জুরিখ থেকে প্যারিস
শেয়ার করুন
ফলো করুন
বিজ্ঞাপন

আমি তখন জুরিখের বহিরাগত অংশে, মূল শহরে প্রবেশ করছি। সিগন্যাল পড়েছে, মাথা ঘুরিয়ে আশপাশ দেখে নিলাম। এটা অন্যান্য ইউরোপিয়ান শহরের মতোই  দেখতে। কিন্তু মূল শহরে ঢুকতেই আমার ধারণা পাল্টে গেল।

পাথর বিছানো সরু পথগুলোতে মানুষের কোলাহলে সরগরম। ট্রাম-বাসগুলো কাজ শেষে ঘরে ফেরা মানুষদের গন্তব্যে নিয়ে যাচ্ছে। রাস্তায় এক অজানা শিল্পী কী যেন সুর তুলছেন, যা পড়ন্ত বিকেলটাকে মোহনীয় করে তুলেছে। আশপাশে জটলা পাকিয়ে একদল মানুষ একাগ্রচিত্তে তা শুনছে।

রাস্তার ধারের বাড়িগুলো বেশ বিচিত্র। একই রকম দেখতে প্রতিটি বাড়ি কিন্তু প্রতিটি ভিন্ন রঙে রাঙা। তার পাশে একটি পুরোনো গির্জা মাথা উঁচু করে যেন আন্দাজ করছে সন্ধ্যা কত দূরে।

বিজ্ঞাপন

লক্ষ করলাম, শহরের কেন্দ্রস্থলের রাস্তাগুলো বিভিন্ন ব্র্যান্ডের বিভিন্ন পণ্যের দোকানে ভর্তি। সেখানে অজস্র মানুষের ভিড়। কেনাকাটা করাটা শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেছে এই শহরের মানুষ। আপনি সুইজারল্যান্ড যাওয়ার জন্য পরিকল্পনা করলে অবশ্যই আপনার লাগেজে অতিরিক্ত জায়গা রাখতে ভুলবেন না, যাতে আপনি সর্বোত্তম স্টাইলিশ জামাকাপড়, অনুষঙ্গ, পারফিউম এবং চকলেট বাছাই করতে পারেন।
প্রায় এক ঘণ্টা মূল শহরের এ–প্রান্ত থেকে ও–প্রান্ত ঘুরে এবার বাসেল শহরের দিকে রওনা দিলাম।

জুরিখ শহরে ঢোকার আগে নাম না জানা এক রাস্তায়
জুরিখ শহরে ঢোকার আগে নাম না জানা এক রাস্তায়
ছবি: লেখক

জুরিখ থেকে বাসেলের দূরত্ব প্রায় ১০০ কিলোমিটার। এবারও, হুট করেই সিদ্ধান্ত নিয়েছি দিনের আলো থাকতে থাকতে আরও সামনে এগোনোর।
আমি আগে থেকে কোনো হোটেল বুক করিনি। বাসেলে ঢোকার আগে একটি পেট্রলপাম্পের কাছে ক্যাফেতে বসে বুকিংডটকম আর এয়ার বিএনবি রাতে থাকার জায়গা খুঁজতে থাকি।

মাত্র ১০ মিনিট লাগল হোটেল বাছাই করতে। বাসেল সিটি সেন্টারে ১১৮ ইউরো, মন্দ না!

আমি যখন বাসেলে পৌঁছাই, দিনের আলো তখন প্রায় মরে এসেছে। হোটেল খুঁজতে তেমন বেগ পেতে হলো না ।

আমার কামরাটা সাততালায়। তেমন বড় না। কিন্তু পরিষ্কার–পরিছন্ন। গোসল সেরে ফ্রেশ হয়ে নিলাম। সারা দিন ভারী জ্যাকেট আর গিয়ার পরেছিলাম। টি-শার্টে এখন বেশ হালকা আর চনমনে লাগছে।

ঠান্ডা খুব বেশি না, কিন্তু বেশ বাতাস আছে। উইন্ডস্টপার জ্যাকেটটা তাই পরে নিলাম। আমার রুম থেকে নেমে শহরের কেন্দ্রস্থলের দিকে হাঁটতে শুরু করলাম।

