে নামে গিলগিন নদীতে
পাহাড় থেকে জল এসে নামে গিলগিন নদীতে

কিন্তু পথ তো থেমে থাকে না। আমাদেরও আবার পথে নামতে হলো। পরবর্তী গন্তব্য রিচমন্ডের মিডলটন টাইয়াস; সামনের দীর্ঘ পাহাড়ি পথের আগে সামান্য যাত্রাবিরতি, কিছুটা বিশ্রাম, আর নতুন করে প্রস্তুতি।

বিজ্ঞাপন

বিরতির পর আবার গাড়ি ছোটালাম উত্তরের দিকে। ধীরে ধীরে বদলে যেতে লাগল চারপাশের দৃশ্যপট। শহর ও জনপদের পরিচিত ব্যস্ততা পেছনে পড়ে গিয়ে সামনে খুলে গেল নীল দিগন্ত আর সবুজ পাহাড়ের বিস্তৃত প্রান্তর। পাহাড়ের ঢালে ঢালে ছড়িয়ে আছে ভেড়ার পাল। চারপাশে এক অদ্ভুত নীরবতা, মাঝে মাঝে দূর থেকে একটি-দুটি গাড়ি সেই নীরবতার বুক চিরে চলে যায়।

গিলপিন নদীর ধারে লেখক
গিলপিন নদীর ধারে লেখক

গাড়ি ধীরে ধীরে পাহাড়ের গা বেয়ে ওপরে উঠতে লাগল। যত ওপরে উঠছি, ততই কাছে চলে আসছে পাহাড়ের ঢালে চরতে থাকা ভেড়াগুলো। পেছনের আসনে আরুষি আর এরিয়া ক্লান্ত অথচ মিষ্টি কণ্ঠে গেয়ে চলেছে, ‘বা বা ব্ল্যা শিপ, হ্যাভ ইউ এনি উল...?’
শিশুদের সেই গান হঠাৎ আমাকে নিয়ে গেল কয়েক শতাব্দী পেছনে, মনে পড়ল কৈশোরে পড়া ক্রিস্টোফার মার্লোর সেই বিখ্যাত প্রেমের কবিতা, দ্য প্যাশনেট শেফার্ড টু হিজ লাভ। সেখানে এক মেষপালক তার প্রিয়তমাকে প্রকৃতির সৌন্দর্যের মধ্যে তার সঙ্গে জীবন কাটানোর আহ্বান জানায়। পাহাড়, নদী, ফুল আর বসন্তের সৌন্দর্যকে ঘিরে তার স্বপ্ন—ক্ষণস্থায়ী জীবনের মধ্যেই যেন ভালোবাসার এক অনন্ত বসন্ত খুঁজে নেওয়া।

বিজ্ঞাপন

এই পাহাড়ি সৌন্দর্যের সামনে দাঁড়িয়ে মার্লোর সেই আকুলতা যেন নতুন অর্থ পেল। মনে হলো, প্রকৃতির এমন নিবিড় সান্নিধ্যে এলে মানুষও তার ভেতরের কোনো হারিয়ে যাওয়া প্রেম, সৌন্দর্য কিংবা সরলতার কাছে ফিরে যেতে চায়।

ক্রসথওয়াইট উপত্যকা
ক্রসথওয়াইট উপত্যকা

সেই অনুভূতিরই যেন আরেকটি বাঙালি প্রতিধ্বনি পাই অতুলপ্রসাদ সেনের গানে—
‘প্রকৃতির ঘোমটাখানি খোল্ লো বধূ,
ঘোমটাখানি খোল্।
আছি আজ পরান মেলি দেখব বলি—
তোর নয়ন সুনিটল…’
মার্লোর মেষপালকের প্রেম আর অতুলপ্রসাদের প্রকৃতির ঘোমটা খোলার আকুতি, দুটি ভিন্ন ভাষা, ভিন্ন সময়, অথচ অনুভূতির জায়গায় আশ্চর্য এক সেতুবন্ধন। প্রকৃতির পরম সৌন্দর্যের সামনে দাঁড়িয়ে মানুষের সেই চিরন্তন আকাঙ্ক্ষা, দেখতে চাওয়া, অনুভব করতে চাওয়া, ভালোবাসতে চাওয়া।

