
এক ছুটির দিনে নিজস্ব বাহন যোগে রওনা করেছি নরসিংদীর পলাশ উপজেলার ডাঙ্গা ইউনিয়নের জয়নগর এলাকায় অবস্থিত শত বছরের পুরোনো জমিদার বাড়িটি দেখতে। বাড়িটি কত পুরোনো যাবার আগে ধারণা ছিল না। জমিদার বাড়ি বলেই শত বছরের কথাটি অনুমান করে বলা।
পলাশ উপজেলায় পৌঁছতে ঘন্টা দেড়েকের মত সময় লাগলো।
খুঁজে ফিরছিলাম ডাঙ্গা জমিদার বাড়ি। স্থানীয়রা জানালেন এই নামে কোন জমিদার বাড়ি নেই। লক্ষণ সাহার জমিদার বাড়ি বলেও সন্ধান পাওয়া গেল না। শেষমেশ জানতে চাইলাম জয়নগর পৌঁছবার পথ।
জয়নগরে এসে পথের বয়োজ্যেষ্ঠ একজনের কাছে জিজ্ঞাসা করতেই পথ দেখিয়ে দিলেন। জয়নগরের মূল সড়ক থেকে কিছুদূর চলার পর মেঠো পথ এলো। পথটা বেশ সরু। আমাদের বাহন প্রবেশ করতে অসুবিধা হচ্ছিলো।
বাড়ির কাছাকাছি এসে আমাদের বাহন থামলো।
নিপুণ কারুকাজ যাকে বলে!

নব্য ধ্রুপদী স্থাপত্যের বিশেষ উহাহরণ এই বাড়িটি।
যতদূর জেনেছি লক্ষণ সাহা নামে এক জমিদার এই জমিদারির প্রতিষ্ঠাতা ও স্থাপনার নির্মাতা। মূল ভবনের পাশেই রয়েছে আরেকটি কারুকার্যখচিত মন্দির, আছে অর্ধনির্মিত প্রাচীন বাড়ি। বাড়ির পেছনে রয়েছে গাছের বাগান। বাড়িসহ বাগানের চারদিক উঁচু প্রাচীর দ্বারা বেষ্টিত। সেই সময় তৈরি করা জমিদার বাড়ির সুন্দর পুকুর আর সান বাঁধানো পুকুরঘাটও দৃষ্টি এড়ায় না।
মূল ভবনের ওপরে লেখা জামিনা মহল। লক্ষণ সাহার বাড়ির নাম জামিনা মহল!
আশেপাশে কথা বলার লোক খুঁজে কাউকেই দেখতে পেলাম না। মূল ভবনের ভেতর প্রবেশ করবো কি করবো না, বুঝতে পারছি না।

সাত-পাঁচ ভেবে ভেতরে প্রবেশ করলাম। বিভিন্ন অনলাইনে এই জমিদার বাড়ি সম্পর্কে লেখা দেখেছি ২৪ কক্ষ বিশিষ্ট বাড়িটি। কিন্তু এই সংখ্যার সূত্র কিংবা সত্যতা কতটুকু জানি না। স্থাপনাটি দ্বিতল। নীচতলার দুপাশে দুটি পরিবার রয়েছে বলে মনে হলো। কথা বলার মত কাউকে পেলাম না। নীচতলার পেছনের দিকের ঘরগুলো খালি। তবে কয়টি কক্ষ রয়েছে আমি গুনে দেখিনি।
ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠলাম। ওপরের সব ঘর খালি। সামনের ঘরগুলোর সাথে কারুকার্যময় ঝুল বারান্দাগুলো কি যে সুন্দর! ভিয়েনা ও প্যারিস শহরের কথা মনে পড়লো। ধ্রুপদী স্থাপত্যের নকশা করা বারান্দাগুলো দেখেছি ইউরোপের অনেক শহরে। সেই শহরগুলোর সাথে এই স্থাপত্যের একমাত্র ফারাক সংরক্ষণ। ইউরোপের অন্যান্য শহরে রোমানদের কাছ থেকে অনুপ্রাণিত হয়েছে। আমাদের ভূখণ্ডের তৎকালীন বনেদী বাড়ির মালিকরাও ইউরোপের অন্যান্য দেশের অনুকরণ করেছেন নিজস্ব অট্টালিকা নির্মাণে।

