মধুচন্দ্রিমায় সবচেয়ে জনপ্রিয় যে ইকো রিসোর্ট
শেয়ার করুন
ফলো করুন

শীতে চলে বিয়ের ধুম। বিয়ের পরেই নবদম্পতিরা একান্ত কিছু মুহূর্ত কাটাতে চলে যায় প্রকৃতির কাছাকাছি কোথাও। সদ্য বিবাহিতদের এই বেড়ানোকে বলা হয় হানিমুন। বাংলায় আরও রোমান্টিক শব্দ আছে,  মধুচন্দ্রিমা। বিবাহিত জীবনের শুরুতেই এসময়ের কিছু মধুর স্মৃতি তাদের প্রেমকে আরও গভীর করে। বোঝাপড়াকে আরও নিবিড় করে।

শান্ত এই রিসোর্ট মধুচন্দ্রিমার জন্য আদর্শ
শান্ত এই রিসোর্ট মধুচন্দ্রিমার জন্য আদর্শ

বাংলাদেশে প্রচলিত কিছু পর্যটন কেন্দ্রই হয় মধুচন্দ্রিমার গন্তব্য।  কিন্তু শীতের ছুটিতে পর্যটনকেন্দ্রগুলো থাকে লোকারণ্য। শহর থেকে দূরে এসে সেই শহুরে ব্যস্ততা, গাড়ির শব্দ আর ইট-পাথর নিয়েই থাকতে হয়। তাই সেসব জায়গায় নিজেদের মতো আয়েশ করে নিরিবিলি সময় কাটানো সম্ভব হয় না। এক্ষেত্রে কোলাহল মুক্ত ও প্রকৃতির কাছাকাছি একটি জায়গাই হতে পারে মধুচন্দ্রিমার জন্য আদর্শ। নিজেদের দ্বৈতজীবনের শুরুতে এমন একটা ঘুরে আসার অভিজ্ঞতা শেয়ার করার ইচ্ছে সম্বরণ করতে পারছি না।

বিজ্ঞাপন

পাখির কিচিরমিচির, রোদের আলো-ছায়া, পাতার ঝরে পড়া, মৃদুমন্দ হিমেল বাতাস– এমন প্রকৃতির এমন সব ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অনুষঙ্গ মনকে পূর্ণ করে তোলে। আর সেই আস্বাদ মেলে এখানে। আরও আছে শান্ত পাহাড়, হৃদয়ের দুকূল ভাসানো সুবিশাল সমুদ্র, প্রৃকৃতির পটে আঁকা সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের ছবি, ঝাউবন ও বালিয়াড়ি।  সব মিলে এ এক অনন্য আয়োজন। আর সেটা মিলবে কক্সবাজারের পেঁচারদ্বীপের মারমেইড বিচ রিসোর্টে। হিমছড়ি ও ইনানী বিচের মাঝামাঝি, টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের একপাশে ১৪ একর জায়গায় যত্ন করে সাজানো এই রিসোর্ট।

অভ্যর্থনা মন ভরায়
অভ্যর্থনা মন ভরায়

অভ্যর্থনা আয়োজনেই অতিথিদের মুগ্ধ করে মারমেইড। অতিথিদের বরণ করে নেওয়া হয় টকটকে লাল জবা ও নারকেল পাতায় তৈরি মালা দিয়ে। ওয়েলকাম ড্রিংকস হিসেবে দেওয়া হয় ডাবের পানি। এর পরিবেশনাও বেশ হৃদয়গ্রাহী। গ্লাসটি সাজানো হয় নারকেল পাতা আর জবাফুলের পাপড়ি দিয়ে। এখানে বলে রাখা ভাল, তাদের প্রতিটি আয়োজন ও পরিবেশনায় জবার উপস্থিতি দৃষ্টি এড়ায় না।  

বিজ্ঞাপন

মূল ফটক থেকে লবি পর্যন্ত যেতেই পরিষ্কার ধারণা করা যায় কেন ইকো রিসোর্ট হিসেবে এত নাম কুড়িয়েছে মারমেইড। একদম শেষ না হয়ে যাওয়া পর্যন্ত প্রতি জিনিসকে কোনো না কোনোভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে মারমেইডে। ভাঙা তৈজসপত্র নিখুঁতভাবে ব্যবহার করা হয়েছে রাস্তার ঢালাইয়ে। ফেলে দেওয়া বালতি ও বোতল দিয়ে করা হয়েছে ভেতরের পথগুলোর আলোকসজ্জা। জাহাজের কাঠ দিয়ে বেঞ্চ, ঝাউগাছের গুঁড়ি দিয়ে সাজসজ্জা। পুরনো অনেকগুলো হারিকেন সাজানো হয়েছে গাছের ডালে। নির্মাণ কাজে ব্যবহৃত সামগ্রী দিয়ে বানানো হয়েছে স্থাপত্য।
রাতের আলোকসজ্জায় আরও আকর্ষণীয় আর মোহময় হয়ে ওঠে মারমেইড।  প্লাস্টিকের বোতল, বালতিগুলো আরও বেশি দৃশ্যমান এসময়, জানান দেয় নিজেদের পুনর্ব্যবহারযোগ্যতার।

