কঙ্কালের রাজ্যে একদিন: কী কী আছে চট্টগ্রামের আলোচিত অ্যানাটমি মিউজিয়ামে?
শেয়ার করুন
ফলো করুন

অভীষ্ট গন্তব্যে পা রাখার আগেই দৃষ্টি আটকে যায় অতিকায় এক জিরাফের কঙ্কালে। জিরাফের প্রলম্বিত গ্রীবা যেন খানিকটা থমকে দেয় পথচলা। সামনে এগিয়ে নির্দিষ্ট খোপে জুতো রেখে কাচের দরজার ওপাশে প্রবেশ করতেই পা পড়ে কোমল লাল গালিচায়।

আগেই দৃষ্টি আটকে যায় অতিকায় এক জিরাফের কঙ্কালে
আগেই দৃষ্টি আটকে যায় অতিকায় এক জিরাফের কঙ্কালে
 কাঠের বাক্সের ওপর সাজানো গৃহপালিত ও বুনো নানা প্রাণীর কঙ্কাল
কাঠের বাক্সের ওপর সাজানো গৃহপালিত ও বুনো নানা প্রাণীর কঙ্কাল

গালিচার একপাশে কাঠের বাক্সের ওপর সাজানো গৃহপালিত ও বুনো নানা প্রাণীর কঙ্কাল। সেই তালিকায় অতিকায় উট, হাতি ও ঘোড়ার পাশাপাশি আছে অপেক্ষাকৃত ছোট ভেড়া, ছাগল ও শূকরের কঙ্কাল। উভচর প্রাণী কুমিরের দেহকাঠামোর স্থান হয়েছে বিশাল এক কাচের বাক্সে। অন্যান্য প্রাণীর ওপর ছড়ি ঘোরানো মানুষের কঙ্কালও বাদ যায়নি এই সংগ্রহশালা থেকে। দুপেয়ে মানুষের দুই পাশের কাচের খাঁচায় আছে আকাশচারী পাখিদের দেহকাঠামো।

বিজ্ঞাপন

কোয়েল, ঘুঘু, বুলবুলি, বাদুড়ের কঙ্কাল ছোট ছোট কাচের খোপজুড়ে। একসময় যারা দুই ডানায় ভর করে আকাশ চষে বেড়াত, তারা আজ আয়ুষ্কাল শেষে কাচের বাক্সে নমুনা হিসেবে স্থান পেয়েছে। এ যেন কঙ্কালেরই এক রাজ্য!

এ যেন কঙ্কালেরই এক রাজ্য
এ যেন কঙ্কালেরই এক রাজ্য

পোশাকি নাম অ্যানাটমি মিউজিয়াম হলেও অনেকেই একে চেনেন কঙ্কাল জাদুঘর হিসেবে। মিউজিয়ামটির অবস্থান চট্টগ্রাম শহরের খুলশী এলাকায় চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও এনিম্যাল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের ভেতরে। ইউসুফ চৌধুরী ভবনের নিচতলায় প্রায় ৩ হাজার বর্গফুট জায়গাজুড়ে গড়ে উঠেছে এই মিউজিয়াম।

বিজ্ঞাপন

শুক্র ও শনিবার এবং সরকারি ছুটির দিন ছাড়া প্রতি রবি থেকে বৃহস্পতিবার সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত জাদুঘরটি খোলা থাকে। এটি পরিদর্শনের জন্য কোনো টিকিট কাটতে হয় না।

সব বয়সী দর্শনার্থীর জন্যই উন্মুক্ত
সব বয়সী দর্শনার্থীর জন্যই উন্মুক্ত
এটি পরিদর্শনের জন্য কোনো টিকিট কাটতে হয় না
এটি পরিদর্শনের জন্য কোনো টিকিট কাটতে হয় না

সব বয়সী দর্শনার্থীর জন্যই উন্মুক্ত। তবে এই মিউজিয়ামের মূল উদ্দেশ্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রাণীদেহের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের অবস্থান, গঠন ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে জ্ঞানকে সমৃদ্ধ করা। তাই পর্যটক হিসেবে মিউজিয়াম ঘুরে দেখার সময় শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দেওয়াই শ্রেয়।

গৃহপালিত ও বুনো নানা প্রাণীর কঙ্কাল ছাড়াও এখানে দেখার মতো অনেক কিছু আছে। অনেক প্রাণীর পূর্ণ কঙ্কালের পাশাপাশি শরীরের বিশেষ কিছু অংশের হাড়ও ধাতব স্ট্যান্ডে প্রদর্শনের জন্য সাজানো আছে। কুকুর ও ছাগলের সামনের ও পেছনের পায়ের অস্থিগুলোই মূলত এতে স্থান পেয়েছে।

বিশেষ কিছু অংশের হাড়ও প্রদর্শনের জন্য সাজানো আছে
বিশেষ কিছু অংশের হাড়ও প্রদর্শনের জন্য সাজানো আছে
এই সংগ্রহশালায় আছে বেশ কিছু মাথার খুলি
এই সংগ্রহশালায় আছে বেশ কিছু মাথার খুলি

