
প্রায় বছর দশেক আগের কথা। আমাদের তখন ঝড়ের মেঘে তড়িৎ হওয়ার সময়। মাসের শেষে পকেটের তলানিতে পড়ে থাকত কয়েকটা পাউন্ড আর ঝড়ের কবলে পড়া জাহাজের নাবিকের চোখে দেখা লাইটহাউসের টিমটিমে হ্যাজাকের মতো কিছু স্বপ্ন। মাঝেমধ্যেই সেই স্বপ্নের সলতেগুলো ক্যামেরার আউট অব ফোকাসের মতো ঝাপসা হয়ে উঠত নানান বিপত্তিতে। কিন্তু অট্টহাস্যে আকাশ ফেলে, ভোলানাথের ঝুলি ঝেড়ে আমরা আবারও দক্ষ নাবিকের মতো কম্পাসে গন্তব্যটা ঠিক করে নিতাম।

মাসের শেষের সেই অবশিষ্ট পয়সাগুলো হয়তো যোগ হতে পারত সঞ্চয়ী হিসাবে। কিন্তু গণিতের ছাত্র হয়েও আমার হিসাবের খাতা বরাবরই বড্ড বিমূর্ত। তাই যোগের চেয়ে বিয়োগের পাল্লাই ভারী থাকত। বিনিময়ে আমরা তখন খুচরো আনন্দ কিনতাম। এখন যখন ফিরে দেখি ১০ বছরের পুরোনো দিনগুলো, মনে হয় ভুল করিনি একবিন্দুও।
আমরা তখন ঘুরে বেড়াতাম সুযোগ পেলেই। প্রতিটি ভ্রমণেই আমাদের সামনে উন্মোচিত হতো জীবনের হাজারো মানে। কবি আবুল হাসানের কবিতার লাইনের মতো, ‘এ ভ্রমণ আর কিছুই নয়, কেবল তোমার কাছে যাওয়া...’ তেমনই এক আয়োজন ছিল আইল অব হোয়াইট নামে ক্ষুদ্র ব্রিটিশ আইল্যান্ড ভ্রমণে।

মূলত প্রায় বছরখানেক ধরে আইল অব হোয়াইট আমাদের টানছিল, কিন্তু নানা কারণে হয়ে উঠছিল না। অগত্যা আচমকা এক চমৎকার আগস্টের সকালে আমি আর মৌনী বেরিয়ে পড়েছিলাম আইল অব হোয়াইটের উদ্দেশে। সঙ্গে কিছু খুচরো পয়সা, দুইটা ব্যাকপ্যাক, ব্যস। লন্ডনের ভিক্টোরিয়া কোচ স্টেশন থেকে সস্তা দামের ন্যাশনাল এক্সপ্রেসের কোচে চড়ে পোর্টসমাউথ সাউথ সি, সেখান থেকে হোভার ট্রাভেলে করে সাগর পাড়ি দিয়ে সাগর আর অবারিত প্রকৃতির মোহনা আইল অব হোয়াইট। হোভার থেকে নেমেই দেখি সকাল গড়িয়ে দুপুর। সিদ্ধান্ত হলো, স্যান্ড ডনের এক ক্যাফের পাব বেঞ্চে বসে খোলা আকাশের নিচেই হবে মধ্যাহ্নভোজন। মেনু হলো দুজনের দুটো বার্গার, দুজনে শেয়ার করে এক পোরশন ফ্যাট পটেটো চিপস আর দুটো পেপসি।
এরপর ভরপেটে শুরু হলো সাগরের বালুময় সৈকত এভারল্যান্ড ধরে উদ্দেশ্যহীন হাঁটা। হাঁটতে হাঁটতে এসে ক্লান্ত হয়ে থামলাম একেবারে ক্লিফের নিচে। একেবারেই নির্জন সৈকত। বেলাভূমির এক পাশে সাগর, আরেক পাশে একদম খাড়া পাহাড়। ধারণা করা হয়, ৮ হাজার থেকে ৯ হাজার বছর আগে, অর্থাৎ বরফ যুগে আইল অব হোয়াইট নামের এই ছোট দ্বীপটি সংযুক্ত ছিল ইংল্যান্ডের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে।

