ইস্তাম্বুলে রুমির সন্ধানে
শেয়ার করুন
ফলো করুন

ইস্তাম্বুলে কিছু জায়গা আছে, যেখানে গেলে মনে হয়, আপনি শুধু একটি শহরের ভেতর দিয়ে হাঁটছেন না, হেঁটে চলেছেন সময়ের ভেতর দিয়ে। কয়েক শতাব্দী পুরোনো ব্লু মস্কের মিনার, আয়া সোফিয়ার স্থাপত্য, সরু পাথরের গলি, শত বছরের গ্র্যান্ড বাজার, ইজিপশিয়ান স্পাইস বাজার, বসফরাসের নীল জল কিংবা সন্ধ্যার আলোয় শহরের সিলুয়েট—সবকিছুর মধ্যেই যেন ইতিহাসের কোনো না কোনো গল্প লুকিয়ে আছে। ইস্তাম্বুলের সৌন্দর্য তাই শুধু চোখে দেখার নয়, কোথাও কোথাও তা অনুভব করারও।

গত বছর ইস্তাম্বুল ভ্রমণের পরিকল্পনা করার সময় নিজের তালিকায় একটি বিষয় বিশেষভাবে রেখেছিলাম—সুফি সেমা বা ঘূর্ণায়মান দরবেশদের পরিবেশনা দেখা। তুরস্কের এই বিখ্যাত সুফি ঐতিহ্যকে কাছ থেকে দেখার ইচ্ছা অনেক দিনের। বিশেষ করে জালালউদ্দিন মুহাম্মদ রুমি ও শামস তাবরিজির দর্শন আমাকে বরাবরই আকৃষ্ট করে। শত শত বছর আগে তাঁরা যে জীবনবোধ, ভালোবাসা ও আত্ম–অন্বেষণের কথা বলেছেন, তা আজও মানুষকে নিজের ভেতরের দিকে তাকাতে শেখায়।মন অশান্ত হলে রুমির কিছু কথা যেন ব্যস্ততার মাঝেও থামিয়ে দেয়। জীবনকে, সম্পর্ককে, এমনকি নিজেকেও নতুন করে বোঝার একটি সুযোগ তৈরি করে।

বিজ্ঞাপন

রুমির শহর কোনিয়া নয়, গন্তব্য ইস্তাম্বুল

তুরস্কের কোনিয়ায় জালালউদ্দিন মুহাম্মদ রুমির মাজারে যাওয়ারও খুব ইচ্ছা ছিল। কিন্তু ইস্তাম্বুল থেকে কোনিয়া বেশ দূরে হওয়ায় এবারের ভ্রমণে সেখানে যাওয়া সম্ভব হয়নি। তাই ঠিক করলাম, অন্তত ইস্তাম্বুলেই সেমা দেখে এই সুফি ঐতিহ্যের কাছাকাছি যাওয়া যাক।প্রথম পছন্দ ছিল ঐতিহাসিক ওরিয়েন্টাল এক্সপ্রেস স্টেশন। পুরোনো স্টেশনের ইতিহাস, স্থাপত্য আর সেই আবহের মধ্যে ঘূর্ণায়মান দরবেশদের সেমা দেখার কল্পনাটা আমার কাছে ভীষণ আকর্ষণীয় ছিল।

কিন্তু ভ্রমণের গল্প সব সময় পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোয় না। সেখানে সেমা অনুষ্ঠানের টিকিট পেলাম না। একটু হতাশ হয়েছিলাম। কিন্তু সেই ছোট্ট হতাশাই শেষ পর্যন্ত আমাকে নিয়ে গেল হোদজাপাশা কালচার সেন্টারে।

খোঁজ নিয়ে সেখানকার সেমা অনুষ্ঠানের টিকিট বুক করলাম। তখনো জানতাম না, টিকিট না পাওয়ার সেই হতাশাটাই শেষ পর্যন্ত ইস্তাম্বুল ভ্রমণের অন্যতম স্মরণীয় অভিজ্ঞতার দরজা খুলে দেবে।

