
বৃষ্টিস্নাত মধ্যদুপুর। আকাশজুড়ে মেঘ, বাতাসে ভেজা মাটির গন্ধ। টাঙ্গাইল শহরের কোলাহল পেরিয়ে সন্তোষে ঢুকতেই যেন বদলে গেল চারপাশ। শহর খুব দূরে নয়, অথচ এখানে এসে মনে হলো, সময়টা একটু ধীর হয়ে গেছে।
রাস্তার পাশে সবুজ, পুরোনো গাছের ছায়া, কোথাও ভেজা পুকুরের জল, কোথাও আবার বয়সের ভারে নুয়ে পড়া স্থাপনা। হাঁটতে হাঁটতে মনে হলো, সন্তোষকে শুধু একটি জায়গা হিসেবে দেখলে ভুল হবে; এই মাটিতে, পুরোনো দেয়ালের গায়ে আর পুকুরের জলে জমে আছে টাঙ্গাইলের বহু বছরের ইতিহাস। ব্রিটিশ শাসনের আগে এটি ‘খোশনদপুর’ নামে পরিচিত ছিল টাঙ্গাইলের এই স্থান। সন্তোষেই একসময় জমিদারবাড়ির আঙিনায় শিক্ষার আলো জ্বালানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন একজন নারী, তিনি বিদ্যোৎসাহী শ্রীমতী জাহ্নবী চৌধুরাণী।
মাত্র ৯ বছর বয়সে জাহ্নবী চৌধুরাণীর বিয়ে হয়েছিল আর ১৩ বছর বয়সে বিধবা হন তিনি। স্বামীর মৃত্যুর পর দায়িত্ব নেন জমিদারির। সেই সময়ের সামাজিক বাস্তবতায় একজন নারী হিসেবে জমিদারি পরিচালনা করাই ছিল বড় দায়িত্ব। কিন্তু জাহ্নবী চৌধুরাণীর চিন্তার পরিধি ছিল আরও বড়। নিজের জমিদারির মানুষের জীবনযাত্রা, বিশেষ করে দরিদ্র প্রজাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি ভাবতেন, সেই ভাবনা থেকেই জন্ম নেয় একটি বিদ্যালয়ের স্বপ্ন।
১৮৭০ সালের ৩ জুন, নিজের বসতবাড়ির আঙিনায় প্রায় সাড়ে চার একর জায়গার ওপর প্রতিষ্ঠা করেন সন্তোষ জাহ্নবী উচ্চবিদ্যালয়। প্রথম যাত্রা ছিল শণের ঘরে, পরে বিদ্যালয়কে ঘিরে গড়ে ওঠে এক বিশাল শিক্ষাঙ্গন। তৎকালীন বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলার দ্বিতীয় এবং বর্তমান টাঙ্গাইল জেলার প্রাচীনতম উচ্চবিদ্যালয় হিসেবে পরিচিত প্রতিষ্ঠানটি শুধু একটি স্কুল ছিল না, এটি ছিল একসময়ের সামাজিক পরিবর্তনের স্বপ্ন।
জাহ্নবী চৌধুরাণী শুধু ভবন নির্মাণ করেই থেমে থাকেননি। শিক্ষার্থীদের জ্ঞানচর্চার জন্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন পাঠাগার ও বিজ্ঞানাগার। সেখানে ছিল নানা দুষ্প্রাপ্য বই ও বৈজ্ঞানিক সরঞ্জাম। পাঠাগারের উল্লেখযোগ্য সংগ্রহের মধ্যে ছিল ৩৬ খণ্ডের এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা। বিদ্যালয়ের সামনে ১৮৭৩ সালে নির্মিত হয় সূর্যঘড়ি।
বিখ্যাত পি সি সেন এমএয়ের সহযোগিতায় তৈরি সেই সূর্যঘড়ি ছিল সময় জানার এক অভিনবব্যবস্থা। আজকের মুঠোফোনের যুগে দাঁড়িয়ে সেই ঘড়ির কথা ভাবলে সময়ের ব্যবধানটা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সবচেয়ে বিস্ময়কর স্থাপত্যের মধ্যে ছিল ১০১টি বিশাল দরজাওয়ালা প্রাসাদোপম ভবন। জানালাবিহীন সেই দীর্ঘ ভবন আজও সন্তোষের ইতিহাসের অন্যতম আকর্ষণ।
