একটি বিকেল, একজন কবি এবং স্বাধীনতার স্বপ্ন
শেয়ার করুন
ফলো করুন

বিদায়, প্রিয় স্বদেশ আমার, সূর্যচুম্বিত ভূমি,
প্রাচ্যের সাগরের মুক্তা তুমি, হারানো স্বর্গভূমি।
আনন্দভরে সঁপে দিই আজ জীবন আমার সারা,
দুঃখে-দহনে ক্ষয়িত হলেও নেই তাতে কোনো হারা।
আরও যদি হতো উজ্জ্বল, নবীন, মহিমাময়,
তোমারই মঙ্গল তরে দিতাম তাও অকুণ্ঠ হৃদয়।
মি আলতিমু আদিওস (আমার শেষবিদায়)
– হোসে রিজাল

বিজ্ঞাপন

ম্যানিলার বিকেলগুলোয় একধরনের অদ্ভুত প্রশান্তি আছে। হালকা বাতাসে দুলছে গাছের পাতা, দূরে ম্যানিলা উপসাগরের জলরেখা ঝিলমিল করছে। সেই শান্ত বিকেলের মধ্যেই আমি দাঁড়িয়ে আছি রিজাল উদ্যানের এক কোণে। চারপাশে পর্যটকদের বিচরণ, ক্যামেরার ক্লিক, শিশুদের উচ্ছ্বাস। অথচ এই একই ভূমি একদিন সাক্ষী হয়েছিল একটি জাতির ইতিহাস বদলে দেওয়া মুহূর্তের।
দিনটি ছিল ১৮৯৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর।

হোসে রিজাল
হোসে রিজাল

ভোরের আলো তখন মাত্র ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে বাগুমবায়ান উদ্যানে। সৈনিকদের একটি ফায়ারিং স্কোয়াডকে সামনে রেখে দাঁড়িয়ে আছেন এক ব্যক্তি। তাঁর চোখে নেই ভয়ের ছায়া, নেই অনিশ্চয়তার কম্পন। অপলক দৃষ্টিতে তিনি তাকিয়ে আছেন বন্দুকধারীদের দিকে। তাঁর নাম হোসে রিজাল।

পেশায় রিজাল ছিলেন চক্ষুবিশেষজ্ঞ, নেশায় লেখক ও কবি, আর হৃদয়ে ছিলেন এক দুর্দম বিপ্লবী। তিন শতকেরও বেশি সময় ধরে ফিলিপাইনের ওপর চেপে বসা স্প্যানিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে যে জাতীয় চেতনা ধীরে ধীরে জেগে উঠছিল, রিজাল ছিলেন তার অন্যতম প্রধান আলোকবর্তিকা। তাঁর কলম ছিল অস্ত্রের চেয়ে শক্তিশালী।

বিজ্ঞাপন

আর সে কারণেই সম্ভবত তিনি স্প্যানিশ সাম্রাজ্যের কাছে এত ভয়ংকর হয়ে উঠেছিলেন। কোর্ট মার্শালের বিচারে রাষ্ট্রদ্রোহ, বিদ্রোহ ও ষড়যন্ত্রের অভিযোগে তাঁর মৃত্যুদণ্ড নির্ধারিত হয়। গভর্নর জেনারেল ক্যামিলো ডি পোলাভিয়েজা মনে করেছিলেন, একজন রিজালকে সরিয়ে দিতে পারলেই হয়তো থেমে যাবে স্বাধীনতার স্বপ্ন। কিন্তু বিপ্লবকে কি কখনো হত্যা করা যায়?

হোসে রিজালের সমাধিসৌধের সামনে লেখক
হোসে রিজালের সমাধিসৌধের সামনে লেখক

সকাল ৭টা ৩ মিনিট।
হঠাৎ গর্জে উঠল বন্দুকের শব্দ। ইতিহাস বলে, মাটিতে লুটিয়ে পড়ার ঠিক আগে রিজাল মৃদুস্বরে উচ্চারণ করেছিলেন, ‘Consummatum est’। ল্যাটিন এই বাক্যের অর্থ, ‘সব সম্পন্ন হলো’ অথবা ‘সব শেষ হলো’। সেই মুহূর্তে যেন ক্রুশবিদ্ধ যিশুর শেষ উচ্চারণ প্রতিধ্বনিত হয়েছিল তাঁর কণ্ঠে।

