প্রিয় প্রাহায় এখনো মায়া ছড়িয়ে আছেন কাফকা
শেয়ার করুন
ফলো করুন

প্রাগ শহরের পাথুরে গলি, গথিক মিনার, পুরোনো সেতু আর ভলতাভা নদীর কুয়াশামাখা বাতাসে আজও যেন ভেসে বেড়ান ফ্রানৎস কাফকা। এ শহরের অলিগলিতেই জন্ম নিয়েছিল সেই নিঃসঙ্গতা, অস্বস্তি আর অস্তিত্বের প্রশ্ন, যা পরে রূপ নেয় বিশ্বসাহিত্যের অনন্য সব রচনায়। ১৮৮৩ সালের ৩ জুলাই প্রাগের এক মধ্যবিত্ত ইহুদি পরিবারে জন্ম নিয়েছিলেন এই কিংবদন্তি কথাসাহিত্যিক। মনে হয়, এখানেই হয়তো একদিন ঘুম ভেঙে গ্রেগর সামসা নিজেকে আবিষ্কার করেছিলেন এক বীভৎস পোকায় রূপান্তরিত হয়ে। ‘দ্য মেটামরফোসিস’-এর স্রষ্টা কাফকার জন্মদিনে তাঁর রহস্যময় শহর ঘুরে আসা যাক লেখকের সঙ্গে।

বিজ্ঞাপন

কাফকার শহর প্রাগ আমাকে হাতছানি দিয়েছে কতবার! সাংবাদিক হিসেবে ২০১৭ সাল থেকে প্রায় প্রতিবছরই (করোনার জন্য ২০২০ সাল বাদে) ইউরোপ সফর থাকে। প্রতিবারই ভাবি, এবার যাব। কিন্তু যাওয়া হয় না। মেলে না  সময়, মেলে না সুযোগ। তা–ই বা বলি কেন? মোজার্টের শহর ভিয়েনা কিংবা আন্তোনি গাউদির বার্সেলোনা বা ফ্যাশনের রাজধানী মিলানসহ কত শহরই তো ঘুরেছি। প্যারিসকে তো বানিয়েছি ট্রানজিট টাউন! তাহলে প্রাগে যাওয়া হচ্ছিল না কেন? কেন প্রিয় লেখক কাফকার সমাধিতে গিয়ে দুদণ্ড শান্তির পরশ নিতে পারছিলাম না? এই অপ্রাপ্তির হতাশা আমাকে দীর্ণ করেছে। এর ভেতরই ২০২৪ সালে পার হয়ে গেল তাঁর মৃত্যুর শত বছর।
এ প্রতীক্ষার অবসানে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেই ফেলি, যে করেই হোক, যেতেই হবে। প্রিয় প্রাহাতে। প্রিয় লেখকের শহরে।

প্রাহা বিমানবন্দর
প্রাহা বিমানবন্দর

কান চলচ্চিত্র উৎসবের ঠাসা সূচির মধ্যেই ইউরোউইংস বিমানের টিকিট নিশ্চিত করলাম। দুই দিন, এক রাতের সফর। ডর্ম বুকিং দেওয়া হলো। যোগাযোগ হলো প্রাগের চার্লস বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া বাংলাদেশি শিক্ষার্থী অপ্সরী নন্দনার সঙ্গে। শহর আমাকে ঘুরিয়ে দেখানোর দায়িত্ব তাঁর। অপ্সরী একাত্তরের বীর মুক্তিযোদ্ধা, ভাস্কর ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণীর নাতনি।