বিভিন্ন ক্যাটাগরির রুম আছে এখানে
বিভিন্ন ক্যাটাগরির রুম আছে এখানে

গার্ডেন বাংলো, গার্ডেন স্যুইট, মারমেইড স্যুইট, বিচ ভিলা, পুল স্যুইট ফ্যামিলি বিচ ভিলা, বিচ হাউস, স্লিপিং বোটসহ মোট ১০টি ক্যাটাগরিতে ৩৫টি কক্ষ বিন্যাস করা মারমেইডে।  প্রতিটি কটেজে কাঠ ও বাঁশের ব্যবহার গ্রামীণ আবহ তৈরি করেছে।
প্রতিটি কটেজই গাছপালায় ঘেরা। তবুও প্রতিটি কক্ষ শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত। আছে ফ্রিজ, গিজার, প্রসারিত স্নানঘর ও অন্যান্য সকল সুযোগ–সুবিধা। অন্যান্য জায়গার মতো শুধু নির্দিষ্ট কক্ষে নয়, ঘুরে বেড়ানো যায় পুরো রিসোর্ট জুড়ে, যা ‘নিজের বাড়ি’র অনুভূতি দেয়। মারমেইডে আছে একটি রেস্তোরাঁ, জুস বার, লাইভ বার-বি-কিউ স্টেশন, সুইমিং পুল, প্রাইভেট বিচ ও রোমাঞ্চক সব অ্যাক্টিভিটি।

মারমেইডের সুইমিংপুলটির কথা আলাদাভাবে বলতে হয়। ৩০০ ফুট দীর্ঘ এই পুলটি কক্সবাজারের সবচেয়ে বড় সুইমিংপুল। কৃত্রিম এই পুলের পেছনে পাহাড় আর সামনে বালিয়াড়ি, একটু দূরে রেজু খাল, তারপর অথৈ সমুদ্র। এখানকার ডেকচেয়ারে বসে সেরে নেওয়া যায় রৌদ্রস্নান ও সকালের নাশতা।

পুলসাইডেই সকালের নাস্তার আয়োজন করা হয়
পুলসাইডেই সকালের নাস্তার আয়োজন করা হয়

এই পুলের পাশেই প্রতিদিন সকালে আয়োজন করা হয় নাশতার। মারমেইডের সকালের নাশতার সুনাম বেশ। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও সতেজ-সুস্বাদু খাবার উপভোগ করতে ছুটে আসেন আশেপাশের অন্যান্য হোটেলের অতিথিরাও।

শীতকাল এখানে থাকে ‘লাইভ পিঠা স্টেশন’। স্থানীয় নারীদের তৈরি পিঠার স্বাদ মন ভোলায় অতিথিদের। থাকে মৌসুমি ফল ও ফলের রস। পেঁপে, আনারস, তরমুজ, গাজর, কমলার জুসসহ ইশপগুল আর তোকমাসহ আরও আয়োজন। পরোটা, খিচুড়ি, ডিম ভাজি, ডাল আর মুরগির মাংসসহ কন্টিনেন্টাল কুইজিন ব্যুফের পাশাপাশি স্বাদ নেওয়া যায় অন্যান্য কুইজিনও ।  সঙ্গে চা, কফি তো আছেই।

রাতও এখানে উপভোগ্য
রাতও এখানে উপভোগ্য

মারমেইডের রেস্তোরাঁয় দেশি খাবারের সঙ্গে পাওয়া যায় শেফের বিশেষ কিছু পদও। ভর্তা, মাছ-মাংসের সঙ্গে চট্টগ্রামের বিখ্যাত কালা ভুনা, মেজবানি গরুর মাংস  যেমন আছে, আছে সামুদ্রিক মাছের নানা পদ। খাবারের সব কিছু সংগ্রহ করা হয় স্থানীয়দের কাছ থেকে।