রিজালের জীবন শেষ হয়েছিল, কিন্তু তাঁর শুরু করা পথচলা থামেনি।

মাত্র দুই বছরের মধ্যেই তাঁর জ্বালানো স্ফুলিঙ্গ দাবানলের রূপ নেয়। স্প্যানিশ শাসনের ভিত্তি কেঁপে ওঠে, ঔপনিবেশিক শক্তি বিদায় নিতে বাধ্য হয়। যদিও প্রকৃত স্বাধীনতার স্বাদ পেতে ফিলিপিনোদের আরও কয়েক দশক অপেক্ষা করতে হয়েছিল, তবু রিজালের রক্তেই যেন স্বাধীনতার বীজ রোপিত হয়েছিল। ইতিহাসের এক বিস্ময়কর পরিহাস হলো, যে উদ্যানে তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছিল, স্বাধীনতা-উদ্‌যাপনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ আয়োজনও হয়েছে সেই একই স্থানে। আজ সেই উদ্যান আর বাগুমবায়ান নামে পরিচিত নয়। পুরো পৃথিবী একে চেনে রিজাল পার্ক নামে।

পার্কের মধ্যে হোসে রিজাল ফোয়ারা
পার্কের মধ্যে হোসে রিজাল ফোয়ারা

হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে গেলাম রিজালের সমাধিসৌধের সামনে। ১৯১২ সাল থেকে এখানে শায়িত আছেন ফিলিপাইনের এই জাতীয় বীর। সুউচ্চ স্মৃতিস্তম্ভটি শেষ বিকেলের আলোয় আরও গম্ভীর, আরও মর্যাদাবান মনে হচ্ছিল। তার ভিত্তিমূলে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছিলাম, আর চেষ্টা করছিলাম কল্পনা করতে সেই শেষ মুহূর্তটিকে।
কী ভাবছিলেন রিজাল?

মৃত্যুকে আলিঙ্গন করার আগে কি তিনি তাঁর প্রিয় দেশটির ভবিষ্যৎ স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখেছিলেন? নাকি মাত্র পঁয়ত্রিশ বছর বয়সে সংগ্রামের শেষ পরিণতি না দেখে চলে যাওয়ার বেদনাই তাঁকে আচ্ছন্ন করেছিল? হয়তো উত্তরটি লুকিয়ে আছে তাঁর মৃত্যুর আগে রচিত সেই অমর কবিতার পঙ্‌ক্তিগুলোয়, যেখানে আত্মত্যাগের মধ্যেও এক অদম্য আশার দীপ্তি জ্বলে ওঠে।

মেঘের আড়াল থেকে জেগে উঠা ফিলিপাইন
মেঘের আড়াল থেকে জেগে উঠা ফিলিপাইন

ঢাকা থেকে ম্যানিলার সরাসরি কোনো উড়োজাহাজ নেই। আমার যাত্রাও শুরু হয়েছিল সিঙ্গাপুর হয়ে। আকাশপথে দক্ষিণ চীন সাগর পেরিয়ে তিন ঘণ্টার যাত্রা। উড়োজাহাজের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে মনে হচ্ছিল যেন পৃথিবীর নীলতম জলরাশির ওপর দিয়ে ভেসে চলেছি। অনন্ত সমুদ্রের বুক চিরে মাঝে মাঝে মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছিল ছোট ছোট জনহীন দ্বীপ। সেগুলোকে দূর থেকে মনে হচ্ছিল সমুদ্রের বুকে ছড়িয়ে থাকা পান্নার টুকরা।

হঠাৎই মেঘের ফাঁক গলে একটুকরা উঁচু ভূমি চোখে পড়ল। বুঝলাম, ফিলিপাইনের উপকূল কাছে চলে এসেছে। ৭ হাজার ৬৪১টি দ্বীপের দেশ ফিলিপাইন যেন সমুদ্রের বুকের ওপর ভাসমান এক দ্বীপমালা। এর মধ্যে মাত্র দুই হাজারের মতো দ্বীপে মানুষের বসতি। অন্যগুলো এখনো প্রকৃতির নিজস্ব নীরব অধিকারেই রয়ে গেছে।

