আর্কা ফ্যাশন উইকে সুপারহিট থ্রিফটিং
শেয়ার করুন
ফলো করুন

শেষ হলো জাঁকজমকপূর্ণ প্রথম আর্কা ফ্যাশন উইক। এটি আর্কা স্টুডিওর একটি উদ্যোগ। ২৬ থেকে ২৮ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হয় ফ্যাশনের এই বর্ণাঢ্য আয়োজন। এই তিন দিন ফ্যাশনপ্রেমী তরুণ, ইনফ্লুয়েন্সার ও উদ্যোক্তাদের পদচারণে মুখর ছিল রাজধানীর গুলশান লিংক রোডের আলোকি কনভেনশন সেন্টার প্রাঙ্গণ।

আয়োজনে ৩৫টি ফ্যাশন ব্র্যান্ড ও ডিজাইনার লেবেল অংশ নিয়েছিল। মিস্টার ও মিস সেলিব্রিটি বাংলাদেশ-এর গ্র্যান্ড ফিনালে, ১৫টি নতুন সম্ভাবনাময় ব্র্যান্ডের ফ্যাশন শো, ১০ জন প্রতিভাবান শিল্পীর শিল্পকর্ম প্রদর্শন ও বাংলাদেশের জনপ্রিয় ৫টি ব্যান্ডের কনসার্ট অনুষ্ঠিত হয়েছিল এখানে। এ ছাড়া ছিল ডিজাইন ল্যাবে দর্শনার্থীদের ডিজাইনার হয়ে ওঠার অনন্য সুযোগ। তবে সবচেয়ে জমজমাট ছিল আলোকি কনভেনশন সেন্টারের মেইন হলের মার্কেটপ্লেস।

এই মার্কেটপ্লেসে দেশের ৫০ জন মেধাবী ও উদ্যমী উদ্যোক্তা ছোট-বড় স্টলে তাঁদের তৈরি পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসেছিলেন। এখানে পাওয়া গেছে ওয়েস্টার্ন, ফিউশন, ট্র্যাডিশনাল, সাসটেইনেবল, থ্রিফট, শৈল্পিক পোশাকসহ নানা ধরনের অনুষঙ্গ। দর্শনার্থীরা ব্যাপক উৎসাহের সঙ্গে প্রদর্শিত পণ্যগুলো ক্রয় করেছেন। তবে এখানে জেন-জি ফ্যাশনপ্রেমীদের আকর্ষণের মূলে ছিল থ্রিফট স্টোরগুলো। আর্কা ফ্যাশন উইকের তিন দিন এই থ্রিফট স্টোরগুলোতে প্রচুর কেনাবেচা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

গত কয়েক বছরে ফ্যাশন–বিশ্বের অনেক পরিবর্তন হয়েছে। পরিবর্তন না বলে সংস্কার বললেও খুব একটা ভুল হবে না। পরিবেশের ক্ষতির জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী ফ্যাশন–শিল্প নিজেদের পাপ মোচন করতে সাসটেইনেবিলিটির পথ ধরেছে। টেকসই ফ্যাশনের জোয়ারে ভেসে এসেছে প্রি-লাভড বা সেকেন্ডহ্যান্ড ফ্যাশন। পৃথিবীর প্রয়োজনে পরিবেশসচেতন মানুষেরা থ্রিফট স্টোর থেকে কেনাকাটা করছেন। থ্রিফটিং সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় হয়েছে জেন-জিদের কাছে। এমনকি অনেক মিলেনিয়ালরাও ঝুঁকছেন এই দিকে। তাঁদের জন্য গত বছর পশ্চিমা ফ্যাশনের সবচেয়ে বড় ট্রেন্ড হয়েছে থ্রিফট শপিং। আমাদের দেশেও বেশ জনপ্রিয় হয়েছে ফ্যাশনের এই টেকসই ধারা। তার প্রমাণ মেলে আর্কা ফ্যাশন উইকের মার্কেটপ্লেসের থ্রিফট স্টোরগুলোতে।

আমাদের দেশে একদল দৃঢ়চেতা ফ্যাশনমনস্ক তরুণ–তরুণী ধীরে ধীরে একটি অনলাইনভিত্তিক থ্রিফট কমিউনিটি গড়ে তুলছে। তাদেরই একটি অংশ আর্কা ফ্যাশন উইকের মার্কেটপ্লেসে সেকেন্ডহ্যান্ড পণ্য নিয়ে হাজির হয়েছিল। তবে এখানে একটি কথা না বললেই নয়। সব থ্রিফট স্টোরে ব্যবহৃত সেকেন্ডহ্যান্ড পোশাক ছিল না। কিছু বিক্রয়কেন্দ্রে ছিল এমন পোশাক, যা ফাস্ট ফ্যাশনের চক্করে পড়ে কখনো কোনো দোকানে বিক্রির সুযোগই পায়নি। আবার আমাদের দেশের গার্মেন্টসের পরিত্যক্ত পোশাকগুলোকে নতুন জীবন দেওয়া হয়েছে এই থ্রিফট স্টোরগুলোতে।

