ইয়র্ক: ইতিহাসের শহর পেরিয়ে উত্তরের পথে
শেয়ার করুন
ফলো করুন

এবারের গ্রীষ্মে আমাদের পথচলার ঠিকানা উত্তর ইংল্যান্ড ও স্কটল্যান্ডের সীমান্তঘেঁষা পাহাড়ি অঞ্চল। প্রায় এক হাজার কিলোমিটারের এই রোড ট্রিপ শুরু হবে কেমব্রিজের বাড়ি থেকে। প্রথম রাতের আশ্রয় ঐতিহাসিক ইয়র্কে; তারপর ধীরে ধীরে এগিয়ে যাব লেক ডিস্ট্রিক্টের নিভৃত ক্রসথওয়াইট ভ্যালিতে, গিলপিন নদীর শান্ত পাড়ে শতবর্ষী গিলপিন ভিউ কটেজে, যেখানে চারটি দিন কেটে যাবে পাহাড়, নদী, মেঘ আর নীল আকাশের সান্নিধ্যে।

ইয়র্ক মিনিস্টারের সামনে সেলফি তুলছেন লেখক সঙ্গে তাঁর স্ত্রী মৌনি
ইয়র্ক মিনিস্টারের সামনে সেলফি তুলছেন লেখক সঙ্গে তাঁর স্ত্রী মৌনি

সেই পথে হয়তো ভ্রমর সত্যিই বিবাগি হবে কোনো নিভৃত নীল পদ্মের টানে, আকাশ নত হবে পাহাড়ের পানে, আর গিলপিনের জলের শব্দ মিশে যাবে দূরের ওউজ, ডেরওয়েন্ট, কেন্ট, ব্রথেই ও রথেই নদীর স্মৃতির সঙ্গে। তারপর আবার পথ, ল্যাঙ্কাশায়ার, ট্রেন্ট নদীর তীর, শেক্‌সপিয়ারের স্ট্র্যাটফোর্ডশায়ার, শেফিল্ড পেরিয়ে লেস্টার। সেখানে প্রিয় নাজমুল আলবাব অপু আর তুলি ভাবির বাড়িতে এক মধ্যাহ্নভোজ, কিছু আপনজনের উষ্ণতা, তারপর আবার পরিচিত ঘরের পথে ফেরা।

বিজ্ঞাপন

এই ভ্রমণ তাই শুধু এক শহর থেকে আরেক শহরে যাওয়ার গল্প নয়; এ ভ্রমণ পাহাড়ের কাছে একটু নত হওয়া, নদীর কাছে কিছুক্ষণ থেমে থাকা, নীল আকাশের নিচে নিজের ভেতরের নীরবতাকে শোনা—আর পথের বাঁকে বাঁকে খুঁজে পাওয়া কিছু দৃশ্য, কিছু মানুষ, কিছু অনুভূতি, যা ফিরে আসার পরও মনের ভেতর বহুকাল বয়ে চলে।
এই সেই যাত্রার গল্প—নীল পাহাড়, নদী আর নীরবতার দেশে।

সেইন্ট উইলফ্রিড ক্যাথলিক চার্চ
সেইন্ট উইলফ্রিড ক্যাথলিক চার্চ

রোববার সকাল প্রায় ১০টা। বাড়ি থেকে বেরোতে বেরোতেই দিন বেশ খানিকটা গড়িয়ে গেছে। তবু মন তখন উত্তরের ডাকেই সাড়া দিচ্ছে। কেমব্রিজ ছেড়ে আমরা গাড়ি ছোটালাম উত্তরের পানে। পথ যত এগোতে লাগল, শহরের পরিচিত দৃশ্য তত পেছনে পড়ে রইল। তিনটা যাত্রাবিরতি শেষে কেমব্রিজ থেকে ইয়র্কশায়ার পৌঁছাতে পৌঁছাতে দুপুর গড়িয়ে বিকেল। বিকেল সাড়ে চারটার দিকে এসে পৌঁছালাম আমাদের গন্তব্যে।

সামনে এক রাতের বিশ্রাম। কারণ, পরদিন আবার প্রায় চার ঘণ্টার ড্রাইভ, বিরতি ধরেই। কিন্তু ইয়র্কে এসে যে অভ্যর্থনা অপেক্ষা করছিল, তাতে পথের ক্লান্তি মুহূর্তেই উধাও!