বিজ্ঞাপন

শহর থেকে যেন অন্য এক সময়ে

হোদজাপাশা একটি পুরোনো অটোমান হামামকে পুনরুদ্ধার করে তৈরি করা সাংস্কৃতিক কেন্দ্র।
হোদজাপাশা একটি পুরোনো অটোমান হামামকে পুনরুদ্ধার করে তৈরি করা সাংস্কৃতিক কেন্দ্র।

হোদজাপাশা একটি পুরোনো অটোমান হামামকে পুনরুদ্ধার করে তৈরি করা সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। কয়েক শতাব্দী পুরোনো স্থাপত্যের গম্বুজ, পাথরের দেয়াল আর মৃদু আলোয় জায়গাটির মধ্যে এমনিতেই একধরনের রহস্যময়তা আছে।

মৌলাভিদের ব্যবহার্য পোশাক
মৌলাভিদের ব্যবহার্য পোশাক

নির্ধারিত সময়ের বেশ খানিকটা আগেই পৌঁছে গিয়েছিলাম। বাইরে তখনো ইস্তাম্বুলের ব্যস্ততা, কিন্তু ভেতরে ঢুকতেই পরিবেশটা বদলে গেল।মনে হচ্ছিল, শহরের বর্তমান সময়টাকে দরজার বাইরে রেখে কয়েক শতাব্দী পেছনে চলে এসেছি।

মূল অডিটোরিয়ামের বাইরে ছিল একটি প্রদর্শনী কেন্দ্র। কাচের বাক্সে সাজানো ছিল জালালউদ্দিন মুহাম্মদ রুমি, শামস তাবরিজি এবং বিভিন্ন সুফি দরবেশের সঙ্গে সম্পর্কিত নানা সামগ্রী। ছিল পোশাক, ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্র এবং সুফি সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন নিদর্শন।

দারবিশদের ব্যবহার্য বাদ্যযন্ত্র
দারবিশদের ব্যবহার্য বাদ্যযন্ত্র

সেখানেই চোখ আটকে গেল রুমির একটি মোমের মূর্তিতে। মূর্তিটি এতটাই জীবন্ত মনে হচ্ছিল যে একমুহূর্তের জন্য মনে হলো, তিনি যেন দূর দেশ থেকে তাঁর দর্শন দেখতে আসা দর্শনার্থীদের স্বাগত জানাচ্ছেন।

প্রদর্শনীতে রুমির দর্শন নিয়ে লেখা একটি বোর্ডেও চোখ আটকে গেল। বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে সেটি পড়ছিলাম।

রুমির একটি কবিতার ভাবার্থে যে একত্বের কথা উঠে আসে, তার সারাংশ যেন এমন—নিজের আর অন্যের মধ্যে যে বিভেদ আমরা তৈরি করি, তার বাইরেও রয়েছে একটি বৃহত্তর একতা। আমরা সবাই একই সারসত্তার অংশ। ভুল ধারণা ও স্বার্থপরতার কারণে আমরা নিজেদের আলাদা করে দেখি।

একা মানুষ যেন একটি শস্যদানা, কিন্তু সবার সঙ্গে মিললে সেই দানাই হয়ে উঠতে পারে একটি সোনার খনি।

আরেকটি চিত্রকল্প আমাকে বিশেষভাবে ভাবিয়েছে—পাত্র আলাদা হলেও ভেতরের জল এক। পাত্র ভেঙে গেলে সেই জল আর আলাদা থাকে না।
রুমির দর্শনের এই একত্বের ধারণা সেমার অভিজ্ঞতাকে বোঝার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হলো।

রুমির দর্শন আসলে কী নিয়ে

রুমিকে শুধু একজন কবি হিসেবে দেখলে তাঁর ভাবনার বিস্তারটা বোঝা কঠিন। তাঁর দর্শনের কেন্দ্রে রয়েছে ভালোবাসা, আত্ম–অন্বেষণ, অহং অতিক্রম এবং স্রষ্টার সঙ্গে আত্মিক একতার আকাঙ্ক্ষা।

