
অনেকেই বলেছেন কোভিডের কারণে শিশু-কিশোর এবং তরুণ প্রজন্ম তথা জেন-জিদের কী রকম মানসিক সমস্যা হচ্ছে, তা নিয়ে লেখার জন্য। এটা সত্যি যে কোভিডের সময় থেকে শিশু-কিশোর এবং তরুণ প্রজন্মের মধ্যে আতঙ্ক অনেক বেড়ে গেছে। আমি নিজেই সেই সময় থেকে মানসিক অবসাদগ্রস্ত শিশু-কিশোর রোগী অনেক পেয়েছি এবং এখনো পেয়ে যাচ্ছি। এমনকি গত সপ্তাহেই ২২ বছর বয়সী একটি মেয়েকে নিয়ে তার মা এসেছিলেন। মেয়েটি কোভিডের পর থেকে সম্পূর্ণ কনফিডেন্স হারিয়ে ফেলেছে। মেয়েটি পড়াশোনা, কাজকর্ম, বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে বেড়াতে যাওয়া—সবকিছু বন্ধ করে দিয়েছে। এমনকি একটি সময় সে ভলান্টিয়ার হিসেবে কাজও করত অন্যদের সাহায্য করার জন্য। সেই মেয়েটি সবকিছু ছেড়ে দিয়েছে দেখে আক্ষেপ লেগেছে।
কেন কোভিড চলে যাওয়ার পরও জেনারেশন-জিকে পিটিএসডি জাপটে ধরে আছে? কোভিড স্বাস্থ্য ছাড়াও সামাজিক, মানসিক ও অর্থনৈতিক খাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এই মহামারির সবচেয়ে হৃদয়বিদারক দিক ছিল পরিবারের প্রিয়জনদের আকস্মিক মৃত্যু। অনেক পরিবার তাদের ঘনিষ্ঠ সদস্যদের হারিয়েছে। তরুণদের জন্য এটি গভীর শোক এবং মানসিক আঘাতের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জেনারেশন-জির ছেলেমেয়েরা অনেক আধুনিকভাবে বড় হয়েছে। তাদের ডিজিটাল জীবন এক ধরনের ছকের মালার আদলে চলে যাচ্ছিল। সেই মাধ্যমে অভ্যস্ত প্রজন্ম রাতে ঘুমায়নি রাতের পর রাত। খেয়েছে ফাস্ট ফুড বা কম পুষ্টিগুণসম্পন্ন খাবার। তাদের অনেকেরই পারিবারিক জীবন ছিল টালমাটাল। কোভিড তাদের অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু চ্যালেঞ্জের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। মানুষ আধুনিক জীবনযাত্রার নাম করে যে আসলে একে ওপর থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছিল, তেমনি শিশুরাও সেই জীবনে অভ্যস্ত ছিল। জেন-জি প্রজন্ম এই প্রথম মৃত্যু, আতঙ্ক, হতাশা, খাবারের কষ্ট, নিরাপত্তাহীনতা, লকডাউনকে এত কাছ থেকে এত দীর্ঘ সময়ের জন্য দেখেছে।

সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছিল পড়াশোনা আর চাকরির ক্ষেত্রে। স্কুল, কলেজ, ইউনিভার্সিটি বন্ধ হয়ে গেল। কাজে যাওয়া বন্ধ হয়ে গেল। টিভিতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সারাক্ষণ মৃত্যুর খবর চলছিল। কাছের মানুষের মৃত্যু, দূরের মানুষের মৃত্যু, নিজের জীবনের অনিশ্চয়তা, প্রিয় মানুষকে হারানোর আতঙ্ক—সবকিছু মিলিয়ে মস্তিষ্কে বড় ধরনের পরিবর্তন হয়ে যায়। কী কী পরিবর্তন হয়েছে, তা পিটিএসডি নিয়ে আমার আগের লেখা দুটি পড়লেই ধারণা পাবেন। এ সময় যদিও মানুষ অনলাইনে পড়াশোনা, অনলাইনে চাকরি ইত্যাদিতে অভ্যস্ত হওয়ার চেষ্টা করেছিল; কিন্তু ব্যক্তিগত যোগাযোগের বিকল্প হতে পারেনি। সেই সংকট এখনো চলছে। এই যে সংকট চলছে, এটাই পিটিএসডি। মানুষের কাছে গেলে, বাইরে গেলে মারা যেতে পারে, এই নিরাপত্তাহীনতা এবং প্রায় দুই বছরের জন্য নিজের জীবনের ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণ চলে যাওয়াটাই কোভিডজনিত পিটিএসডির মূল কারণ।
