
ইট-পাথরের শহরের যান্ত্রিকতায় আমরা হারিয়ে ফেলি আমাদের মনের আনন্দলোক। কাজী নজরুলের সেই কবিতার মতো—কোথায় স্বর্গ, কোথায় নরক, কে বলে তা বহুদূর; মানুষের মাঝেই স্বর্গ-নরক, মানুষেতেই সুর-অসুর। এই নগরে যখন মাঝরাতে নিস্তব্ধতার মাঝে প্রশান্তি আর পারলৌকিক স্বর্গ খুঁজতে হয়, তখন সবুজ পাহাড়ের মাঝে স্বর্গের সিঁড়ি দেখার হাতছানি উপেক্ষা করা সম্ভব নয়। সেই টানেই এবার গিয়েছিলাম মায়ুং কপাল, হাতিমুড়া।

আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রামে আছে অদেখা অনেক সৌন্দর্য, যা প্রথাগত ভ্রমণের স্থান থেকে একেবারেই আলাদা। প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা দর্শনীয় স্থানগুলোতে নান্দনিকতার পাশাপাশি থাকে মৌলিকতার ছোঁয়া। তার অকৃত্রিমতা অপরিবর্তিত রেখে কিছু মানবসৃষ্ট অবকাঠামোর সংযোজন জায়গাটির সৌন্দর্য আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। খাগড়াছড়ির মায়ুং কপাল, হাতিমুড়া বা হাতিমাথা ঠিক এমনই একটি জায়গা, যার প্রাচীনতায় লেশমাত্র দাগ ফেলেনি মনুষ্যসৃষ্ট কর্মকাণ্ড। উল্টো প্রকৃতির এই অপার বিস্ময়কে সাজিয়ে তুলেছে শৈল্পিক অলংকরণে। অদ্ভুত আকৃতির এই পাহাড় নিয়েই এবারের ভ্রমণের গল্প।
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের পার্বত্য চট্টগ্রামের খাগড়াছড়ি জেলার দুর্গম পাহাড়ঘেরা অন্যতম ইউনিয়ন পেরাছড়া। এই ইউনিয়নের সবচেয়ে দর্শনীয় পাহাড়টির নাম “হাতিমাথা” বা “মায়ুং কপাল”। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১,২০৮ ফুট উঁচু এই পাহাড় নানা জনগোষ্ঠীর মোট ১৫টি গ্রামকে সযত্নে আগলে রেখেছে।

এগুলোর মধ্যে আছে খাগড়াছড়ি সদর উপজেলা ও মাটিরাঙ্গা উপজেলার সীমান্তবর্তী ভাঙ্গামুড়া, মাখন তাইসা পাড়া, বদলছড়া, হাজা পাড়া, কিনাপা পাড়া, কাপ্তালপাড়া, বাগড়া পাড়া, সাধুপাড়া ও কেশব মহাজনপাড়া।


হাতিমাথার খাড়া পাহাড় বেয়ে পাহাড়ি জনগণের উঠানামার সুবিধার্থে ২০১৫ সালের ১৩ জুন পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধানে নির্মিত হয় ৩০৮ ফুট দীর্ঘ লোহার সিঁড়ি। এই সিঁড়িপথ দিয়ে পাহাড়ের চূড়ায় যেতে প্রায় ৩০০টি ধাপ পেরোতে হয়।
অদ্ভুত আকৃতির এই পাহাড় প্রাকৃতিকভাবেই গঠন পেয়েছে হাতির মাথার মতো। এ কারণেই “হাতিমাথা” বা “হাতিমুড়া” নামকরণ। “মায়ুং কপাল” নামের উৎপত্তি এখানকার সংখ্যাগরিষ্ঠ নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী ত্রিপুরাদের কাছ থেকে। তারা “হাতি” বোঝাতে “মায়ুং” এবং “মাথা” বোঝাতে “কপাল” শব্দ ব্যবহার করে। এছাড়াও পাহাড়টি স্থানীয়ভাবে আরও কয়েকটি নামে পরিচিত। অনেকে একে হাতিমুড়া বলে ডাকে, আর চাকমাদের কাছে এটি “এঁদো সিরে মোন” নামে পরিচিত।

