
শীতে শর্ষের ক্ষেতে ফুটে ওঠা হলুদ ফুলের সমুদ্র মানুষকে দুর্বারভাবে আকৃষ্ট করে। অবারিত হলুদের মাঝে ছবি তুলতে যাচ্ছেন অনেকেই এই মৌসুমে। এ এক ভাইরাল ট্রেন্ডও বলা যায়। তবে এজন্য ঘুরতে গিয়ে ছবি তুলতে তুলতে আমরা অনেক সময় অজান্তে ক্ষতি করে ফেলি সেই ক্ষেতের ফসলের আর কৃষকের।

অথচ একটু সচেতন হলে, কোনো ধরনের ক্ষতি ছাড়াই দেশের যেকোনো প্রান্তের সর্ষে ক্ষেতের সৌন্দর্য উপভোগ করা আর ট্রেন্ড মেনে শর্ষে ক্ষেতে ছবি তোলা সম্ভব।
শীতে শর্ষে ফুলের ক্ষেত নরম রোদ, হালকা বাতাস আর মৌমাছির ইতিউতি উড়ে বেড়নো মিলিয়ে এক অপূর্ব দৃশ্যের অবতারণা হয়, যা স্বাভাবিকভাবেই দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করে।

হলুদ ফুলের এই সমুদ্রে তোলা ছবিগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হরহামেশাই চোখে পড়ে। এই সৌন্দর্য দেখতেই শহর ছেড়ে মানুষ ছুটে যায় গ্রামে, ক্যামেরার ফ্রেমে ধরে রাখতে চায় মুহূর্তগুলো। কিন্তু সেই মুহূর্ত ধরে রাখতে গিয়েই আমরা অনেক সময় ভুলে যাই—এই ফুলের ক্ষেত কেবল সৌন্দর্যের জন্য নয়, কৃষকের জীবিকার সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত।

শর্ষে ফুল সাধারণত ডিসেম্বরের শেষ দিক থেকে পরিপূর্ণতা পেতে শুরু করে। জানুয়ারি মাসজুড়ে থাকে এর পূর্ণ সৌন্দর্য, আর ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝির দিকে ধীরে ধীরে শেষ হয় ফুলের মৌসুম। শর্ষে ফুল দেখার সবচেয়ে ভালো সময় জানুয়ারির প্রথম থেকে শেষ সপ্তাহ। এই সময়েই মাঠজুড়ে হলুদ রঙের সবচেয়ে ঘন, প্রাণবন্ত ও মনমুগ্ধকর দৃশ্য দেখা যায়।
কয়েক বছর ধরেই শর্ষে ক্ষেতে মানুষের যাতায়াত আর তাতে ফসলের ক্ষতির খবর দেখে যাওয়ার খুব একটা ইচ্ছা কখনোই আমার হয়নি। তবে এবার অ্যাডভেঞ্চার ক্লাব রোপ ফোরের আয়োজনে পাবনার দিলপাশা, চলনবিল সংলগ্ন এলাকায় একটি ডে ট্রিপের ইভেন্ট দেখে মনে হলো একবার গিয়ে দেখা যাক, বিষয়টা আসলে কেমন। এই আয়োজনের পেছনে ছিলেন রোপ ফোরের টিম লিডার, মাউন্টেনিয়ারিং ও অ্যাডভেঞ্চার ট্রেনিংয়ের প্রশিক্ষক মহিউদ্দিন মাহি।

দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি পরিবেশবান্ধব ও দায়িত্বশীল ভ্রমণ নিয়ে কাজ করছেন। শর্ষে ক্ষেতের মতো সংবেদনশীল জায়গায় তাঁর উদ্যোগ মানেই প্রচলিত ঘোরাঘুরির বাইরে কিছু ভিন্ন অভিজ্ঞতার সম্ভাবনা। সেই কারণেই এই শীতের প্রথম ভ্রমণ গন্তব্য হিসেবে ঠিক হলো পাবনার দিলপাশার চলনবিল সংলগ্ন শর্ষে ক্ষেত।
ঢাকা থেকে পাবনা শহরের দূরত্ব প্রায় ১৪৪ কিলোমিটার। সাধারণত সময় লাগে সাড়ে চার ঘণ্টার কাছাকাছি। তবে আমাদের গন্তব্য ছিল পাবনার ভাঙ্গুড়া উপজেলার দিলপাশা এলাকা। কমলাপুর থেকে সকাল ছয়টার ট্রেন যা আদতে ছেড়ে যায় ছয়টায়। সকাল সোয়া দশটার দিকে আমরা পৌঁছে যাই বড়াল ব্রিজ রেলওয়ে স্টেশনে। ঈশ্বরদী–সিরাজগঞ্জ রেলপথের এই লাইনটি নির্মিত হয়েছিল ১৯১৫–১৬ সালের মধ্যে, তৎকালীন সারা–সিরাজগঞ্জ রেলওয়ে কোম্পানির মাধ্যমে। প্রায় ১১০ বছর পুরোনো এই রেললাইনের অংশ হিসেবেই বড়াল ব্রিজ রেলওয়ে স্টেশনটি গড়ে ওঠে।


ইতিহাসের ভার বহন করা এই পথে চলাটাই যেন ছিল এক ধরনের টাইম ট্র্যাভেল। ২২ জনের আমাদের অভিযাত্রী দল একটু রোমাঞ্চের আশায় বড়াল নদীর ওপর নির্মিত ব্রিটিশ আমলের লোহার রেলসেতুটি হেঁটেই পার হয়ে যায়। স্থানীয় ছেলে ও রোপ ফোরের সদস্য আহসানুজ্জামান তৌকির জানালেন, বড়াল ব্রিজের পাশেই বসে বাংলাদেশের অন্যতম বড় গরুর হাট। শনিবার হাটবার হওয়ার কারণে সেদিন ভীড় ছিল চোখে পড়ার মতো।
উৎকৃষ্ট মানের গরুর দুধের কারণেই পাবনার ঘি ও মিষ্টির সুনাম সারা দেশে। তার বাস্তব প্রমাণ মিলল সকালের নাশতার পর, রবিউল টি স্টলে এক কাপ দুধ চা মুখে দিয়েই । বড়াল নদীর ওপর লোহার সেতু, শীতের পাতাঝরা বিশাল বৃক্ষ, আর নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে গরম চায়ের কাপে চুমুক এই শীতের সকাল উপভোগ করার অভিজ্ঞতা ছিল মনে রাখার মতো।


এরপর আমাদের গন্তব্য হলো চলনবিলের দিলপাশার শর্ষে ক্ষেত। বর্ষাকালে এই ক্ষেতগুলো ডুবে থাকে পানিতে, তখনই জেলেরা মাছ ধরার মৌসুমে থাকে। এরপর আসে ধানের সময়, যখন চাষিরা জমিতে ধান চাষ করেন, আর শীতকালে হয় শর্ষে চাষ। এখান থেকে উৎপন্ন হয় শর্ষের তেল ও এই ফুলের মধু, যা সুন্দরবনের মধুর চেয়ে স্বাদে ভিন্ন।

ভ্যানে করে চলার পথে আমরা উপভোগ করছিলাম স্থানীয় মানুষের জীবনচিত্র।ক্ষেতের মাঝ দিয়ে এগোচ্ছে তাদের দৈনন্দিন কাজ, আর ওপরে উড়ে চলা অতিথি পাখিদের ওড়াউড়ি।
রেললাইনের নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছার পর ঢাল বেয়ে আমরা নেমে শর্ষে ক্ষেতের পাশে এসে দাঁড়াই। আইল ধরে হাঁটতে হাঁটতে চলনবিলের ধারে পৌঁছানো পর্যন্ত মন ভরে ওঠে প্রকৃতির ছোঁয়ায়। ভ্রমণ শুরুর আগে মাহি ভাই ব্রিফিং দিয়ে বললেন, এটি কোনো সাধারণ ট্যুরিস্ট স্পট নয়, তাই সব ধরনের সুযোগ সুবিধা সবসময় পাওয়া যাবে না এ বিষয়টি মাথায় রেখে সবাইকে মানিয়ে চলতে হয়েছে। স্থানীয়দের সঙ্গে কোনো ধরনের নেতিবাচক আচরণ করা যাবে না এই নির্দেশনাও ছিল কঠোরভাবে অনুসরণযোগ্য। ছবি তুলতে চাইলে শর্ষে ক্ষেতের ভেতরে প্রবেশ নিষেধ; জমির মাঝখানের আইল বা সীমারেখা ধরে দাঁড়িয়ে ছবি তুলতেই হবে। কোনো শর্ষে ফুল ছেঁড়া যাবে না এবং কৃষকের ক্ষতি হয় এমন কোনো কাজ করা যাবে না।


