চিলি: এক দেশ, বহু পৃথিবী ৫
শেয়ার করুন
ফলো করুন

লেগুনা সিহার

আজ এক সপ্তাহ আমি আতাকামায়। ট্রাভেল এজেন্সি থেকে ক্ষুদে বার্তা এসেছে। নিষেধাজ্ঞায় থাকা একটি পর্যটন স্থানের ওপর নিষেধাজ্ঞা উঠিয়ে নিয়েছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ। নাম তার ‘লেগুনা সিহার’। আমরা এক মিনিবাসভর্তি পর্যটক যাত্রা শুরু করলাম দুপুরের পর। ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যার পর হবে বলেছে গাইড।

আতাকামা মরুভুমির ‘লেগুনা সিহার’–এ ভেসে থাকা
আতাকামা মরুভুমির ‘লেগুনা সিহার’–এ ভেসে থাকা

আমি জানতাম, জর্ডানে আছে ডেড-সি বা মৃত সাগর, যেখানে ভেসে থাকা যায়। এখানে এসে দেখছি আতাকামা মরুভূমিতেও এমন জলাশয় আছে, যেখানে ভেসে থাকা যায়। স্থানীয় বাসিন্দারা একে বলে লেগুন অর্থাৎ লেক। এ লেগুন মূলত সমুদ্রের নোনা পানির অংশ। একসময় এ লেগুন বালু ও পাথর দ্বারা সমুদ্র থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছে এবং আজকের এ অবস্থায় এসেছে। জর্ডানের মৃত সাগর আর এই সিহার লেগুনটির মধ্যে মৌলিক পার্থক্য হলো ডেড-সির পানি রঙিন নয়। সিহার লেগুনের পানি রঙিন ও আবেদনময়ী। আমি সাঁতার জানি না। আমার পানিতে ভেসে থাকার জন্য এটা যথার্থ।

বিজ্ঞাপন

যেখানে মরুভূমি সব কেড়ে নেয়, সেখানে কী অবিশ্বাস্য রকম আমি দেখতে পাচ্ছি সম্মুখের লেগুনে পানি, কোমলতা আর ছায়া। চারদিকে অনুর্বর ভূমি। আমি আমার ক্যামেরাটা গাইডের হাতে গছিয়ে নেমে পড়লাম। গাইড নির্দেশনা দিচ্ছে, পানিতে নেমে চিত হয়ে পা দুটি সামনের দিকে টানটান করে ছড়িয়ে দাও। আমি তাই করার চেষ্টা করছি। লেগুনের লবণ পানি আমায় ভাসিয়ে দিল। আরে, কী অনায়াসে আমি ভেসে যাচ্ছি পানিতে। সাঁতার না জানা আমার জন্য এটাই প্রথম সাঁতার। আমি পানির ওপর চিত হয়ে শুয়ে। পুরো আকাশ ঝুঁকে এসে আমার তামাশা দেখছে। আমার শরীর পানিতে ভাসা শোলার মতো হালকা। আমি নিজের ওজন ভুলে গেছি। এখানে কোনো খাটাখাটনি নেই। রবীন্দ্রনাথ যেমন বলেছেন, ‘শুধু যাওয়া-আসা, শুধু স্রোতে ভাসা।’

বিজ্ঞাপন

হঠাৎ করেই আকাশ অন্ধকার হতে শুরু করল, ঝড় এল। আমার ক্যামেরা ছিল গাইডের হাতে। দৌড়ে দ্রুত তীরে উঠে ক্যামেরা ব্যাগে ঢুকিয়ে দিলাম দৌড়। কোন দিকে যাচ্ছি তা জানি না, সবাই যেদিকে যাচ্ছে আমিও সেদিকে। বাতাসের গতি মানুষ উড়িয়ে নেওয়ার মতো। এ বাতাস হিংস্র, এ বাতাস রাক্ষুসে।

লেগুনা সিহার– এর প্রবেশ পথে পর্যটক দল
লেগুনা সিহার– এর প্রবেশ পথে পর্যটক দল

দৌড়ে এসে থামলাম এক উম্মুক্ত গোসলখানায়। গোসলখানার উলটা দিকে কিছু ছোট ছোট কক্ষ। যেখানে গোসলের পর কাপড় পাল্টানোর ব্যবস্থা আছে। ব্যাগ এক কক্ষে রেখে বেরিয়ে এসে গোসলখানার কৃত্রিম ঝরনার নিচে দাঁড়িয়ে রইলাম। গোসলখানার এক পাশে কয়েকটি কক্ষ থাকার কারণে ঝড়ের তীব্রতা বেশি; আক্রমণ করতে পারছে না এদিকটায়।