খাগড়াছড়িতে এর আগে দুবার এলেও এখানে কখনো যাওয়া হয়নি। রাঙামাটিতে ফুল বিজু দেখতে এসেছিলাম। তার আগের দিন ভাবলাম, পাহাড়ে এসে একটু ট্র্যাকিং না করলে ভ্রমণের আনন্দ অসম্পূর্ণ থেকে যায়। সেই কারণেই আমি আর আমার বন্ধু সামিরা দুজন মিলে রওনা দিলাম খাগড়াছড়ির উদ্দেশ্যে। আমাদের সিএনজি চালক তং ময় চাকমা সকাল সাড়ে সাতটায় আমাদের নিয়ে রওনা দেন। সেখানে পৌঁছাতে সময় লাগে প্রায় আড়াই ঘণ্টা। পানছড়ি বাজার থেকে সিঙ্গিপাড়া হয়ে জামতলী ব্রিজ পার হয়ে পৌঁছালাম চেঙ্গী নদীর পাড়ে। ভরা বর্ষায় এই নদী দু’কূল ছাপিয়ে যায়, তবে শুষ্ক মৌসুমে হেঁটে পার হওয়া যায়।
খাগড়াছড়িতে এর আগে দুবার এলেও এখানে কখনো যাওয়া হয়নি। রাঙামাটিতে ফুল বিজু দেখতে এসেছিলাম। তার আগের দিন ভাবলাম, পাহাড়ে এসে একটু ট্র্যাকিং না করলে ভ্রমণের আনন্দ অসম্পূর্ণ থেকে যায়। সেই কারণেই আমি আর আমার বন্ধু সামিরা দুজন মিলে রওনা দিলাম খাগড়াছড়ির উদ্দেশ্যে। আমাদের সিএনজি চালক তং ময় চাকমা সকাল সাড়ে সাতটায় আমাদের নিয়ে রওনা দেন। সেখানে পৌঁছাতে সময় লাগে প্রায় আড়াই ঘণ্টা। পানছড়ি বাজার থেকে সিঙ্গিপাড়া হয়ে জামতলী ব্রিজ পার হয়ে পৌঁছালাম চেঙ্গী নদীর পাড়ে। ভরা বর্ষায় এই নদী দু’কূল ছাপিয়ে যায়, তবে শুষ্ক মৌসুমে হেঁটে পার হওয়া যায়।

নদী পার হয়ে আমরা স্থানীয় একজন গাইড নিলাম। যেহেতু এটি অফ-ট্রেইল পাহাড়ি গ্রামের ভেতরের পথ, তাই স্থানীয় কাউকে গাইড হিসেবে নেওয়াই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ। আমরা তপন ত্রিপুরা নামে এক কিশোরকে ৫০০ টাকার বিনিময়ে সঙ্গে নিলাম।
হাতিমুড়ায় পৌঁছানোর দীর্ঘ পথের একঘেয়েমি দূর করেছে খরস্রোতা চেঙ্গী নদী। নদীর ওপর দিয়ে পারাপারের জন্য রয়েছে কাঠের সাঁকো। পথে পড়বে দুটি ঝিরি, এরপর বিস্তৃত সমতল ভূমি—কোথাও জুমক্ষেত, কোথাও ধু-ধু প্রান্তর। এমনই এক মাঠ পেরিয়ে দেখা মিলবে অদ্ভুত নামের এক পাহাড়ি গ্রাম বানতৈসা। এখানে ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর বসবাস।

তিনটি উঁচু টিলা পেরোতে গিয়ে আমরা বেশ হাঁপিয়ে উঠেছিলাম। আমাদের পার্বত্য অঞ্চলের পাহাড়গুলো সমতল বা ধানক্ষেত থেকে শুরু হলেও ধীরে ধীরে ঝিরি পার হয়ে বাড়তে থাকে উচ্চতা। সরু, আঁকাবাঁকা পথ পেরোতে পেরোতে ক্লান্তি যেন চেপে বসে।
চৈত্রের শেষে পাহাড়িরা জুম চাষের জন্য জমিতে আগুন ধরায়।

সেই পোড়া কাঠ আর পাতার গন্ধ, সঙ্গে গরম বাতাসের ঝলক—মনে হচ্ছিল অন্য এক জগতে চলে এসেছি। হুট করেই ইংরেজি সাহিত্যিক নেইল গেইম্যানের একটা উক্তি মাথায় চলে এলো ''শী ওয়াজ বিউটিফুল বাট শী ওয়াজ বিউটিফুল ইন দ্যা ওয়ে অ্যা ফরেস্ট ফায়ার ওয়াজ বিউটিফুল বাংলায় “সে ছিল সুন্দরী, তবে তার সৌন্দর্য ছিল ঠিক যেন এক বনভূমির দাবানলের মতো মুগ্ধকর, কিন্তু ভয়ংকর।”
যত উপরে উঠছিলাম, পথ যেন ততই শেষ হচ্ছিল না। স্থানীয়দের আধা ঘণ্টার পথ আমাদের মতো শহুরে মানুষের কাছে এক ঘণ্টা মনে হয় প্রতিবার পাহাড়ে এসে এই অভিজ্ঞতা নতুন করে উপলব্ধি করি।
সবচেয়ে উঁচু টিলা পার হওয়ার পর আমাদের গাইড তপন জানালো—এবার আর কোনো টিলা নেই। শুনে যেন কিছুটা হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। কিছু দূর এগোতেই দেখা মিলল কাপতলা পাড়ার—ছোট্ট একটি গ্রাম। গাছের নিচে কাঠের বেঞ্চে বসে একটু বিশ্রাম নিতেই শরীর-মন জুড়িয়ে গেল।