নব্যধ্রুপদী বা নিওক্ল্যাসিকাল স্থাপত্যের প্রধান অনুপ্রেরণা এসেছে অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে প্রাচীন গ্রিস ও রোমের স্থাপত্যশৈলীর পুনরুজ্জীবনের আকাঙ্ক্ষা থেকে। অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে উনিশ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত এই শৈলী ইউরোপ ও আমেরিকায় প্রবল প্রভাব বিস্তার করেছে। প্রাচীন রোমান স্থাপত্য এবং গ্রিক মন্দিরের স্থাপত্যশৈলী (যেমন– ডোরিক, আয়নিক ও করিন্থিয়ান স্তম্ভের ব্যবহার) দেখা দেখা গেছে।
ঝুল বারান্দাগুলো সম্পর্কে অল্প করে বলি; ধ্রুপদী স্থাপত্যের ঝুল বারান্দা বা জুলিয়েট ব্যালকনি হলো সরু, অলঙ্কৃত রেলিংযুক্ত বারান্দা, যা সাধারণত ভবনের ওপরের তলায় ফ্রেঞ্চ জানালার বাইরে স্থাপন করা হয়। এটি মূলত ভূমধ্যসাগরীয় (ফ্রান্স, স্পেন, ইতালি) শৈলী, যা ব্রিটিশ আমলে ভারতবর্ষে জনপ্রিয় হয়।


দোতলার একটি কক্ষে লোহার ভাঙা একটি সিন্দুক দেখতে পেলাম। এটিকে গোপনসিন্দুক বলেই মনে হলো। খুলতে না পেরে ভাঙা হয়েছে। লোহা কাটার যন্ত্রও হয়তো ব্যবহার করা হয়েছে। গোপন বলছি কারণ একটি দেয়াল আলমারির একপাশের দেয়ালে সিন্দুকটি রাখা। দেয়াল আলমারির নিশ্চয়ই দরজা ছিল। বাইরে থেকে সিন্দুকটি দৃষ্টিগোচর হতো না এবং আকারে ছোট। দোতলা থেকে ছাদে গেলাম। ছাদে স্থানীয় কিশোররা খেলাধুলা করছে।
দোতলা থেকে নামার সময় এক মাঝবয়সী নারীকে দেখতে পেলাম। হাসি দিয়ে এগিয়ে গেলাম কথা বলার জন্য। তিনি জানালেন, বিশাল আকৃতির এই জমিদার বাড়ির বর্তমান মালিকানায় রয়েছেন আহম্মদ আলী নামে এক উকিল। যার কারণে এই বাড়িটি উকিলের বাড়ি নামেও পরিচিত। সেই জন্য পথে ডাঙ্গা জমিদার বাড়ি কিংবা লক্ষণ সাহার বাড়ির হদিস অনেকে দিতে পারছিলেন না ।


লক্ষণ সাহার তিন পুত্র– নিকুঞ্জ সাহা। প্যারিমোহন সাহা ও বংকু সাহা। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর এদেশে থেকে যান শুধু প্যারিমোহন সাহা। প্যারিমোহন সাহার পুত্র নারায়ন সাহা স্বাধীনতার পর জমিদারের রেখে যাওয়া সমস্ত সম্পত্তি আহম্মদ আলীর কাছে বিক্রি করে বর্তমান নারায়ণগঞ্জ জেলায় চলে যান। আহম্মদ আলী স্ত্রীর নাম অনুসারে বাড়িটির নাম পরিবর্তন করে জামিনা মহল নামকরণ করেন। আগে জমিদার ভবনের কোন নাম ছিল কিনা তা জানার কোন সুত্র পাইনি। মূলত আহম্মদ আলী ওকালতি পেশার সাথে সংযুক্ত ছিলেন বিধায় বর্তমানে এই জমিদার বাড়িটি উকিলের বাড়ি হিসেবেই বেশি পরিচিত। কিন্তু বর্তমানে আহম্মদ আলীও নারায়ণগঞ্জ জেলায় বসবাস করছেন।
এদিকে স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের অভিযোগ, জমিদারের রেখে যাওয়া এই বিশাল সম্পত্তি ছিল দেবোত্তর হিসেবে। স্থানীয় এক প্রবীণ বাসিন্দা বলেন, তৎকালীন ভারতবর্ষে এই এলাকাটি ছিল দেবোত্তর হিসেবে। মূলত দেবোত্তর বলতে বোঝায় ওয়াকফ জমি। ওই সময়ে দেবোত্তর জমি হলে জামিদারকে খাজনা দিতে হতো না।

স্থানীয়রা আরও জানান, এলাকার হিন্দু সম্প্রদায় ট্রাস্ট নামে একটি সংগঠন দেবোত্তর এই সম্পত্তিটি বিক্রি করার পর আদালতে মামলা করেন; যা এখনও চলমান। মামলা জটিলতা ও দেখভাল করার অভাবেই বর্তমানে লক্ষণ সাহার এই জমিদার বাড়িটি অযত্ন আর অবহেলায় পড়ে রয়েছে।
সমস্ত তথ্য স্থানীয়দের কাছ থেকেই জানা। যাচাই করার কোন দ্বিতীয় সূত্রের সন্ধান পাইনি। স্থানীয়রা, যারা তথ্য দিয়েছেন সবাই নিজের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক। তাই কারো নাম উল্লেখ করছি না।

কি আর করা! খানিক সময় পুকুরঘাটে কাটিয়ে ঢাকার পথ ধরি।
ছবি: লেখক