
দৈনিক পত্রিকা মারফত জেনেছিলাম ঢাকার পাঁচটি বাড়িকে নতুন করে হেরিটেজ হাউস হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে ‘Hidden Heritage: Homes in Dhaka’ এই শিরোনামের আওতায়। এ তালিকার চারটি বাড়ির নাম আমার পরিচিত হলেও একটি বাড়ি অপরিচিত লাগছিল। হেরিটেজ–প্রেমিকদের জিজ্ঞাসা করেও সদুত্তর পাচ্ছিলাম না।

বাড়ির অবস্থান পুরান ঢাকার সাতরওজা এলাকার আবুল হাসনাত রোডে। এ রকম বলার পর, দু–একজন বলল, হয়তো বাঘবাড়ি হতে পারে। বাঘবাড়ি! একটু চকম লাগল বৈকি! এটাও মাথায় ঢুকছিল না যে হাটুরিয়া হাউস কী করে বাঘবাড়ি হলো? সেটা খুঁজতেই গেলাম সাতরওজা এলাকায়। এখানে বলে রাখি, সাতরওজা আসলে সাতটি রওজার সমাহার না। বরং উচ্চারণ বিভ্রাট। মূল শব্দটি হলো সাচরওজা। অর্থাৎ এখানে যাঁর মাজার তাঁকে সত্যপীর বলা হয়ে থাকে, তাই সাচরওজা বা সত্যপীরের রওজা পরিণত হয়েছে সাতরওজায়।
যাহোক, সেখানে গিয়ে পথের পাশে এক দোকানে বাঘবাড়ির নাম বলতেই পথ দেখিয়ে দিল। ১৪ নম্বর আবুল হাসনাত রোডের বাড়ির সাদামাটা একটি গেটের কাছে এসে দাঁড়ালাম। খোলাই পেলাম গেটটি। গেট দিয়ে ধীরপায়ে হেঁটে যাচ্ছি। সামনের একতলা লাল বাড়িটি দেখতে পাচ্ছি। সকালের আলো গিয়ে পড়েছে বাড়িটির একপাশে। দূর থেকেই কয়েকটি ছবি তুললাম। বাড়ির চত্বরে বাগান। একেবারে বাড়ির সামনে এলাম। দাঁড়িয়ে আছি চুপ করে। ভাবছি, কী করব। আচমকা বাড়ির ভেতর থেকে একজন বেরিয়ে এলেন। আমি ক্ষীণস্বরে বললাম, বাড়িটি দেখতে এসেছি। উনি অত্যন্ত আগ্রহভরে অভিবাদন জানালেন।

কয়েকটি সিঁড়ি পেরিয়ে বাড়ির বারান্দায় এসে বুঝলাম, কেন এটির নাম বাঘবাড়ি হলো। বাঘ শিকার করার পর বাঘের মাথাটি সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে। শুধু বাঘ নয়, বারান্দাজুড়েই রয়েছে বেশ কয়েকটি প্রাণীর মাথা, সেখানে হরিণ ও বুনো মহিষও আছে।
পুরো বারান্দায় পুরোনো আসবাবপত্র; টেবিল–চেয়ার আর দেয়ালে ঝুলছে অনেকগুলো পুরোনো ছবি। ‘সবই শত বছরের পুরোনো’, বললেন শিবলী মোহাম্মদ ফজলুল করিম। এই বাড়ির একজন উত্তরাধিকারী। এখন হাটুরিয়া হাউসে তিনি বসবাস করেন তাঁর স্ত্রীসহ।

শিকার করা প্রাণীগুলো দেখিয়ে বললেন, ‘এগুলো আমার দাদা খান বাহাদুর শেখ ফজলুল করিমের শিকার করা। হাটুরিয়া হাউস এখন উলফাতুন্নেসা খাতুন চৌধুরানী ওয়াক্ফ এস্টেট আর আমার দায়িত্বে রয়েছে।’

শিবলী সাহেবের দাদি উলফাতুন্নেসা খাতুন চৌধুরানী। চৌধুরানী ছিলেন গোলাম আলী চৌধুরীর কনিষ্ঠ কন্যা আর গোলাম আলী চৌধুরী হলেন হাটুরিয়া এস্টেটের সর্বশেষ জমিদার।হাটুরিয়া এস্টেটের পূর্বপুরুষ শেখ নিয়ামত উল্লাহ সিরিয়া থেকে বিক্রমপুরে আসেন, বর্তমানের মুন্সিগঞ্জ। শেখ ফজলুল করিমের বাবা ছিলেন শেখ মোহাম্মদ আমির; তিনি বিয়ে করেন মকিম বাজারের মৌলভী বাড়ির মেয়ে সালেহা খাতুনকে। তাঁদেরই বংশধর হলেন শেখ ফজলুল করিম; এই বাড়ির প্রতিষ্ঠাতা। হাটুরিয়া হাউসের নির্মাণকাল ১৯১৭ সাল।

