বাংলাদেশের ঐশ্বর্য সন্ধান ২১: নিশ্চিহ্নের পথে বালিয়া জমিদার বাড়ি
শেয়ার করুন
ফলো করুন

আমাদের দেশে বেশির ভাগ অঞ্চলে বনেদী বাড়িগুলোর তথ্য একেবারেই পাওয়া
যায় না। উনিশ ও বিশ শতকের জমিদার বাড়িগুলো সম্পর্কে তথ্যের অপ্রতুলতা যেমন থাকে তেমনি সমস্যা হয় ঠিকানা খুঁজে পেতে। যে গল্পগুলো শোনা যায়, তা আসলে জনশ্রুতি এবং স্থানীয় গল্প। বেশির ভাগ বাড়িতে বংশধররা নেই, যাঁরা বসবাস করছেন তাঁরাও খুব বেশি কথা বলতে চান না। দেখা যায় কিছু অংশ ভেঙে যাচ্ছে, পরিত্যক্ত অবস্থায় আছে, আবার কতক অংশ ব্যবহার হচ্ছে। আবার সব বাড়িই যে জমিদার বাড়ি ছিল সেটা নয়। কিছু কিছু বাড়ি আসলে সেই এলাকার তৎকালীন ধনাঢ্য বণিকদের; কেউ আবার ছিলেন জাতিদার, ভূস্বামী ইত্যাদি। আপাতত দেখা যাক বালিয়া জমিদার বাড়ি সম্পর্কে কতটুকু খুঁজে পাওয়া যায়!

বিজ্ঞাপন

ভাই বালিয়া জমিদার বাড়ি কোন দিকে?
সাটুরিয়া-দারাগ্রাম বাজারে অটোরিক্সা থেকে নেমে একজন স্থানীয়
পথচারীর কাছে জানতে চাইলাম। তিনি অবাক হয়ে তাকিয়ে বললেন, “এই এলাকায় কোন বালিয়া জমিদার বাড়ি নেই”। এভাবে একে একে বেশ কয়েকজনের
কাছে জানতে চাইলাম। কেউ কোন সদুত্তর দিতে পারলেন না। গুগলেও কিছু আসছে না। গুগল কেবলই বালিয়াটি জমিদার বাড়ি দেখাচ্ছে। শুধু গুগল নয়, এলাকার কয়েকজনও “বালিয়া” শব্দটি উচ্চারণ করার সঙ্গে সঙ্গে জানালেন, বালিয়াটি জমিদার বাড়ি এখানে নয়; কিন্তু আমার পুরোপুরি বিশ্বাস ছিল, আমি সঠিক নামই বলছি।

বাড়ির সীমানা প্রাচীর
বাড়ির সীমানা প্রাচীর

এই অভিজ্ঞতার সঙ্গে আরও একটি তথ্য শেয়ার করি, বালিয়া জমিদার বাড়ি ভ্রমণ করার পর যখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি ছবি শেয়ার করেছিলাম প্রায় শতভাগ মানুষ বালিয়া আর বালিয়াটি নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন, অনেকে বলেছেন আমি হয়তো ভুল করছি। যাহোক ভ্রমণে ফিরি।

বিজ্ঞাপন

পথে দাঁড়িয়ে ভাবছি কি করবো। এমন সময় একজন অটোরিক্সা চালক পথ বাতলে
দিলেন পথ। বললেন, “আপনাদের কালিঘাট বাজারে যেতে হবে। সেখানে কাউকে জিজ্ঞাসা করলেই দেখিয়ে দেবে বালিয়া গ্রামের জমিদার বাড়ি”।

