বাকলাই: পাহাড়ের কান্না নাকি প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য?
শেয়ার করুন
ফলো করুন

বাংলাদেশের পাহাড়প্রেমীদের কাছে বান্দরবানের থানচি বেশ পরিচিত নাম। এই অঞ্চলের নাইটিং মৌজার বাকলাই গ্রামের মধ্যমণি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে প্রায় ৩৮০ ফুট উঁচু বাকলাই জলপ্রপাত। দেশের সর্বোচ্চ জলপ্রপাত কোনটি, তা নিয়ে মতপার্থক্য থাকলেও সৌন্দর্যের বিচারে বাকলাই নিঃসন্দেহে অনন্য।

অনেক দূর থেকেই পাহাড়ের গায়ে জলধারা চোখে পড়ে
অনেক দূর থেকেই পাহাড়ের গায়ে জলধারা চোখে পড়ে

কেওক্রাডং ও তাজিংডংয়ের মাঝামাঝি অঞ্চলে এর অবস্থান। রুমা থেকে প্রায় ১১০ কিলোমিটার এবং থানচি থেকে প্রায় ৪৫ কিলোমিটার দূর থেকেই পাহাড়ের গায়ে এর জলধারা চোখে পড়ে। স্থানীয় ব্যক্তিদের কেউ কেউ একে বাক্তালাই ঝরনাও বলেন।

দুর্গম পাহাড়ি পথ এবং পর্যটনসুবিধার সীমাবদ্ধতার কারণে খুব কম মানুষই ঝরনার একেবারে পাদদেশ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেন। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর সম্প্রতি প্রশাসনের পক্ষ থেকে এটি আবার পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

মেঘের ভেতর দিয়ে যাত্রা

আমাদের অভিযাত্রা মেঘের ভিতর দিয়েই
আমাদের অভিযাত্রা মেঘের ভিতর দিয়েই

নিজেদের একটু উজ্জীবিত করতে আমরা নয়জনের একটি দল বেরিয়ে পড়লাম বাকলাইয়ের উদ্দেশে। দলে ছিলেন আবদুল্লাহ, মারুফ, শফিক, আকাশ, কাফি, তাওহিদ, আবু তালেব, রুমেল ও কাউসার। প্রতিবারের মতো এবারও কয়েকজন প্রিয় বন্ধুকে খুব মিস করেছি—রাশেদ, সাখাওয়াত, মিশু, রাফি, ফাহাদ, ফারুক ও হারুন। সাধারণত তাঁরাও আমাদের এই পাহাড়যাত্রার সঙ্গী হন।

ভোরে হোটেল থেকে বেরিয়ে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গুছিয়ে চাঁদের গাড়িতে রওনা দিলাম। আলীকদম বাজার থেকে সকালের নাশতা সংগ্রহ করে নেওয়া হলো। এরপর শুরু হলো পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথের যাত্রা।

গাড়ি যত ওপরে উঠছিল, মনে হচ্ছিল মেঘের মধ্য দিয়েই এগিয়ে যাচ্ছি। বিশেষ করে ডিম পাহাড় পার হওয়ার সময় এই অনুভূতি আরও তীব্র হয়। এর আগেও ডিম পাহাড়ে এসেছি, কিন্তু এবার ভোরে পৌঁছানোর কারণে মেঘের দেখা পেয়েছি বেশি।

বিজ্ঞাপন

যাত্রাপথে একটি জায়গায় পাহাড়ধসে রাস্তার ওপর পাথর পড়ে থাকতে দেখলাম। আমাদের চালক সালাউদ্দিন বিষয়টি সেনাবাহিনীকে জানিয়ে রেখেছিলেন। তবে তাঁদের আসতে কিছুটা সময় লাগবে বুঝতে পেরে আমরা নিজেরাই হালকা কিছু পাথর সরিয়ে পথ পরিষ্কার করে আবার যাত্রা শুরু করি।

পথে কয়েকটি ভিউ পয়েন্টে গাড়ি থামিয়ে পাহাড় আর মেঘের দৃশ্য উপভোগ করলাম। ভোরে রওনা দেওয়ার সুবিধা এখানেই—পথটা যেমন তুলনামূলক ফাঁকা থাকে, তেমনি সময়ও হাতে থাকে বেশি।