হোটেলের জানালা দিয়ে রাতের বাসেল
হোটেলের জানালা দিয়ে রাতের বাসেল
ছবি: লেখক

ইস্টারের ছুটি শুরু হয়েছে। প্রায় সব দোকানপাট বন্ধ। রাস্তায় মানুষজন প্রায় নেই বললেই চলে। অনেকটা ভুতুড়ে লাগছে শহরটাকে। এ তো জুরিখের পুরো বিপরীত! কিছু রেস্টুরেন্ট খোলা। ভেতর থেকে কাচের প্লেট আর চামচের ঠুনঠান শব্দ আসছে। শহরটিতে প্রায় এক ঘণ্টার মতো হাঁটলাম। বাসেল ট্রেনস্টেশনের সামনে একটি চিকেন অ্যান্ড চিপসের দোকানের সামনে দেখলাম উঠতি বয়সের ছেলেপেলেদের ভিড়।

খাবারের সময় হয়ে গেছে ততক্ষণে। তাই আমিও লাইনে দাঁড়িয়ে গেলাম। ১৫ মিনিট অপেক্ষা করে অটোমেটিক মেশিনে খাবার অর্ডার করলাম। খাবার আসতে আরও ১৫ মিনিট লাগল। বেশ করে খেয়েদেয়ে হোটেলের দিকে রওনা দিলাম।

ফিরতি পথে বুঝতে পারলাম যে আমি কতটুকু ক্লান্ত। দেরি না করে ঘুমোতে গেলাম, খুব ভোরে রওনা দিতে হবে!

বাসেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ
বাসেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ
ছবি: লেখক

ভোরের আলো সবে ফুটছে, রাস্তাঘাট সুনসান, কিছু মানুষ ভোরে জগিং করতে বেরিয়েছে। আল্লাহর নাম নিয়ে বাইকটা স্টার্ট দিলাম। ম্যাপে ডেস্টিনেশন দিয়ে রেখেছি কালিয়াস (ফ্রান্স)।

অদ্ভুত সুন্দর গোলাপি সকালটা। কিছু দূর যাওয়ার পর বুঝলাম কী ভুলটা করেছি!
শীত তো কোথাও নেই, বসন্তকালের সকাল বেলায় যাঁরা সুইজারল্যান্ডে স্কুটার অথবা মোটরবাইক চালিয়েছেন, তাঁরা জানেন যে সকালের কনকনে ঠান্ডা বাতাস কতটা বিরক্তিকর। সকালের এই বাতাস আমার খুবই অপছন্দের। বাইকটা থামিয়ে ভাবছি কী করা যায়। একবার এক বন্ধু বলেছিল যে জ্যাকেটের নিচে কাগজ ঢুকিয়ে নিলে নাকি বুকে কোনো বাতাস লাগে না। কিন্তু এখন কাগজ কোথায় পাব?

কাগজ নেই, কিন্তু রেইনকোট তো আছে! আমি এবার বুদ্ধি করে জ্যাকেটের ওপর রেইনকোট পরে নিলাম। ভালোই হলো সিদ্ধান্তটা, বাতাসটা আসলেই অনেক কম লাগছে। হাসিমুখে নিজের পিঠে একটা অদৃশ্য চাপড় দিলাম।

সামনে মাইলের পর মাইল পাড়ি দিতে হবে। আজকের মধ্যেই কালিয়াস যাব, সেখান থেকে ইউরো টানেল হয়ে যুক্তরাজ্যে ঢোকার পরিকল্পনা। আজকের রাতটা ফ্লক্সটন অথবা ডোভারে কাটাব। এক ঘণ্টার কিছু বেশি হলো চলছি, তেল নেওয়ার জন্য এখনো কোনো বিরতি নিইনি। আশা করছি সামনে একটা তেলের পাম্প পাব।

সন্ধ্যার বাসেল
সন্ধ্যার বাসেল
ছবি: লেখক

অনেকটা অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে হঠাৎ ফ্রান্সের সীমান্ত দেখতে পেলাম। গতি কমালাম। দেখলাম বর্ডার পুলিশ, আমি থামার জন্য প্রস্তুতি নিলাম। কিন্তু কেউ থামতে বলল না। কোনো চেক ছাড়াই আমি ফ্রান্সে ঢুকে গেলাম। জীবনে প্রথমবার ফ্রান্স এসেছি, তা–ও নিজের মোটরবাইকে। খুব খুশি লাগছে। আমার খুশি দেখে মাথার ওপর সূর্য যেন ফিক করে হেসে উঠল। খুব সকাল সকাল বের হওয়ার সুবাদে বেশ খানিকটা পথ পার করে ফেলেছি ইতিমধ্যে। রাস্তাগুলো বেশ প্রশস্ত, দীর্ঘ সময় স্পিড ডিসিপ্লিনে ছিলাম সুইজারল্যান্ডে, এবার একটু স্পিড তোলা যায়। স্পিড তুলে বেশ মজা পাচ্ছিলাম।