হোদজাপাশার প্রদর্শনীতে রুমির দর্শনের যে সারসংক্ষেপটি পড়েছিলাম, সেখানে পূর্ণমানব হওয়ার আকাঙ্ক্ষা, অহংকে অতিক্রম করে ঐশ্বরিক সত্যের দিকে এগিয়ে যাওয়া এবং ভালোবাসার মাধ্যমে আত্মিক উপলব্ধির কথা তুলে ধরা হয়েছিল।
সেখানে ‘ফানাফিল্লাহ’ ধারণার কথাও ছিল—অর্থাৎ নিজের অহং ও পৃথক সত্তার সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে স্রষ্টার একত্বে বিলীন হওয়ার আকাঙ্ক্ষা।

রুমিকে বুঝতে গেলে শুধু তাঁর কবিতা পড়লেই হয় না, তাঁর দর্শনের ভেতর কিছুটা সময়ও কাটাতে হয়।
রুমিকে বুঝতে গেলে শুধু তাঁর কবিতা পড়লেই হয় না, তাঁর দর্শনের ভেতর কিছুটা সময়ও কাটাতে হয়।

রুমির কাছে মৃত্যু নিয়েও রয়েছে ভিন্ন এক উপলব্ধি। তাঁর মৃত্যুকে তিনি পরম প্রেমিকের সঙ্গে মিলনের মতো করে দেখেছেন বলেই তাঁর মৃত্যুর রাতকে বলা হয় ‘ওয়েডিং নাইট’ বা ‘শব-ই-আরুস’।

এই মঞ্চে পরিবেশিত হয় নৃত্য
এই মঞ্চে পরিবেশিত হয় নৃত্য

বোর্ডের সামনে দাঁড়িয়ে এসব পড়ছিলাম, আর মনে হচ্ছিল—রুমিকে বুঝতে গেলে শুধু তাঁর কবিতা পড়লেই হয় না, তাঁর দর্শনের ভেতর কিছুটা সময়ও কাটাতে হয়।
ঠিক তখনই সেমার সময় হয়ে গেল।

শুরু হলো সেমা

সেমা পরিবেশনার টিকেট
সেমা পরিবেশনার টিকেট

দর্শকেরা নিজেদের আসনে বসে অপেক্ষা করছেন। অডিটোরিয়ামের আলো ধীরে ধীরে বদলে গেল। চারপাশে নেমে এল একধরনের গভীর নীরবতা। তারপর ভেসে উঠল সুফি সংগীতের সুর।

ঐতিহ্যবাহী তুর্কি বাদ্যযন্ত্রের সেই সুর খুব সহজে ব্যাখ্যা করা যায় না। কোথাও যেন যাত্রা, কোথাও প্রত্যাবর্তন। সুর এগিয়ে যায়, আবার ফিরে আসে। এরপর প্রবেশ করলেন সেমাজেনরা—ঘূর্ণায়মান দরবেশ। সাদা পোশাক, লম্বা টুপি, সংযত পদক্ষেপ।
প্রথমে তাঁদের চলাফেরা ছিল ধীর এবং প্রায় নিঃশব্দ। তারপর ধীরে ধীরে শুরু হলো ঘূর্ণন। একজন। তারপর আরেকজন। তারপর একসঙ্গে কয়েকজন।

মোমের আবক্ষে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে তাঁদের জীবন
মোমের আবক্ষে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে তাঁদের জীবন

সাদা পোশাকগুলো যখন ঘুরতে শুরু করল, মনে হলো মাটির ওপর যেন সাদা ফুল ফুটে উঠছে।কিছুক্ষণ পর বুঝলাম, আমি শুধু একটি সুন্দর পরিবেশনা দেখছি না। এর ভেতরে অন্য একধরনের অনুভূতি কাজ করছে।প্রথম দেখায় সেমাকে হয়তো নৃত্য মনে হতে পারে। কিন্তু মেভলেভি সুফি ঐতিহ্যে সেমা একটি আধ্যাত্মিক সাধনার অংশ। ঘূর্ণনের মাধ্যমে আত্মিক যাত্রা, স্রষ্টার প্রতি ভালোবাসা এবং নিজের অহং ও পার্থিব আসক্তিকে অতিক্রম করার আকাঙ্ক্ষা প্রতীকীভাবে প্রকাশ করা হয়।

পরিবেশনার সময় ছবি তোলা ও ভিডিও করা নিষেধ
পরিবেশনার সময় ছবি তোলা ও ভিডিও করা নিষেধ