কিন্তু ক্রমাগত বরফ গলে সাগরের জলের উচ্চতা বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে ধীরে ধীরে চারপাশের স্থলভাগ সাগরে ডুবে যায় এবং উঁচু অংশ, অর্থাৎ আজকের আইল অব হোয়াইট থেকে যায় দ্বীপ আকারে। যেখানে প্রকৃতি তার অপার সৌন্দর্য দান করেছে দুই হাত ভরে। মাঠের পর মাঠ হলুদ শর্ষে ফুলের মধু খেয়ে ক্লান্ত মৌমাছি বিশ্রাম নেয় অবারিত গম অথবা ভুট্টাখেতে। সাগরের বাতাস ঢেউ খেলে যায় উঁচু পাহাড়ের সবুজ ঢালে। ঢালু উপত্যকার সবুজ ঘাসে গা এলিয়ে জিরোয় ক্লান্ত মেষের পাল।
এদিকে ক্লান্তি ভর করেছে আমাদের শরীরেও। শুরু হলো থাকার জায়গা খোঁজার পালা। অবশেষে একটা লজ পাওয়া গেল, স্যান্ড ডনের সৈকত থেকে মাইল দুয়েক দূরে। দুজনের থাকার জন্য একটা এন-স্যুট ডাবল বেডরুম, সঙ্গে চা–কফি তৈরির যাবতীয় সরঞ্জাম। আর কী চাই? লজে ঢুকতেই শুরু হলো মুষলধারে বৃষ্টি। স্নান সেরে বৃষ্টিময় বিকেলে জানালার পাশে বসে ক্লান্ত পা দুটো এলিয়ে এক কাপ গরম চা যেন একনিমেষেই ভুলিয়ে দিল সারা দিনের যাবতীয় ক্লান্তি।

সময়ের পরিবর্তনে এখন পাঁচ তারকা হোটেল হয়তো হাতের নাগালেই, কিন্তু সেদিনের সেই নাম না জানা সস্তা লজের চায়ের কাপে যে আনন্দ-নির্যাস ছিল, সেটা আজও সুগন্ধি রুমাল হয়ে রয়ে গেছে পরানের অতল গহিনে।
এদিকে বেলা গড়িয়ে প্রায় সন্ধ্যা। অজানা শহরের আমরা দুজন আবারও বেরোলাম গন্তব্যহীন। হাঁটতে হাঁটতে আবারও চলে এলাম সৈকতের অন্য প্রান্তে, যেখানে রয়েছে দারুণ কাঠের তৈরি ঘাট আর উঁচু বিশাল পাটাতনজুড়ে নানা রকম উদ্যাপনের অনুষঙ্গ। এর মধ্যে আবারও শুরু হলো বৃষ্টি। সাগরপাড়ের বৃষ্টির রয়েছে অদ্ভুত সৌন্দর্য। কাঠের পাটাতনে বসে ভরা জোয়ারে সেই সৌন্দর্যে মোহিত হলাম আমরা। এরপর বহুবার একসঙ্গে সূর্যাস্ত দেখেছি, কিন্তু বৃষ্টি সেই একবারই।

রাতে ফেরার পথে সুপারমার্কেট থেকে কেনা বানরুটি, কলা আর চা দিয়ে সকালে নাশতা সেরেই বেরোলাম আইল অব হোয়াইটের বাকি সৌন্দর্যের রহস্য উন্মোচনে। দুজনের দুটো বাস পাস করে নিলাম সারা দিনের জন্য, অর্থাৎ দ্বীপের যেকোনো বাসে যেকোনো সময় আমরা উঠতে পারব। ব্যাকপ্যাকে পানীয় জল, কিছু খাবার আর গোটা দ্বীপের একখানা ম্যাপ। উদ্দেশ্য, মেঘের সঙ্গী হয়ে হংসবলাকার পাখায় ভর করে ভেসে যাব পূর্ব সমুদ্র থেকে আলোকতড়িতে।
ঝকঝকে সকালের আলোয় দোতলা বাসের ওপর থেকে কিছুক্ষণ পরপরই সুন্দর কোনো এলাকা দেখলেই আমরা নেমে পড়ছি হুড়মুড় করে। তারপর গোটা এলাকা ঘণ্টাখানেক চষে বেড়ানো। তারপর আবার আরেকটা বাসে চেপে অন্য গন্তব্য। আমাদের এই চষে বেড়ানোয় বাদ যায়নি ধূসর গমখেত থেকে শুরু করে গার্লিক ফেস্টিভ্যাল। এমন রহস্যময় ভ্রমণে জেগে ওঠে ভেতরের শুশ্রূষা, তিনি বলেন, তুই ক্ষত মুছে আকাশে তাকা। আমরা ক্ষত মুছে আকাশে তাকিয়ে কবি আবুল হাসানের কবিতার লাইনের মতো আঁধার সরিয়ে দূরে বাতিঘরের টিমটিমে আলোতেও প্রাণিত হই। জিইয়ে রাখি মেঘের ভেতরে তড়িৎ হওয়ার স্বপ্ন।


