
কখনো আটপৌরে সারোয়ার-কামিজে পাশের বাড়ির মেয়ে, কখনো কেজো ইউনিফর্মে নার্স, আবার হঠাৎ কোনো দৃশ্যে অস্ত্রধারী, নির্দয় আততায়ীর শ্বাসরুদ্ধকর বেশভূষা—একই মানুষকে একই ছবিতে ভিন্ন ভিন্ন রূপে উপস্থাপন করতে একটি বিষয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আর তা হলো একেবারে মোক্ষম সময়ে সঠিক পোশাক। আর নানারূপে উপযুক্ত পোশাকের জন্য প্রয়োজন যথাযথ কস্টিউম ডিজাইন। ১৫ সেপ্টেম্বর মুক্তি পাওয়া ওয়েব চলচ্চিত্র ‘নিঃশ্বাস’–এ এই কাজটি যথেষ্ট দক্ষতার সঙ্গে করেছেন কস্টিউম ডিজাইনার বীথি আফরীন।
পরিচালক রায়হান রাফিও বললেন, এ ধরনের চরম বাস্তবধর্মী চলচ্চিত্রে চরিত্রগুলো দর্শকের কাছে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে উপযুক্ত পোশাক পরিকল্পনার কোনো বিকল্প নেই। আর নিঃশ্বাস ছবিতে যেখানে প্রধান চরিত্রগুলো পর্যায়ক্রমিক পরিবর্তন বা ট্রান্সফরমেশনের মধ্য দিয়ে যাওয়ার ব্যাপারটি স্পষ্ট হয়েছে, সেখানে এই বিষয়টির গুরুত্ব আসলে আরও বেড়ে যায়। তাই ‘টান’ ও ‘ফ্লোর নম্বর ৭’-এ তাঁর সঙ্গে কস্টিউম নিয়ে কাজ করে দারুণ রিয়েলিস্টিক লুক তৈরি করা বীথি আফরীনের ওপরেই রাফি আস্থা রাখেন অন্য ধরনের ছবি ‘নিঃশ্বাস’-এর জন্য৷ নিরাশ যে করেননি বীথি, তার প্রমাণ আমাদের সামনেই।
প্রথমেই চলে আসে কেন্দ্রীয় চরিত্র নিপা। এই চরিত্রে অভিনয় করেছেন এই সময়ের সাড়াজাগানো অভিনেত্রী তাসনিয়া ফারিণ। তিনি বর্তমান সময়ে নন–গ্ল্যামারাস, বাস্তবধর্মী চরিত্রগুলোতে দর্শকের মন জয় করে নিয়েছেন। ‘নিঃশ্বাস’ ছবিতে তাঁর পোশাকে দেওয়া হয়েছে সর্বোচ্চ মনোযোগ৷ মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়েদের নিত্যদিনের পরিধেয় সারোয়ার-কামিজেই তিনি দেখা দিয়েছেন প্রথমে। আটপৌরে ভাব আনতে পোশাকগুলোতে ধুয়ে-শুকিয়ে ওয়েদারিং করা হয়েছে। এরপর আসে তাঁর নার্সের কস্টিউমের কথা। নার্সের পোশাকটি সত্যিকারের সেবিকাদের পোশাক থেকেই প্রাণিত কিন্তু এটি যেন কোনো বিশেষ প্রতিষ্ঠানের পোশাকের প্রতিনিধিত্ব না করে, সেদিকেও খেয়াল রাখা হয়েছে।
এই ছবিতে বিশ্বাসযোগ্য চরিত্রের পোশাক পরিকল্পনার সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষাটি দিয়েছেন বীথি শেষের দিকে, ফারিণের আততায়ী রূপটিকে নিখুঁতভাবে উপস্থাপন করতে গিয়ে। বেশ কয়েকবার বিভিন্নভাবে বিভিন্ন পোশাকে ট্রায়াল দিয়েই এই কস্টিউমটি চূড়ান্ত করা হয়। তারপরও কোথাও কী যেন মিসিং—এমন ভাবনা থেকেই বীথি উদ্যোগ নেন তাসনিয়া ফারিণের ভ্রু অন্যভাবে শেপ দিতে। এতে কস্টিউমের সঙ্গে কপ্লিমেন্ট করা একটি শীতল, ক্রুদ্ধ আর স্থির লুক আসে তাঁর মধ্যে।
আরেক গ্ল্যামার-কন্যা, জনপ্রিয় তারকা সাফা কবিরের কস্টিউম এমনভাবে ঠিক করেছেন বীথি, যেভাবে এর আগে সাফাকে কেউ দেখেনি। পোশাকের পারিপাট্য এড়িয়ে এক উদ্ভ্রান্ত, বিপদগ্রস্ত, অস্থির চরিত্রের উপযুক্ত চিত্রায়ণ দেখি এখানে আমরা। ডাক্তার, নার্স, রোগীদের সবার কস্টিউমই অত্যন্ত বাস্তবধর্মী। মনে হচ্ছে দেখে, এ এক সত্যিকারের হাসপাতালেরই ভেতরের দৃশ্য। ছবির গুরুত্বপূর্ণ দুই পুরুষ চরিত্রে ইমতিয়াজ বর্ষণ আর সায়েদ জামান শাওনের কস্টিউমও অত্যন্ত বাস্তবধর্মী মনে হয়েছে। সব চরিত্রের পোশাকের ক্ষেত্রেই একধরনের মোনোটোন ধাঁচের কালার প্যালেটের ব্যবহার লক্ষণীয়। কোথাও খুব উজ্জ্বল বা বহুবর্ণিল কাপড়ের ব্যবহার করেননি বীথি।
আসলে রিয়েলিস্টিক কস্টিউম ডিজাইন ফ্যাশন ডিজাইনিংয়ের থেকে একেবারেই আলাদা। ঢাকার ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলপমেন্ট অলটারনেটিভ থেকে মেজর-ইন-পেইন্টিংয়ে স্নাতক ডিগ্রি নিয়ে পরে নিজের আগ্রহেই চলচ্চিত্রজগতে পা রাখেন বীথি আফরীন। ২০১৭ সালে চ্যানেল আইয়ে ‘সাত ভাই চম্পা’ সিরিজ দিয়ে শুরু। এরপর ‘টান’, ‘রেডরাম’, ‘ফ্লোর নম্বর ৭’—ফিরে তাকাতে হয়নি এই কস্টিউম ডিজাইনারকে। কাহিনির সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত করে বাস্তবধর্মী লুক তৈরির দক্ষতাই তাকে রায়হান রাফির মতো নির্মাতাদের কাছে এক নির্ভরযোগ্য করে তুলেছে। অবশ্য এ ধরনের কাজ করতে তিনি ভালোবাসেন। সেই আন্তরিকতা আর নিষ্ঠার ছাপ ‘নিঃশ্বাস’ ছবির পরতে পরতে সুস্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।