
সূত্রাপুর জমিদারবাড়ির গল্প শুরুর আগে এলাকাটির কথা অল্প করে জেনে নিই। ঢাকার সূত্রাপুর বিখ্যাত ছিল সূত্রধরদের জন্য।

ঢাকা একসময় নৌকা আর কারুশিল্পের জন্য প্রসিদ্ধ ছিল। এসব কাঠের কাজ যাঁরা করতেন, তাঁরাই ‘সূত্রধর’ নামে পরিচিত, আমরা চলতি বাংলায় যাঁদের সুতার বলে থাকি। সেসব কারুশিল্পী পুরান ঢাকার একটি নির্দিষ্ট এলাকায় বসবাস শুরু করেন। এসব পেশাজীবীর কারণে এই এলাকার নাম হয় সূত্রাপুর।
দেশ বিভাগের আগেই সূত্রাপুরের নাম বদল হয়ে রূপলাল দাস লেন হয়। তবু এলাকাটি সূত্রাপুর নামেই এখনো পরিচিত। ঢাকার প্রাচীন মহল্লাগুলোর মধ্যে সূত্রাপুর অন্যতম।
এই সূত্রাপুরে রয়েছে একটি জমিদারবাড়ি, রেবতী মোহন দাস রোডে। হিন্দু জমিদার রেবতী মোহন দাস বাড়িটি নির্মাণ করেন। এই সেই ব্যক্তি, যিনি ওয়াল্টার রোডে বিজলিবাতি স্থাপনের জন্য টাকা দিয়েছিলেন। এ জন্য ওয়াল্টার রোডের একটি বিরাট অংশের নাম রেবতী মোহন দাসের নামানুসারে রেবতী মোহন দাস রোড বা আর এম দাস রোড রাখা হয়।
জমিদারবাড়ির গেটটি খোলা পেলাম। পাতলা লোহার একটি গেট। অবশ্য এটি জমিদারবাড়ির মূল ফটক নয়। নব্য ধ্রুপদি স্থাপত্য। অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকলাম বাড়িটির দিকে। অনেক লোকের আনাগোনা চোখে পড়ল। ধীর পায়ে বাড়ির বারান্দায় গেলাম।

জমিদারবাড়িটি পাশাপাশি দুটি আলাদা ভবনের সমন্বয়ে তৈরি। এর মধ্যে দক্ষিণ প্রান্তের ভবনটি বেশি প্রাচীন। প্রায় ৫০ ফুট উঁচু প্রবেশমুখে আছে ৩টি কোরিন্থিয়ান স্তম্ভ। এর দুই অংশে লতা-পাতামণ্ডিত অর্ধবৃত্তাকার কাঠামো এবং এর নিচে গোলাকার নকশা দেখা যায়। পুরো দালানে বিভিন্ন আয়তনের প্রায় ৩৫টি ঘর আছে। উত্তর পাশের তিনতলা ভবনটি রেবতী মোহন দাসের কোনো এক আত্মীয় নির্মাণ করেন বলে জানা যায়। এটিও ৫০ ফুট উঁচু প্রবেশমুখ এবং প্রায় সমানসংখ্যক কক্ষ আছে।
শতবর্ষী এ ভবনে ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের অর্ধশতাধিক পরিবার দীর্ঘদিন ধরেই বসবাস করছে। তাদের বসবাসের সুবিধার্থে সেখানে তৈরি করা হয়েছে টয়লেট ও রান্নাঘর। এর পাশাপাশি সেখানে ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তাদের জন্য তৈরি করা হয়েছে দ্বিতল ব্যারাক ও ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি রাখার জন্য তৈরি হয়েছে ছাউনিও। এসবের বাইরে সেখানে একটি ফায়ার সার্ভিস জাদুঘর নির্মাণেরও পরিকল্পনা চলছে বলে জেনেছি।

নাজির হোসেনের ‘কিংবদন্তির ঢাকা’ গ্রন্থ থেকে জানা যায়, ব্রিটিশ আমলের জমিদার রায় বাহাদুর সত্যেন্দ্র কুমার দাস ভবনটি নির্মাণ করেন। তাঁর বাবা রেবতী মোহন দাসের নামানুসারে ভবনটির সামনের রাস্তার নামকরণ করা হয়েছে ‘আর এম দাস রোড’।
দেশ বিভাগের সময় এই জমিদারদের বংশধরেরা বাড়িটি ত্যাগ করে চলে যান এবং শত্রুর সম্পত্তি হিসেবে বাড়িটি সরকারের অধিকারে আসে।
স্থাপনাটি ঢাকার প্রত্নস্থল হিসেবে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তালিকায় আছে। তবে অধিদপ্তরের কোনো বোর্ড চোখে পড়েনি।

ধীরে ধীরে শ্রীহীন হয়ে পড়ছে বাড়িটি। ভবনের ভেতরে–বাইরে নানা নতুন স্থাপনা তৈরি হচ্ছে। অন্যরা অনুমতিক্রমে বসবাস করতেই পারেন, কিন্তু স্থাপনার ভেতরে নতুন কিছু তৈরির বা নষ্ট করার অনুমতি কি আছে?
রেবতী ভবনটি নতুন। নির্মাণ করা হয়েছে ১৯৪২ সালে। উত্তর পাশের তিনতলা ভবনটি রেবতী মোহন দাসের কোনো এক আত্মীয় নির্মাণ করেন বলে জানা যায়। এটিও ৫০ ফুট প্রবেশমুখ এবং প্রায় সমানসংখ্যক ঘর আছে।

আর বি এস কে দাস কে ছিলেন জানতে পারিনি, তবে ফলকটি মাস ছয়েক আগে দৃষ্টিগোচর হয়। এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অনেক অবৈধ দোকান ছিল এখানে, সেগুলো সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
ছবি: লেখক