হঠাৎ সামিরা বলে উঠল, “ইশ! এত সুন্দর গ্রাম… এখানে যদি থাকা যেত!” কথাটা শুনে এক স্থানীয় বৃদ্ধ বললেন, “দিদি, থাকবেন—আমরা ঘর বানিয়ে দেব।” পাহাড়ের এই সরল মানুষগুলোর সঙ্গে শহরের মানুষের মানসিকতার পার্থক্য বারবার আমাকে মুগ্ধ করে।
বিরতি শেষে আবার হাঁটা শুরু করলাম। পথে দেখি আম পড়ে আছে—যেন আমাদের জন্যই কেউ সাজিয়ে রেখেছে। একটি ছোট কুটির থেকে মলয় ত্রিপুরা নামে এক ব্যক্তি বেরিয়ে এসে আমাদের হাতে তুলে দিলেন সেই আমগুলো। কোনো দ্বিধা ছাড়াই ব্যাগ ভরে দিলেন।


প্রকৃতির কাছে এলেই আমার মনে হয় যেন বইয়ের ভেতর ঢুকে যাচ্ছি। হঠাৎই মনে পড়ে গেল “পথের পাঁচালী”র দুর্গার কথা সামান্য ফল নেওয়ার জন্য কত অপমান সহ্য করতে হয়েছিল তাকে। অথচ এই সময়েও এমন নিঃস্বার্থ আপ্যায়ন দেখলে মনে হয়—মানুষের ভেতরে মায়া এখনো বেঁচে আছে। আর এই মায়ার খোঁজেই তো বারবার পাহাড়ে ছুটে আসা।
কাপতলা পাড়ার পর স্বর্গের সিঁড়ির আগে আর কোনো জনপদ নেই। তবে উঁচু-নিচু পথে হাঁটতে হাঁটতে চোখে পড়ে ছোট ছোট মাচাঘর। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে দিতে মাঝেমধ্যে কুয়ার ঠাণ্ডা পানিতে গলা ভেজানো যায়।
অবশেষে দেখা মিলল সেই সিঁড়ির বনের ভেতর থেকে আকাশের দিকে উঠে যাওয়া অসীম ধাপ। নিচ থেকে তাকালে মনে হয় যেন এই সিঁড়ি আকাশ ছুঁয়ে ফেলেছে। আর তাই সিঁড়ি নির্মাণের পর থেকেই স্থানীয়দের কাছে এর নাম স্বর্গের সিঁড়ি।



হাতিমাথা পাহাড়ের পাদদেশে পৌঁছতেই দেখা যায় প্রায় ১২০ ডিগ্রি কোণে বাঁক নিয়ে ওপরে উঠে গেছে সিঁড়িটি। ১০ থেকে ১৫ মিনিট সময় লাগে এই সিঁড়ি বেয়ে চূড়ায় উঠতে। স্বর্গে না নিলেও এই সিঁড়ির শেষ প্রান্ত আপনাকে পৌঁছে দেবে এক নয়নাভিরাম দৃশ্যে। চূড়ায় দাঁড়িয়ে প্রায় পুরো খাগড়াছড়ি শহরটাই চোখের সামনে ভেসে ওঠে। সিঁড়ীটা দেখার পরই লেড জেপলিনের স্টেরওয়ে টু হ্যাভেন গানটা মাথায় ঘুরতে লাগলো। কল্পনায় ভাবলাম লেড জ্যাপলিন রবার্ট প্লান্টের কণ্ঠে জিমই পেইজের সেই আইকনিক সোল গিটার আমাকে আত্মিক শান্তির জগতে নিয়ে গেলো। ।


আমি আর সামিরা চুপচাপ দাঁড়িয়ে সেই দৃশ্য উপভোগ করলাম। তারপর ইচ্ছে পূরণের এক টুকরো কয়েন পাহাড়ের মাঝে ছুঁড়ে দিয়ে আবার ফিরে চললাম একই পথে চেঙ্গী নদীর দিকে।শহুরে কলুষতা রেখে এলাম পাহাড়ের মাঝে। আবার হয়ত কখনো দেখা হবে স্বর্গের সিঁড়ীতে বাস্তব জগতে কিংবা পরোলোকে।
গ্রীষ্ম, বর্ষা ও শীত সব ঋতুতেই যাওয়া যায় এখানে। তবে বর্ষায় প্রকৃতি তার পূর্ণ রূপে থাকে, আর শীতে ট্রেইল হাঁটা সহজ হয়।

ঢাকা থেকে বাস, ট্রেন বা বিমানে চট্টগ্রাম হয়ে খাগড়াছড়ি পৌঁছে সহজেই যাওয়া যায়। সেখান থেকে পানছড়ি হয়ে চেঙ্গী নদী পার হয়ে ট্রেকিং করতে হয়।


গাইড নেওয়া জরুরি
পর্যাপ্ত পানি ও শুকনো খাবার রাখুন
দলবদ্ধভাবে ভ্রমণ করুন
স্থানীয়দের প্রতি সম্মান বজায় রাখুন
ছবি: লেখক