
কলাকোপা ইউনিয়নের মূল সড়ক থেকে প্রাসাদোপম বাড়িটি চোখে পড়ে। রাজধানী থেকে এর দূরত্ব খুব বেশি নয়, ঘণ্টা দেড়েকের পথ। ঢাকার নবাবগঞ্জ উপজেলার কলাকোপা ইউনিয়নে ইছামতী নদীর তীরে এই জমিদারবাড়ির অবস্থান। বাড়িটির নাম ‘কোকিল প্যারি জমিদারবাড়ি’। নিওক্ল্যাসিক্যাল স্থাপত্যরীতিতে নির্মিত বাড়িটির বিশালাকার পিলারগুলোর দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকলাম। বাড়িটি বর্তমানে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। এই ভগ্নদশাতেই দ্বিতল ভবনটির নির্মাণশৈলী যারপরনাই মুগ্ধ করেছে। ১৯৫০ সালে জমিদারপ্রথা বিলুপ্ত হওয়ার পর বাড়িটি কোকিল প্যারি উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষকদের আবাসন হিসেবে ব্যবহৃত হতো।


স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, ছয়–সাতটি পরিবার এই বাড়িতে বসবাস করত। কারুকাজগুলোর মধ্যে আচমকা চোখে পড়ল কয়েকটি ভাস্কর্য। ভালো করে খেয়াল করলে বোঝা যায়, দেবী ভেনাসের ভাস্কর্য অঙ্কিত রয়েছে দেয়ালে। দেবী ভেনাস হলেন রোমান পুরাণে প্রেম, সৌন্দর্য, উর্বরতা, সমৃদ্ধি ও বিজয়ের দেবী।
আমি সব সময় তথ্যের অপ্রতুলতার সম্মুখীন হই বাংলাদেশের বনেদি বাড়িগুলোকে কেন্দ্র করে। কোকিল প্যারি জমিদারবাড়ি সম্পর্কে প্রচলিত তথ্যগুলোও বেশ জটিল ও গোলমেলে।
প্রথম প্রশ্ন হলো কোকিল প্যারি কে ছিলেন? এই প্রশ্নের যে খুব সদুত্তর পেয়েছি, তা নয়। এই জমিদারবাড়িকে ঘিরে স্থানীয় লোকজনের কাছে দুই ধরনের তথ্য পেয়েছি। আমি দুটিই তুলে ধরছি।

জানা যায়, বিক্রমপুরের ভাগ্যকুল জমিদারবাড়ির এক বংশধর কোকিল প্যারি এই জমিদারির গোড়াপত্তন করেন। প্রায় ২০০ বছর আগে যদুনাথ রায় ব্রিটিশদের কাছ থেকে জমিদারিপ্রাপ্ত হন। কোকিল প্যারি জমিদারবাড়ির নির্মাতা রাধারমণ রায়ের সঙ্গে যদুনাথ রায়ের রক্তের সম্পর্ক ছিল। যদুনাথ রায় ও রাধারমণ রায় দুজনেই ব্যবসায়ী ছিলেন। বরিশাল থেকে সুপারি, লবণ ও শাড়ি–কাপড় কিনে কলকাতা ও মুর্শিদাবাদে বিক্রি করতেন।
আর একটি তথ্যমতে, ১৮ শতকে জমিদার ব্রজেন রায় এই বাড়ি তৈরি করেন। তিনি সুদর্শন রায় হিসেবেও পরিচিত ছিলেন। নান্দনিক বাগানে ঘেরা ইট, সুরকি ও রডের ব্যবহারে নির্মিত অপরূপ নির্মাণশৈলীর জমিদারবাড়িটিকে ‘ব্রজ নিকেতন’ নাম দেওয়া হয়। কালক্রমে কোকিল পেয়ারি জমিদারবাড়ির মালিকানা প্রথমে একজন তেল ব্যবসায়ী ও পরবর্তী সময়ে একজন জজের কাছে চলে যায়। ফলে জমিদারবাড়ির ইতিহাসের সঙ্গে ‘তেলিবাড়ি’ ও ‘জজবাড়ি’ নাম দুটি যুক্ত হয়। কোকিল প্যারি জমিদারবাড়ির ৫০০ গজের মধ্যে আছে বৌদ্ধমন্দির, শ্রীলোকনাথ সাহার বাড়ি, কলাকোপা আনসার ক্যাম্প, উকিলবাড়ি, দাসবাড়ি, আদনান প্যালেস ও ইছামতী নদী।


