
কিছুদিন আগে আমার কাছে একটি শিশুকে নিয়ে আসা হয়েছিল। ওর নাম রিদোয়ান। বেশ ভালো ছাত্রই ছিল সে। বাংলাদেশের একটি নামকরা স্কুলে পড়ত। পড়ালেখার পাশাপাশি সৃষ্টিশীল বিষয়ে ভালো হওয়ায় রিদোয়ান স্কুলে তো বটেই, দেশে–বিদেশে অনেক পুরস্কার পেয়েছে একসময়। তাকে নিয়ে তার মা–বাবাও অনেক গর্ব করত। তারপর একটা সময় এল; সে সবকিছুতে পেছাতে লাগল। সবকিছু ছেড়ে দিতে লাগল। ছাড়তে ছাড়তে একসময় রিদোয়ান স্কুলে যাওয়াটাও ছেড়ে দিল। ওর বয়স এখন বারো। তার যখন দশ বছর বয়স, তখন থেকেই সে আর স্কুলে যায় না। স্কুলে যাওয়ার কথা বললে চিৎকার করে, জিনিসপত্র ভাঙচুর করে। মা–বাবা অনেক চেষ্টা করেও সফল হয়নি। ফলে একসময় হাল ছেড়ে দিয়েছে।

রিদোয়ানকে অনেক চেষ্টা করে আমার সঙ্গে কথা বলতে রাজি করাতে পারে তার মা। শর্ত ছিল তার ভালো না লাগলে সে বের হয়ে যাবে এবং কেউ তাকে জোর করতে পারবে না। যাহোক, আমার কাছে আসার পর প্রথম সেশনেই সে বেশ ভালো অনুভব করে। পরপর সাত দিন সে আমার সেশনে যোগ অংশ নেয়। দ্বিতীয় সেশনেই সে অঝোরে কাঁদল। অতটুকু শিশুর বুকফাটা আর্তনাদ দেখে আমারই ভেতরটা হু হু করছিল। সত্যি কথা বলতে, যা শুনলাম তাতে আমি তো হতভম্ব।
রিদোয়ান জানায়, তাকে ক্লাসের কিছু ছেলে টার্গেট করে এবং সবকিছুতেই তাকে বুলি করা শুরু করে। একদিন সেই ছেলেগুলো ক্লাসের বিরতিতে ক্লাসের ভেতর জোর করে তার প্যান্ট খুলে ফেলে এবং তার গোপনাঙ্গ নিয়ে হাসাহাসি করে। এর কিছুদিন পর থেকেই সে পিটিএসডিতে আক্রান্ত হয়। অথচ এত বড় একটি ঘটনার কথা শিশুটির মা–বাবা জানতই না।

স্কুল বা মহল্লা বা অ্যাপার্টমেন্টের অন্য শিশুদের দ্বারা খুব বাজেভাবে বুলিংয়ের শিকার হওয়া শিশুরা প্রায়ই আমার কাছে আসে। বুলিং একটি গুরুতর সামাজিক সমস্যা, যা সারা বিশ্বেই শিশুদের জন্য একটি বড় হুমকি হিসেবে কাজ করছে। কিছু শিশু অন্য শিশুদের নিপীড়ন, হাসি-ঠাট্টা এবং শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন করে অনেক বিকৃত আনন্দ পায়। বুলিংয়ের ফলে অনেক শিশু মানসিক চাপ, জটিলতা এবং পিটিএসডিতে (পোস্টট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডার) আক্রান্ত হয়।
বুলিং হলো এমন আচরণ, যেখানে একজন বা একটি দল অন্যজনকে নিয়মিত এবং উদ্দেশ্যপূর্ণভাবে নির্যাতন করে। এটি শারীরিক, মানসিক বা সামাজিক আক্রমণের মধ্যে পড়ে। বুলিংয়ের শিকার শিশুরা একাকিত্ব, অসহায়ত্ব, উদ্বেগ, আতঙ্ক, ভীষণ ভয়, উৎকণ্ঠা, অবিচার, নিজের অক্ষমতার অনুভূতি নিয়ে ধুঁকতে থাকে, যা তাদের মানসিক স্বাস্থ্যকে দীর্ঘ মেয়াদে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