আমার কিছু রোগী আছে, যারা এত বেশি মাত্রায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যে তারা অ্যাগ্রোফোবিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ছেলে-মেয়ে একই পরিমাণে আক্রান্ত হয়েছে। তারা কোনো সেন্টারে পরীক্ষা দিতে গেলে বা কোনো কারণে বাইরে যেতে হলে আতঙ্কে ভুগতে শুরু করে এবং প্যানিক অ্যাটাক শুরু হয় এবং আমাকে অনলাইনে ইমার্জেন্সি সেশন নিয়ে তাদের স্বাভাবিক করতে হয়। একটা বড় ভয় যে বাইরে গেলে কোভিড তাদের ধরবে বা মেরে ফেলবে। তাই তারা ডিজিটাল পড়াশোনা, ডিজিটাল চাকরি এবং ডিজিটাল সম্পর্কের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। তারা বাইরে গিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে আর আড্ডা দিতে পারে না। ভালোবাসার মানুষকে জড়িয়ে ধরতে পারে না। বাইরে গিয়ে চটপটি, ফুচকা খেয়ে, হই-হুল্লোড় করতে পারে না। অনেক ক্ষেত্রে তাদের বাবা-মায়েরা, ভাইবোনেরা, মামা-চাচা, শিক্ষক তথা পরিবারের সবাই এবং তাদের আশপাশের সমাজের সবাই একটি অপ্রাকৃতিক ভয়ে অন্য রকম আচরণ করে।
আমার এক জেন-জি রোগী ২০২০ সালের মার্চে আমেরিকা স্বামীর কাছে যাওয়ার পর লকডাউন শুরু হয় এবং সে প্লেন জার্নি করায় তার কোভিডে আক্রান্ত হয়েছিল। তার স্বামী আতঙ্কিত হয়ে বাসা ছেড়ে চলে গিয়েছিল। সেই মেয়েটি কিছু চিনতে পারছিল না নতুন দেশে। কোনো সাহায্য ছাড়া ঘরের ভেতর একা একা পড়েছিল। সে বেঁচে ছিল এবং এখনো বেঁচে আছে কিন্তু সে গত বছর স্বামীকে ডিভোর্স দিয়ে দেশে ফিরে গেছে।
বর্তমানে সে মানসিক রোগীতে পরিণত হয়েছে। আমি তার সেশন নিচ্ছি। সে অনেক বেশি আতঙ্কগ্রস্ত। কোনোভাবেই সে তার শারীরিক যন্ত্রণা, মানসিক কষ্ট, নতুন দেশে একটি ঘরে একা পড়ে থাকা, ঘরে কোনো খাবার না থাকা, ক্ষুধার কষ্ট, সর্বোপরি যে মানুষটির জন্য দেশ ছেড়ে, বাবা-মা ছেড়ে নতুন একটি দেশে গেছে, সে মানুষটি তাকে কোনো ধরনের সহায়তা করেনি। ডাক্তার, হাসপাতাল, চিকিৎসা, খাবার, পানি কোনো কিছুর ব্যবস্থা করেনি। বরং তাকে ফেলে ঘর ছেড়ে পালিয়ে গেছে। এ রকম নির্মমতার শিকার তাকে হতে হয়েছে, এটা সে এখনো মেনে নিতে পারছে না। এই মেয়েটি একসময় সুস্থ হবে আমার আরও অনেক রোগীর মতো। কিন্তু তার সুন্দর জীবন পিটিএসডির করাল গ্রাসে তলিয়ে গেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী কোভিডের পর থেকে তরুণদের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা ২৫ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।