এই বাড়ি এখন একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান। নাম খানকায়ে আলিয়া। এখানে বার্ষিক অনেক অনুষ্ঠান হয়; ওরস, কাওয়ালি সন্ধ্যা, শবেবরাত, ঈদে মিলাদুন্নবী সবই শ্রদ্ধার সঙ্গে পালিত হয় এবং সর্বসাধারণের জন্য তা উন্মুক্ত।
১৯২৭ সালে ঢাকার দুটি বাড়িতে বৈদ্যুতিক বাতি জ্বলে; একটি আহসান মঞ্জিল, অন্যটি এই হাটুরিয়া হাউস। এসব ইতিহাস বলছিলেন খান বাহাদুর শেখ ফজলুল করিমের নাতি শেখ শিবলী মোহাম্মদ ফজলুল করিম। তাঁর দাদি উলফাতুন্নেসা খাতুন চৌধুরানীর ইচ্ছায় এই বাড়িতে খানকা প্রতিষ্ঠা করা হয়।

তাঁদের বিশাল ফ্যামিলি ট্রি, সেখান থেকে সহজ করে বলতে গেলে—খান বাহাদুর শেখ ফজলুল করিমের সাত ছেলে, তিন মেয়ে। খান বাহাদুরের এক ছেলের নাম আফজালুল করিম, আফজালুল করিমের ছেলে এই শিবলী সাহেব।
শিবলী আমাকে খান বাহাদুরের প্রতিটি ছেলেমেয়ের পরিচয় দিয়েছেন। খান বাহাদুররা চার ভাই সমাজের উঁচু অবস্থানে ছিলেন। সবার গল্প বলছি না।

হাটুরিয়া হাউসে কোনো জাদুঘর নেই। কিন্তু পুরো বাড়িটার ইতিহাস আর সংরক্ষিত জিনিসগুলো দেখে আমার এটিকে জাদুঘরের থেকে কম মনে হয়নি। ঢাকার নবাবদের সংগ্রহশালার পর এই বাড়িটিকে আমার সমৃদ্ধ জাদুঘর মনে হয়েছে। তবে বিলুপ্ত বলধা সংগ্রহশালার কথা বইতে পড়েছি। তথ্য জেনে মনে হয়েছে, সেটিও দারুণ একটি সংগ্রহশালা ছিল।

হাটুরিয়া হাউসের বারান্দা দেখতেই বেশ অনেকটা সময় লেগেছে। কারুকাজ করা দরজা পেরিয়ে ঢুকি একটি বড় হলঘরে। বিশাল একটি হলঘর। শিবলী বললেন, এখানে এখন কাওয়ালি সন্ধ্যা ও বিভিন্ন মজলিশের আয়োজন করা হয়।
সিলিংয়ে দেখলাম ঝুলছে বিভিন্ন ধরন ও রঙের ঝাড়বাতি। হলঘরের দুপাশে দেখলাম দুটি বেশ বড় আয়না; এই দুটি নাকি বেলজিয়াম থেকে আনা হয়েছিল। কাচ, পিতল, কাঁসার নানা ফুলদানি, শোপিস শোভা পাচ্ছে এই ঘরটিতে।

এরপর শিবলী আমাকে পাশের ঘরে নিয়ে গেলেন। এটি বাড়ির ডাইনিং হল। এখানে কথা হলো শিবলীর স্ত্রীর সঙ্গে। তিনি আমাকে তাঁর দাদাশ্বশুর ও শ্বশুরের ব্যবহৃত নানা তৈজসপত্র দেখালেন। আমি দেখছি আর অবাক হচ্ছি। সেই সময়ের খাবার গরম রাখার পাত্র, সোনা–রুপার প্রলেপ দেওয়া চামচ, বাটি ইত্যাদি দেখছি আর শুধু মুগ্ধ হচ্ছি।
শিবলী একটি আলমারি থেকে ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে উপাধি পাওয়া খান বাহাদুর মেডেলটি বের করে দেখালেন। খান বাহাদুর শেখ ফজলুল করিম আরও অনেক উপাধি পেয়েছেন কলকাতা থেকে, সেগুলো সংরক্ষিত রয়েছে হাটুরিয়া হাউসে। শেখ ফজলুল করিমের ব্যবহৃত পালঙ্ক, চেয়ার, টেবিলও রয়েছে হাটুরিয়া হাউসে। কিছু ভিন্ন ধরনের রাজকীয় থালাবাটির সংগ্রহ যেমন মূল্যবান তেমনি দৃষ্টিনন্দন।

পুরো হাটুরিয়া হাউস ভালো করে পর্যবেক্ষণ করার জন্য প্রয়োজন ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা। অনেকক্ষণ সময় নিয়ে শিবলী মোহাম্মদ ও তাঁর স্ত্রী গোটা হাটুরিয়া হাউসের সংগ্রহ আমাকে দেখিয়েছেন। তাঁরা দুজনেই অত্যন্ত সদালাপী। হাটুরিয়া হাউসের আতিথেয়তায় ভীষণ আপ্লুত হয়েছি। শিবলী মোহাম্মদের জন্ম এই বাড়িতেই। তাঁর বয়স এখন ৬৬। সানন্দে সামলাচ্ছেন তিনি এই হেরিটেজ।
ছবি: লেখক