এরই মধ্যে বাজপাখির চোখ দিয়ে হাইওয়ের ওপরের দিকে সাইনবোর্ডের দিকে নজর রাখছিলাম। গুগল ম্যাপ খুব ভালো কাজ করে, কিন্তু সব সময় বিশ্বাস করতে নেই। তাই নিজের ইন্দ্রিয় ব্যবহার করে এগোচ্ছি যতটুকু সম্ভব।

বেশ কিছুক্ষণ ধরে একটা সাইনবোর্ড চেষ্টা করছে নজর কাড়ার, কিন্তু চেষ্টা করছি পাত্তা না দেওয়ার।

অনেকটা আকাশের রং ধারণ করে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা একটি গির্জা
অনেকটা আকাশের রং ধারণ করে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা একটি গির্জা
ছবি: লেখক

কিন্তু সাইনবোর্ডে তো লেখা ‘প্যারিস ৫৫৭ কিলোমিটার’! আমি কিছুক্ষণের মধ্যেই চেষ্টা করা বন্ধ করে দিলাম। প্যারিসের এত কাছে এসে যদি ক্যালিয়াস চলে যাই তাহলে কেমন দেখায়! ত্বরিত সিদ্ধান্ত নিলাম যে আজকের রাতটা প্যারিসেই থাকব।
সকালে বের হওয়ার সময় প্যারিসে যাওয়ার কথা আমার মাথায় আসেনি। যাহোক, আবার তেল নেওয়ার জন্য থামলাম। বেশ গরম লাগছে, তাই রেইনকোট খুলে ফেলেছি। ‘শ্রাবণধারায় এত চেনা কি খুঁজে পাও, যা আমার মাঝে নেই একবিন্দু পরিমাণও’—এনকরের গানটা লুপে দিয়ে ফ্রান্সের পথে বুক চিতিয়ে একের পর এক গাড়িকে পেছনে ফেলে প্যারিসকে ছুঁতে দিতে ছুটে চলেছি। মাঝেমধ্যে কিছু উইন্ডমিল দেখি, থামি, জিরাই, ঘাসে লুটিয়ে বিশ্রাম নিই, বাসায় কথা বলি, দেশের বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলি।

বিকেলের শুরুতে প্যারিসের মুখে এসে পৌঁছাই। সারা দিন বাইক চালিয়েছি, বেশ ক্লান্ত লাগছে। প্যারিস শহর তখনো প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূরে। আমি ম্যাপে দেখছি যে এই ৭০ কিলোমিটার যেতে আরও ৯০ মিনিটের মতো লাগবে, আমার গতিবেগ এখন ঘণ্টায় ১৪০ কিলোমিটার হলে। হিসাব মিলছে না, কোনো সমস্যা আছে, কোনো কারণে গুগল ম্যাপ সময়টা সঠিকভাবে অনুমান করতে পারছে না। আমি হাইওয়ে থেকে বের হয়ে এখন টোলমুক্ত রাস্তায় ঢুকব, যেখানে স্পিড লিমিট বেশ কম।

হাইওয়ে থেকে বের হওয়া মাত্র হাত ওপরে তুলে উদ্‌যাপন করতে লাগলাম, মনে হচ্ছিল যেন সারা দিন বোলিং করে টেস্ট ম্যাচের শেষ বিকেলে আমি দ্য ওয়াল রাহুল দ্রাবিড়ের উইকেটে।

সুইটজারল্যান্ড- ফ্রান্স বর্ডার
সুইটজারল্যান্ড- ফ্রান্স বর্ডার
ছবি: লেখক

আশপাশের গাড়ির আরোহীরা হয়তো ভাবছে করে কী এই ছেলে? যাক তাদের ভাবনা চুলোয়!