সেমাজেনদের একটি হাত থাকে ওপরে, অন্য হাত নিচের দিকে। এই ভঙ্গিমার মধ্যেও রয়েছে প্রতীকী অর্থ—ঐশ্বরিক অনুগ্রহ গ্রহণ করে তা পৃথিবীর মানুষের মধ্যে প্রবাহিত করার ধারণা।আর শরীরের অবিরাম ঘূর্ণনের মাঝেও থাকে এক অদ্ভুত ভারসাম্য।

আমি অনেকক্ষণ তাকিয়ে ছিলাম। ভাবছিলাম, কীভাবে একজন মানুষ এতক্ষণ ধরে ঘুরতে পারেন, অথচ তাঁর শরীরের সেই ঘূর্ণনের মধ্যে যেন কোনো অস্থিরতা নেই!
সম্ভবত সেমার সৌন্দর্য এখানেই—শরীর ঘুরছে, কিন্তু মন স্থির।

কয়েক শ বছর পরেও যে প্রশ্নগুলো একই

সেমার দিকে তাকিয়ে বারবার রুমির কথাই মনে হচ্ছিল। ত্রয়োদশ শতকের কবি, দার্শনিক ও সুফি সাধক জালালউদ্দিন মুহাম্মদ রুমির দর্শনের কেন্দ্রে রয়েছে ভালোবাসা, আত্ম–অন্বেষণ এবং নিজের সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে বৃহত্তর সত্যের দিকে এগিয়ে যাওয়া।

জালালুদ্দিন মুহাম্মাদ রুমির মোমের ভাস্কর্য সম্মুখে
জালালুদ্দিন মুহাম্মাদ রুমির মোমের ভাস্কর্য সম্মুখে

হোদজাপাশার সেই পুরোনো গম্বুজের নিচে বসে মনে হচ্ছিল, কয়েক শ বছর পেরিয়ে গেলেও মানুষের কিছু প্রশ্ন আসলে বদলায়নি।

আমি কে?

আমি কোথায় যাচ্ছি?

আমার জীবনের অর্থ কী?

আমার ভেতরের অস্থিরতা কোথায় গিয়ে থামবে?

সম্ভবত এ কারণেই রুমির দর্শন আজও পৃথিবীর নানা প্রান্তের মানুষকে আকর্ষণ করে।
সময় বদলায়। পৃথিবী বদলায়। প্রযুক্তি বদলায়। কিন্তু নিজের সঙ্গে মানুষের যে প্রশ্ন, সেটি থেকে যায়।

তুরস্কের ঐতিহ্য, বিশ্বের মানুষের অনুভব

আমার কাছে সুফি সংস্কৃতি তুরস্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক পরিচয়। তবে এর সৌন্দর্য শুধু তুরস্কের মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ইস্তাম্বুলে এ ধরনের অনুষ্ঠানে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে আসা মানুষকে দেখা যায়। কেউ পর্যটক, কেউ সংস্কৃতিপ্রেমী, কেউ রুমির দর্শনের প্রতি আগ্রহী, আবার কেউ ব্যস্ত জীবনের বাইরে কিছুক্ষণের জন্য একটি শান্ত অভিজ্ঞতা খুঁজছেন।

একটি ঐতিহ্য তার নিজস্ব মাটি, ইতিহাস ও ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে জন্ম নিয়েছে, কিন্তু সময়ের সঙ্গে তা পৃথিবীর নানা মানুষের কাছে আত্মিক অনুভবের অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছে—বিষয়টি আমার কাছে বেশ সুন্দর লেগেছিল।

সারা বিশ্বের সুফি ভক্তরে আসেন সুফি নৃত্য দেখতে
সারা বিশ্বের সুফি ভক্তরে আসেন সুফি নৃত্য দেখতে

কারও কাছে সেমা প্রার্থনা। কারও কাছে ধ্যান। কারও কাছে আত্মশুদ্ধির প্রতীক।
আবার কারও কাছে কয়েক মুহূর্তের গভীর নীরবতা। অর্থ আলাদা হতে পারে, কিন্তু অনুভূতিটা কোথাও যেন একই জায়গায় গিয়ে মেলে। সবচেয়ে সুন্দর ছিল সেই নীরবতা
সেমা অনুষ্ঠানের সময় ছবি তোলা বা ভিডিও করার সুযোগ নেই। করতালিও নয়। প্রথমে একটু অদ্ভুত লেগেছিল।