রিজাল পার্কের ভেতরে সবুজের প্রাচুর্য
রিজাল পার্কের ভেতরে সবুজের প্রাচুর্য

নিনয় একুইনো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নেমে প্রথম বিস্ময় কাটল দ্রুত ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়া দেখে। অকারণ কোনো জটিলতা ছাড়াই বেরিয়ে এলাম। বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীদের জন্য বিস্ময়কর ঘটনাই বটে। বিমানবন্দরের বাইরে অপেক্ষা করছিল গাড়ি। একটানা পথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছালাম বোনিফাসিও গ্লোবাল সিটির গ্র্যান্ড হায়াত হোটেলে। আমার কক্ষটি ছিল ৫৬ তলায়। জানালার সামনে দাঁড়িয়ে ম্যানিলাকে প্রথম দেখার অভিজ্ঞতা আজও মনে আছে। দূরে কংক্রিটের অরণ্য পেরিয়ে উঁচু পাহাড়সারি, ঝলমলে সড়ক, কাচে মোড়া আকাশচুম্বী ভবন আর সন্ধ্যার আলোয় ধীরে ধীরে বদলে যাওয়া নগরীর রং।

ম্যানিলা শহরের বাণিজ্যিক কেন্দ্র বলা হয়ে থাকে তাগুইগ জেলার বোনিফাসিও গ্লোবাল সিটিকে। একসময় এটি ছিল আমেরিকান সামরিক ঘাঁটি, ফোর্ট বোনিফাসিও। আজ সেটিই রূপ নিয়েছে ফিলিপাইনের অন্যতম আধুনিক ব্যবসায়িক কেন্দ্রে। বিপ্লবী আন্দ্রে বোনিফাসিওর নামে নামকরণ করা এই অঞ্চলকে আমার কাছে অনেকটা ঢাকার গুলশানের মতো মনে হয়েছে, তবে আরও পরিকল্পিত, আরও পরিচ্ছন্ন এবং আরও সুশৃঙ্খল।

হোটেল রুম থেকে দেখা ম্যানিলা শহর
হোটেল রুম থেকে দেখা ম্যানিলা শহর
বিশেষ উপায়ে চলছে মাছ রান্না

দুপুরের খাবারের আয়োজন ছিল একটি অ্যারাবিয়ান রেস্তোরাঁয়। সেখানে একটি বিশেষ খাবার দেখার সুযোগ হয়। বিশাল এক লবণের ঢিবির ভেতরে অ্যালুমিনিয়াম ফয়েলে মোড়ানো সামুদ্রিক মাছ চাপা দেওয়া হলো। এরপর পুরো লবণের স্তূপে আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া হলো। কিছুক্ষণ পর আগুন নিভে গেলে ধীরে ধীরে সেই সাদা আবরণ ভেঙে বের করা হলো মাছটি। খাবারটি যেমন সুস্বাদু ছিল, তার চেয়েও বেশি স্মরণীয় ছিল উপস্থাপনার অভিনবত্ব।

খাওয়া শেষ করে রওনা হলাম রিজাল পার্কের উদ্দেশে। আমাদের সঙ্গে ছিলেন স্থানীয় গাইড জিন। অল্প সময়ের মধ্যেই বুঝলাম, তিনি শুধু গাইড নন, যেন চলমান একটি বিশ্বকোষ। ইতিহাস, সংস্কৃতি, রাজনীতি, স্থাপত্য, খেলাধুলা, স্থানীয় জীবনযাপন যাই জিজ্ঞেস করা হোক না কেন, উত্তর তাঁর ঠোঁটের আগায়। আমাদের দলের একজন মজা করে বলেই বসলেন, ‘জিন যদি বাংলাদেশে বিসিএস ভাইভা দিতে যায়, বোর্ডের সদস্যরাই বিপদে পড়বেন!’

