বাংলাদেশের ঐশ্বর্য সন্ধান ৩০: রোয়াইলের পথে, হারিয়ে যাওয়া জমিদারির গল্প
শেয়ার করুন
ফলো করুন

সেদিন থেমে থেমে বৃষ্টি পড়ছে। সংগত কারণেই অসহনীয় গরম। তার ওপর গণপরিবহনে ভ্রমণ। আধবেলা চলে গেল ধামরাই সদরে। ধামরাই সদর থেকে সুতিপাড়া বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে নামলাম। মূল সড়কের মোড়েই রয়েছে একটি বটগাছ। বটগাছ ধরে এগুলে সরু পথ। পথের পাশেই কয়েকটি দোকান। এখান থেকে অটোরিকশায় চেপে রোয়াইল যেতে হবে।

ছাদবিহীন দেয়াল
ছাদবিহীন দেয়াল

দোকানে জিজ্ঞেস করতেই বলল রোয়াইল জমিদারবাড়ি চিনি না। অতঃপর বললাম রোয়াইল বাজার যাব। এখান থেকে সরাসরি রোয়াইল বাজার যাওয়ার ব্যবস্থা নেই। ভেঙে ভেঙে যেতে হবে। অটোরিকশা সিরিয়াল ধরতে হবে। অটোরিকশায় বসতেই আকাশ ভেঙে এল। এক হাত দূরের কিছু দেখা যাচ্ছে না। মিনিট বিশেক অপেক্ষা করার পর বৃষ্টির তেজ কিছুটা কমল। অটোরিকশা চলতে শুরু করল।

বিজ্ঞাপন

ঢাকার এত কাছে এত নিভৃত পল্লি। কদাচিৎ বাড়িঘর দেখা যাচ্ছে। তবে ইটের ভাটার কমতি নেই। একটি সরু খাল এল, খালের পানি কালো। বুঝলাম কোনো ফ্যাক্টরি কিংবা ইটের ভাটার বর্জ্য হবে। পথে লালমাটির কাদা। মনে হচ্ছে পাহাড়ি অঞ্চলের মাটির ঢল। ট্রাক চলাচলের জন্য এ রকম হয়েছে। এই সরু পথ কি ট্রাকের জন্য তৈরি হয়েছে! আমি প্রশ্ন করি নিজেকে। এই দেশে কি ভাবনাচিন্তা করে কোনো নাগরিক স্থাপত্য কিংবা পথ নির্মাণ হয় কিংবা তার ব্যবহার। মাঝে মাঝেই পথ এবড়োখেবড়ো। তবে

বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ আর আষাঢ় মাসের সবুজ গাছপালা দেখতে মন্দ লাগছে না।
অটোরিকশা বদল করে আমরা এলাম রোয়াইল বাজার। ছোট্ট একটি বাজার। লোকসমাগমও কম। চার রাস্তার মোড়ে একটি বটগাছ। বটগাছ ধরে এগোলে একটি মন্দির। মন্দিরের পাশেই প্রাথমিক বিদ্যালয়। আমাদের দেখে কিছু আগ্রহী লোক জানতে চাইলেন কোথা হতে এসেছি, কেন এসেছি। একজন নিজের পরিচয় দিলেন মন্দির কমিটির সভাপতি কিরণ প্রসাদ বাউল। তিনি জানালেন, এই শিবমন্দিরটি রোয়াইল জমিদারবাড়ির। আমারও দেখে সে রকম মনে হলো।

বিজ্ঞাপন

মন্দিরের ভেতরে প্রবেশ করলাম। কালো পাথরের একটি ফলক দেখতে পেলাম। সংস্কৃত ভাষায় লেখা রয়েছে মন্দিরের প্রতিষ্ঠাকাল। পাশে বাংলায়ও লেখা রয়েছে। স্থানীয় লোকজন জানালেন মন্দির সংস্কার করার সময় বাংলায় লেখা হয়েছে ১২১৬ সাল। তার অর্থ দাঁড়ায় এই মন্দিরের বয়স দুই শ বছরের বেশি।

২০০ বছরের পুরোনো শিবমন্দির
২০০ বছরের পুরোনো শিবমন্দির
মন্দিরের শিবলিঙ্গ
মন্দিরের শিবলিঙ্গ