আবার অনেকের মতে, এসব স্থাপনা কোকিল প্যারি জমিদারবাড়ির অংশ।
অসমর্থিত সূত্রমতে, কোকিল প্যারি জমিদারের ছিল পাঁচ ছেলে। জমিদার তাঁর মূল বাড়িটি ছোট ছেলেকে দিয়ে যান, আর বাকি চার ছেলের জন্য আরও চারটি বাড়ি নির্মাণ করে যান। এই বাড়িগুলোকে স্থানীয় বাসিন্দারা তেলিবাড়ি বলে চেনেন। এসব বাড়ির এমন নামকরণের ইতিহাস হলো—জমিদারের পরবর্তী সময়ে এসব বাড়ির মালিকানা জনৈক তেল ব্যবসায়ীর হাতে চলে যায়। ধারণা করছি, এই সব কটি স্থাপনা কোকিল প্যারি জমিদারবাড়ির অংশ। কেননা, তৎকালীন কোনো জমিদারবাড়ির আশপাশে অন্য কোনো ধনাঢ্য ব্যক্তির ভবন নির্মাণ সে সময় হতো না বলেই মনে হয়। কোকিল প্যারি জমিদারের এই বিশাল বাড়িগুলো পরবর্তী প্রজন্মের কারও হাত ঘুরে বিক্রি হয় কোনো এক আইনজীবীর কাছে, যাঁর মাধ্যমে আরও কিছু আইন পেশাজীবী এই বাড়িগুলো কিনে নেন। ফলে বাড়িগুলোর নামকরণ হয়েছে জজবাড়ি, উকিলবাড়ি ইত্যাদি।
কোকিল প্যারি জমিদারবাড়ির চত্বরে রয়েছে দুটি স্মৃতিমন্দির। জমিদার কোকিল প্যারি মৃত্যুবরণ করলে তাঁর ছেলে শ্রী রাধারমণ রায় পিতার স্মৃতির উদ্দেশে৵ ১৩৩৪ বঙ্গাব্দ একটি স্মৃতিমন্দির নির্মাণ করেন। পরবর্তী সময়ে মায়ের স্মৃতির উদ্দেশ্যে তিনি আরও একটি মন্দির নির্মাণ করেন। দুটি মন্দিরেই মা–বাবার ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ১৯৭১ সালে মায়ের ভাস্কর্যটি খোয়া যায়; আর বাবার ভাস্কর্যটির মাথা ভেঙে ফেলা হয়। শোনা যায়, মূর্তি দুটি ইউরোপ থেকে তৈরি করে আনা হয়েছিল।


মায়ের ভাস্কর্যটির আসন বা বেদি এখনো রয়েছে। হয়তো এই বেদির ওপরই ভাস্কর্যটি স্থাপন করা হয়েছিল। বাবার ভাস্কর্যের আসনভঙ্গির সঙ্গে গৌতম বুদ্ধের আসনভঙ্গির মিল থাকায়, অনেকে এই ভাস্কর্যকে গৌতম বুদ্ধের ভাস্কর্য মনে করতেন। এই ভাস্কর্যের গায়ে একটি চাদরের মতো কাপড়ের প্রতিকৃতি দেখতে পেলাম, সেখানে ভিন্ন লিপিতে কিছু লেখা রয়েছে হরেকৃষ্ণ। লিপির পাশাপাশি কিছু কারুকার্যও রয়েছে। বাঁ হাত একটা জপের থলির মধ্যে ঢোকানো। আসলে তুলসী মালা জপ করার সময় হাত এমন জপের থলির মধ্যে রাখা হয়। সেটাই বোঝা যাচ্ছে। এটা থেকে আন্দাজ করা যায় তিনি বৈষ্ণব ছিলেন।
কোকিল প্যারি জমিদারবাড়ির সঠিক তথ্য কখনো উদ্ঘাটিত হবে কি না, জানা নেই। আপাতত জনশ্রুতি আর স্থানীয় বাসিন্দাদের মৌখিক তথ্যই ভরসা।
ছবি: লেখক