বিজ্ঞাপন

ফ্রান্সের নিস শহরের বিমানবন্দর থেকে উড়ল ইউরোউইংসের ফ্লাইট। ১ ঘণ্টা ৪০ মিনিটের উড়ান। ভূমধ্যসাগর আর আল্পস পর্বত পেরিয়ে প্রাহা বিমানবন্দরে যখন পৌঁছলাম, তখন স্থানীয় সময় সাড়ে ছয়টা।
ফোন চালু হতেই অপ্সরীর মেসেজ, ‘আমি এয়াপোর্টে আছি। টার্মিনাল দুইয়ে।’ পরীক্ষা শেষ করে বিমানবন্দরে এসেছে অপ্সরী।
দেখা হতেই চোখেমুখে আনন্দ। বলল, ‘ইউরো আগে ভাঙিয়ে নিন।’ অল্প কিছু ইউরো ভাঙিয়ে ২৪ ঘণ্টার জন্য শহর ট্রান্সপোর্টের টিকিট কেটে নিলাম। তারপর বিমানবন্দর থেকে ছুটলাম ডর্মে। আটটার মধ্যে পৌঁছাতে হবে!

শহরে
শহরে

ঠিকঠাকমতোই ডর্ম খুঁজে পেলাম। আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে অপ্সরীসহ বেরিয়ে পড়লাম। বিকেলের সোনাঝরা রোদে তখন মায়া ছড়াচ্ছে প্রাগ। অ্যাকর্ডিয়ান বাজিয়ে চার্লস ব্রিজে তখন মূর্ছনার মৌতাত বুনছেন অজানা কোনো শিল্পী। চোখের পলকে সময় ফুরিয়ে গেল। রাত নামল। ঐতিহ্যবাহী চেক খাবার মুখে রুচল না। ম্যাকডোনাল্ডসই সই। খেয়ে অপ্সরীকে বিদায় জানিয়ে ডর্মে ফিরলাম।
পরদিন সকাল–সকাল বেরিয়ে পড়লাম অপ্সরীসহ।

প্রাহা শহরের বুকের ভেতর শান্ত সমাহিত বাতিস্লাভা নদী। একসময়ের প্রাহা এখন প্রাগ। সেই রূপসী শহরকে কেউ কেউ ‘কাফকার প্রাগ’ও বলে থাকেন! এটা কি আশ্চর্য নয়! একটা শহর কত কত ইতিহাস আর মনীষীর জন্ম দিয়েছে, সেই শহরকে কাফকার নামেই পরিচিত হতে হবে কেন? কারণ, এ শহরের ক্যাথেড্রাল, চার্লস ব্রিজ কিংবা বিকেলের সোনালি আকাশে এখনো কাফকার পরাবাস্তব জগৎ যেন ছড়িয়ে আছে।

বাতিস্লাভার তীরে
বাতিস্লাভার তীরে

শুরুতেই গন্তব্য ‘কাফকা হাউস’। একসময়ের ‘বিগ টাওয়ার’ নামে পরিচিত এ ভবনেই কাফকা জন্মেছিলেন ১৮৮৩ সালের এই দিনে। জায়গাটা ইহুদি পাড়া নামে খ্যাত। জন্মের পর মাত্র দুই বছর কাফকা এ ভবনে ছিলেন। তবে আগের ভবনটি এখন নেই। পুনর্নির্মিত ভবনই এখন কাফকা হাউস!

 'কাফকা হাউজ'–এর সামনে লেখক
'কাফকা হাউজ'–এর সামনে লেখক

মাত্র চল্লিশ বছরের জীবনে কাফকাকে মেনে নিতে হয়েছে যন্ত্রণার বিদঘুটে দানবকে। সহ্য করতে হয়েছে সংখ্যালঘু হওয়ার চাপ।
কাফকার লেখায় অনেক কিছুই হঠাৎ করে হয়। হঠাৎ করেই কেউ পোকা হয়ে যায়, হঠাৎ করেই কেউ গ্রেপ্তার হয়, বিচার শুরু হয়, হঠাৎ করেই কেউ উধাও হয়, এটা ঘটেই কাফকার লেখায়।