শুধু শিক্ষাই নয়, মানুষের চিকিৎসার কথাও ভেবেছিলেন জাহ্নবী চৌধুরাণী। সন্তোষ এলাকায় তিনি দাতব্য চিকিৎসালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। পরবর্তী সময়ে সেই চিকিৎসাকেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত হয় যক্ষ্মা চিকিৎসার ইতিহাস। স্থানীয়ভাবে এটি টিবি ক্লিনিক বা যক্ষ্মা নিরাময় কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পায়। একসময় যক্ষ্মা ছিল ভয়ংকর এক রোগ। চিকিৎসাব্যবস্থা ছিল সীমিত। এমন সময়ে একটি দাতব্য চিকিৎসালয়ের উদ্যোগ নিছক একটি ভবন নির্মাণের ঘটনা ছিল না। এর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল মানুষের পাশে দাঁড়ানোর একটি মানবিক চিন্তা। দেড় শ বছর পর কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এই ভবনে আজও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে যক্ষ্মা চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। ২৫০ শয্যার সরকারি হাসপাতালটিতে ভিড় জমে রোগীদের।

বৃষ্টিতে আটকে পড়ে এই ভবনের সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হচ্ছিলাম। একটা হাসপাতাল, কি নান্দনিকভাব করা! ভবনটির স্থাপত্যে নব্য ধ্রুপদি বা ঔপনিবেশিক আমলের স্থাপত্যশৈলীর ছাপ স্পষ্ট। অফ-হোয়াইট বা হালকা ক্রিম রঙের চুনকাম করা দেয়ালের ওপর রয়েছে অলংকরণসমৃদ্ধ করিন্থীয় ধাঁচের স্তম্ভশীর্ষ, যা ভবনটি আভিজাত্যপূর্ণ করে তুলেছে। পাশাপাশি দেয়ালের ওপরের অংশে দেখা যাচ্ছে ছাঁচে তৈরি কারুকার্যময় কার্নিশ, যা ঐতিহাসিক স্থাপত্যটির সৌন্দর্য ও সময়ের সাক্ষ্য বহন করছে।
জাহ্নবী চৌধুরাণীর জনহিতকর কাজের আরেকটি নিদর্শন হিসেবে সন্তোষের ইতিহাসে শিক্ষা ও চিকিৎসা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে বিদ্যালয়, অন্যদিকে মানুষের চিকিৎসার জন্য দাতব্য উদ্যোগ। যেন একটি জমিদারবাড়ির আঙিনা ধীরে ধীরে পরিণত হয়েছিল জনকল্যাণের এক ছোট্ট কেন্দ্রে। এই এলাকার ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আরও এক বিস্ময়কর গল্প। স্থাপনা নির্মাণের জন্য মাটি কাটতে গিয়ে তৈরি হয়েছিল বিশাল এক জলাশয়। ইংরেজি ‘টি’ অক্ষরের মতো আকৃতির হওয়ায় সেটির নাম হয় ‘টি পন্ড’। পরে এটি মানুষের পানির প্রয়োজন মেটাতেও ব্যবহার করা হয়েছে। আজও সেই পুকুর সন্তোষের ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে। বিদ্যালয়, দাতব্য চিকিৎসালয়, যক্ষ্মা নিরাময় কেন্দ্র এবং ঐতিহাসিক পুকুর—সবকিছুকে পাশাপাশি রাখলে বোঝা যায়, সন্তোষের গল্প আসলে শুধু জমিদারবাড়ির গল্প নয়। এটি শিক্ষা, চিকিৎসা, জনকল্যাণ এবং মানুষের জীবনকে ঘিরে তৈরি হওয়া একটি সামাজিক ইতিহাস।