কী প্রশান্তি লাগছে বোঝাতে পারব না। দিনের আরেকটি ভালো সিদ্ধান্ত ছিল এটা। উদ্‌যাপন শেষ করে মাপে তাকালাম, নাহ মাপে কোনো সমস্যা আছে! স্পিড কিছুটা কম হলো ১২০-২৫–এর আশপাশে; সে হিসাবে প্যারিস পৌঁছাতে বেশিক্ষণ লাগার কথা নয়। কিন্তু এখনো প্রায় এক ঘণ্টার ওপরে দেখাচ্ছে কেন? ঘটনাটা বুঝলাম কিছুক্ষণ পর। রাস্তায় আস্তে আস্তে গাড়ির সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে, কিছু দূর যেতেই দেখি যানজট শুরু হলো। রোববার হঠাৎ নিজেকে আবিষ্কার করলাম হাজার হাজার গাড়ির পেছনে। প্রশংসা আপাতত করতেই হয় তার অ্যাকুরেসির জন্য। এমনিতেই আমি বেশ ক্লান্ত, তার ওপর মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হলো প্যারিসে ঢোকার অনেক ধীরগতি।

সামনে হয়তো কোনো অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে। ১৫-২০ কিলোমিটার গতিতে গাড়ি চালাচ্ছি আর ভাবনার মেঘগুলো পর্যালোচনা করছি। আমি ধীরগতিতে সামনে এগোচ্ছি, নতুন কোনো শহর সামনে, তাই বোঝার চেষ্টা করছি এই শহরের মানুষের ড্রাইভিং মাইন্ডসেট দেখে। হঠাৎ দেখি একটি মোটরসাইকেল জিগজ্যাগ করে শাঁই করে ছুটে গেল, তার পেছনে আরও ছয়–সাতটি। সব কটিরই নম্বর প্লেট ফ্রান্সের।

সীমান্ত পেরিয়ে ফ্রান্সের হাইওয়েতে
সীমান্ত পেরিয়ে ফ্রান্সের হাইওয়েতে
ছবি: লেখক

এই সুযোগ হাতছাড়া করা যায় না। ‘হোয়েন ইউ রাইড ইন ফ্রান্স রাইড লাইক আ ফ্রেঞ্চ’—এই ফিলোসফি নিয়ে আমি জিগজাগ করতে করতে তাদের পিছু নিলাম। যার ফল বেশ দ্রুত প্যারিস পৌঁছালাম। যাক গুগল ম্যাপকে ফাঁকি দিতে পেরেছি।
প্যারিস পৌঁছানোর প্রায় তিন ঘণ্টা বাকি থাকতেই ফোন দিয়েছিলাম বাপ্পি ভাইকে। বাপ্পি ভাই বেশ কিছুদিন হলো প্যারিসে থাকেন। প্যারিসে এসেই সোজা তাঁর রেস্টুরেন্টে।

কিছুক্ষণ কুশলাদি বিনিময় করে, খেয়েদেয়ে রওনা দিলাম আমার হোটেলের দিকে। প্যারিসে তখন শেষ বিকেলের ভয়ানক যানজট। আর্ক দ্য ট্রায়মফের সামনের রাস্তাকে তো মনে হলো রিকশা ছাড়া মতিঝিল। আমিও পুরান ঢাকা স্টাইলে বাইক চালাতে লাগলাম। যেখানে যেমন আরকি! হোটেলে এসে গোসল সারলাম। ফ্রেশ হয়ে পাঁচতলার ওপর থেকে নিচে রাস্তায় তাকাচ্ছি। বিকেলের আলো শেষ হতে এখনো অনেক বাকি। ফেসবুকে পোস্ট দিতে বসলাম, যাক ভালোভাবে আমি প্যারিস এসে পড়েছি।

আজ তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে যাব, সকালে উঠে ঠিক করব কীভাবে কী দেখব। চোখ বন্ধ করে ঘুমানোর চেষ্টা করছি, এমন সময় ফোন বেজে উঠল। রাহুল?
আমি: বন্ধু কী অবস্থা?
রাহুল: আমাদের মধ্যে এত দূরত্ব কখন হলো যে তুই প্যারিস আসলি আর আমাকে জানালি না?
আমি: দোস্ত মনে ছিল না একদম, এখানে আসার প্ল্যান আজ সকাল পর্যন্তও ছিল না।

রাহুল: ওকে, কোথায় আছিস? ঠিকানা দে, আসছি।
আমি: বন্ধু আমি অনেক ক্লান্ত, আগামীকাল সকালে একটা হেলমেট নিয়ে আয়, আমি তোকে ঠিকানা পাঠাচ্ছি।
রাতে ভালোই ঘুম হলো, বিছানাটা ব্যাসেলের হোটেলের চেয়ে বেশ ভালো। এই চিন্তা করে ছোট্ট হাসি দিয়ে দিন শুরু হলো।

প্রকাশ: ০৪ জুন ২০২২, ০৭: ১২
বিজ্ঞাপন