
‘থমথমে পরিবেশ, শুধুই নিশ্বাসের শব্দ শোনা যায়,’ টিজারটি পোস্ট করার সময় এ কথাই লিখেছেন রায়হান রাফি। ১৫ সেপ্টেম্বর ওটিটি প্ল্যাটফর্ম চরকিতে মুক্তি পেয়েছে মেধাবী নির্মাতা রায়হান রাফির ছবি ‘নিঃশ্বাস’। এটা চরকির অরিজিনাল ফিল্ম।
‘কাউকে বিশ্বাস করা যায় না, ট্রাস্ট নো ওয়ান,’ এমন বার্তা দেওয়া টিজার ও ট্রেলারে ছবির কলাকুশলীদের একেবারে বাস্তবধর্মী লুক, দম বন্ধ করা দৃশ্যপটে পরপর ঘটে যাওয়া ভয়ংকর ঘটনাবলির আলামত আর আলো-আঁধারিময় বিবর্ণ দৃশ্যায়ন সবার নজর কাড়ছে। তাই রায়হান রাফির কাছেই জানতে চাওয়া হয় এই ছবি নির্মাণের পেছনের গল্প আর তাঁর ভাবনাপ্রক্রিয়া।
রায়হান রাফির ছবি মানেই অন্য রকম কিছু। ‘টান’, ‘সাত নম্বর ফ্লোর’, ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি’র পর বাঁধভাঙা জনপ্রিয়তা পাওয়া ‘পরাণ’। আবার সামনে আসছে ঐতিহাসিক পটভূমিতে তৈরি ‘দামাল’ও। এর মধ্যে একেবারে অন্য রকম আমেজে নির্মিত ‘নিঃশ্বাস’ চলচ্চিত্রটি রায়হান রাফিকে আবার নতুন করে চেনাবে, এমন আভাসই পাওয়া গেল এই গুণী নির্মাতার সঙ্গে কথা বলে।
হাসপাতালে ঘটে যাওয়া কিছু বড় ঘটনা-দুর্ঘটনার আভাস দেখা যায় মুভির ট্রেলারে। রায়হান রাফি সে সূত্রে নিজেই বলেন, ‘হাসপাতাল এই ছবির একটি বড় অংশের পটভূমি। আর হাসপাতালে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এক জীবন-মরণ পর্যায়ের বিষয় হলো নিশ্বাস। সবাই সেখানে নিশ্বাস চলমান রাখার প্রচেষ্টায় ব্যস্ত। মৃত্যুশয্যায় থাকা বা গুরুতর রোগীর কাছে প্রতিটি নিশ্বাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আবার শিশু জন্ম নিলেও সেই নিশ্বাসই তাকে পৃথিবী চেনায় প্রথম। অন্যদিকে যেকোনো ভয়, আতঙ্ক, বিপদ আর নেতিবাচক অনুভূতি বোঝাতে আমরা নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসা বা দম আটকে আসার কথা বলি।’ শ্বাসরুদ্ধকর ছবিটির এই নাম, কী সম্পর্ক এই নামকরণের সঙ্গে ঘটনাপ্রবাহের, এ প্রশ্নের উত্তরে জানা গেল এমন অনেক কথা রায়হান রাফির কাছ থেকে।
বাস্তব চরিত্র নিয়ে কাজ করতে তিনি বরাবরই পছন্দ করেন, বলেন রায়হান রাফি। কখনো কল্পনায় আঁকেন কোনো বিশেষ চরিত্র। কখনো আশপাশের চরিত্রগুলোকে নিজের মতো করে রূপ দেন। তবে রাফি বলেন, সব সময়ই চরিত্রগুলোকে বিশ্বাসযোগ্য করে রূপ দেওয়ার ঐকান্তিক প্রয়াস থাকে তাঁর। মূলধারার বেশির ভাগ চলচ্চিত্রে দেখতে পাওয়া ‘লার্জার দ্যান লাইফ’ আমেজ, তাঁর চরিত্রগুলো রূপায়ণের মূলমন্ত্র নয়। এ প্রসঙ্গে রাফি বলেন, চরিত্রগুলো বাস্তব রূপ দিতে গেলে মেকআপের পাশাপাশি সঠিক কস্টিউমও খুব জরুরি।
