
দীর্ঘ আলাপচারিতার শেষ দিকে আমার প্রশ্ন ছিল ১২৬টি দেশ ঘুরে, হাজারো মানুষের সঙ্গে দেখা করে, এত বছরের ভ্রমণের পর মানুষ সম্পর্কে সবচেয়ে বড় শিক্ষা কী?
প্রশ্নটি শুনে ম্যান্ডি ও লি একে অপরের দিকে তাকালেন। দুজনের চোখেই ফুটে উঠল এক চেনা হাসি। মনে হলো, উত্তরটি তাঁরা বহুবার ভেবেছেন, আবার কখনো ভেবে দেখারও প্রয়োজন হয়নি।

লি ধীরে ধীরে বললেন, ‘টেলিভিশন কিংবা সংবাদমাধ্যম দেখলে মনে হয়, পৃথিবীটা খুব ভয়ংকর। কিন্তু আমরা ১২৬টি দেশ ঘুরে দেখেছি, বেশির ভাগ মানুষই ভালো। তারা আপনাকে সাহায্য করতে চায়, নিজের বাড়িতে আমন্ত্রণ জানাতে চায়, চায় আপনি তাদের দেশটাকে ভালোবেসে ফিরুন।’
ম্যান্ডি তাঁর কথার সঙ্গে যোগ করলেন, ‘খারাপ মানুষ অবশ্যই আছে। কিন্তু তারা সংখ্যায় খুবই কম। ভালো মানুষের সংখ্যাই অনেক বেশি।’
এই কয়েকটি বাক্যই যেন তাঁদের ৩০ বছরের ভ্রমণজীবনের সারসংক্ষেপ।

আমরা অনেকেই আফ্রিকার নাম শুনলেই যুদ্ধ, দারিদ্র্য, দুর্ভিক্ষ কিংবা রাজনৈতিক অস্থিরতার কথা ভাবি। সংবাদপত্রের শিরোনামগুলো আমাদের সামনে প্রায়ই সেই ছবিই তুলে ধরে।
ম্যান্ডি ও লির স্মৃতিতে আফ্রিকার পরিচয় একেবারেই অন্য রকম।
২০১০ সালে ম্যান্ডি ও লি যোগ দিয়েছিলেন একটি ওভারল্যান্ড ট্রাক অভিযানে। ৪০ সপ্তাহের সেই যাত্রায় একটি ট্রাকই ছিল তাঁদের বাড়ি। সঙ্গে ছিলেন আরও ২৪ জন ভ্রমণকারী।
জিব্রাল্টার থেকে শুরু হয়ে ভ্রমণ দলটি পাড়ি দিয়েছিল মরক্কো, মৌরিতানিয়া, সেনেগাল, ঘানা, ক্যামেরুন, কঙ্গো, অ্যাঙ্গোলা, দক্ষিণ আফ্রিকা, তানজানিয়া, কেনিয়া ও ইথিওপিয়া হয়ে মিসর পর্যন্ত—মোট ২৬টি দেশ।
অনেক রাত কেটেছে জঙ্গলের ধারে তাঁবু খাটিয়ে। কখনো বিদ্যুৎ ছিল না, কখনোগোসলের পানিও ছিল সীমিত। বিলাসিতা বলতে কিছুই ছিল না।
তবু প্রতিটি সকাল ছিল নতুন বিস্ময়ে ভরা।
কোনো কোনো দিন তাঁবুর সামনে দাঁড়িয়ে থাকত জিরাফ। কোনো দিন হাতির পাল ধীরে ধীরে হেঁটে চলে যেত দূরের জঙ্গলের দিকে। আবার কোনো দিন দূর থেকে দেখা মিলত সিংহের।
কিন্তু বন্য প্রকৃতির চেয়ে বেশি মনে আছে মানুষের কথা।
ম্যান্ডি বলছিলেন, ‘পশ্চিম আফ্রিকায় ভ্রমণ সহজ ছিল না। কিন্তু মানুষ ছিল অসাধারণ। নাইজেরিয়া, কঙ্গো কিংবা ক্যামেরুন—সংবাদে যেসব দেশের নাম শুনে মানুষ ভয় পায়। অথচ সেই দেশগুলোর ছোট ছোট গ্রামে গিয়ে আমরা দেখেছি অন্য এক পৃথিবী। শিশুরা দৌড়ে এসে হাত নাড়ছে। বয়স্ক মানুষ কৌতূহল নিয়ে গল্প করতে চাইছেন। কেউ বাড়িতে আমন্ত্রণ জানাচ্ছেন। কেউ শুধু হাসিমুখে শুভেচ্ছা জানিয়ে চলে যাচ্ছেন।’
লি বললেন, ‘ভয় ছিল। কিন্তু মানুষের জন্য নয়। ভয় ছিল আমাদের নিজেদের ধারণাগুলো নিয়ে।’
কথাটি আমার মনে গভীর রেখাপাত করেছিল।
অনেক সময় পৃথিবী নয়, আমাদের ধারণাগুলোই সবচেয়ে বড় দেয়াল তৈরি করে।

