
'আজি হতে শতবর্ষ পরে
কে তুমি পড়িছ বসি আমার কবিতাখানি
কৌতূহলভরে
আজি হতে শতবর্ষ পরে'।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিশ্বসাহিত্যের এমন এক ব্যক্তিত্ব, যাঁর চর্চা চলবে যুগ থেকে যুগান্তরে, আর শতাব্দীর পর শতাব্দী ভরে। আজ পঁচিশে বৈশাখ কবিগুরুর ১৬৩তম জন্মজয়ন্তীতে বাংলাদেশে অবস্থিত তাঁর স্মৃতিবিজড়িত কিছু স্থানের সন্ধান রইল। ইচ্ছা হলেই রবীন্দ্রপ্রেমীরা ঘুরে আসতে পারেন এসব স্থানে।

পতিসর কাছারিবাড়ি
এই জায়গাটি নওগাঁ জেলার আত্রাই উপজেলায় অবস্থিত বাংলাদেশের অন্যতম একটি সংরক্ষিত পুরাকীর্তি ও বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিবিজড়িত স্থান। এটি পতিসর গ্রাম নাগর নদীর তীরে অবস্থিত। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দাদা ও জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারের অন্যতম প্রধান সদস্য দ্বারকানাথ ঠাকুর এখানকার জমিদারি ১৮৩০ সালে কেনেন। এরপর ১৮৯০ সালে রবীন্দ্রনাথ জমিদারি দেখাশোনার জন্য এ অঞ্চলে আসেন। এই কাছারিতে অবস্থানকালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বেশ কিছু কাব্য, গল্প ও প্রবন্ধ রচনা করেন। এই স্থানটির চারপাশেই রবি ঠাকুরের পরিবারের উদ্যোগে তৈরি বেশ কিছু স্থাপনা রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো কালীগ্রাম রথীন্দ্রনাথ ইনস্টিটিউশন, দাতব্য হাসপাতাল ও পুরোনো একটি কৃষি ব্যাংক। পতিসর কাছারিবাড়িতে থাকাকালীন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘গোরা’ ও ‘ঘরে বাইরে’ উপন্যাস আর ‘বিদায় অভিশাপ’ কাব্য রচনা করেন।
সিরাজগঞ্জের কাছারিবাড়ি
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পৈতৃক জমিদারবাড়ি ছিল এখানে । ১৮৪২ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দাদা প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর ইংরেজদের কাছ থেকে প্রথম বাড়িটি কিনেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৮৯০ সালে প্রথম শাহজাদপুরের এই কুঠিবাড়িতে আসেন এবং এখানেই রচনা করেন তাঁর অনেক বিখ্যাত সাহিত্যকর্ম। দ্বারকানাথ ঠাকুর ১৮০৭ সালে এ অঞ্চলের জমিদারি পান। তিনি নিজে এখানে জমিদারি করতেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে ১৮৮৯ সালের দিকে কবিগুরু এখানে জমিদার হয়ে আসেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এখানে বসেই রচনা করেন তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘সোনার তরী’, ‘বৈষ্ণব কবিতা’, ‘দুইপাখি’, ‘আকাশের চাঁদ’, ‘পুরস্কার’, ‘হৃদয়’, ‘যমুনা’, ‘চিত্রা’, ‘চৈতালী’। এ ছাড়া ‘গীতাঞ্জলি’ কাব্যের কাজ শুরু করেন তিনি এখান থেকে। ‘পোস্টমাস্টার’ গল্পের ‘রতন’ চরিত্রও শাহজাদপুরে বসেই লেখা। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর সরকার এই কুঠিবাড়িটির গুরুত্ব অনুধাবন করেন। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিভিন্ন শিল্পকর্ম নিয়ে এটি একটি জাদুঘর হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়।


