বাংলাদেশের ঐশ্বর্য সন্ধান ১৭: জমিদার সারদা কৃপা লালার নাচঘর— চট্টগ্রামের  বিস্মৃত ঐতিহ্যের সন্ধানে
শেয়ার করুন
ফলো করুন

গত রমজানের সময়! চট্টগ্রামে পৌঁছেছি দুপুরে। আবাসন আগ্রাবাদ এলাকায় চট্টগ্রাম জাতিতত্ত্ব জাদুঘর চত্বরে, বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের গেস্টহাউস। ইফতার করার আগে ভাবলাম, শহরের চন্দনপুরা এলাকায় ফায়ার সার্ভিস অফিসের অভ্যন্তরে জমিদার সারদা লালার নির্মিত যে স্থাপত্য রয়েছে, সেটায় একবার ঢুঁ মেরে আসি।

যেমন ভাবনা তেমন কাজ। কিন্তু ফায়ার সার্ভিস অফিসের সামনে পৌঁছে সেখানে দাঁড়িয়ে কিছুটা ইতস্তত করছি। ভাবছি, ভেতরে প্রবেশের অনুমতি পাব কি না! রমজানের সময়, তার ওপর অফিসের সময় পেরিয়ে গেছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত কিংবা কাজ করার অনুমতি দেওয়ার হয়তো কেউ থাকবেন না। এসব ভাবতে ভাবতে, মূল গেটের পাশেই খোলা একটি ছোট গেট দিয়ে প্রবেশ করি। হাতের বাঁ দিকে লাল রঙের দোতলা স্থাপত্যটি বেশ সুন্দর। গেটের সোজাসুজি ফায়ার সার্ভিসের অফিস। একজন এগিয়ে এলেন। জানতে চাইলেন, কেন এসেছি। ব্যাখ্যা করার পর নিয়ে গেলেন সিনিয়র সেকশন অফিসারের কাছে। ভদ্রলোক বেশ ভালো। সব শুনে বললেন, কাজ করুন।

বিজ্ঞাপন

স্থাপত্যটির পাশে একটি দিঘি আর দিঘির ঘাট রয়েছে। ফায়ার সার্ভিস অফিসের পেছন দিকে দিঘিটি। বেশ বড়। শুকিয়ে গেছে। ফলে পাড়ের অনেক অংশ দেখা যাচ্ছে। সেই অংশগুলো প্রায় পাথর হয়ে গেছে। অন্তত দূর থেকে দেখে যা বুঝতে পারছি। প্রাচীন কোনো পথে গেলে ছোট ছোট টিলা ও পাহাড়ের গা যেমন পাথুরে রূপ ধারণ করে, অনেকটা সে রকম। ভাবছি, এই জলাধার এবং এই স্থান তাহলে কত পুরোনো!

একটি দেয়ালের কারুকাজ
একটি দেয়ালের কারুকাজ

স্থানীয়ভাবে কিছু বইপত্র আর অনলাইন প্রতিবেদনে এই স্থাপত্যকে সাজ্জেলালার নাচঘর বলা হয়েছে। এমনকি একটি বইয়ে সাজ্জেলালা নামটি দেখে আমি অবাক হয়েছি সংগত কারণেই। গ্রন্থ ও লেখকের নাম উল্লেখ করছি না। বোঝা যাচ্ছিল নামের রূপটি অপভ্রংশ ও পরিবর্তিত হয়েছে। কিন্তু নির্মাতার আসল নাম যখন স্থাপত্যটি প্রথম দেখেছি, তখন জানতাম না।

বিজ্ঞাপন

আর শুধু নাচঘর এখানে কেন নির্মাণ করা হয়েছে, সেটিও জানতাম না। ভবনের গায়ে একটি ফলকে লেখা রয়েছে ‘ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স জাদুঘর’। ভবনটিতে যা দেখেছি, সেটি বলছি। দ্বিতল ভবনের নিচতলায় কয়েকটি কামরা আছে। কামরাগুলো বিভিন্ন সংস্কারের মধ্য দিয়ে গেছে বোঝাই যাচ্ছে। প্রতিটি কামরায় ময়লার স্তূপ।