লেগুনা সিহার–এ ভেসে থাকা পর্যটকরা
লেগুনা সিহার–এ ভেসে থাকা পর্যটকরা

একসময় সূর্য ডুবে গেল। আমাদের ফিরতে হবে। আমাদের গাড়ি যেখানে রাখা আছে, সে পর্যন্ত পৌঁছানো মুশকিল। অন্ধকারে ঝড়ের মধ্যেই গাইডের সাথে সবাই দৌড়াতে শুরু করলাম। তীব্র ঝড়। রাতের ঝড় তাপমাত্রা আরও কমিয়ে দিয়েছে। মরুভূমির শক্তিশালী বাতাস উড়িয়ে নিয়ে যাওয়ার মতো দশা। বাতাসের সঙ্গে দৌড়াচ্ছে বালি।

যেন বালিঝড়। এই বুঝি জীবনের শেষ রাত! মরতে তো হবেই একদিন, তাই বলে দক্ষিণ গোলার্ধের শেষ মাটিতে! ঝড়ের সাথে লড়তে লড়তে একসময় মিনিবাসের মধ্যে উঠে এসে বসেছি। এখন শহরের দিকে যাব। ২৯ কিলোমিটার দূরত্ব। মরুভূমির তীব্র ঝড়ের মধ্যে আমাদের গাড়ি চলতে শুরু করেছে।  

লেগুনা সিহার
লেগুনা সিহার

কখন ‘সান পেদ্র ডি আতাকামা’ শহরে ঢুকেছি টের পাইনি। গাড়িতে নিশ্চুপ বসেছিলাম। গাইডের কথায় স্বাভাবিক হলাম। বাতাসের তীব্রতা কিছু কমলেও ঝড় বন্ধ হয়নি। এ অবস্থায় যার যার হোটেলে পৌঁছানো মুশকিল। আমাদের অনুমতি নিয়ে গাইড গাড়ি থামাল তার চিলিয়ান বন্ধুর বাসার সামনে। সে বাসা আয়তনে বড় আর নিরাপদ। গাইড বলল, ‘ট্যুর এজেন্সি থেকে সামান্য খাবারের ব্যবস্থা আছে। সেটা পর্যটন এলাকায় তোমাদের নিয়ে খাব ভেবেছি। ঝড়ের জন্য তো আর সম্ভব হলো না। এখন তোমরা অনুমতি দিলে আমার বন্ধুর বাড়িতে সে আয়োজন করতে পারি।’ গাইডের এ বার্তা এমন দুর্যোগে আমাদের স্বর্গীয় অনুভূতি দিল। আমরা স্বাভাবিক হতে শুরু করলাম।

আমার জন্য এখানে যে আরও বিস্ময় অপেক্ষা করছে সেটা বুঝেছি খানিক পরে।
গাইড আমাকেই আলাদা করে টেনে নিয়ে তার বান্ধবীর সাথে ‘বাংলাদেশি’ বলে পরিচয় করিয়ে দিতেই মেয়েটি আমায় জাপটে ধরল। আমি ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলাম না। বলল, ‘আমি বেশ কয়েক বছর ভারতে ছিলাম। তোমাদের পাশের দেশ থেকে কয়েক দিন আগে ফিরেছি আতাকামায়। আমি ভারতকে এত ভালোবেসে ফেলেছি যে যদি আবার জন্মাই তবে ভারতীয় হয়ে জন্মাতে চাই।’

এবার আমি বুঝলাম, আমাকে দেখে তার এমন আবেগের কারণ। জামার হাতা উঁচিয়ে আমায় দেখাচ্ছে সে গণেশের ট্যাটু এঁকেছে তাঁর বাহুতে। ভারত থেকে নিয়ে এসেছে শিব আর গণেশের ছবি। অনেকের মাঝে আমাদের দুজনের অনেক গল্প হলো। আর কী কী এনেছ বলতেই বলল মসলা এনেছি। এবার আমি একটু নড়েচড়ে বসলাম। লজ্জাশরম ফেলে দিয়ে বললাম, ‘আমায় দেবে একটু? এ মসলা দিয়ে মাংস রান্না করব, মরুভূমির বুকে স্বদেশি স্বাদ পাব।’

বহু বহু দূর থেকে গোটা দক্ষিণ এশিয়াকে এক দেশ মনে হয় আমার।

ছবি: লেখক

প্রকাশ: ১৪ মার্চ ২০২৬, ০৬: ০০
বিজ্ঞাপন