মেলা চক্কর কেটে অবশেষে পাওয়া গেলো সাভারের ধামরাই উপজেলার বালিয়া জমিদার বাড়ি। অটোরিক্সা একটি সরু গ্রামীণ পথে প্রবেশ করল। দূর থেকেই ক্ষয়ে যাওয়া পুরোনো বাড়ির ইট চোখে পড়ছিলো। বুঝলাম সঠিক স্থানে এসেছি। বাড়ির এক কোণায় নামলাম। পথের সঙ্গেই বাড়ির ধ্বংসাবশেষ ধরে হেঁটে গেলাম। কোন কাঠামোই অবশিষ্ট নেই। দরজা, জানালা সব ক্ষয়ে গেছে।

বাড়ির প্রতিটি কোণায় বটগাছের শাখা প্রশাখা
বাড়ির প্রতিটি কোণায় বটগাছের শাখা প্রশাখা

সেই ফাঁক-ফোকর দিয়ে বাড়ির ভেতরের জঙ্গল দেখা যাচ্ছিলো। ঘন ঝোপঝাড়। উঁকি দিতেও ভয় লাগছিল। কিছুদূর যাবার পর ভগ্ন প্রবেশদুয়ারের মত একটি অবয়ব চোখে পড়লো। সেই দুয়ার থেকে দেখতে পেলাম দ্বিতল বাড়ির আধভাঙা সিঁড়ি। এই বাড়ির গম্বুজসহ একটি ছবি দেখেছিলাম অনেক আগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। কিন্তু সেই গম্বুজ খুঁজে পাচ্ছিলাম না। অনেক উঁকিঝুঁকি দিয়ে অবশেষে আবিস্কার করা গেলো গম্বুজ রয়েছে। গম্বুজও জঙ্গলে ঢেকে গেছে।

বর্তমানে যে অবস্থা দাঁড়িয়েছে, তাতে এই বাড়িটিকে ধ্বংসাবশেষ বলাটাও সমীচীন নয়। এই বাড়ি সম্পর্কে কিছুই জানা নেই। আশেপাশে কাউকেই দেখতে পেলাম না কিছু
জিজ্ঞাসা করার মত। অল্প হলেও তো পেছনের ইতিহাস রয়েছে, এই বাড়িকে ঘিরে। জমিদার বাড়ির ধ্বংসাবশেষের কাছাকাছি একটি মসজিদ ও কবরস্থান দেখতে পেলাম। তিন গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদটির নির্মাণশৈলী বলছে পুরোনো মসজিদ কিন্তু নতুন করে সাদা রঙ করা হয়েছে।

উত্তরসূরীদের সাথে আলাপ
উত্তরসূরীদের সাথে আলাপ
সৈয়াদূর রহমান ও খোদেজা খানম
সৈয়াদূর রহমান ও খোদেজা খানম

বাড়ির চত্বরে কিছু আধুনিক দালান দেখতে পেলাম। দেখে বোঝা যাচ্ছে কেউ
বসবাস করছেন। এমন সময় বাড়ির ভেতর থেকে একজন তরুণ বেরিয়ে এলেন, নাম ফাহিমুর রহমান খান। এগিয়ে গিয়ে কথা বলে জানা হলো, বালিয়া জমিদার বাড়ির বংশধর তাঁরা। ভেতরে বড় কেউ আছেন কি কথা বলার মতো? এটা বলার পর বাড়ির
ভেতর থেকে তাঁর বাবাকে ডেকে নিয়ে এলেন। নজিবুর রহমান খান আমাদের অভিবাদন জানালেন। খোলা চত্বরে বসে আমরা গল্প জুড়ে দিলাম।

তাঁর কাছ থেকেই জানা হলো এই জমিদারির গোড়াপত্তন করেন মৌলভী আব্দুর রহমান খান। মূলত এই বংশের আদিপুরুষ করিম বক্স খান ও আলিমুদ্দিন খান, দুই
ভাই এসেছিলেন পাকিস্তানের (একসময়ের অবিভক্ত ভারতের পাঞ্জাব) মুলতান থেকে। জমিদার মৌলভী আব্দুর রহমান খান হলেন আলিমুদ্দিন খাঁর ছেলে। আদিপুরুষের আগমন ও জমিদারির গোড়াপত্তনের সময়কাল সঠিকভাবে জানতে পারিনি

