বাংলাদেশের ঐশ্বর্য সন্ধান ২৬: রায়বাড়ির বিস্মৃত ঐতিহ্যে বেদনার প্রতিচ্ছবি
শেয়ার করুন
ফলো করুন

আমাদের একান্নবর্তী পরিবার। তবে ধীরে ধীরে লোকসংখ্যা কমছে। অন্য গ্রহে তারা ভীড় জমিয়েছেন আর আমার পুত্র রয়েছে অতলান্তিকের ওপারে। তবু ঈদ তো আসে। তাই ঈদের সকালে নামাজ শেষ করে বাড়ির পুরুষরা বাসায় ফিরলে, সালাম–কদমবুচি আর কুশল বিনিময় সেরে পরিবারের সবাই একসাথে নাস্তা করি। এরপর সকালের পারিবারিক পর্ব শেষ করে আমরা দুজন বেরিয়ে পড়ি ঢাকার অদূরে কোন না কোন ঐতিহাসিক স্থাপত্যের উদ্দেশে। কারণ বাংলাদেশে চলমান ঐতিহ্য ভ্রমণের সঙ্গে আচমকা ২০২১ সাল থেকে যুক্ত হয়েছে ঈদ ঐতিহ্য ভ্রমণ।

ভাঙা ভবনের সামনে লেখক
ভাঙা ভবনের সামনে লেখক

ফাঁকা রাজপথে ছুটে চলার মজাই আলাদা। আমার জীবনসঙ্গীর বিষয়টি ভালো লাগুক আর না লাগুক, তিনি ঈদ ঐতিহ্য ভ্রমণে সর্বদা পাশে আছেন। আমি জানি ভ্রমণকে ঘিরে আমি সেলফ অবসেসড পারসন।

বিজ্ঞাপন

এবারের গন্তব্য মুন্সীগঞ্জের শ্রীপুর উপজেলার মাইজপাড়া গ্রাম। ৭–৮ বছর আগে গিয়েছিলাম গ্রামের জমিদার বাড়িটি দেখতে। স্থানীয়দের কাছে পরিচিত ‘রায়বাড়ি’ হিসেবে। তখনই জীর্ণ অবস্থা দেখেছি। রায়বাড়ির কাছাকাছি একটি উঁচু মঠ-মন্দিরও আছে। ভাবলাম দুটো স্থাপত্য আর কতটাই বা জীর্ণ হয়েছে, বরং স্বচক্ষে দেখে আসি।
ইরান-মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধে রাজধানী জুড়ে আজ ঈদের দিন দেখছি প্রায় সব পেট্রোল পাম্প বন্ধ। ঈদের আগ থেকেই রাজধানীর পেট্রোল পাম্পগুলোতে গাড়ির লাইন দেখেছি। আমরা কিছুটা কায়দা করে তেল খরচ কম করেছি। আগ থেকেই জানি ঈদের দিন আমরা কিছুটা দূরে যাবো।

এই বাড়িটির কেবল একটি দেয়াল অবশিষ্ট রয়েছে
এই বাড়িটির কেবল একটি দেয়াল অবশিষ্ট রয়েছে

ফাঁকা ঢাকার কথা বলছিলাম, কিন্তু কি কারণে যেন, গত দুবছর ফাঁকা ঢাকার আমেজ কম পাই। বেশ নির্বিঘ্নে কম সময়ে মূল সড়ক ধরে শ্রীনগর পৌঁছাই। মুন্সীগঞ্জে জেলায় প্রবেশের মুখে পড়বে সিরাজদিখান উপজেলা, তারপরই শ্রীপুর উপজেলা।

বিজ্ঞাপন

শ্রীপুর উপজেলা বাজার থেকে সোজা একটি পথ চলে গেছে প্রায় ১৫ কিলোমিটার। শ্রীপুর উপজেলার রাঢ়ীখাল ইউনিয়নের তিনদোকান বাজারের পাশ দিয়ে একটি সরু পথ গেছে মাইজপাড়া অবধি। তিন দোকান বাজারে এসে যে কাউকেই জিজ্ঞাসা করলে রায়বাড়ি আর মঠ মন্দির দেখিয়ে দিবে।

এটা রায়বাড়ির প্রবেশ দুয়ার ছিল কিনা জানা যায় না
এটা রায়বাড়ির প্রবেশ দুয়ার ছিল কিনা জানা যায় না