কিরণ প্রসাদ বাউল জানালেন জমিদারবাড়ির অধিকাংশ ভবন নষ্ট হয়ে গেছে। এখন পরিত্যক্ত। মন্দির থেকে বেরিয়ে তিনি নিয়ে গেলেন খানিকটা ভেতরের দিকে। সামনে একটি মাধ্যমিক স্কুল। সামনে বিশাল মাঠ। স্কুল চত্বরে প্রবেশ করতে করতে কিরণ প্রসাদ জানালেন আগে এখানে একটি বড় কারুকাজ করা গেট ছিল। এখন পুরোপুরি বিলুপ্ত।

স্কুল মাঠের সামনেও একটি মন্দির ছিল। এখন গড়ের মাঠ। ইট ভেঙে রাখা হয়েছে একটি ভবনের সামনে। এই দুটি ভবন টিকে রয়েছে জমিদারবাড়ির। ১৯৯৬ সালে জমিদারবাড়িতে কলেজ স্থাপন করা হয়েছিল। কলেজের কার্যক্রম বন্ধ। ইটগুলো পেরিয়ে ভেতরে গেলে পুরোনো বাড়ির আদল পাওয়া যায়। আমি প্রথমে যে ভবন দেখলাম, সেই ভবনের ছাদ নেই।

জমিদার বাড়িতে স্থাপিত কলেজ
জমিদার বাড়িতে স্থাপিত কলেজ

কিন্তু পাশের ভবনটির ছাদ রয়েছে। ক্লাসরুমের আদলে বড় জানালা ইট গাঁথুনি দিয়ে জানালা ছোট করা হয়েছিল একসময়, দেখে সেটা বোঝা যাচ্ছে। দরজাগুলোও তেমনি। পুরো চত্বরে ঝোপঝাড়। টিপ টিপ করে বৃষ্টি পড়ছে; কিছুটা ভয়ও লাগছে ভেতরে যেতে। বিষাক্ত পোকামাকড় বা সাপের ভয় আরকি! তারপরও খানিক ভেতরে গেলাম।

জমিদারি ভবন চত্বর দেখে বাজারে গেলাম। কথা বললাম কিরণ প্রসাদের সঙ্গে। জানতে চাইলাম জমিদারির প্রতিষ্ঠাতার নাম। তিনি কয়েকটি কাগজ বের দেখালেন। সেখানে লেখা রয়েছে ভারত সম্রাট। আমার যত দূর মনে হয়, ভারত সম্রাট কারও উপাধি এটি প্রকৃত নাম নয়।

জঙ্গলে ঢাকা জমিদার বাড়ির সামনে লেখক
জঙ্গলে ঢাকা জমিদার বাড়ির সামনে লেখক

কিরণ প্রসাদ সিএস জরিপ ও এএস জরিপের কাগজ সংগ্রহ করেছেন। আরও কয়েকটি নাম সামনে এল। কিন্তু পেছনের ইতিহাসটা বোঝা গেল না। সুভেন্দ্র মোহন রায়, সচিন্দ্র মোহন রায় ও তাদের পিতার নাম নিরোধ মোহন রায়। ক্ষীরোদ মোহন রায়, হিরেন্দ্র মোহন রায়, সুরেন্দ্র মোহন রায়, দেবেন্দ্র মোহন রায় ও দুর্গাবতী দেবী। তাঁরা সবাই হয়তো এই পরিবারের উত্তরসূরি।

ইতিহাসের খুব কাছাকাছি হয়তো যেতে পারিনি। তবে স্থানীয়দের আতিথেয়তা ভালো লেগেছে। কিরণ প্রসাদ তাঁর সাধ্যমতো চেষ্টা করেছেন তথ্য দেওয়ার।

ধামরাই অঞ্চল থেকে রোয়াইল বাজার কিছুটা জটিল পথ। স্থানীয় লোকজন জানিয়েছেন, সাভার কাঁচাবাজার ধরে এলে পথ সোজা ও কম সময় লাগে। ফেরার পথে সাভার হয়ে এলাম। বাজার থেকে পরিচিত এক অটোরিকশাকে কিরণ প্রসাদ বলে দিলেন আমাদের কাঁচাবাজার পর্যন্ত নামিয়ে দিতে। রোয়াইল বাজার থেকে ৪০ মিনিটের মতো সময় লাগল।

সেখান থেকে আমাদের পরবর্তী গন্তব্য রাজা হরিশ্চন্দ্রের ভিটা।

ছবি: লেখক

প্রকাশ: ২৬ জুন ২০২৬, ০৬: ০০
বিজ্ঞাপন