রিজাল পার্ক বাসস্টপ
রিজাল পার্ক বাসস্টপ

১৪০ একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত রিজাল পার্ক ম্যানিলার এক সবুজ ফুসফুস। সুগন্ধি ফুল, কৃত্রিম প্রস্রবণ, গাছপালায় ঘেরা পথ আর পাখির কলতানে ভরা এই উদ্যান আমার মতো দৌড়বিদদের জন্য যেন এক স্বপ্নভূমি। কিন্তু এর সৌন্দর্যের চেয়েও বড় এর ইতিহাস।

আন্দ্রে বোনিফাসিওর ভাস্কর্য
আন্দ্রে বোনিফাসিওর ভাস্কর্য

স্বৈরশাসক ফার্দিনান্দ মার্কোসের বিরুদ্ধে গণ–আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় রচিত হয়েছে এখানে। বিশ্ব যক্ষ্মা দিবসে প্রায় ছয় হাজার মানুষের অংশগ্রহণে বিশ্বের বৃহত্তম মানব-ফুসফুসের প্রতিকৃতিও তৈরি হয়েছিল এই উদ্যানে। ২০০৫ সালের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ান গেমসের উদ্বোধন থেকে শুরু করে ২০১০ সালের ম্যানিলা জিম্মি সংকট, বহু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাই এই উদ্যানকে ইতিহাসের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।

রিজাল স্মৃতিস্তম্ভের ঠিক বিপরীতে দাঁড়িয়ে আছে এক বিশাল পতাকাস্তম্ভ, যেন ইতিহাসের এক নীরব প্রহরী। বিকেলের আলোয় তার দীর্ঘ ছায়া উদ্যানের সবুজ ঘাসের ওপর গিয়ে পড়ছিল। দেড় শ ফুট উঁচু এই স্তম্ভটির দিকে তাকালে মনে হয়, এটি শুধু ইস্পাতের নির্মাণ নয়, বরং একটি জাতির স্বাধীনতার স্মৃতিচিহ্ন। ১৯৪৬ সালের ৪ জুলাই, দীর্ঘ ঔপনিবেশিক অধ্যায়ের অবসান ঘটিয়ে স্বাধীন ফিলিপাইনের পতাকা প্রথমবারের মতো এখানেই উড়েছিল। সেই মুহূর্তের উচ্ছ্বাস, মানুষের চোখের জল আর স্বাধীনতার আবেগ যেন এখনো বাতাসে মিশে আছে।

দেড় শ ফুট উঁচু পতাকাস্তম্ভ
দেড় শ ফুট উঁচু পতাকাস্তম্ভ

পরবর্তী গন্তব্যে যাওয়ার আগে আবারও ফিরে এলাম হোসে রিজালের স্মৃতিস্তম্ভের কাছে। স্মৃতিস্তম্ভের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে বুঝতে পারলাম, কোনো জাতির ইতিহাস আসলে শুধু যুদ্ধ আর রাজনীতির গল্প নয়; ইতিহাস তৈরি হয় কিছু মানুষের নীরব আত্মত্যাগে, কিছু অসমাপ্ত স্বপ্নে, কিছু অমর বিশ্বাসে। ফিলিপাইন সম্পর্কে আমার দীর্ঘদিনের ধারণাগুলো ছিল ভিন্ন।

এই দেশটির নাম শুনলেই চোখে ভেসে উঠত ইমেলদা মার্কোসের বিখ্যাত তিন হাজার জোড়া জুতা, প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো দুতার্তের বিতর্কিত মাদকবিরোধী অভিযান, কিংবা মিন্দানাওয়ের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের খবর। কিন্তু রিজাল উদ্যানের সেই বিকেলে দাঁড়িয়ে আমার কাছে ফিলিপাইন নতুন এক পরিচয় পেল।

ম্যানিলার ফুসফূস এই পার্ক
ম্যানিলার ফুসফূস এই পার্ক

এখন থেকে ফিলিপাইন মানেই আমার কাছে সমুদ্রঘেরা কোনো দ্বীপরাষ্ট্র নয়, কোনো রাজনৈতিক সংবাদও নয়। ফিলিপাইন মানেই আমার কাছে এক তরুণ কবির গল্প, যিনি বন্দুকের সামনে দাঁড়িয়েও বিশ্বাস হারাননি। এক চিকিৎসকের গল্প, যিনি তাঁর কলম দিয়ে একটি জাতির আত্মাকে জাগিয়ে তুলেছিলেন। আর এক বিপ্লবীর গল্প, যিনি নিজের জীবন দিয়ে প্রমাণ করে গেছেন যে মানুষের মৃত্যু হতে পারে, কিন্তু স্বাধীনতার স্বপ্নের মৃত্যু হয় না।

ছবি: লেখক; হোসে রিজালের ছবি: উইকিপিডিয়া

প্রকাশ: ২৯ আগস্ট ২০২৬, ০৬: ০০
বিজ্ঞাপন