সরু ইট বসানো পথের একপাশে দেখছি হিজল গাছ। পুরো মুন্সীগঞ্জ জুড়ে রয়েছে দিঘী। এই এলাকাও এর ব্যক্তিক্রম নয়। সামনে পথ আরও সরু, তাই এলাকার বাজারে আমরা বাহন রেখে হেঁটে রওনা করি রায়বাড়ির উদ্দেশে। পথিমধ্যে একজন গ্রামবাসী উৎসাহী হয়ে খানিক গল্প করেন, তারপর আমাদের সঙ্গেই আসেন রায়বাড়ি চত্বরে।

বাড়ির চত্বরে প্রবেশের আগে একটি বড় দিঘীর পাড় থেকে দেখলাম উঁচু মঠ-মন্দিরটি।
ধীরে ধীরে এগিয়ে যাই জমিদার বাড়ি চত্বরে। প্রথমে একটি আধভাঙ্গা স্থাপত্য চোখে পড়ে। এর কিছুদুর পর একটি দেয়াল। এরকম তিন–চারটি দেয়াল পার হওয়ার পর আসে ভাঙ্গা দ্বিতল একটি ভবন। দ্বিতল ভবনের সামনে কিছু নতুন ঘরবাড়ি। আমি দ্বিতল ভবনটি ধরে এগিয়ে যাই।

দেয়াল জুড়ে বটগাছের দৌরাত্ম
দেয়াল জুড়ে বটগাছের দৌরাত্ম

চারপাশ একই রকম ছাদবিহীন। দেয়ালের গায়ে বটগাছ জন্মেছে। ভবনের ভেতরে প্রবেশের সাহস পাই না। এত ঝোপঝাড়। স্থানীয় যিনি আমাদের সঙ্গে আছেন তাঁর নাম জাহাঙ্গীর মাঝি। ঘুরে ঘুরে দেখাচ্ছেন আমাদের। প্রতিটি ভবনের অবস্থা একই রকম। বেশ কয়েকটি পৃথক ভবন। কোনটিই অক্ষত নেই। কিন্তু ভবনগুলোর চারপাশে নতুন  ঘরবাড়ি তৈরি হয়েছে। ঈদের দিন বিধায় হয়তো কাউকে দেখলাম না কিংবা স্থানীয়দের বসবাস আসলেই কম।

চত্বরের চারপাশ জুড়ে বেশ কয়েকটি দিঘী রয়েছে। ভবনের সংখ্যা আমি গুণে দেখিনি। তবে এখন মনে হচ্ছে গুণে দেখা উচিত ছিল। পরের বার গেলে বিলুপ্ত ভবনগুলোর হিসাব পাওয়া যেত।

মাইজপাড়া গ্রামের পথে হিজলের গাছ
মাইজপাড়া গ্রামের পথে হিজলের গাছ

জমিদার বাড়ির চত্বর তো দেখা হলো, এখন পেছনের ইতিহাস জানাটা জরুরি। আমার প্রতিটি লেখায় সম্ভবত আমি উল্লেখ করেছি বাংলদেশের বনেদী বাড়ির তথ্যের অপ্রতুলতা সম্পর্কে। রায়বাড়ি ক্ষেত্রেও সেটা প্রযোজ্য। তারপরও যা কিছু জেনেছি, সেগুলোই শেয়ার করছি।

বাংলার তৎকালীন দেওয়ান মুর্শিদ কুলী খান ১৭২২ খ্রিস্টাব্দে ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থার বেশ পরিবর্তন সাধন করেন। তখন বিক্রমপুরকে ৮টি তালুকে বিভক্ত করে ৮ জনকে জমিদারির দায়িত্ব প্রদান করেন। গোবিন্দ প্রসাদ রায় মাইজপাড়া তালুকের দায়িত্ব পান। পরবর্তী সময়ে তাঁর উত্তরসুরী তারা প্রসাদ রায় ও বৈদ্যনাথ রায় জমিদারি এগিয়ে নিয়ে যান।

অবয়ব দেখে বঝার উপায় নেই স্থাপত্যটি কি ছিল?
অবয়ব দেখে বঝার উপায় নেই স্থাপত্যটি কি ছিল?