জাহ্নবী চৌধুরাণীর উত্তরাধিকারও থেমে থাকেনি তাঁর সময়ে। সন্তোষ ছয়আনি জমিদার পরিবারের সঙ্গে যুক্ত তাঁর পুত্রবধু রানি দিনমণি রায় চৌধুরাণীও জনহিতকর নানা কাজের জন্য স্মরণীয়। তিনি দার্জিলিংয়ে স্বামীর নামে বৈকুণ্ঠনাথ থায়সিস ওয়ার্ড প্রতিষ্ঠা করেন।
ঢাকায় নির্মাণ করেন বৈকুণ্ঠনাথ আশ্রম। মিটফোর্ড হাসপাতালে নারীদের জন্য ওয়ার্ড নির্মাণ, কাগমারীতে রানি দিনমণি মহাশ্মশান ঘাট প্রতিষ্ঠা এবং নদীতীরে মরদেহ সৎকারের জন্য দাতব্য কাঠের ভান্ডার স্থাপনও তাঁর জনহিতকর কাজের মধ্যে উল্লেখযোগ্য। সন্তোষের ইতিহাস তাই একজন নারী জমিদারের হাত ধরে শুরু হয়ে আরেক নারী জমিদারের জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড আরও বিস্তৃত হয়েছে।
তবে এই জায়গার গল্প শুধু জমিদার পরিবার কিংবা পুরোনো স্থাপনায় আটকে নেই।

সন্তোষের মাটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এ এলাকায়ই জন্মেছিলেন মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। সন্তোষে এক দিকে যেমন জমিদারি আমলের শিক্ষা ও জনকল্যাণের ইতিহাস চোখের সামনে আসে। অন্য দিকে মনে পড়ে বাংলার কৃষক, শ্রমজীবী ও সাধারণ মানুষের অধিকার নিয়ে কথা বলা এক প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতার কথাও।
টাঙ্গাইলের সন্তোষের জমিদার ভারতীয় ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি স্যার মন্মথনাথ রায় চৌধুরীর সম্মানার্থে ভারতে ঐতিহ্যবাহী সন্তোষ ট্রফি আয়োজিত হচ্ছে এখনো।
সন্তোষের ভেজা দুপুরে সেই পুরোনো দেয়াল যেন বলছিল, একসময় এখানে একটি কিশোরী বিধবার স্বপ্ন বাস্তব হয়েছিল। জমিদারির অর্থে গড়ে উঠেছিল বিদ্যালয়। মানুষের চিকিৎসার জন্য তৈরি হয়েছিল দাতব্য চিকিৎসালয়। সূর্যের ছায়া মেপে সময় জানাত সূর্যঘড়ি। ১০১টি দরজা দিয়ে প্রজন্মের পর প্রজন্ম শিক্ষার্থীরা প্রবেশ করেছে জ্ঞানের জগতে। আর এই মাটিতেই জন্ম নিয়েছে এমন মানুষ, যাঁরা পরে ছড়িয়ে পড়েছেন ইতিহাসের নানা অধ্যায়ে।

টাঙ্গাইল ঘুরতে এসে সবাই তাঁতের শাড়ি আর মিষ্টির খোঁজ নেয়। কিন্তু সন্তোষে একবার দাঁড়ালে টাঙ্গাইলকে আর শুধু ভ্রমণের শহর বলে মনে হয় না, এই শহর একটি দীর্ঘ স্মৃতির সমাধিলিপি। যে সময়ের কেন্দ্রে ছিলেন একজন নারী, শ্রীমতী জাহ্নবী চৌধুরাণী। একজন নারী জমিদার, যিনি নিজের সময়কে শুধু শাসন করেননি, নিজের সামর্থ্য দিয়ে মানুষের ভবিষ্যৎ গড়ার চেষ্টা করেছিলেন।
ছবি: লেখক