কুষ্টিয়ার শিলাইদহ কুঠিবাড়ি
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কুঠিবাড়ি বাংলাদেশের অন্যতম এক দর্শনীয় স্থান। এটি কুষ্টিয়া থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরে কুমারখালী উপজেলার শিলাইদহ ইউনিয়নে অবস্থিত। কুষ্টিয়ার চৌড়হাস থেকে জনপ্রতি ৫০ টাকা অটোরিকশায় যাওয়া যায়। বাগান, পুকুর ও কুঠিবাড়ির মূল ভবনসহ এর আয়তন ৩৩ বিঘা। আর মূল ভবনটি দাঁড়িয়ে আছে আড়াই বিঘার ওপর। ছোট-বড় সব মিলিয়ে এতে মোট কক্ষ রয়েছে ১৮টি। অত্যন্ত মনোরম কায়দায় সাজানো এই কুঠিবাড়ি। জমিদারি দেখাশোনা করতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রায় এক দশক অনিয়মিতভাবে এখানে অবস্থান করেছেন। রবীন্দ্রনাথের ব্যবহার্য অনেক জিনিসপত্রই রয়েছে এখানে।
দক্ষিণডিহিতে মৃণালিনী দেবীর বাড়ি
খুলনা জেলার ফুলতলা থানার দক্ষিণডিহির সঙ্গে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। এই গ্রামেই জন্মেছিলেন কবিপত্নী মৃণালিনী দেবী। ১৮৮৩ সালের ৯ ডিসেম্বর কবি রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ভবতারিণীর বিয়ে সম্পন্ন হয় কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে। বিয়ের পর কবির নামের সঙ্গে মিলিয়ে ভবতারিণীর নাম রাখা হয় মৃণালিনী। একাধিক ঐতিহাসিক সূত্রে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর দক্ষিণডিহিতে বিয়ের কন্যা দেখা উপলক্ষে গিয়েছিলেন বলে বলা হয়েছে। ইন্দিরা দেবী লিখেছেন, পূর্ব প্রথানুসারে রবি কাকার কনে খুঁজতে তার বউ ঠাকুরানীরা, মা আর নতুন কাকিমা, জ্যোতি কাকা মশায় আর রবি কাকাকে সঙ্গে বেঁধে নিয়ে যশোর যাত্রা করলেন। আমরা দুই ভাইবোনও সে যাত্রায় বাদ পড়িনি। জোড়াসাঁকোয় জন্মগ্রহণ করলেও তাঁর পূর্বপুরুষেরা ছিলেন ওই অঞ্চলেরই মানুষ। দক্ষিণডিহি থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার গেলেই কবির পূর্বপুরুষের জন্মভিটা দেখতে পাওয়া যাবে খুলনা জেলার রূপসার পিঠাভোগ গ্রামে।

মাছিমপুরের রবীন্দ্র ভাস্কর্য
এখানে নির্মাণ করা রয়েছে রবীন্দ্রনাথের আবক্ষ মূর্তি। ১৯১৯ সালে এখানে এসেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তারিখটা ছিল ৬ নভেম্বর। উদ্দেশ্য ছিল মণিপুরী সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়া। এখানে এসেই এই নৃগোষ্ঠীর সংস্কৃতির সবচেয়ে শৈল্পিক প্রকাশ মণিপুরী নৃত্য প্রথম দেখেন কবিগুরু। বলা হয়ে থাকে, এর পর থেকেই মণিপুরী নাচ ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বময়। সিলেট নগরের ভেতরে সুরমা নদীতীরবর্তী ছোট্ট একটি পাড়া। ১৯১৯ সালে অবকাশ যাপনের জন্য অবিভক্ত ভারতের আসাম রাজ্যের তৎকালীন রাজধানী শিলংয়ে এসেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। সেখানে অবস্থানকালে শ্রীহট্ট ব্রাহ্মসমাজের পক্ষ থেকে তাঁকে সিলেট সফরের আমন্ত্রণ জানানো হয়।


৫ নভেম্বর সকালে সুরমা নদীর চাঁদনী ঘাটে শঙ্খধ্বনি বাজিয়ে শোভাযাত্রাসহ সিলেটে স্বাগত জানানো হয় কবিকে। সিলেটে তিন দিন অবস্থান করেন কবি। ভ্রমণকালে এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে মুগ্ধ হয়ে সিলেটকে নিয়ে একটি কবিতাও লিখেন রবীন্দ্রনাথ। সে সময় বাংলা থেকে বিচ্ছিন্ন করে সিলেটকে আসামের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছিল। এ নিয়ে আক্ষেপও ফুটে ওঠে রবীন্দ্রনাথের কবিতায়। সিলেটে ভ্রমণকালে ৬ নভেম্বর টাউন হল প্রাঙ্গণে ও ৭ নভেম্বর মুরারিচাঁদ (এমসি) কলেজের ছাত্রাবাসের উদ্যোগে কবিকে সংবর্ধনা প্রদান করা হয়। ৬ নভেম্বর তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় নগরের মাছিমপুর মণিপুরী পাড়ায়। সেখানকার বাসিন্দারা বর্ণাঢ্য আয়োজনে বরণ করেন কবিগুরুকে, মাত্র ছয় বছর আগে যিনি উপমহাদেশের প্রথম ব্যক্তি হিসেবে নোবেল জয় করেছেন। কবির সম্মানে আয়োজন করা হয় মণিপুরী নৃত্যের। রবীন্দ্রনাথের ‘চিত্রাঙ্গদা’, ‘চণ্ডালিকা’, ‘মায়ার খেলা’, ‘নটীর পূজা’, ‘শাপমোচন’ নৃত্যনাট্যে মণিপুরী নৃত্যের সুর ও তাল অনুসরণ করা হয়েছে। বলা হয়ে থাকে, মণ্ডপ প্রাঙ্গণ থেকে মণিপুরী নৃত্যকে সর্বজনীন করে তোলেন রবীন্দ্রনাথ।