জমিদার বাড়ির এই অংশটুকুই কেবল টিকে আছে
জমিদার বাড়ির এই অংশটুকুই কেবল টিকে আছে
খোদিত রয়েছে জমিদার আব্দুর রহমান ও ওয়াহেদ বক্স এর নামের অদ্যাক্ষর
খোদিত রয়েছে জমিদার আব্দুর রহমান ও ওয়াহেদ বক্স এর নামের অদ্যাক্ষর

জমিদারের উত্তরসুরী নজিবুর রহমান খান আমাকে একটি বংশলতিকা দেখালেন, সেটি থেকেই জানা হলো এই জমিদারির অল্প ইতিহাস। গল্প করার সময় দেখছিলাম বাড়ির সীমানা প্রাচীরটিও ক্ষয়ে গেছে। সেই ভগ্নপ্রাচীর থেকে একটি ইট এনে দেখালেন নজিবুর রহমান খান। যেখানে খোদিত রয়েছে জমিদার আব্দুর রহমান ও ওয়াহেদ বক্সের নামের অদ্যাক্ষর। প্রথম জমিদার ভারতে মারা গেছেন। আদিপুরুষ আলিমুদ্দিন খানের সমাধি রয়েছে মসজিদের পাশের সমাধিক্ষেত্রে। নজিবুর রহমান ও ফাহিমুর রহমানের সঙ্গে আমরা যখন কথা বলছি, তখন বাড়ির ভেতর থেকে বেরিয়ে এলেন একজন বয়জ্যেষ্ঠ নারী। তিনি খোদেজা খানম, শেষ জমিদারের জীবনসঙ্গী। তাঁর বয়স ৯০ বছর। যদিও তাঁর গল্প বলার ধরণ ও চলাফেরা দেখে বোঝার উপায়ই নেই, জীবনের দীর্ঘসময় তিনি পার করে ফেলেছেন।

জমিদার বাড়ির সংরক্ষিত পুরোনো স্মৃতি দেখতে আগ্রহ প্রকাশ করলাম। নজিবুর রহমান আমাকে সৈয়াদুর রহমান খানের একটি ছবি দেখালেন। সৈয়াদুর রহমান এই
পরিবারের শেষ জমিদার। পুরোনো আরও একটি ছবিতে রয়েছেন সৈয়াদুর রহমান ও খোদেজা খানম। নকিবুর রহমানের পরিবারের কাছে বিদায় নিয়ে আমরা ঢাকা মুখো হলাম। বর্তমানে বালিয়া জমিদার বাড়িটির বেশিরভাগ অংশই একেবারে ধ্বংসপ্রাপ্ত শুধুমাত্র এর উঁচু গম্বুজ আর স্তম্ভ যুক্ত বাড়ির মূল প্রবেশপথটিতে অতীত ঐশ্বর্যের কিছুটা আভাষ পাওয়া যায়।

মেঠো পথের পাশে বাড়ির ধবংসাবশেষে দাঁড়িয়ে লেখক
মেঠো পথের পাশে বাড়ির ধবংসাবশেষে দাঁড়িয়ে লেখক

আগ্রহীদের জন্য: ঢাকা থেকে বালিয়া জমিদার বাড়িতে যাওয়ার জন্য কয়েকটি পথ রয়েছে। তবে ভ্রমণকারীদের জন্য সবচেয়ে সহজ উপায় হল গাবতলী বাস স্টপ থেকে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক হয়ে সাটুরিয়া বাস স্টপে যাওয়া। সাটুরিয়া বাস স্টপ নেমে অটোরিকশায় সাটুরিয়া-দারাগ্রাম বাজার হয়ে কালীঘাট বাজার। সেখান থেকে বালিয়া জমিদার বাড়ি মাত্র কয়েক ধাপ দূরে।

ছবি: লেখক

প্রকাশ: ১৬ জানুয়ারি ২০২৬, ০৭: ০০
বিজ্ঞাপন