আমরা তো এখন প্রায় প্রতিটি মুহূর্ত ক্যামেরায় ধরে রাখতে অভ্যস্ত। কোনো সুন্দর জায়গায় গেলে ছবি, বিশেষ কোনো অভিজ্ঞতা হলে ভিডিও, তারপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট। কিন্তু সেখানে বসে মনে হলো—সবকিছু ধরে রাখার প্রয়োজন নেই। কিছু অভিজ্ঞতা ক্যামেরার জন্য নয়। কিছু মুহূর্ত শুধু স্মৃতির জন্য।
হোদজাপাশার সেই সন্ধ্যায় তাই ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকাইনি। তাকিয়ে ছিলাম ঘূর্ণায়মান মানুষগুলোর দিকে। শুনছিলাম সংগীত। আর অনুভব করছিলাম চারপাশের নীরবতা।

বাইরে ফিরে দেখি, ইস্তাম্বুল একই আছে

অনুষ্ঠান শেষ হলো। ধীরে ধীরে বাইরে বেরিয়ে এলাম। ইস্তাম্বুল তখনো আগের মতোই ব্যস্ত। গাড়ি চলছে। মানুষ হাঁটছে। দোকানে আলো জ্বলছে। কোথাও খাবারের গন্ধ, কোথাও পর্যটকদের ভিড়। সবকিছু একই আছে। কিন্তু আমার কাছে শহরটাকে একটু অন্য রকম লাগছিল। কিছুক্ষণ আগেও আমি একটি ঐতিহাসিক স্থাপনার ভেতরে বসে কয়েক শ বছরের পুরোনো একটি আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য দেখছিলাম। আর এখন আবার আধুনিক শহরের বাস্তবতায় ফিরে এসেছি।

এই দুই ইস্তাম্বুল যেন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে আধুনিকতা, অন্যদিকে ইতিহাস। একদিকে কোলাহল, অন্যদিকে নীরবতা। আর সম্ভবত এই বৈপরীত্যই ইস্তাম্বুলকে এত আকর্ষণীয় করে তুলেছে।

কিছু অভিজ্ঞতা ছবি ছাড়াই থেকে যায়

ভ্রমণে আমরা অনেক জায়গা দেখি। অনেক ছবি তুলি, অনেক খাবার খাই, অনেক গল্প জমাই। কিন্তু সব অভিজ্ঞতা আমাদের ভেতরে সমানভাবে থেকে যায় না। হোদজাপাশার সেমা অনুষ্ঠান আমার কাছে তেমনই একটি স্মৃতি, যা কোনো ছবি ছাড়াই থেকে গেছে।

বরং ছবি না থাকার কারণেই হয়তো সেই সন্ধ্যাটি আরও বেশি মনে আছে।
আজও চোখ বন্ধ করলে দেখতে পাই সাদা পোশাকের সেই ঘূর্ণন। শুনতে পাই ঐতিহ্যবাহী সংগীতের সুর। মনে পড়ে পুরোনো গম্বুজের নিচে পাশাপাশি বসে থাকা নীরব দর্শকদের কথা। আর মনে হয়, ইস্তাম্বুলে সেদিন আমি শুধু সেমা দেখিনি। কিছুক্ষণের জন্য নিজের ভেতরেও যেন একটি যাত্রা করেছিলাম।

শহরের ভিড় থেকে ইতিহাসে, ইতিহাস থেকে দর্শনে, আর দর্শন থেকে নিজের ভেতরের এক নীরব জায়গায়। সেই কারণেই হোদজাপাশার সন্ধ্যাটি আমার কাছে শুধু ইস্তাম্বুল ভ্রমণের একটি স্মৃতি নয়—এটি এমন একটি ভ্রমণ, যার পথ বাইরে দিয়ে শুরু হলেও শেষ হয়েছিল ভেতরের দিকে।

ছবি: লেখক

প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২: ২১
বিজ্ঞাপন