মারমেইডের রেস্তোরাঁর বর্ধিত অংশটুকু সমুদ্রের দিকে মুখ করা। দোতলা কাঠামোর নিচের অংশে টেবিল বিছিয়ে খাবারের আয়োজন করা। আর উপরের অংশটুকু আয়েসের জন্য, আড্ডার জন্য। কেউ কেউ মেডিটেশনও করে থাকেন। সমুদ্র, পাহাড় আর রিসোর্টের পুরো রূপ দেখা যায় এখানে বসে। এই দোতলা কাঠামোর পিলারগুলোর পেছনেও গল্প আছে।

প্রকৃতিকে এভাবে জড়িয়ে রাখা হয়েছে
প্রকৃতিকে এভাবে জড়িয়ে রাখা হয়েছে

নতুন পিলার তৈরি করতে গেলে অনেক গাছ কাটতে হতো। তাই আগের দিনের বৈদ্যুতিক খুঁটিকে ব্যবহার করা হয়েছে বিভিন্ন এলাকা থেকে সংগ্রহ করে আনা হয়েছে। তারপর সেগুলো দিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে এই দোতলা।

রেস্তোরাঁর পাশেই ফ্রেশ জুস বার ও বার–বি–কিউ স্টেশন। মূলত লাইভ ফিশ বার-বি-কিউ সেশনটি কেমিস্ট্রি অব কাঁকড়া নামে পরিচিত। অতিথিদের নির্বাচিত সামুদ্রিক মাছ কিংবা কাঁকড়া বার-বি-কিউ করা যায় এখানে।  

জোয়ারের সময় সমুদ্র সবচেয়ে কাছে চলে আসে মারমেইডের। তাদের প্রাইভেট বিচে বসে তখন উপভোগ করা যায় সমুদ্রের কলতান আর উথাল–পাথাল।  ভিড় নেই, নেই কোনো অপ্রয়োজনীয় শব্দ। সদ্য বিবাহিত দুটি মানুষ এমন প্রকৃতির মাঝে হারিয়ে গিয়ে নিজেদের সম্পর্কের শুদ্ধতা ও সৌন্দর্য উপলব্ধি করতে পারেন। অবিরল কথার মাঝে আবিষ্কার করেন নিজেদের। আর আনমনে তখন তারা হাতে হাত রেখে বলতেই পারেন:
এমন এক শান্ত সমুদ্রে,
তোমার সঙ্গে ভাসতে চাই,
ভালোবাসার মধুর যাত্রায়,
দুটি হৃদয় এক হয়ে চলতে চাই।

এখানেও আছে একটি কফি স্টোর। নাম ‘সি সাইলেন্স ক্যাফে’। কুকি, কোকোনাট কেক ও বিভিন্ন ধরনের কফি পাওয়া যায় এখানে। নৈশব্দের অদৃশ্য জালে জড়ানো এই ক্যাফেতে নির্মিশেষ বসে কফির স্বাদ আর উভয়ের হৃদয়ের উষ্ণতা অনুভব করা যায় অনায়াসে। কথায় কথায় জুড়িয়ে গেলে কফি নেওয়া যাবে আবার। কাটিয়ে দেওয়া যাবে ইচ্ছেমত সময়।

খাল পেরিয়ে চলে যাওয়া যায় মূল সৈকতে
খাল পেরিয়ে চলে যাওয়া যায় মূল সৈকতে

মারমেইডের বালির মাঠ ও কাঠের পুল পেরিয়ে গেলেই রেজু খাল তারপর আমাদের চিরচেনা বঙ্গোপসাগর। ঝাউবনে ঘেরা বালিয়াড়ির অংশটুকু সাজানো নানা অনিন্দ্য স্থাপনায়। মাঝেমাঝেই অতিথিদের জন্য এখানে বিচ ফুটবল ও ভলিবলের আয়োজন করে থাকে মারমেইড। এছাড়া চাইলে রেজু খালে কায়াকিংয়ের ব্যবস্থাও করে দেয়। কায়াকিং করে খাল পাড়ি দিয়ে চলে যাওয়া যায় মূল সমুদ্র সৈকতে।

সান্ধ্যকালীন বিভিন্ন আয়োজনে মাতিয়ে রাখা হয় মারমেইডকে। অতিথিদের বিনোদনের জন্য ফায়ার শোর ব্যবস্থা করা হয় প্রায়ই। মুভি নাইট আর গানের আসরও বসে। বিশেষ করে এই মৌসুমে। সবমিলিয়ে নবদম্পতিরা ভীষণ উপভোগ করবে মারমেইড বিচ রিসোর্টের প্রকৃতি, পরিষেবা ও আয়োজন।

ছবি: লেখক

প্রকাশ: ২৫ জানুয়ারি ২০২৫, ০৬: ০০
বিজ্ঞাপন