পাহাড়ের পর পাহাড়

বাকলাই যাওয়ার পথে সেনাবাহিনীর খাতায় নাম এন্ট্রি করে যেতে হয়। তাই জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্মনিবন্ধনের ফটোকপি সঙ্গে রাখা জরুরি।

তাজিংডং যাওয়ারও চেষ্টা ছিল আমাদের। কিন্তু প্রশাসনের অনুমতি না থাকায় সে পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়নি।

গাড়ি থেকে নামার পর শুরু হলো আসল অভিযান। স্থানীয় গাইডের নির্দেশনা মেনে ঝরনার দিকে হাঁটা। ৭ থেকে ১০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয়; সময় লাগে দুই থেকে তিন ঘণ্টা।

অনিন্দ্য জলধারার খোঁজে
অনিন্দ্য জলধারার খোঁজে

কারও হাতে ছোট বাঁশ, কারও হাতে লাঠি। পাহাড়ি পথে হাঁটার সময় এগুলো বেশ কাজে আসে। সামনে শুধু পাহাড় আর পাহাড়—একটি পাড়ি দিয়ে আবার আরেকটি। আমাদের সঙ্গে থাকা ছোট সাউন্ডবক্সও হয়ে উঠেছিল পথের সঙ্গী। ক্লান্তি এলে গান, আড্ডা আর একটু নাচানাচিতে আবার চাঙা হয়ে উঠেছি।
তবে পথটা মোটেও সহজ নয়।

পাহাড়ি ঝিরিপথে পা পিছলে পড়ার ঝুঁকি আছে। এবারের দলে দুজন ছিলেন একেবারেই নতুন। বিশেষ করে রুমেল ও কাফিকে বেশ ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। একপর্যায়ে রুমেল মাঝপথ থেকে ফিরে যেতে চেয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত স্থানীয় গাইড ও দলের সবার সহযোগিতায় তিনিও গন্তব্যে পৌঁছাতে পেরেছেন।

পথে পাহাড়ি জীবনের দেখা

পাহাড়ি পথে চলা
পাহাড়ি পথে চলা

এই যাত্রার আরেকটি বড় পাওয়া ছিল পাহাড়ি মানুষের জীবনযাপন কাছ থেকে দেখা।
উঁচু পাহাড়ের ঢালে ছোট ছোট দোচালা স্কুল। সেখানে পড়াশোনা করছে পাহাড়ি ছেলেমেয়েরা। কোথাও জুমচাষ, কোথাও বাঁশের বাগান, আবার কোথাও পাহাড়ি ফলের গাছ। পথের দুই পাশে দেখা মিলেছে পেঁপে, পেয়ারা, পাহাড়ি কলাসহ নানা গাছপালার।
প্রকৃতির সৌন্দর্যের পাশাপাশি পাহাড়ের মানুষের জীবনযাপনও এই যাত্রাকে আলাদা করে দিয়েছে। কঠিন ভূপ্রকৃতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া তাঁদের জীবন যেন পাহাড়েরই আরেক গল্প।
মূল ঝরনায় যাওয়ার পথে একটি ছোট ঝরনাও চোখে পড়ে। কিন্তু সেটি পেরিয়ে সামনে এগোতে হলে আবার পাহাড়, আবার ঝিরিপথ, আবার চড়াই।

সামনে যখন বাকলাই

এ দৃশ্য অনির্বচনীয়
এ দৃশ্য অনির্বচনীয়

প্রায় তিন ঘণ্টার পথ পাড়ি দিয়ে যখন বাকলাইয়ের কাছে পৌঁছালাম, তখন সবার ক্লান্তি যেন মুহূর্তেই উধাও।

দূর থেকেই শোনা যাচ্ছিল পানির তীব্র শব্দ। কাছে যেতেই চোখের সামনে খুলে গেল বিশাল জলধারা। প্রায় ৩৮০ ফুট ওপর থেকে পানি নিচের পাথরে আছড়ে পড়ছে। এত উঁচু থেকে নেমে আসা পানির সেই শব্দ আর দৃশ্য একসঙ্গে মিলে তৈরি করে অন্য রকম এক রোমাঞ্চ।

সেই মুহূর্তে মনে হয়, আমাদের দৈনন্দিন জীবনের যত ব্যস্ততা, যত সমস্যা—সবই এই বিশাল প্রকৃতির সামনে কত ক্ষুদ্র।