বিজ্ঞাপন

ড. রব্বানীর গার্ডেনে ঢুকেই দেখি—এলাহি কাণ্ড। নিজের বাগানের কচুশাক, লাউডাঁটা চচ্চড়ি, মুরগির রোস্ট—কত কী সাজিয়ে রেখেছেন ড. রব্বানী। আমাদের জন্য অপেক্ষা করছেন, অথচ নিজেরা না খেয়ে! এত ভালোবাসার সামনে আর দেরি করার উপায় কী? বসে গেলাম। তারপর হাপুস হুপুস করে খেলাম আরজু ভাবির দুর্দান্ত রান্না। ভ্রমণের আনন্দ যে শুধু পথে পথে নয়, মানুষের ভালোবাসাতেও লুকিয়ে থাকে, সেদিন আবার মনে হলো।

ডা. রান্নানির বাড়িতে খাওয়াদাওয়া
ডা. রান্নানির বাড়িতে খাওয়াদাওয়া

খাওয়া-দাওয়া শেষে গ্রাম পেরিয়ে গমখেতের পাশে, এক বিশাল ওকগাছের ছায়ায় বসল সন্ধ্যার পঞ্চায়েত। চারপাশে ইংল্যান্ডের গ্রাম্য নৈঃশব্দ্য, দূরে ফসলের মাঠ, মাথার ওপরে আকাশ, অস্তগামী টকটকে লাল সূর্য, আর আমাদের আড্ডা। ইতিহাসের শহরে যাওয়ার আগে যেন ইতিহাসেরই এক শান্ত ভূমিকা।

যেখানে  ইতিহাসের স্তর একের ওপর এক

ইয়র্কে দাঁড়িয়ে মনে হয়, এই শহরের মাটির নিচে শুধু মাটি নেই, আছে হাজার বছরের গল্প। উত্তর সাগরের উত্তাল জলরাশি পেরিয়ে, ওউজ নদীর মোহনা ধরে ৮৬৬ সালের ১ নভেম্বর অল সেইন্টস ডেতে ভাইকিংরা অতর্কিতে এসে পৌঁছেছিল ইয়র্কের মাটিতে। স্থানীয় অ্যাংলো-স্যাক্সন রাজা অসবার্টের সঙ্গে সংঘর্ষের পর তারা ইয়র্ক দখল করে নেয়। সেই থেকেই এই শহরের ইতিহাসে শুরু হয় ভাইকিং যুগের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

ইয়র্ক মিনিস্টারের সামনে লেখক
ইয়র্ক মিনিস্টারের সামনে লেখক

অবশ্য ভাইকিংদেরও বহু আগে এই ভূমিতে এসেছিল রোমানরা। তাদের রেখে যাওয়া চিহ্ন আজও ইয়র্কের বুকের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। প্রায় দুই হাজার বছরের পুরোনো সেই রোমান স্তম্ভের সামনে দাঁড়িয়ে সময়ের হিসাব যেন হঠাৎ বদলে যায়। ৭১ খ্রিষ্টাব্দে নির্মিত রোমান সামরিক ঘাঁটি থেকে শুরু করে আজকের আধুনিক ইয়র্ক—একটি শহরের মধ্যে কত শতাব্দী যে পাশাপাশি বসবাস করছে!

আর সেই রোমান স্মৃতির কাছেই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে মধ্যযুগীয় ইয়র্ক মিনস্টার। বিশাল গথিক স্থাপত্য, আকাশছোঁয়া চূড়া, পাথরের শরীরে শতাব্দীর কারুকাজ—প্রথম দর্শনে মনে হলো, প্যারিসের নটর-ড্যামের কথা যেন মনে করিয়ে দেয়। তবে ইয়র্ক মিনস্টারের নিজস্ব মহিমা আলাদা। তার সামনে দাঁড়ালে মানুষ ছোট হয়ে যায়, ইতিহাস বড় হয়ে ওঠে। এর ঠিক সামনেই মিনস্টার ইয়ার্ডে সিংহাসনে উপবিষ্ট একটি দৃষ্টিনন্দন ব্রোঞ্জের মূর্তি চোখে পড়ে। মূর্তিটি রোমান সম্রাট কনস্টানটাইন দ্য গ্রেটের, যিনি খ্রিষ্টীয় ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সম্রাট হিসেবে পরিচিত।

ইয়র্কের বিখ্যাত রাস্তায়—দ্য শ্যাম্বলস– এর সামনে আরুষি
ইয়র্কের বিখ্যাত রাস্তায়—দ্য শ্যাম্বলস– এর সামনে আরুষি
দ্য শ্যাম্বলস
দ্য শ্যাম্বলস