ভবনের একটি জানালা
ভবনের একটি জানালা

ভবনটির ডান দিকের একটি কক্ষ দেখে মনে হলো সেখানে হয়তো পারফরম্যান্স হতো। কামরার ভেতরে ওপরে চারদিকে ঝুলবারান্দার মতো রয়েছে। কক্ষের মাঝে একটি দেয়াল তুলে দেওয়া হয়েছে, তাই আকার-অবয়ব সঠিকভাবে বোঝা যাচ্ছে না।
নব্য ধ্রুপদি স্থাপত্য দেখে বোঝা যাচ্ছে, অবশ্যই তৎকালীন কোনো জমিদার কিংবা অভিজাত বণিক এটি নির্মাণ করেছেন। তথ্য বলতে আমার কাছে এটুকুই ছিল।

গুগল করলে এই স্থাপত্য নিয়ে অনেক মুখরোচক লেখা ও ভিডিও পাওয়া যায়। এর কোনোটিই আমার কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হয়নি। আমি সোশ্যাল মিডিয়ায় এই ভবনের একটি ছবি শেয়ার করেছিলাম, অনেক তথ্য পেয়েছি। ওপার বাংলা থেকেও অনেকে তথ্য দিয়েছেন। তাঁদের তথ্য পেয়েই আমি জেনেছি জমিদারের সঠিক নাম। তাঁর নাম সারদা কৃপা লালা।

চট্টগ্রাম শহরের চন্দনপুরা এলাকায় সারদা লালার দিঘীর ঘাটে লেখক
চট্টগ্রাম শহরের চন্দনপুরা এলাকায় সারদা লালার দিঘীর ঘাটে লেখক

সবার দেওয়া তথ্য থেকে আমি জেনেছি, লালাবাড়ির অবস্থান বোয়ালখালী উপজেলায়। সেখানেও তাদের কিছু বাড়ি রয়েছে। সারদা লালার স্মৃতিমন্দির, তাদের পারিবারিক সমাধিক্ষেত্রও আছে। তথ্যগুলো জেনে আমি লালাবাড়িতে গিয়েছি। খুঁজে পেয়েছি তাঁর সমাধি।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুভাকাঙ্ক্ষীরা যেসব তথ্য দিয়েছেন, সেগুলো সংক্ষেপে তুলে ধরছি। তথ্যগুলো মিলিয়ে দেখার কিংবা ক্রস চেক করার সুযোগ নেই। লালাবাড়ির উত্তরসূরিদের সঙ্গে কথা বলার মতো কাউকে পাইনি। আর সঠিক তথ্য উপস্থাপন করতে হলে দীর্ঘ গবেষণা প্রয়োজন। ঐতিহ্য ভ্রমণে শুধু একটি বিষয় নিয়ে কাজ করা কিছুটা কষ্টসাধ্য, সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুলও।

ভবনের ভেতরে দেখে এটিকে নাচঘর বলে অনুমেয়
ভবনের ভেতরে দেখে এটিকে নাচঘর বলে অনুমেয়

বলা হয়ে থাকে, তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের বারানসিতে বিখ্যাত এক নর্তকী ছিলেন। নাম গর্ডন বাঈ! সেই গর্ডন বাঈজির জন্যই এই দ্বিতল বাড়িটি নির্মাণ করা হয়েছিল। সারদা লালার উত্তরসূরিদের সম্পর্কে দুটি তথ্য পাওয়া গেছে। জানা যায়, ১৯৬০–এর দশকের শেষ দিকে সারদা লালার বিধবা পুত্রবধূ গ্রামের বাড়ি এবং সব সম্পত্তি একজন মুসলমান ভদ্রলোকের কাছে বিক্রি করে সপরিবার (কনিষ্ঠ যমজ দুই ছেলে, নাম জটু ও চান্দু, বড় দুজন আগেই চলে গিয়েছিল) ভারতে চলে যান!