গ্রামের এই এলাকাটি বৃক্ষে পরিপূর্ণ। পথের পাশে একটি বকুল ফুলের গাছ রয়েছে। স্থানীয়রা বলছেন যে এটা ২০০–৩০০ বছরের পুরোনো। এবার উঁচু মঠটি দেখবার পালা। আসলে স্থানটিকে জমিদার বাড়ির সমাধিক্ষেত্র মনে হয় আমার।

তারা প্রসাদ রায় মৃত্যুবরণ করলে তাঁর চিতাস্থলে প্রায় ১৫৫ বছর আগে মাইজপাড়া মঠটি নির্মাণ করা হয়। সেখানে আসলে তিনটি মঠ রয়েছে। তারা প্রসাদ রায়ের স্মৃতিসমাধির দুই পাশে তাঁর দুই সহধর্মিনী সুধামনি দেবী ও নবদুর্গা দেবীর স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করা হয়।

রায়বাড়ির স্মৃতিমঠ
রায়বাড়ির স্মৃতিমঠ

উঁচু মঠটির আগা ভেঙে পড়েছিলো ২০১৩ সালে। কাছে গিয়ে দেখলাম ভাঙ্গা আগাটি মাটিতে পড়ে আছে। খুব খেয়াল করলে বোঝা যায় উঁচু মঠটির সামনের দেয়ালে কিছু লেখা রয়েছে। যদিও দূর থেকে খালি চোখে পড়া যায় না সেসব লেখা। আগে কিছুটা স্পস্ট ছিল এখন একেবারেই ম্রিয়মান। মঠের গায়ে লিখিত হরফ থেকে জানা যায়, ১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দে এটা তৈরি করেছিলেন রাজনারায়ণ নামে একজন নির্মাণ-কারিগর।  

তারাপ্রসাদ রায়ের মঠের নির্মাণশৈলী অত্যন্ত চমৎকার ও কারুকার্যময়। মঠের গায়ে অসংখ্য ছিদ্র রয়েছে।  খোপগুলোতে একসময়  প্রচুর পাখি বসবাস করত। মঠের চূড়ায় পর পর তামার তৈরি দুটি কলস ছিল। অনেকের ধারণা, কলসে রত্নসামগ্রী থাকতে পারে। সে কারণে দুবার চূড়ার কলস ভাঙার চেষ্টা করা হয়েছে। প্রথমবার ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে কতিপয় দুস্কৃতকারী কলস দুটিকে ভেঙে নামানোর চেষ্টা করে।

শতবর্ষী বকুল গাছ
শতবর্ষী বকুল গাছ

কিন্তু লৌহদন্ড শক্ত থাকায় কোনোভাবেই কলস তারা নিতে পারেনি। কলসের নিচের দিকের পোড়া মাটি খসে পড়ে। দ্বিতীয়বার, ২০০৮ সালের মার্চ মাসে রাতের অন্ধকারে বাঁশ ফেলে ওপরে উঠে নিচ থেকে দড়ি বেঁধে টেনে কলস দুটিকে নামিয়ে আনার চেষ্টা করা হয়েছিল কিন্তু দড়ি ছিঁড়ে যাওয়ায় সে চেষ্টাও ব্যর্থ হয়েছে। ছিঁড়ে যাওয়া দড়ির অংশটি অনেকদিন ঝুলে ছিল। ভাঙা অংশ বিশেষ ক্রমাগত বৃষ্টির পানিতে দূর্বল হয়ে পড়লে ২০১৩ সালের এক রাতে বিকট শব্দে মঠের  উপরের অংশ ভেঙে পড়ে যায়।  

স্থানীয়রা জানিয়েছেন, পরদিন থানা থেকে  পুলিশ এসে কলস দুটি নিয়ে যায়। পরে থানা থেকে জানানো হয়েছে যে, কলসে শুধুমাত্র বালুমাটি পাওয়া গেছে। এখন চূড়াবিহীন মঠটি ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছে। ভগ্ন এ মঠটিতে আগাছা জন্মে দ্রুত ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে যাচ্ছে। ইতিহাস ও ঐতিহ্যের স্মারক হিসেবে মাইজপাড়ার মঠটি সংস্কার করে সংরক্ষণ করা প্রয়োজন।

বিকেলের মাইজপাড়া; দিঘীতে প্রকৃতির প্রতিচ্ছবি
বিকেলের মাইজপাড়া; দিঘীতে প্রকৃতির প্রতিচ্ছবি

মঠ চত্বরে দিঘীর পাড়ে বাতাস বইছে। মঠ ঘিরে পাখির কলকাকলি।  বেশ লাগছে পরিবেশ। ঢাকায় ফিরতে মন চাইছে না। তবু ফিরতে তো হবেই। অল্প সময় পরেই ঢাকামুখো হই আমরা।

ছবি: লেখক

প্রকাশ: ২৭ মার্চ ২০২৬, ০৮: ১৪
বিজ্ঞাপন