ঝরনার সামনে লেখকও তাঁর বন্ধুরা
ঝরনার সামনে লেখকও তাঁর বন্ধুরা

ঝরনার পানিতে নেমে সবাই মিলে গোসল করলাম। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে আসার পর ঠান্ডা পানির সেই স্পর্শ যেন শরীরের সব ক্লান্তি ধুয়ে দিল। সঙ্গে আনা ছোলা-মুড়ি খেয়ে আবার কেউ কেউ পানিতে নেমে পড়লাম।

এত আনন্দ হচ্ছিল যে কিছু সময়ের জন্য ভুলেই গিয়েছিলাম, আবার এই দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে ফিরতে হবে।

ফেরার পথেও পাহাড়ের গল্প

ঝিরির সামনে লেখক
ঝিরির সামনে লেখক

কিছুক্ষণ পর ফেরার প্রস্তুতি নিতে হলো। এবার অবশ্য সবার শক্তি কিছুটা কমে এসেছে। সঙ্গে নেওয়া শুকনা খাবারও প্রায় শেষ।
পথে পাহাড়িদের চাষ করা কিছু ফল পাওয়া গেল। পেঁপে, পেয়ারা কিংবা স্থানীয় ফল খেতে খেতে এগিয়ে চললাম। ভোরে রওনা দেওয়ায় এবার বেশ সুবিধা হয়েছে। হাতে পর্যাপ্ত সময় ছিল এবং দিনের আলো থাকতে দুর্গম পথের বড় অংশ পেরিয়ে আসতে পেরেছি।
বাকলাই যেতে হলে তাই ভোরে রওনা দেওয়াই ভালো। সঙ্গে পর্যাপ্ত শুকনা খাবার ও পানি রাখাও জরুরি।

কখন যাবেন

প্রাকৃতিক ঝরনার আসল রূপ দেখতে হলে বর্ষাকালই সবচেয়ে ভালো সময়। এ সময় পাহাড়ি জলধারা পূর্ণ যৌবন ফিরে পায়। প্রচণ্ড গতিতে পানি নেমে আসে, আর বাকলাই হয়ে ওঠে আরও দুর্দান্ত।
তবে বর্ষায় ঝুঁকিও বেশি। ভারী বৃষ্টির সময় পাহাড়ধসের আশঙ্কা থাকে এবং ঝিরিপথে পানির স্রোত বেড়ে যেতে পারে। তখন পথ হয়ে ওঠে আরও দুর্গম ও বিপজ্জনক। তাই আবহাওয়ার পরিস্থিতি জেনে তবেই যাত্রা করা উচিত।

কীভাবে যাবেন

বাকলাই যেতে হলে প্রথমে আলীকদম-থানচি সড়কের বাকলাই পাড়া এলাকার কাছাকাছি যেতে হয়। আলীকদমে যেতে পারেন কক্সবাজারের চকরিয়া হয়ে, অথবা বান্দরবান থেকে আলীকদমের পথে।

দল বড় হলে আলীকদম থেকে চাঁদের গাড়ি বা জিপ ভাড়া করা সুবিধাজনক। পথে প্রায় ১০ কিলোমিটার পর একটি সেনাবাহিনীর ক্যাম্প রয়েছে। সেখানে জাতীয় পরিচয়পত্র ও ফোন নম্বর দিয়ে নাম নিবন্ধন করে সামনে যাওয়ার অনুমতি নিতে হয়।
সময় ব্যবস্থাপনাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ট্র্যাকিং শেষ করে বিকেল ৫টার আগে ক্যাম্পে ফিরে রিপোর্ট করতে হয়। সময় পেরিয়ে গেলে সেদিন থানচিতে রাত কাটানোর প্রয়োজন হতে পারে। তাই ভোরে রওনা দেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ ও সুবিধাজনক।

আশপাশে আরও যা দেখবেন

থানচি-রুমার এই বিস্তীর্ণ পাহাড়ি অঞ্চল ছোট-বড় অসংখ্য ঝরনায় সমৃদ্ধ। বাকলাইয়ের পথে দেখা যেতে পারে জিনসিয়াম ঝরনা। কাছাকাছি রয়েছে জনপ্রিয় জাদিপাই জলপ্রপাত এবং পাশাপাশি থাকা দুই ঝরনা—তলাবং ঝরনা।