আরও একটি তথ্য হলো, সারদা লালার একমাত্র সন্তান মনীন্দ্র লালা অল্প বয়সে ক্ষয়রোগে মৃত্যুবরণ করলে সারদা লালা তাঁর সব সহায়–সম্পত্তি তাঁর অকালবিধবা পুত্রবধূ মাধুরীলতা লালাকে উইল করে (তাঁর নাবালক নাতিদের অভিভাবক হিসেবে) দান করে যান। তাঁর মৃত্যুর পর মাধুরীলতা দেবী নিপুণভাবে জমিদারি চালিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু স্বাধীনতাযুদ্ধের পর তাঁদেরই এক জ্ঞাতি আদিনাথ লালা তাঁর নাবালক পুত্র দিলীপ লালাকে হত্যার উদ্দেশ্যে ছুরিকাঘাত করেন।

দিঘীর ঘাটের সামনে থেকে এই পথ লালাবাড়ি পর্যন্ত গেছে
দিঘীর ঘাটের সামনে থেকে এই পথ লালাবাড়ি পর্যন্ত গেছে

এতে মাধুরীলতা দেবী ভয় পেয়ে তাঁর দুই নাবালক সন্তানকে ভারতে পাঠিয়ে দেন। ওখানেই দিলীপ ও তাঁর ভাই লেখাপড়া করে ভালো পদে সরকারি চাকরি করে জীবন ধারণ করছেন। ২০১৬ সালের দিকে এক কন্যাসন্তানকে উত্তরাধিকারী হিসেবে রেখে মাধুরীলতা লালা ভারতে চলে যান। ওই মেয়েও উচ্চশিক্ষিত এবং বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ায় বসবাস করেন।

এই ভবনের একটি গৌরবময় ইতিহাস রয়েছে। অনেকে জানিয়েছেন, ব্রিটিশ আমলে এই ভবনে ছিল একটি স্কুল। যেখানে শিক্ষক ছিলেন অগ্নি যুগের বিপ্লবী মাস্টারদা সূর্য সেন। চন্দনপুরার এই নাচঘর নিয়ে সুচরিত চৌধুরীর লেখা একটি নাটক প্রচারিত হয়েছিল চট্টগ্রাম বেতার থেকে আশির দশকের শুরুর দিকে। অনেকে আরও জানিয়েছেন, সারদা লালার অনেক সম্পদ চট্টগ্রাম শহরে এখনো বিদ্যমান।
লালাবাড়ি ও সমাধি যেমন দেখেছি

বোয়ালখালিতে সারদা লালার বাড়ি
বোয়ালখালিতে সারদা লালার বাড়ি
হয়তো শেষ স্মৃতিচিহ্ন
হয়তো শেষ স্মৃতিচিহ্ন

নাচঘর দেখার পাঁচ মাস পর বোয়ালখালী উপজেলায় যাই। সেদিন থেমে থেমে বৃষ্টি ঝরছিল। একটি অটোরিকশা নিই বোয়ালখালীর শ্রীপুর বুড়া মসজিদে যাব বলে। বোয়ালখালীতে লালাবাড়ি রয়েছে, এ তথ্য আমি ভুলে গিয়েছিলাম। বোয়ালখালীতে ঘুরতে ঘুরতে আচমকা একটি শানবাঁধানো দিঘির ঘাট চোখে পড়ে। অটোরিকশাচালক বলেন, এটা লালাবাড়ির দিঘি। সঙ্গে সঙ্গে জিজ্ঞেস করি, এটা কি সারদা লালার বাড়ি? তিনি বলেন, জি আপা।

একদম দেরি না করে, অটোরিকশা থামিয়ে দিঘির পাড় ধরে হেঁটে যাই বাড়ির গেটে। কয়েকটি জায়গায় কিছু আধুনিক ভবন আছে। একটি মাটির দ্বিতল ভবনে দুজন নারীকে দেখতে পেয়ে জানতে চাই, সারদা লালার সমাধি কোথায়? একজন আঙুলের ইশারায় দেখান দিঘির দিকে।