চলার পথে কোনো ধরনের ময়লা ফেলা নিষিদ্ধ ছিল। পাশাপাশি বলা হয়েছিল দলের সঙ্গে চলা বাধ্যতামূলক। কেউ যেন দলছুট না হয়, সে বিষয়েও বিশেষভাবে নজর রাখা হয়। এই নিয়মগুলো শুধু ঘোষণায় সীমাবদ্ধ ছিল না; পুরো ভ্রমণজুড়েই রোপ ফোরের সদস্যরা নিয়ম মানা হচ্ছে কি না, তা সতর্কভাবে তদারকি করেছেন। ফলে ভ্রমণটি যেমন উপভোগ্য হয়েছে, তেমনি পরিবেশ ও কৃষকের প্রতি দায়িত্বশীল থাকার বার্তাটিও সবার মধ্যে স্পষ্টভাবে পৌঁছে গেছে।
শর্ষে ক্ষেতের ভেতরে ঢুকে ছবি তুললে গাছ ভেঙে যায়, ফুল নষ্ট হয়, ক্ষতি হয় ফসলের। তাই দূর থেকেই উপভোগ করুন এই সৌন্দর্য। ক্ষেতের আইল বা পাশের কাঁচা রাস্তা থেকেই ছবি তুললে দৃশ্য কম সুন্দর হয় না বরং আরও বাস্তব লাগে। প্রকৃতি তার জায়গায় থাকুক, আমরা থাকি দর্শক হয়ে।এটাই ছিল এই ভ্রমণের বার্তা।


ক্ষেতের আইলের আঁকা-বাঁকা পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে আনন্দঘন মুহূর্তগুলো নিমিষেই শহুরে জীবনের ক্লান্তি ভুলিয়ে দিচ্ছিল। এর মধ্যেই হয়ে গেল দুপুরের খাবারের সময়। আগে থেকেই হোস্ট টিম বাজার করে লাকড়ির চুলায় দুপুরের রান্না প্রস্তুত করে রেখেছিল। দেশি মুরগির ভুনা, ক্ষেত থেকে তুলে আনা টাটকা সবজি, টাকি মাছের ভর্তা আর পাতলা ডাল আর ভাত। সব মিলিয়ে সেই খাবার সবাইকে দিল পরিপূর্ণ তৃপ্তি। খাওয়া শেষে মিষ্টিমুখের আয়োজনে ছিল চাটমোহরের বিখ্যাত রসমালাই।
ভোজনের পর আবার হাঁটা শুরু। সর্ষে ক্ষেতের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এক বিশাল বটগাছের নিচে গিয়ে জড়ো হলাম সবাই। ছবি তোলা, গল্প আর আড্ডার ফাঁকে ফাঁকে কখন যে সময় গড়িয়ে গেল, টেরই পাওয়া যায়নি। বেশ কয়েক কিলোমিটার হাঁটার পর পাবনার বিখ্যাত বিশাল আকৃতির নসিমন–করিমন গাড়িতে চড়ে আমরা রওনা দিই স্টেশনের পথে। চলতি পথের দুপাশে পড়ন্ত বিকেলের শর্ষে ক্ষেত।

সেই সঙ্গে চোখে পড়ছিল স্থানীয় মানুষের সরল দৃষ্টি ।কেউ হাত নেড়ে, কেউ হাততালি দিয়ে বিদায় জানাচ্ছিল। সেই মুহূর্তগুলো যেন বলে দিচ্ছিল, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের জীবন কতটা সহজ, কতটা আলোকময়। এই ভ্রমণ আমাদের মনে করিয়ে দেয় দায়িত্বশীল ভ্রমণই পারে প্রকৃত সৌন্দর্যকে সবচেয়ে সুন্দরভাবে তুলে ধরতে। আর সেই সৌন্দর্য সংরক্ষণ করাই শেষ পর্যন্ত আমাদের সবার জন্য সবচেয়ে মঙ্গলময়।