বিজ্ঞাপন

আর্কা ফ্যাশন উইকের প্রথম দিন মার্কেটপ্লেসে মাঝারি মাত্রায় কেনাবেচা হয়েছে। দ্বিতীয় দিন শুক্রবার থাকায় প্রচুর দর্শনার্থীর সমাগম হয়েছিল। সন্ধ্যায় সেখানকার আলো থ্রিফট শপে গিয়ে দেখা যায় প্রচুর ভিড়। সবাই একের পর এক পণ্য দেখছেন এবং পছন্দমতো পণ্য পেলেই কিনে ফেলছেন। এমনকি কয়েকজনকে পোশাক নিয়ে কাড়াকাড়িও করতে দেখা গেছে। কারণ, এই আলো থ্রিফট শপে কিছু বিখ্যাত ব্র্যান্ডের ট্র্যাডিশনাল ও ওয়েস্টার্ন পোশাক পানির দামে বিক্রি করা হচ্ছিল। সেই দিনই তাদের স্টক আউট হয়ে যায়।

আলো থ্রিফট শপের মতোই সেকেন্ডহ্যান্ড ও পরিত্যক্ত পোশাকের সম্ভার নিয়ে এসেছিল ভিন্টেজ অল দ্য ওয়ে, জায়ন, কার্পাস, থ্রিফট আর আস। এখানে বলে রাখা ভালো যে এই থ্রিফট স্টোরগুলোর বেশির ভাগ কর্ণধারেরা হয় ও লেভেল বা এ লেভেল পড়ছে বা পাস করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতি নিচ্ছেন। যেমন ভিন্টেজ অল দ্য ওয়ের স্বত্বাধিকারী ইসরাত নাহার বর্তমানে উত্তরার ইন্টারন্যাশনাল হোপ স্কুল বাংলাদেশে এ লেভেলে পড়ছে। গত বছর ও লেভেল পরীক্ষার পর ছুটির সময়গুলোতে অনলাইনে এই থ্রিফট স্টোরটি খুলে বসে সে। তাকে সহায়তা করেন তার মা রাবেয়া বেগম। আর্কা ফ্যাশন উইকের মার্কেটপ্লেসে মা-মেয়ে মিলে একটা ছোট স্টল দিয়েছিলেন। রাবেয়া বেগমের কাছ থেকে জানা গেল, ভিন্টেজ অল দ্য ওয়ের পুরোনো পোশাকগুলো সব জাপান থেকে আমদানি করা। জাপানের বিভিন্ন পোশাকের দোকানের পরিত্যক্ত পোশাকগুলো সেখান থেকে বিভিন্ন দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। রাবেয়া বেগম বাংলাদেশের ডিলারের মাধ্যমে এই পোশাকগুলো সংগ্রহ করেন। এগুলোর দাম কোয়ালিটিভেদে ২০০ থেকে ৩০০০ টাকার মধ্যে নির্ধারণ করা হয়। পোশাকের দাম একদম হাতের নাগালে হওয়ায় এবার প্রচুর কেনাবেচা হয়েছে তাঁদের।

ভিন্টেজ অল দ্য ওয়ের মতো থ্রিফট আর আস, জায়ন ও কার্পাসে বেশ ভালোই ভিড় দেখা গেছে। বেশির ভাগ ক্রেতাই জেন-জি ও মিলেনিয়াল। তাঁদের মধ্যে একজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার শিক্ষার্থী রূহানী। প্রায় দুই বছর ধরে তিনি থ্রিফটিং করছেন। তিনি বলেন, ‘এখন স্টুডেন্ট দেখে দৈনন্দিন পোশাকের বাজেট কম থাকে। নিউমার্কেট, গাউসিয়া, নুরজাহান মার্কেট ঘুরে কমের মধ্যে পোশাক কেনাই যায়। কিন্তু সেগুলো বেশি দিন টেকে না। কিন্তু থ্রিফটিং করলে কম দামে অনেক ভালো ব্র্যান্ডের ভালো মানের পোশাক হাতের নাগালে চলে আসে। এ জন্যই প্রথমে থ্রিফটিং-এর প্রতি আমার আগ্রহ বাড়ে। আর পরিবেশ রক্ষার তাগিদ তো আছেই। সব মিলিয়ে এটি একটা দারুণ সমাধান।’ রূহানীর মতো একই চিন্তা করেই আমাদের দেশের বেশির ভাগ তরুণ-তরুণী থ্রিফট শপ খুলছেন এবং সেখান থেকে কেনাকাটা করছেন। ভবিষ্যতে এর পরিমাণ অনেক বেশি বাড়বে। আর্কা ফ্যাশন উইক সেই আভাসই দিয়েছে।

ছবি: খালেদ সরকার

প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৩, ০৮: ১৪
বিজ্ঞাপন