লালা বাড়ির দিঘী ঘাট
লালা বাড়ির দিঘী ঘাট

পুরোনো ভবন আরও একটি টিকে আছে। প্রায় ভাঙা অবস্থায়। এটিও মাটির তৈরি, তবে ইটের গাঁথুনিও দেখা যাচ্ছে। পাতলা জাফরি ইটগুলো দাঁত বের করে আছে। সেই ইট খুলে নিয়ে পাশের বাড়ির উঠানে বিছানো হয়েছে বৃষ্টি-কাদা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য। পাশে একটি আধুনিক বাড়ি রয়েছে। সেখান থেকে একজন বেরিয়ে এসে নানা কথা জানতে চাইলেন। আমরা কে, কেন এসেছি, সাংবাদিক নাকি আমরা—এসব আরকি।

তারপর ভদ্রলোক নিজে নিজেই বলতে আরম্ভ করলেন, ‘এই জায়গা আমরা কিনে নিয়েছি।’ আমি তাঁকে আশ্বস্ত করি, আমার ভিন্ন কোনো উদ্দেশ্য নেই, সারদা লালার বাড়ির খোঁজে আমরা এসেছি। আমি ভ্রমণ করি, তাই ঘুরে ঘুরে দেখছি। তিনি আমার ফোন নম্বর চাইলেন। হয়তো অবাক হচ্ছিলেন ভাঙা বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছি, ইটের ছবি তুলছি বলে। একবার তিনি আশ্বস্ত হওয়ার চেষ্টা করছেন, আবার ভাবনায় ডুবে যাচ্ছেন। আমি সেসব পাত্তা না দিয়ে নিজের কাজ করছি। এরই মধ্যে বৃষ্টি বেড়ে যায়। আরও বেশ কিছু কাজ আছে, তাই বৃষ্টি থামার অপেক্ষা না করে কাজ শেষ করি।
বাড়ি ঘুরে দিঘির ঘাটে যাই। তখন বেশ বৃষ্টি। সময় বাঁচাতে বৃষ্টি উপেক্ষা করেই দিঘির দিকে যাই। সমাধিক্ষেত্রে কয়েকটি সমাধি জঙ্গলে ঢাকা। নামফলক দেখতে পাইনি।

সারদা কৃপা লালার সমাধি
সারদা কৃপা লালার সমাধি
সমাধির এপিটাফ
সমাধির এপিটাফ

তারপর জঙ্গল সরিয়ে খুঁজে দেখি একটি ফলক। পড়া যাচ্ছে না। ব্যাগ থেকে টিস্যু বের করে কাদা মুছি। পুরু ধুলো জমেছে, তার ওপর বৃষ্টিতে সেটা কাদায় রূপ নিয়েছে। টিস্যুতে খুব বেশি কাজ হলো না। তারপর ব্যাগে থাকা এক বোতল পানি ঢেলে দিলে দৃষ্টিগোচর হয় সারদা কৃপা লালা, কুসুম কুমারী লালা, মনীন্দ্র চন্দ্র লালার নাম। এটা তিনজনের স্মৃতিস্তম্ভ বা স্মৃতিমন্দির বা স্মৃতিমঠ—যেটাই বলি না কেন।
চট্টগ্রাম শহরের চন্দনপুরা এলাকায় ফায়ার সার্ভিস অফিস চত্বরে একটি দ্বিতল স্থাপত্যকে কেউ কেউ জমিদার সারদা লালার নাচঘর বলেন। সত্যতা আমার জানা নেই।

আজ তাঁর নিবাস, দিঘির ঘাট, স্মৃতিফলক, সমাধি দেখা হলো। আমি কী করে বোয়ালখালীর এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি ভুলে গেলাম! পরিকল্পনা ছাড়া আমার আর্কাইভে দারুণ কিছু সংযোজিত হলো।

এই আনন্দ নিয়ে বৃষ্টি মাথায় করে পরের গন্তব্যের দিকে পা বাড়াই ।

ছবি: লেখক

প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ২০২৫, ০৬: ০০
বিজ্ঞাপন