শহরের কোয়াদ্রিও কমপ্লেক্সে চেক শিল্পী ডেভিড চের্নির তৈরি কাইনেটিক ভাস্কর্যে ফ্রানৎস কাফকার সেই মানসিক অস্থিরতা কিংবা দ্বন্দ্বই যেন ধরা দিয়েছে। ১১ মিটার উঁচু আধুনিক এ ভাস্কর্য নিখুঁতভাবে কাফকার অবয়ব তৈরি করে, আবার এলোমেলো হয়ে যায়। ৩৯ টন ওজনের গতিশীল ভাস্কর্যটি ৪২টি ঘূর্ণায়মান স্টেইনলেস স্টিল দিয়ে তৈরি। কত কত পর্যটক অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকেন ভাস্কর্যটির দিকে। প্রিয় লেখকের পুনর্বিন্যস্ত অবয়ব দেখে হয়তো খুঁজে নেন, কী ভঙ্গুর কিন্তু দৃঢ় চিন্তার এক মানুষ, কাফকা!

শিল্পী ডেভিড চের্নির শিল্প ভাবনায় 'হেড অব ফ্রানৎজ কাফকা'র ভাস্কর্যের সামনে লেখক
শিল্পী ডেভিড চের্নির শিল্প ভাবনায় 'হেড অব ফ্রানৎজ কাফকা'র ভাস্কর্যের সামনে লেখক

তবে ফ্রানৎস কাফকাকে নিয়ে সবচেয়ে মোক্ষম ভাস্কর্যটির শিল্পী ইউরোস্লাভ রোনা। এটি রয়েছে প্রাগের ওল্ড টাউন আর ইহুদি কোয়ার্টারের একদম মাঝামাঝি জায়গায়। একপাশে স্প্যানিশ সিনেগগ। অন্যপাশে চার্চ অব দ্য হোলি স্পিরিট। এর ভেতর মাথাবিহীন একটা দেহের কাঁধে বসে আছেন মাথাওয়ালা কাফকা। ক্লান্ত চোখ। ডান হাতের তর্জনী কিছু নির্দেশ করছে। তাঁর এক ছোটগল্প থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে শিল্পী এ ভাস্কর্য গড়েছেন।

সেই কাফকার জগতের খোঁজ শহরজুড়ে। ব্রাতিস্লাভা নদী ছুঁয়ে কাফকা মিউজিয়ামের স্যুভেনির শপের পরতে পরতে কাফকা আর তাঁর সাহিত্যকর্ম। কত ভাষায়, কত বিন্যাসে তাঁর লেখা সব বই। জার্মান ভাষায় ‘মেটামরফোসিস’–এর ‘মিনি বুক’ সংস্করণটা কিনে নিলাম সংগ্রহে রাখার জন্য। কাফকার প্রতিকৃতিসংবলিত একটা ফ্রিজ ম্যাগনেটও কেনা হলো।

ওল্ডটাউনে 'মাথাবিহীন কাফকা'র ভাস্কর্য
ওল্ডটাউনে 'মাথাবিহীন কাফকা'র ভাস্কর্য

হৃদয়জুড়ে তবু কী এক হাহাকার! কোথায় ঘুমিয়ে আছেন প্রিয় কাফকা? কোথায় খুঁজে পাব?
মৃত্যু হয়েছিল ভিয়েনার কাছাকাছি কিয়েলিংয়ে। সমাধি কি ওখানেই? এমন কত প্রশ্ন মাথার ভেতর। অপ্সরী খোঁজটা দিল। নিয়ে গেল শহরের একটা প্রান্তে, যেখানে বাসস্টেশনের শেষ গন্তব্য। ইহুদিদের জন্য তৈরি এক নতুন কবরস্থানে।