এই ছবিতে তাসনিয়া ফারিণের হাসপাতালে কর্মরত নিপা নামের এক নার্সের গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রটি সাজাতে গিয়ে এক মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে কেমন সালোয়ার-কামিজ পরবে, তার ব্যবহৃত অনুষঙ্গ কেমন হবে, এমনকি তার কাপড়ে আটপৌরে ভাব ফুটিয়ে তোলার বিষয়টিকে রাফি খুব গুরুত্ব দেন। একই সঙ্গে হাসপাতালে কাজ করার সময় তার ইউনিফর্ম বা পোশাক যেন প্রাসঙ্গিক হয়, সেদিকে খেয়াল রাখা হয়েছে। পরে একেবারে অস্ত্র হাতে এক নেতিবাচক, নিশ্বাস দ্রুত করে দেওয়া রূপে তাকে দেখানোর সময়ও তার মাথার কাপড়, পোশাক আর লুকের ব্যাপারে খুবই মনোযোগী ছিলেন বলে জানালেন তিনি। কয়েকটি লুক টেস্ট করার পরই রায়হান রাফি চূড়ান্ত রূপটি ঠিক করেন।
‘নিঃশ্বাস’ ছবিতে সাফা কবিরের করা অস্থির, গুরুতর অসুস্থ ও বিপদগ্রস্ত তরুণীর চরিত্রটি খুব মনোযোগ আকর্ষণ করছে সবার। তাঁর সঙ্গে জোড় বাঁধা সৈয়দ জামান শাওনের লুকও একই রকম নজরকাড়া। ভাবলেশহীন কঠিন মুখে বন্দুক হাতে ইমতিয়াজ বর্ষণের রূপায়ণে রয়েছে সেই রুদ্ধশ্বাসের আমেজ। পোস্টার আর ট্রেলারে আরেক ভয়ংকর রূপে ধরা দিয়েছেন রাশেদ মামুনুর রহমান অপু। সবার চরিত্রই রায়হান রাফি মনোযোগের সঙ্গে তৈরি করেছেন বিশ্বাসযোগ্য করে। যেকোনো হাসপাতালে গেলেই এই মানুষগুলোকে আমরা দেখতে পাই। এই চিরচেনা পটভূমির মধ্যেই হঠাৎ ঘটে যাওয়া কোনো ভয়ংকর রক্তক্ষয়ী ধ্বংসাত্মক ঘটনা সাজিয়েই এই ছবি নির্মিত হয়েছে, এমন আভাস পাওয়া গেল রায়হান রাফির কথায়।
চুলচেরা পর্যায়ের বাস্তবনির্ভর ছবিটির কস্টিউমের গুরুদায়িত্ব বীথি আফরীনকে দিয়েছিলেন রায়হান রাফি। রূপসজ্জার কঠিন কাজটি করেছেন মো. খোকন মোল্লা। এই দুজনের সঙ্গেই তিনি আগেও অনেক কাজ করেছেন, জানালেন রায়হান রাফি। তাই বোঝাপড়াটাও ভালো। এ প্রসঙ্গে রাফি জানান, তিনি প্রতিটি দৃশ্যের কালার প্যালেট নিয়ে ভাবেন সব সময়। নির্দিষ্টভাবে কী কী রং থাকবে এতে, তা ভেবেই তিনি কস্টিউম ডিজাইনারের সঙ্গে ঠিক করেন পোশাকের ধরন ও রং।
‘নিঃশ্বাস’ ছবির ‘লো কি লাইট’ বা আলো-আঁধারি ইফেক্টের দৃশ্যায়নের একটি বড় তাৎপর্য রয়েছে এখানে, যা ছবিটি দেখলে বোঝা যাবে, কিছুটা হেঁয়ালি করেই বলেন রাফি। এই জনপ্রিয় পরিচালকের একেবারে অন্য রকম ভাইব দেওয়া ‘নিঃশ্বাস’ ছবির ট্রেলারে ধ্বংসযজ্ঞ ঘটিয়ে উল্টো পথে ফিরে আসা তাসনিয়া ফারিণের দম বন্ধ করা লুকের সঙ্গে দারুণ মানিয়েছে, ভয় ধরিয়েছে, আলোড়ন তুলছে সঙ্গে জুড়ে দেওয়া র্যাপ গানটি, ‘লাশ লাশ লাশ চারিদিকে/ মেতেছে মৃত্যু উল্লাসে/ শ্বাস শ্বাস শ্বাস হচ্ছে নিশীথ/ ছড়াচ্ছে বিষ বিশ্বাসে। চলায় বলায় মগজধোলাই/ বাড়াচ্ছে না বিশ্বাস/ ধানাই পানাই অন্ধ কানাই/ নিভিয়ে দিচ্ছে নিশ্বাস’।