এ ছাড়া কেওক্রাডংয়ের সৌন্দর্য তো আছেই। সময় ও প্রশাসনিক অনুমতি থাকলে পাহাড়ের আরও কিছু আকর্ষণীয় স্থান ঘুরে দেখা যায়।

সঙ্গে যা রাখবেন

বাকলাইয়ের পথ দুর্গম। তাই স্থানীয় প্রশাসনের আওতায় নিবন্ধিত একজন স্থানীয় গাইড সঙ্গে নেওয়া জরুরি। সকাল ৯টা থেকে ১০টার মধ্যে হাঁটা শুরু করলে দিনের আলো থাকতে ফিরে আসার সুযোগ বেশি থাকে।

সঙ্গে রাখতে হবে পর্যাপ্ত পানি, শুকনা খাবার, প্রাথমিক চিকিৎসার সরঞ্জাম, লাঠি, প্রয়োজনীয় ওষুধ, অতিরিক্ত কাপড় এবং ভালো গ্রিপের ট্রেকিং জুতা। পথে দোকান নেই বললেই চলে, তাই প্রয়োজনীয় সবকিছু আগে থেকেই সঙ্গে নিতে হবে।

থাকা ও খাওয়াদাওয়া

আর্মি ক্যাম্প থেকে বাকলাই যাওয়ার পথে থাকার সুযোগ নেই। ঝরনা দেখে সেদিনই আলীকদম অথবা থানচিতে ফিরে আসতে হবে।

আলীকদমে থাকার জন্য কয়েকটি হোটেল ও আবাসিক ব্যবস্থা রয়েছে। আগে থেকে যোগাযোগ করে গেলে সুবিধা হবে। খাওয়ার জন্য আলীকদম ও পানবাজার এলাকায় বেশ কিছু সাধারণ মানের খাবারের হোটেল রয়েছে। সেখানে দেশীয় খাবার পাওয়া যায়।

সতর্কতা

বাকলাইয়ের সৌন্দর্য যতটা মুগ্ধকর, পথ ততটাই কঠিন। পাথুরে জায়গা ও ঝিরিপথ বৃষ্টিতে পিচ্ছিল হয়ে যায়। পাহাড়ধসের আশঙ্কাও থাকে। তাই আবহাওয়ার পূর্বাভাস না দেখে যাত্রা করা উচিত নয়।

নতুনদের জন্য এই ট্র্যাকিং বেশ কঠিন হতে পারে। শারীরিক প্রস্তুতি ছাড়া যাওয়া ঠিক নয়। দুর্ঘটনা ঘটলে দুর্গম পথ পেরিয়ে দ্রুত ফিরে আসাও কঠিন।

তাই পাহাড়কে জয় করার মানসিকতার চেয়ে পাহাড়কে সম্মান করার মানসিকতাই এখানে বেশি জরুরি।

শেষে যা থেকে যায়

বাকলাই থেকে ফেরার সময় শরীর ক্লান্ত ছিল, পা ভারী হয়ে এসেছিল। কিন্তু মনের ভেতর তখনো বয়ে চলেছে সেই জলধারার শব্দ।

পাহাড়ের পর পাহাড় পেরিয়ে, মেঘের ভেতর দিয়ে, ঝিরিপথ ধরে যিনি বাকলাইয়ের কাছে পৌঁছাবেন, তাঁর কাছে এই জলপ্রপাত শুধু একটি পর্যটনকেন্দ্র হয়ে থাকবে না। এটি হয়ে উঠবে একটি অভিজ্ঞতা—কিছুটা রোমাঞ্চের, কিছুটা ভয় পাওয়ার আর অনেকখানি প্রকৃতির কাছে নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করার।

হয়তো তাই বাকলাইকে শুধু পাহাড়ের কান্না বললে কম বলা হবে। এত উঁচু পাহাড় থেকে নেমে আসা জলধারার প্রতিটি ফোঁটায় যেন প্রকৃতি একই সঙ্গে তার সৌন্দর্য, শক্তি আর বুনো স্বাধীনতার গল্প বলে।

ছবি: লেখক

প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬: ০০
বিজ্ঞাপন