তারপর হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছালাম মধ্যযুগীয় ইয়র্কের বিখ্যাত রাস্তায়—দ্য শ্যাম্বলস। সরু রাস্তা, কাঠের পুরোনো বাড়িগুলো যেন একে অপরের দিকে ঝুঁকে আছে, আর প্রতিটি মোড়েই মনে হয় কোনো পুরোনো কাহিনির দরজা খুলে যাবে। হ্যারি পটারের জাদুময় জগতের সঙ্গে এই রাস্তার তুলনা কেন করা হয়, তা সেখানে দাঁড়ালেই খানিকটা বোঝা যায়। বাস্তব আর কল্পকাহিনির মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এক আশ্চর্য জায়গা যেন।
এরপর গেলাম ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে হলো একাডেমিক ও গবেষণা নিয়ে কিছু চমৎকার আলোচনা। ভ্রমণের আনন্দের সঙ্গে জ্ঞানচর্চার এই মেলবন্ধনও বেশ উপভোগ করলাম।

আবার উত্তরের পথে

ইয়র্কে সময় থেমে থাকার সুযোগ নেই। আমাদের সামনে আবার দীর্ঘ পথ। এবার আরও উত্তরের দিকে যাত্রা। সারা দিন গাড়ি চালাতে হবে, উপত্যকা পেরিয়ে, পাহাড়ের গা বেয়ে ক্রমশ ঊর্ধ্বমুখী পথে, যেখানে আকাশ বিবাগি হয় নিভৃত নীল পদ্মের লাগি...।
গাড়ি যখন ইয়র্ককে পেছনে ফেলে এগিয়ে যাচ্ছিল, তখন মনে হচ্ছিল, এই শহরকে কি সত্যিই এক দিনে দেখা যায়?
না, যায় না।

রোমান কলাম
রোমান কলাম

ইয়র্ক এক দিনে দেখার শহর নয়। রোমান, অ্যাংলো-স্যাক্সন আর ভাইকিং—তিন তিনটি সভ্যতার স্মৃতি, মধ্যযুগের গলি, প্রাচীন স্থাপত্য, নদী, দুর্গ, গির্জা, জাদুঘর—কত কী যে রয়ে গেল অদেখা!

ইয়র্কের পথে লেখক
ইয়র্কের পথে লেখক

তবে কখনো কখনো অসম্পূর্ণতাও আশীর্বাদ হয়ে আসে। কারণ, সবটা দেখে ফেললে ফিরে আসার অজুহাত থাকে না। আর ইয়র্ক আমাকে সেই অজুহাতটুকু দিয়ে দিল।
আমার মতো যারা প্রাচীন দর্শন, স্থাপত্য, ইতিহাস আর মানুষের বহু পুরোনো যাপন ভালোবাসেন, তাঁদের কাছে ইয়র্ক নিঃসন্দেহে এক স্বর্গ।

এখানে হাঁটতে হাঁটতে শুধু রাস্তা পার হওয়া যায় না, পার হওয়া যায় শতাব্দী। একটি পাথর ছুঁয়ে মনে হয়, তারও আগে কেউ এই পাথর ছুঁয়েছিল। একটি গলি দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে মনে হয়, এই পথ দিয়েই হয়তো কোনো ভাইকিং যোদ্ধা হেঁটে গিয়েছিল। আর কোনো পুরোনো স্থাপত্যের দিকে তাকালে মনে হয়, সময় আসলে চলে যায়নি, শুধু তার পোশাক বদলেছে।
তাই বিদায়, প্রিয় ইয়র্ক।

ইয়র্ক ভাইকিংস– মধ্যযুগের রাস্তায় অবস্থিত সুভেনির শপ
ইয়র্ক ভাইকিংস– মধ্যযুগের রাস্তায় অবস্থিত সুভেনির শপ

আজ তোমার অনেক কিছুই দেখা হলো না। রয়ে গেল আরও অনেক গলি, আরও অনেক গল্প, আরও অনেক রোমান-স্যাক্সন-ভাইকিং স্মৃতিচিহ্ন।
সেই না-দেখাগুলোই আমার পরের যাত্রার ডাক হয়ে থাক।
প্রিয় ইয়র্ক, আবার আসব, তোমার বিবিধ রতন অনুসন্ধানে। (চলবে)

লেখক: ড. অসীম চক্রবর্তী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও বায়োমেডিকেল ইনফরমেটিক্স বিষয়ের শিক্ষক ও গবেষক, এংলিয়া রাসকিন বিশ্ববিদ্যালয়, কেমব্রিজ, যুক্তরাজ্য।

ছবি: লেখক

প্রকাশ: ২৮ আগস্ট ২০২৬, ০৬: ০০
বিজ্ঞাপন