অতিরিক্ত মানসিক চাপ, আতঙ্কের কারণে শিশুদের অ্যামিগডালা বেড়ে যায়। অ্যামিগডালা মস্তিষ্কের সেই অংশ, যা ভয় ও উদ্বেগ তৈরি করে। বুলিংয়ের কারণে উদ্বেগ বেড়ে যাওয়ার ফলে অ্যামিগডালার কার্যকলাপ বেড়ে যায়, যা তাদের ভয় এবং উদ্বেগের প্রতিক্রিয়া বাড়ায়। ভয়ানক বুলিংয়ের শিকার শিশুরা প্রায়ই তাদের মস্তিষ্কের মধ্যে স্নায়বিক সংযোগে পরিবর্তন অনুভব করে। দীর্ঘস্থায়ী চাপ মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশের কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়। শিশুরা তাদের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে অক্ষম হয়ে পড়ে। তারা ভীষণভাবে উদ্বিগ্ন ও ভয়ার্ত হয়ে পড়তে পারে; এতে করে তাদের দুঃখ বা রাগ প্রকাশ করতে সমস্যা হয়। মানসিক চাপের কারণে শিশুদের শ্বাসকষ্ট, মাথাব্যথা এবং পেটের সমস্যা দেখা দিতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ শারীরিকভাবে অসুস্থতার দিকে নিয়ে যেতে পারে।
আরেকটি শিশুকে আমার কাছে আনা হয়েছিল তখন তার বয়স দশ বছর। ওই ছেলেটির নাম আনাস। তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, স্কুলের ওপরের ক্লাসের কিছু শিশু মিলে তাকে বুলিং করে। আনাস চশমা পরে থাকত। সেই শিশুরা তার চশমা চোখ থেকে খুলে নিয়ে ভেঙে দেয়। আনাস তার শিক্ষকদের কাছে নালিশ করে। কিন্তু সেই শিশুরা স্বীকার করেনি তাদের অপরাধ। একে অপরকে সাহায্য করে এবং প্রমাণ করে যে ওই শিশুটি মিথ্যা বলছে।
এরপর প্রধান শিক্ষক আনাসের মা–বাবাকে ডেকে এনে জানায় যে তাদের ছেলে বেশ মিথ্যা বলতে শিখেছে; নিজের চশমা ভেঙে অন্যদের ফাঁসাতে চাইছে। অপমানিত মা–বাবা ছেলের কথা না শুনে বা বিশ্বাস না করে বাসায় এসে তাকে অনেক বকাঝকা করে। এর ফলে যা হবার তা–ই হয়। আনাস পড়ালেখা ছেড়ে দেয়। সারা দিন ঘর অন্ধকার করে বসে থাকা শুরু করে। একটা সময় ঘুমাতেও পারত না। আমার কাছে বেশ কয়েক মাস চিকিৎসা নেওয়ার পর আনাস ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠে।
দুটো শিশুই এখন ভালো আছে। উভয়েই নতুন স্কুলে ভর্তি হয়েছে এবং পিটিএসডির কালো থাবা থেকে পরিত্রাণ পেয়েছে। তবে শিশুদের বুলিং নিয়ে কাজ করতে গিয়ে দেখেছি যে মা–বাবা ও শিক্ষকদের অসচেতনতা, শিক্ষকদের একপেশে সিদ্ধান্ত যেকোনো শিশুকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেয়। এ ক্ষেত্রে বুলিং নিয়ে স্কুলে প্রচারণা চালানো প্রয়োজন। পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করাও জরুরি। অভিভাবক ও শিক্ষকদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক প্রশিক্ষণের আয়োজন করাটা যুক্তিযুক্ত।

শিশুরা সব সময় মিথ্যা বলে না। কিছু বিষয় আছে তারা অনন্যোপায় না হলে বলে না। এটা অভিভাবক এবং শিক্ষকদের মাথায় রাখতে হবে। প্রয়োজনে যথাযথ ইনভেস্টিগেশন করতে হবে। এ ছাড়া শিশুরা যেন সহজে এসে মা–বাবাকে যেকোনো কিছু বলতে পারে, এতটুকু আস্থার সম্পর্ক শিশুর জন্য তৈরি করে দিতে হবে। শিশুটি যেকোনো ধরনের মানসিক চাপ অনুভব করলে, তার কথা শোনার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সাহায্য প্রদানের মাধ্যমে তার পাশে দাঁড়ানোর প্রস্তুতি নিতে হবে। স্কুলে কাউন্সেলিং সেবার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সহায়তা করলে তারা আরো আত্মবিশ্বাসী হতে পারে।
শিশুদের জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। এর মাধ্যমে তারা একে ওপরের আবেগ বুঝতে সক্ষম হবে, একে অন্যের প্রতি সহানুভূতিশীল হতে শিখবে। তাদের অনুভূতিকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করতে এবং সেগুলোকে স্বাস্থ্যকর উপায়ে প্রকাশ করতে শেখাতে হবে। এ জন্য স্কুলে বিভিন্ন কর্মশালার আয়োজন হতে পারে যথার্থ; তাহলে তারা এসব কর্মশালায় অংশ নিয়ে অভিনয়, শিল্পকর্ম, সৃজনশীল লেখালেখি ইত্যাদির মাধ্যমে তাদের আবেগ প্রকাশের সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে পারবে। মোদ্দা কথা হলো, শিশুরা নিজেদের অনুভূতি যথার্থভাবে প্রকাশ করার মধ্যে তাদের নিজেদের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার শক্তি অর্জন করবে। আমরা সবাই যে মুক্ত সমাজ চাই, সেটা তখনই সম্ভব যদি ছোট থেকে শিশুদের মানসিকভাবে সুস্থ করে গড়ে তোলা যায়।
লেখক: একাধারে নেচারোপ্যাথিক ডাক্তার, পুষ্টিবিদ, কিনেজিওলজিস্ট, ট্রমা রিলিজ থেরাপিস্ট, অটিজম স্পেশালিস্ট, মাইন্ড সেট ট্রেইনার। তিনি কাজ করছেন লন্ডনের ১০, হারলে স্ট্রিট ক্লিনিক এবং অনলাইনেও আছে তাঁর উপস্থিতি।
ই–মেইল: [email protected]
ছবি: চ্যাটজিপিটি