
তাতোপানির উষ্ণ প্রস্রবণের পাশে পূর্ণিমার আলোয় প্রথম চুম্বন, হিমালয়ের পথে অচেনা ট্রেকারদের হাতে হাতে পৌঁছে যাওয়া প্রেমপত্র—সবকিছুই যেন কোনো রোমান্টিক সিনেমার দৃশ্য। কিন্তু বাস্তব জীবন কখনোই শুধু ভালোবাসার গল্প নয়। সেই গল্পের মাঝেই থাকে অপেক্ষা, সংগ্রাম, অনিশ্চয়তা আর প্রতিদিন নতুন করে একে অপরকে বেছে নেওয়ার সাহস।
ম্যান্ডি আর লির জীবনও তার ব্যতিক্রম ছিল না।

নেপাল থেকে নেমে তাঁরা আরও ছয় সপ্তাহ একসঙ্গে ভারত ভ্রমণ করেছিলেন। তারপর একদিন একই বিমানবন্দরে দাঁড়িয়ে বিদায় নিতে হলো দুজনকে। একজন ফিরলেন নিউজিল্যান্ডে, আরেকজন যুক্তরাজ্যে।
যে সম্পর্ক পাহাড়ের পথে জন্ম নেয়, সেই সম্পর্কের ভবিষ্যৎ কী হবে, তা তখন কেউই জানতেন না। কিন্তু দূরত্ব সব সময় ভালোবাসাকে হারিয়ে দেয় না। কখনো কখনো সেটাই ভালোবাসাকে আরও নিশ্চিত করে।
ম্যান্ডি তিন মাসের জন্য ইংল্যান্ডে গেলেন। তারপর ওয়ার্কিং হলিডে ভিসায় থেকে গেলেন আরও কিছুদিন। সেই সময়ই তাঁরা বুঝে গিয়েছিলেন, এটি আর কোনো ছুটির দিনের প্রেম নয়। তাঁরা শুধু একসঙ্গে পৃথিবী দেখতে চান না, একসঙ্গে জীবনটাও কাটাতে চান।
এরপর শুরু হলো আরেক ধরনের ভ্রমণ। এবার আর নতুন দেশ দেখার জন্য নয়, বরং একই ছাদের নিচে থাকার স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য।
লি চলে গেলেন নিউজিল্যান্ডে। দুই বছর সেখানে কাটানোর পর দুজন আবার যুক্তরাজ্যে। তারপর অস্ট্রেলিয়া। একের পর এক নতুন দেশ, নতুন কাজ, নতুন জীবন। তিনটি দেশের নাগরিকত্ব অর্জনের পেছনে কেটে গেছে তাঁদের যৌবনের ১১টি বছর।
কথাটা বলতে বলতে লি হাসতে হাসতে বলেছিলেন, “মানুষ আমাদের ভ্রমণের ছবিগুলো দেখে। কিন্তু ছবির পেছনের ১১ বছরের সংগ্রামটা দেখে না।”
কথাটি শুনে মনে হলো, সত্যিই তো—আমরা প্রায়ই গন্তব্য দেখি, যাত্রাপথ দেখি না। আমরা পাহাড়ের চূড়ার ছবি দেখি, কিন্তু সেখানে পৌঁছাতে কতবার পিছলে পড়তে হয়েছে, সেটা দেখি না।
অনেকেই মনে করেন, যারা পৃথিবী ঘুরে বেড়ান, তাঁদের জীবন বুঝি প্রতিদিনই ছুটি। বাস্তবতা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
অন্য সবার মতো তাঁদেরও ছিল চাকরি, মাসের শেষে বিল, বাড়িভাড়া, কর, দায়িত্ব আর ভবিষ্যতের চিন্তা।
তবে একটি জায়গায় তাঁরা আলাদা ছিলেন। অনেকে ভবিষ্যতের জন্য বড় বাড়ি কেনার স্বপ্ন দেখেন। কেউ দামি গাড়ির জন্য টাকা জমান। ম্যান্ডি আর লি জমিয়েছেন পরবর্তী বিমানের টিকিটের জন্য। তাঁদের কাছে পৃথিবীই ছিল সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ।
২০১৭ সালে তাঁরা এমন একটি সিদ্ধান্ত নিলেন, যা অনেকেই সারাজীবন কেবল কল্পনাতেই রেখে দেন। চল্লিশের কোঠায় দাঁড়িয়ে দুজনেই চাকরি ছেড়ে দিলেন।

ম্যান্ডির তখন ৪৭, লি ৪৬। তাঁদের সন্তান নেই। বিশাল বাড়ির স্বপ্নও নেই। বিলাসবহুল জীবনও নয়। তাঁদের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন ছিল পৃথিবীটাকে নিজের চোখে দেখা।
ম্যান্ডি বলছিলেন, “আমরা কখনো ধনী ছিলাম না। ছোটবেলা থেকেই শিখেছি, অল্প টাকায়ও সুন্দরভাবে বাঁচা যায়। তাই আমরা অর্থ জমিয়েছি জিনিস কেনার জন্য নয়, অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য।”
সেই দর্শন থেকেই জন্ম নিয়েছে তাঁদের ইউটিউব চ্যানেল Frugal Travellers। ‘ফ্রুগাল’ শব্দটির অর্থ কৃপণতা নয়; বরং অপ্রয়োজনীয় খরচ কমিয়ে জীবনের সবচেয়ে জরুরি স্বপ্নটিকে বাঁচিয়ে রাখা। তাঁদের ভিডিওর মূল বার্তাও তাই—পৃথিবী দেখতে লাখপতি হওয়ার দরকার নেই। দরকার সাহস, পরিকল্পনা আর কৌতূহল।