রাশিয়ার গল্পটিও ছিল তেমনই।
ট্রান্স-সাইবেরিয়ান রেলপথ ধরে সেন্ট পিটার্সবার্গ থেকে ভ্লাদিভস্তক পর্যন্ত দীর্ঘ ট্রেনযাত্রা। জানালার বাইরে সাদা বরফে ঢাকা পৃথিবী। মাইনাস ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ঠান্ডা। জমে যাওয়া বৈকাল হ্রদ। অন্তহীন বনভূমি। আর একই কামরায় দিনের পর দিন একসঙ্গে থাকা অচেনা মানুষ।
ম্যান্ডি হেসে বলছিলেন, ‘অনেকে বলেছিল, রাশিয়ায় গেলে সবাই ভদকা খাওয়াবে। কিন্তু আমরা দেখলাম, তারা বরং চা ভাগাভাগি করে খেতে বেশি ভালোবাসে।’
ভাষা খুব বেশি জানা ছিল না। তবু কয়েকটি রুশ শব্দ, এক কাপ গরম চা আর একটি হাসিই বন্ধুত্বের জন্য যথেষ্ট ছিল।
মধ্য এশিয়ার সিল্ক রোডের দেশগুলো—কিরগিজস্তান, তাজিকিস্তান, উজবেকিস্তান, কাজাখস্তান, জর্জিয়া, আর্মেনিয়া ও আজারবাইজানের কথা বলতে গিয়ে দুজনের চোখে অন্য রকম উচ্ছ্বাস দেখা যাচ্ছিল।

তাঁদের কাছে ইতিহাস মানে শুধু পুরোনো স্থাপত্য নয়।
ইতিহাস মানে সেই মানুষগুলো, যারা শত শত বছর ধরে ভ্রমণকারীদের স্বাগত জানিয়ে এসেছে।
কখনো যাযাবরদের তাঁবুতে বসে ধোঁয়া ওঠা চা, কখনো স্থানীয় রুটি, কখনো ঘোড়ার দুধের ঐতিহ্যবাহী পানীয়। প্রতিটি খাবারের সঙ্গে ছিল একটি গল্প। প্রতিটি গল্পের কেন্দ্রে ছিল একজন মানুষ।

মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে পৃথিবীতে যত ভুল ধারণা রয়েছে, ম্যান্ডি ও লির অভিজ্ঞতা যেন তার সম্পূর্ণ বিপরীত।
কুয়েতে একজন স্থানীয় পরিবারের সঙ্গে কয়েক সপ্তাহ থাকার অভিজ্ঞতা তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গিই বদলে দিয়েছিল। সেই পরিবার শুধু নিজেদের বাড়ির দরজাই খুলে দেয়নি; খুলে দিয়েছিল নিজেদের সংস্কৃতি, পারিবারিক ঐতিহ্য আর দৈনন্দিন জীবনের গল্প।
কুয়েতে প্রথম সকালের নাশতার বিল গোপনে দিয়ে গিয়েছিলেন এক অচেনা মানুষ। আর সৌদি আরবে তাঁরা খেয়েছেন জীবনের সবচেয়ে সুস্বাদু খেজুর।
ইরাকি কুর্দিস্তানে কেউ তাঁদের জুসের দাম দিতে দেননি। তাজিকিস্তানেও ঘটেছিল একই ঘটনা।
তাঁদের কাছে আতিথেয়তা কোনো পর্যটন-সেবার অংশ নয়, এটি মানুষের সহজাত সৌজন্য।
কোভিড পৃথিবীকে থামিয়ে দিয়েছিল। দেশের পর দেশে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। সেই সময় ম্যান্ডির ক্যানসারের চিকিৎসাও চলছিল।
তবু তাঁরা স্বপ্ন দেখা বন্ধ করেননি।