কবরস্থানের দিক নির্দেশিত ফলক
কবরস্থানের দিক নির্দেশিত ফলক


সারিবদ্ধ কবর। একটু পরপর নির্দেশিকা। তারই একটিতে লেখা ‘ড. ফ্রানৎস কাফকা। ২৫০ মিটার’। শান্ত সমাহিত আর সব কবরস্থানের মতোই এ কবরস্থানও। নির্দেশিকা মেনেই এগিয়ে যাচ্ছি আর বুকের ভেতর অদ্ভুত এক তোলপাড় টের পাচ্ছি।
হঠাৎই ষড়ভূজাকৃতি অনেকটা স্ফটিকের মতো সমাধি স্থাপত্যটি চোখের সামনে। অল্প কিছু ভক্ত, চুপচাপ পাশে লম্বা চেয়ারে বসে আছেন। কী নীরব এক বিচ্ছিন্নতাবোধ আমাকে গ্রাস করল।

বেঁচে থাকতে মানুষটি পেয়েছিলেন কেবল অবহেলা। মৃত্যুর আগে বন্ধুকে লেখা শেষ চিঠিতে অনুরোধ করেছিলেন তাঁর লেখা সব পাণ্ডুলিপি, খসড়া, নোট বই আর অসমাপ্ত লেখাগুলো যেন পুড়িয়ে ফেলা হয়। শুধু অনুরোধ করেই ক্ষান্ত হননি। হাতের আশপাশে থাকা নিজের কাজের একটা বড় অংশ নিজেই পুড়িয়ে দিয়েছিলেন। শরীরে শক্তি ছিল না। বড় পাণ্ডুর হয়ে গিয়েছিল তাঁর পৃথিবী তখন। যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়ে ১৯২৪ সালের ৩ জুন মারা যান কাফকা।

কাফকার সমাধি
কাফকার সমাধি

অজান্তেই জন্ম দিয়ে গেলেন ‘কাফকায়েস্ক’ নামে নতুন এক ধারার!
বিয়ে করেননি। অনেক নারীই জীবনে এসেছিল। কাউকেই ধরে রাখতে পারেননি। প্রেমিকা ফেলিস বাউয়ারকে প্রায় পাঁচ শ চিঠি লিখেছেন। দুবার বাগ্‌দান হয়েছে। দুবারই ভেঙে গেছে। মৃত্যুর পর সেই চিঠির সংকলন নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে বই ‘লেটারস টু ফেলিস’।

আরেক প্রেমিকা মিলেনা জেসেন্সকা। পেশায় সাংবাদিক। তাঁকেও শয়ে শয়ে চিঠি লিখেছেন। তাঁর কাছে লেখা চিঠিগুলো নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে বেস্টসেলিং বই ‘লেটারস টু মিলেনা’।

ফ্রানৎস কাফকা মিউজিয়ামের স্যুভেনির শপ থেকে কেনা প্রতিকৃতি সম্বলিত ম্যাগনেট আর বই
ফ্রানৎস কাফকা মিউজিয়ামের স্যুভেনির শপ থেকে কেনা প্রতিকৃতি সম্বলিত ম্যাগনেট আর বই

মৃত্যুপথযাত্রী কাফকার শেষ প্রেমিকা ছিলেন দোরা দিয়ামান্ত। মৃত্যু যখন দরজায় কড়া নাড়ছে, তাঁরা ঠিক করলেন যে ফিলিস্তিনে যাবেন। সুখের সংসার গড়বেন। হলো না।
বাবা হারমান কাফকাকে বর্ণনা করতে গিয়ে কাফকা লিখেছিলেন, ‘বাবা আমার পৃথিবীর মানচিত্রের ওপর শুয়ে ছিলেন। তিনি আমার জন্য খুব কম জায়গাই রেখেছিলেন।’ বাবা হারমান কাফকা আর মা জুলিয়ে কাফকার সঙ্গে একই কবরে শুয়ে আছেন প্রিয় কাফকা। হিব্রু ভাষায় পাথুরে শিলালিপিতে যা লেখা, তার অর্থ, ‘তাঁর আত্মা মিলনে আবদ্ধ হোক’।

ছবি: লেখক

প্রকাশ: ০৩ জুলাই ২০২৬, ০৬: ০০
বিজ্ঞাপন