আমি যখন শুনলাম, আজও তাঁরা প্রতিদিন গড়ে ২৫ মার্কিন ডলারের কম খরচে ভ্রমণ করেন, সত্যিই অবাক হয়েছিলাম।
লি হেসে বললেন, “বাজেট ট্রাভেল মানে কষ্ট করে থাকা নয়। বাজেট ট্রাভেল মানে বুদ্ধি দিয়ে ভ্রমণ করা।”
তাঁরা খুব কমই হোটেলে থাকেন। কখনো কাউচসার্ফিংয়ের মাধ্যমে স্থানীয় মানুষের বাড়িতে থাকেন; কখনোবা পেট সিটিং করেন। অর্থাৎ, কেউ বেড়াতে গেলে তাঁর বাড়ি ও প্রিয় পোষা প্রাণীর দায়িত্ব নিয়ে দেখাশোনা করা। কখনো আবার ওয়ার্কঅ্যাওয়ে হয় তাঁদের ভ্রমণের জন্য আয়ের একটি উপায়। অর্থাৎ, ওয়ার্কঅ্যাওয়ের মাধ্যমে দিনে কয়েক ঘণ্টা কাজের বিনিময়ে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করেন।
পর্তুগালে তাঁরা প্রায় দেড় বছর বিভিন্ন পরিবারের বিড়াল-কুকুরের দেখাশোনা করেছেন। আইসল্যান্ডের একটি খামারে গরু দোহনও করেছেন। তাঁদের কাছে এগুলো কোনো ত্যাগ নয়। বরং ভ্রমণের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। কারণ এতে পর্যটক হয়ে নয়, একজন স্থানীয় মানুষের মতো করে একটি দেশকে জানা যায়।

লি বলছিলেন, পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান অভিজ্ঞতাগুলো তাঁরা কখনো পাঁচ তারকা হোটেলে পাননি। পেয়েছেন সাধারণ মানুষের ডাইনিং টেবিলে বসে। কুয়েতে এক পরিবারের সঙ্গে তিন সপ্তাহ থাকার অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে তিনি বললেন, “এই তিন সপ্তাহে আমি মধ্যপ্রাচ্যকে যতটা বুঝেছি, তার আগে কয়েক সপ্তাহ আবুধাবিতে থেকেও ততটা বুঝিনি।”
কথাটা খুব সহজ। কারণ একটি হোটেল আপনাকে একটি বিছানা দেয়। একজন স্থানীয় মানুষ আপনাকে একটি সংস্কৃতি চিনিয়ে দেন।
সেই মুহূর্তে বুঝতে পারলাম, সত্যিই ভ্রমণের সবচেয়ে বড় বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম মানুষ।
পাকিস্তানের গল্পটি বলতে গিয়ে ম্যান্ডির কণ্ঠে অন্য রকম আবেগ ছিল। একটি ছোট্ট দোকান থেকে তাঁরা আপেল কিনেছিলেন। দোকানদার কোনোভাবেই টাকা নিতে চাইছিলেন না। অনেক অনুরোধের পর টাকা নিলেও তাঁর চোখেমুখে ছিল অতিথিকে আপ্যায়ন করতে না পারার আক্ষেপ।

কুয়েতে প্রথম সকালের নাশতার বিল গোপনে পরিশোধ করেছিলেন এক অচেনা মানুষ। ইরাকি কুর্দিস্তানে কেউ তাঁদের জুসের দাম দিতে দেননি। তাজিকিস্তানে একজন পথচারী দুপুরের খাবারের বিল দিয়ে চলে গিয়েছিলেন। সৌদি আরবে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে অচেনা মানুষ পানি এগিয়ে দিয়েছেন।
প্রতিটি দেশেই তাঁরা একই কথা শুনেছেন—“আপনারা আমাদের অতিথি।”
তাঁদের গল্প শুনতে শুনতে বুঝতে পারছিলাম, আমরা অনেক সময় একটি দেশকে চিনে ফেলি সংবাদ শিরোনাম দেখে; কিন্তু একটি দেশের সত্যিকারের পরিচয় লুকিয়ে থাকে তার সাধারণ মানুষের ভেতর।
দক্ষিণ আমেরিকা ভ্রমণের সব পরিকল্পনা প্রায় শেষ। ঠিক সেই সময় ম্যান্ডির শরীরে ধরা পড়ল স্তন ক্যানসার। সবকিছু থেমে গেল। ফিরে যেতে হলো অস্ট্রেলিয়ায়। অস্ত্রোপচার, চিকিৎসা, অনিশ্চয়তা—জীবন যেন হঠাৎ অন্যদিকে মোড় নিল।
আমি জানতে চেয়েছিলাম, সেই সময় কি মনে হয়নি, এবার হয়তো ভ্রমণ শেষ?
ম্যান্ডি খুব শান্ত গলায় বললেন, “বরং তখনই বুঝেছি, জীবন কত ছোট। তাই যত দিন পারি, পৃথিবীটাকে দেখে যেতে চাই।”

এই একটি বাক্য যেন তাঁদের পুরো জীবনদর্শনকে ব্যাখ্যা করে দেয়।
হয়তো সে কারণেই আজ তাঁরা কোনো দেশের সবচেয়ে উঁচু পাহাড়ের কথা বলার আগে একজন আপেল বিক্রেতার গল্প বলেন। কোনো ঐতিহাসিক স্থাপত্যের আগে মনে রাখেন এক অচেনা মানুষের আতিথেয়তা। কারণ তাঁদের কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বিস্ময় কোনো পাহাড় নয়, কোনো প্রাসাদ নয়, কোনো বিশ্ব ঐতিহ্যও নয়; তাঁদের কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বিস্ময়ের নাম—মানুষ।
(চলবে)