প্রতিটি অংশ খুব ভালোভাবে চিহ্নিত করা থাকায় নমুনাগুলোর পরিচয় বুঝতে খুব বেশি বেগ পেতে হয় না। কঙ্কালের পাশাপাশি এই সংগ্রহশালায় আছে বেশ কিছু মাথার খুলি। এর মধ্যে সবচেয়ে চমকপ্রদ নামটি অবশ্যই বেবুনের।

কঙ্কাল ও খুলি ছাড়াও সামুদ্রিক ও স্থলজ নানা প্রাণীর সংরক্ষিত নমুনা আছে এখানে। ট্যাক্সিডার্মি করা বিশাল এক হাঙর সবার নজর কাড়ে। দেখে মনে হয়, উদ্যত হাঁ নিয়ে এখনই শিকারের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে প্রস্তুত এই জলজ প্রাণী!

বিশাল এক হাঙর সবার নজর কাড়ে এখানে
বিশাল এক হাঙর সবার নজর কাড়ে এখানে

এ ছাড়া আছে বেজি, বনবিড়াল, কুকুর, ছাগল ও ভেড়ার সংরক্ষিত নমুনা। প্রাণীগুলোর দেহ এত নিখুঁতভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে যে প্রথমবার দেখলে জীবিত বলে ভ্রম হতে পারে।

প্রাণীগুলোর দেহ নিখুঁতভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে
প্রাণীগুলোর দেহ নিখুঁতভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে

কাচের বয়ামে রাসায়নিকভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে নানা প্রজাতির সরীসৃপ। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য বঙ্গরাজ সাপ। ফরমালিনে সংরক্ষিত নানা প্রাণীর পৃথক অঙ্গপ্রত্যঙ্গও স্থান পেয়েছে এই সংগ্রহশালায়। তালিকায় আছে ছাগলের নাড়িভুঁড়ি, মহিষের অন্ত্র, শুকর ও ঘোড়ার কিডনি, কচ্ছপের ডিম, অস্ট্রিচের পৌষ্টিকতন্ত্রসহ আরও নানা নমুনা।

ফরমালিনভর্তি কাচের জারে আছে অনেক প্রাণী, ভ্রূণ ও প্রাণীর অঙ্গপ্রত্যঙ্গ
ফরমালিনভর্তি কাচের জারে আছে অনেক প্রাণী, ভ্রূণ ও প্রাণীর অঙ্গপ্রত্যঙ্গ

জারভর্তি নানা প্রাণীর ভ্রূণও আছে এই জাদুঘরে। মানুষের ভ্রূণের পাশাপাশি ছাগল, মহিষ, শুকরসহ বিভিন্ন প্রাণীর ভ্রূণ রাখা হয়েছে ফরমালিনভর্তি কাচের জারে।

এই জাদুঘরের প্রতিটি নমুনা সংগ্রহের পেছনে বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যানাটমি বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের শ্রম রয়েছে। দেশের নানা প্রান্ত থেকে নানা ধরনের নমুনা সংগ্রহ করে সমৃদ্ধ করা হয়েছে এই সংগ্রহশালা।

একটি নমুনা পুরোপুরি প্রস্তুত করতে ছয় মাস থেকে এক বছর পর্যন্ত সময় লাগে
একটি নমুনা পুরোপুরি প্রস্তুত করতে ছয় মাস থেকে এক বছর পর্যন্ত সময় লাগে

মৃত প্রাণীর দেহাবয়ব ঠিক রেখে কঙ্কাল তৈরি করা বেশ শ্রমসাধ্য ও সময়সাপেক্ষ কাজ। ক্ষেত্রবিশেষে একটি নমুনা পুরোপুরি প্রস্তুত করতে ছয় মাস থেকে এক বছর পর্যন্ত সময় লাগে।

দর্শনার্থীদের সুবিধার্থে প্রতিটি নমুনার নাম বাংলা ও ইংরেজি—দুই ভাষাতেই দেওয়া আছে। কঙ্কালগুলোর ক্ষেত্রে ইংরেজিতে রয়েছে বিস্তারিত বিবরণও। উট কিংবা হাতির অতিকায় কঙ্কালের সামনে দাঁড়ালে প্রকৃতির গঠনশৈলী নিয়ে এক অদ্ভুত বিস্ময় জাগে।

কঙ্কালগুলোর ক্ষেত্রে ইংরেজিতে রয়েছে বিস্তারিত বিবরণ
কঙ্কালগুলোর ক্ষেত্রে ইংরেজিতে রয়েছে বিস্তারিত বিবরণ

বইয়ের পাতায় কিংবা টেলিভিশনের তথ্যচিত্রে প্রাণীবিজ্ঞানের যেসব বিস্ময়ের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল, সেগুলো স্বচক্ষে দেখার অভিজ্ঞতা নিঃসন্দেহে অন্য রকম। প্রাণীবিদ্যার এই বিস্ময়কর জগৎ আমার ক্ষুদ্র ভ্রমণভান্ডারে যোগ করেছে এক বৈচিত্র্যময় অভিজ্ঞতা।

প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৫: ০০
বিজ্ঞাপন