পরদিন সকাল সকাল আমরা লজ থেকে বেরিয়ে আমরা উঠে পড়ি ছাদখোলা বাসে। কখনো পাহাড়ের ওপর দিয়ে, কখনো খোলা প্রান্তর দিয়ে লোকালয় থেকে অনেক দূরে ঘুরে বেড়াবে আমাদের বাস। দোতলার খোলা ছাদে বসে মেঘের সঙ্গে মেঘ হয়ে মনের বিষণ্ন অঞ্চলকে বিদায় জানাব আমরা। অসাধারণ সেই বাসভ্রমণের কথা মনে থাকবে আমৃত্যু। পাহাড়ের খাড়া পথ বেয়ে ওপরে ওঠার সময়ে ভয় আর আনন্দের সংমিশ্রণ শাণ দিচ্ছিল ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়তে।
ভ্রমণ শেষে বাস এসে থামল একেবারেই সৈকতে, ঠিক যেখান থেকে আমরা হোভার ট্রাভেলে চড়ে ফিরব মূল ভূখণ্ডে। এভারল্যান্ড সৈকতে আমাদের শেষ দিনের সময়টুকু আমরা উপভোগ করলাম চেটেপুটে। তিন দিনের ভ্রমণের বাজেট থেকে বেঁচে গেছে কিছু পাউন্ড। তাই ঠিক করলাম, সেই পাউন্ড দিয়ে ফিশ অ্যান্ড চিপস খাওয়া হবে। বিখ্যাত ইংলিশ ফিশ অ্যান্ড চিপস।

কিন্তু উদ্বৃত্ত পাউন্ডের সঙ্গে ফিশ অ্যান্ড চিপসের দামের তির্যক সম্পর্ক থাকার কারণে কয়েকটা দোকান খুঁজতে হলো। অবশেষে যা পেলাম, তা খুবই সুস্বাদু এবং আমাদের ক্ষুধা নিবারণের জন্য যথেষ্ট ছিল। কিন্তু পাশের টেবিলে ফিশের পরিমাণ দেখে আমাদের তুলনামূলক বামনাকৃতির পোরশন বলে দিচ্ছিল, আমরা আসলে অর্ডার করেছি কিডস মেনু থেকে। তবে সেই খর্বকায় ফিশ অ্যান্ড চিপসের আবেদন ফুরাবে না কোনো দিনও।
আসলে বিশাল বড় পোরশন, ঝাঁ–চকচকে হোটেলের লবি কিংবা বিলাসবহুল রেস্তোরাঁর আড়ম্বর নয়; বরং আমাদের চাহিদা ছিল প্রকৃতির সান্নিধ্যে জীবনকে নিজেদের মতো করে উপভোগ করা। নির্জন সৈকতে সূর্যাস্তের লাল আলোয় ‘কলো কলো কলমেন্দ্র নির্ঝরিণীর প্রলয়’ আহ্বান শুনতে যাওয়া।

যেখানে পায়ের নিচে রয়েছে পাহাড়, তাঁর কথায় পাথর সরিয়ে ঝরনার প্রথম জলে স্নান করে বেঁচে উঠব নিযুতবার। সময় বয়ে গেছে অনেক, আমাদের যাপিত জীবনেও এসেছে হাজার পরিবর্তন; কিন্তু জলের মধ্যে জল হওয়ার বাসনা এখনো রয়েছে জীবন্ত। এখনো আমরা প্রতিটা ভ্রমণে মন্ত্রের মতো পাঠ করি, ‘এ ভ্রমণ আর কিছু নয়, কেবল তোমার কাছে যাওয়া...’
লেখক: ড. অসীম চক্রবর্তী, গবেষক ও শিক্ষক, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড কম্পিউটিং, এংলিয়া রাসকিন বিশ্ববিদ্যালয়, কেমব্রিজ
ছবি: লেখক