দুপুর গড়িয়ে বিকেল। অবশেষে আমরা পৌঁছে গেলাম আমাদের বহু প্রতীক্ষিত গন্তব্য, ক্রসথওয়াইট ভ্যালির কটেজে।

কটেজের জানালা দিয়ে বাইরে যতদুর চোখ যায়
কটেজের জানালা দিয়ে বাইরে যতদুর চোখ যায়

সামনেই ছোট্ট পাহাড়ি নদী গিলপিন। অনাবৃষ্টির কারণে জলধারা কিছুটা ক্ষীণ, তবু তার স্বচ্ছ স্রোত সারা দিন আপন মনে বয়ে চলেছে। দুপাশের পাহাড় থেকে নেমে আসা অসংখ্য ছোট ছোট ঝিরি এসে তাকে নিঃশব্দে বাঁচিয়ে রাখছে। ক্ষীণ হলেও তার চলা থেমে নেই—অবিরাম, নিরলস।

কন্ট্রাক্টস অ্যান্ড ফান্ডিং কোড
কন্ট্রাক্টস অ্যান্ড ফান্ডিং কোড

আর সেই নদীর পাড়েই লাইমস্টোনের তৈরি শতবর্ষী ছোট্ট বাড়ি, গিলপিন ভিউ। আশপাশের পাহাড়ের নরম সবুজ আদরের বাড়িটি যেন কোনো প্রিয় লকেটের মতো পাহাড়ের শরীরে লেপটে আছে। চারপাশের সবুজ, পাহাড় আর নীরবতার সঙ্গে তার এমন নিবিড় সখ্য, মনে হয় বাড়িটি এখানে তৈরি হয়নি; বরং বহুদিন ধরে এই পাহাড়েরই কোনো পুরোনো স্মৃতি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে বদলে গেল পুরো উপত্যকার দৃশ্য। আশপাশের কটেজগুলোর জানালায় একে একে জ্বলে উঠল আলো। দূর থেকে মনে হলো, পাহাড়ের বুকজুড়ে অন্ধকারের মধ্যে ছোট ছোট তারা ফুটে উঠছে। রাত যত গভীর হলো, আলোগুলো ততই মনে হলো যেন আকাশের তারার সঙ্গে মিশে যাচ্ছে।

সকালে গিলপিনের তীরে
সকালে গিলপিনের তীরে

আর নিচে, অন্ধকারের ভেতর দিয়ে গিলপিন তার ক্ষীণ জলরেখা নিয়ে বয়ে চলেছে।
ভোররাতে ঘুম ভাঙে সেই জলের শব্দে। তার সঙ্গে যোগ হয় পাখিদের কিচিরমিচির। দুইয়ে মিলে নিস্তব্ধ পাহাড়ের বুকে যেন এক অপার্থিব সিম্ফনি বাজতে থাকে।
এমন ভোরে মানুষ নিজের কাছেই ফিরে আসে।

বয়ে চলে গিলপিন
বয়ে চলে গিলপিন

শহরের কোলাহল, ব্যস্ততা, হিসাব—সব যেন দূরের কোনো জীবনের গল্প হয়ে যায়। এখানে নেই কোনো তাড়া। শুধু পাহাড় আছে, জল আছে, পাখির ডাক আছে—আর আছে ভোর হয়ে ওঠার এক অপূর্ব ধীরতা।

লেখক: ড. অসীম চক্রবর্তী,  কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও বায়োমেডিক্যাল ইনফরমেটিকস বিষয়ের শিক্ষক ও গবেষক, এংলিয়া রাসকিন বিশ্ববিদ্যালয়, কেমব্রিজ, যুক্তরাজ্য।
ছবি: লেখক

প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬: ০০
বিজ্ঞাপন