
ইস্তানবুলের হৃদয়ে ইতিহাস, বিশ্বাস ও সৌন্দর্যের মিলনে আয়া সুফিয়ায় যেনো এক অনন্য সৌন্দর্য। চারদিন ইস্তাম্বুল সফরে জুমার নামায আদায় করেছি আয়া সোফিয়ায়; এই অভিজ্ঞতা সারাজীবন মনে রাখার মতো।

ইস্তানবুল, তুরস্কের প্রাণকেন্দ্র, অটোমান সাম্রাজ্যের সমৃদ্ধ ইতিহাস ধারণ করে। সাড়ে তিন হাজার বছরের ঐতিহ্যপূর্ণ এই শহর টানে সারা বিশ্বের মুসলিমদের। উমরাহ ও হজ্বের পরও এবারের ইস্তানবুল সফর অন্তরকে দিয়েছে প্রশান্তি।
সফরের তৃতীয় দিন ছিল পবিত্র জুমা। ভাগ্যক্রমে আমার মেয়ের সঙ্গে আয়া সুফিয়ায় নামাজ পড়ার সৌভাগ্য হয়েছে। সফরের প্রথমদিনও আয়া সুফিয়ায় যোহরের নামায আদায় করেছিলাম; তবে জুমার নামাজের অভিজ্ঞতা একেবারেই ভিন্ন এবং গভীর। ইতিহাসের এক জীবন্ত সাক্ষী এই মসজিদে নামাজ আদায় করা সত্যিই ছিল এক অনন্য অনুভূতি।

৫৩৭ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত এই স্থাপনা প্রায় ৯১৬ বছর ধরে বিভিন্ন খ্রিস্টান শাসকের আমলে গির্জা হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। সময়ের পরিক্রমায় ১৪৫৩ সালে কনস্টান্টিনোপলের পতনের পর অটোমান সাম্রাজ্যের মহান শাসক ফাতিহ সুলতান মুহাম্মদ এটিকে মসজিদে রূপান্তরিত করেন। ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে আবার পরিবর্তন এসেছে; ১৯৩৪ সালে হয়েছে জাদুঘর, আর দীর্ঘ অপেক্ষার পর ২০২০ সালের জুলাইয়ে এটি পুনরায় মসজিদে রূপান্তর করা হয়েছে।
আয়া সুফিয়ার ভেতরে পা রাখার মুহূর্তটিই ছিল সবচেয়ে গভীর অনুভূতির। বিশাল গম্বুজের নিচে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছিল, শত শত বছর যেন এক নিঃশ্বাসে কথা বলছে। দেয়ালজুড়ে নিখুঁত কারুকাজ, ইসলামী ক্যালিগ্রাফি আর বাইজেন্টাইন শিল্পকর্মের মিলনে এমন এক সৌন্দর্য, যা নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। প্রতিটি খোদাই, প্রতিটি রেখাই ইতিহাসের কথা বলে, শত বছর ধরে যা মানুষকে আকৃষ্ট করে আসছে।

নামাজে দাঁড়ানোর পর মনে হলো শরীর নয়, মনটাই যেন সিজদায় চলে গেছে। প্রাণটা শীতল হয়ে এলো এক অদ্ভুত প্রশান্তিতে, যেন সব ভাঙা ভাঙা চিন্তা, অবসাদ, ও দৈনন্দিন কোলাহল হঠাৎ থেমে গেল। জুমার আগে ইমামের খুতবা আর সুরার আয়াত প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল দেয়ালে দেয়ালে, সুউচ্চ মিনারে, যেন শব্দগুলোই সরাসরি হৃদয়কে স্পর্শ করছে।
ভাবা যায়, ইহুদি থেকে বাইজেন্টাইন আর তারপর মুসলিম শাসনের সময় তিনটি ধর্মের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের সাক্ষী এই আয়া সুফিয়া। প্রতিটি কোণ, প্রতিটি মিনার যেন মানুষের আশীর্বাদ আর বিশ্বাসের নিদর্শন। সেখানে দাঁড়িয়ে আমার মনে হলো, মানুষ মাত্রই আধ্যাত্মিকভাবে কত ছোট, কিন্তু একই সঙ্গে কত বড়; কারণ ইতিহাস, বিশ্বাস এবং সৌন্দর্যের সঙ্গে সংযুক্ত হলে মন আর অন্তরাত্মা এক অনন্য প্রশান্তিতে ভরে যায়।

এই মসজিদ শুধু মুসলমানদের কাছেই নয়, খ্রিস্টানদের কাছেও সমানভাবে পবিত্র। একসময় এটি প্রজ্ঞার ঈশ্বর ‘লোগোস’কে উৎসর্গ করা গির্জা ছিল। তাই আয়া সুফিয়া আজও ধর্মের সীমানা ছাড়িয়ে মানবসভ্যতার এক অনন্য ঐতিহ্য। সেই কারণেই সারা বছর পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে মুসলমান, খ্রিস্টানসহ বিভিন্ন ধর্মের হাজারও পর্যটক ছুটে আসেন ইস্তানবুলে এই ইতিহাস স্বচক্ষে দেখার জন্য।
জুমার নামাজ শেষে আমরা গিয়েছিলাম কাছেই অবস্থিত আরেকটি ঐতিহাসিক স্থাপনা, সুলতান আহমেদ মসজিদ, যা বিশ্বজুড়ে পরিচিত ব্লু মসজিদ নামে। নীল টাইলসে মোড়া এই মসজিদেও রয়েছে এক স্বর্গীয় সৌন্দর্য, কিন্তু আয়া সুফিয়ার অনুভূতি ছিল আলাদা—আরও গভীর, আরও নীরব। সেখানে প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি দৃষ্টি যেন এক ধরনের অন্তর্দৃষ্টি উন্মোচন করে, যা শুধু চোখে নয়, হৃদয়ে ধারণ করা যায় হয়।

ইস্তানবুল শুধু একটি শহর নয়, এটি সময়ের সংযোগস্থল। এখানে দাঁড়িয়ে মনে হয় ইতিহাস এখনো বেঁচে আছে, শুধু রূপ বদলেছে। যেখানে আমরা আমাদের নিজস্ব ঐতিহ্যকে অনেক সময় অবহেলা করি বা হারিয়ে ফেলি, সেখানে অবাক করে দিয়ে দেখা যায় তুর্কিরা কীভাবে নিজের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে যত্ন ও সযত্নে সংরক্ষণ করছে। এই শহর আমাদের শেখায় ইতিহাসের সঙ্গে জীবনের সংযোগ কিভাবে তৈরি হয়, আর কীভাবে অতীত এখনও আমাদের জীবনে প্রভাব ফেলে।
আয়া সুফিয়ায় জুমার নামাজ আদায় করা আমাদের ভ্রমণের অংশ ছিল না; বরং এটি হয়ে উঠেছে জীবনের এক স্মরণীয়, আত্মিক অভিজ্ঞতা—একটি মুহূর্ত যা দীর্ঘদিন হৃদয়ে অনুরণিত হবে। সেখানে সময় থেমে গিয়েছে মনে হয়, এবং আমরা অনুভব করেছি, কখনও কখনও প্রকৃত ভ্রমণ মানে শুধু নতুন জায়গা দেখা নয়, বরং আত্মার গভীরে এক নীরব প্রশান্তির সন্ধানও।
ছবি: নাদিয়া ইসলাম