বরং সেই সময় তাঁদের আরও একটি শিক্ষা দিয়েছিল—জীবন কখনোই নিশ্চিত নয়। তাই স্বপ্নগুলোকে বারবার পিছিয়ে দেওয়ারও কোনো মানে নেই।
ভ্রমণ তাঁদের কাছে শুধু পৃথিবী দেখার উপায় নয়; জীবনকে নতুন করে দেখারও একটি পদ্ধতি।
আমি জানতে চাইলাম, এত বছরের অভিজ্ঞতায় নতুন ভ্রমণকারীদের জন্য সবচেয়ে জরুরি পরামর্শ কী? তাঁদের পরামর্শ—ভ্রমণের আগে যতটা সম্ভব পড়াশোনা করুন। স্থানীয় সংস্কৃতি সম্পর্কে জানুন। যেখানে স্থানীয় মানুষ খায়, সেখানেই খাওয়ার চেষ্টা করুন। সব সময় কিছু নগদ অর্থ সঙ্গে রাখুন।

আর শেষে এমন একটি পরামর্শ দিলেন, যা শুনে আমরা সবাই হেসে উঠলাম—‘ভ্রমণে একটি ছোট চামচ সঙ্গে রাখবেন।’ কেন? আইসক্রিম খাওয়া থেকে শুরু করে ফল কাটা, সুপারমার্কেট থেকে খাবার কিনে পার্কে বসে খাওয়া—একটি ছোট চামচ নাকি অসংখ্য সমস্যার সমাধান করে দেয়। ছোট্ট এই পরামর্শও যেন তাঁদের পুরো জীবনদর্শনের প্রতীক।
সুখ অনেক সময় বড় কিছুর মধ্যে নয়। ছোট ছোট প্রস্তুতির মধ্যেই লুকিয়ে থাকে।
সাক্ষাৎকারের শেষ প্রশ্নটি ছিল বাংলাদেশের মানুষ নিয়ে।
ম্যান্ডি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন। তারপর ধীর গলায় বললেন, ‘বাংলাদেশের মানুষ অসাধারণ আন্তরিক। রাস্তায় বের হলেই কেউ না কেউ কথা বলতে চায়, সাহায্য করতে চায়, আপন করে নিতে চায়। আমার শুধু একটাই আশা—পর্যটন যতই বাড়ুক, এই আন্তরিকতা যেন কখনো হারিয়ে না যায়।’
লিও সম্মতি জানিয়ে বললেন, ‘অনেক দেশে দেখেছি, পর্যটক বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বন্ধুত্বের জায়গাটা ব্যবসা দখল করে নেয়। বাংলাদেশ যেন সেই পথে না হাঁটে। এখানকার মানুষের সবচেয়ে বড় সম্পদ তাদের হৃদয়।’

সেদিন বিদায় নেওয়ার সময় মনে হচ্ছিল, আমি যেন দুটি ভ্রামণিকের সাক্ষাৎকার নিয়ে ফিরছি না, আমি ফিরছি মানুষের ওপর নতুন করে বিশ্বাস স্থাপন করে।
ম্যান্ডি ও লি লিওনেল মেসি, ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোসহ পৃথিবীর বহু বিখ্যাত মানুষের সঙ্গে দেখা করেছেন। অসংখ্য রাষ্ট্র, সংস্কৃতি ও সভ্যতা দেখেছেন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, তাঁদের সবচেয়ে প্রিয় স্মৃতিগুলো কোনো তারকাকে ঘিরে নয়, বরং এক আপেল বিক্রেতাকে নিয়ে; একজন দোকানদারকে নিয়ে; একজন ট্যাক্সিচালককে নিয়ে; একজন অচেনা মানুষকে নিয়ে, যিনি নিঃশব্দে অন্যের সকালের নাশতার বিল পরিশোধ করে চলে গিয়েছিলেন।
হয়তো ভ্রমণের আসল অর্থ এটাই।
পাসপোর্টে নতুন সিল যোগ করা নয়, পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু পাহাড় দেখা নয়, বরং বারবার আবিষ্কার করা—পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর জায়গা কোনো দেশ বা শহর নয়, বরং পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর গন্তব্য হলো মানুষ।

ম্যান্ডি ও লির কাছ থেকে বিদায় নেওয়ার পর অনেকক্ষণ ধরে একটি কথাই আমার মনে ঘুরছিল—পৃথিবীকে যদি আমরা শুধু সংবাদ শিরোনামের চোখে দেখি, তাহলে ভয়ই দেখব। কিন্তু যদি মানুষের চোখে দেখি, তাহলে আবিষ্কার করব—ভাষা, ধর্ম, সীমান্ত আর রাজনীতির ওপারেও মানুষ আসলে মানুষেরই আপন।
হয়তো এই বিশ্বাসটুকুই ম্যান্ডি ও লির ৩০ বছরের ভ্রমণের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি; আর আমারও।
ছবি: ইন্সটাগ্রাম