কোভিডজনিত পিটিএসডির প্রধান দুটো বৈশিষ্ট্য হলো, মানুষকে এড়িয়ে চলা এবং সব বিষয়ে অতিরিক্ত সচেতনতা অবলম্বন করা; যার ফলে রোগী নিজে এবং তার পরিবারের সবার জন্য দৈনন্দিন জীবন সহজভাবে যাপন করা বেশ কঠিন হয়ে পড়ে। এর সঙ্গে তো হতাশা, রাগ, অপারগতার কারণে মুড সুইং হতে থাকে। একটি বিষয় পরিষ্কার হয়ে গেছে যে জেন-জি প্রজন্ম দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর ক্ষমতা তুলনামূলকভাবে কম। তাই তারা সামাজিক চাপ ও মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা মোকাবিলায় বেশি সংবেদনশীল আচরণ করে।
জেনারেশন–জির সদস্যরা কোভিডের কারণে যে মানসিক চাপ ও পিটিএসডিতে ভুগছে, তা তাদের দৈনন্দিন জীবনকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করছে। তারা একাকী অনুভব করে, পড়াশোনা ও কাজের চাপ বাড়ছে এবং সামাজিক সম্পর্কগুলোয় দূরত্ব তৈরি করে দিচ্ছে। এই পরিস্থিতি তাদের স্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে, যা ভবিষ্যতে তাদের কর্মজীবন ও সম্পর্কগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এ ছাড়া গবেষণায় দেখা গেছে যে এই প্রজন্মের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। কারণ, একাকিত্ব এবং কিছু করতে না পারার অসহায়ত্ব। মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যাগুলো তাদের জীবনযাত্রার মানকে হ্রাস করছে এবং অনেকেই উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং হতাশায় ভুগছে। এ কারণে, তাদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলো যেমন কলেজের জীবন, কর্মসংস্থান এবং সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তাদের চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হচ্ছে।
প্রতিকারের জন্য নিজের চিন্তাভাবনা ও মস্তিষ্কের ওপর নিয়ন্ত্রণ নেওয়া খুব জরুরি
পুষ্টিকর খাবার খাওয়া, নিয়মিত এক্সারসাইজ করা, রাতে সময়মতো ঘুমাতে যাওয়াটা খুব জরুরি। এর সঙ্গে থাকতে হবে নিয়মিত ট্রমা রিলিজ এবং মেডিটেশন। নেতিবাচক চিন্তা করা মস্তিষ্কের একটি প্রোগ্রাম। এখান থেকে বের হয়ে আসর জন্য নিয়মিত ইতিবাচক অ্যাফারমেশন খুব জরুরি। অ্যাফারমেশন হলো একটি ইতিবাচক বাক্য বারবার বলা। যেমন ‘আমি এখন ২০২৪ সালে আছি এবং আমি নিরাপদ।’ অথবা ‘আমার সঙ্গে কোভিডের সময় যা হয়েছে, তা থেকে আমি বেঁচে ফিরেছি এবং আমি ভালো আছি ও ভালো থাকব।’ এর সঙ্গে ধীরে ধীরে শ্বাস নিয়ে নিজের নার্ভাস সিস্টেমকে পেরিফেরাল নার্ভাস সিস্টেমে এনে শান্ত করুন এবং শান্ত থাকুন। নিজেকে বের করে আনুন পিটিএসডির অন্ধকার থাবা থেকে।
লেখক: একাধারে নেচারোপ্যাথিক ডাক্তার, পুষ্টিবিদ, কিনেজিওলজিস্ট, ট্রমা রিলিজ থেরাপিস্ট, অটিজম স্পেশালিস্ট, মাইন্ড সেট ট্রেইনার। তিনি কাজ করছেন লন্ডনের ১০, হারলে স্ট্রিট ক্লিনিক এবং অনলাইনেও আছে তাঁর উপস্থিতি।
ই–মেইল: [email protected]
ছবি: চ্যাটজিপিটি