
‘ইমেলদা মার্কোসের কি সত্যিই তিন হাজার জোড়া জুতা ছিল?’
প্রশ্নটা ছুড়ে দিলাম জিনের দিকে। আমরা তখন সান্তিয়াগো দুর্গের প্রবেশদ্বারে দাঁড়িয়ে। সেই মাত্রই কাউন্টার থেকে আমাদের জন্য টিকিট সংগ্রহ করেছে। দুপুরের আলোয় দুর্গের প্রাচীন পাথুরে দেয়াল যেন বহু শতকের স্মৃতি বুকে নিয়ে নীরবে দাঁড়িয়ে আছে।
জিন হেসে বলল, ‘হয়তো তিন হাজারের বেশি ছিল। তবে তিনি যখন মালাকানান প্রাসাদ ছেড়ে পালিয়ে যান, তখন সেখানে প্রায় ১ হাজার ২০০ জোড়া জুতা পাওয়া গিয়েছিল।’
‘জুতাগুলো এখন কোথায়? আমরা কি সেগুলো দেখতে যাব?’
‘জাতীয় জাদুঘরে কিছু আছে, কিছু আবার মারিকিনা শু মিউজিয়ামে। তবে সেখানে গেলে আজ ম্যানিলা উপসাগরের সূর্যাস্ত দেখা হবে না।’
জুতার জাদুঘর যতই কৌতূহল জাগাক, সাগরের বুকে অস্তগামী সূর্যের রঙিন বিদায়কে হার মানানো কঠিন। তাই সেই ভাবনা আপাতত সরিয়ে রাখলাম; বরং সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ইতিহাসের এই বিশাল দরজাটিই খুলে দেখি।
প্রত্নস্থানগুলোর প্রতি আমার এক অদ্ভুত দুর্বলতা আছে। পৃথিবীর বহু পুরোনো স্থাপনা আমাকে এমনভাবে ডাকে, যেন তারা নিজেদের গল্প শোনানোর জন্য অধীর হয়ে অপেক্ষা করছে। সান্তিয়াগো দুর্গও তেমনই এক গল্পকার। প্রায় সাড়ে ৪০০ বছরের পুরোনো এই দুর্গের প্রতিটি ইট, প্রতিটি করিডর, প্রতিটি ভাঙাচোরা দেয়াল যেন ইতিহাসের একেকটি পাণ্ডুলিপি।
দুর্গের ভেতরে পা রাখতেই মনে হলো সময় যেন উল্টো দিকে হাঁটা শুরু করেছে।
এক দিন এই পথেই হেঁটেছেন স্প্যানিশ গভর্নররা। এই চত্বরে প্রতিধ্বনিত হয়েছে সেনাদের বুটের শব্দ। আমেরিকান পতাকা উড়েছে এই প্রাচীরের ওপর। আবার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিভীষিকায় জাপানি সৈন্যদের পদচারণে কেঁপে উঠেছে মাটিও। কামানের গোলা আর বুলেটের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়েছে এই প্রাচীন দেয়াল। মাটির নিচের অন্ধকার কারাগারগুলো শুনেছে রাজবন্দীদের আর্তনাদ, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সৈনিকদের শেষ প্রার্থনা।
সান্তিয়াগো দুর্গ তাই কেবল একটি সামরিক বা প্রশাসনিক স্থাপনা নয়। এটি যেন ইতিহাসের এক নীরব সমাধিক্ষেত্র, যেখানে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে আটকে আছে অসংখ্য মানুষের স্বপ্ন, বেদনা আর অপূর্ণ আর্তি। কখনো কখনো মনে হয়, সন্ধ্যার বাতাসে আজও ভেসে আসে সেই অতৃপ্ত আত্মাদের দীর্ঘশ্বাস।
ফিলিপাইনের ইতিহাসও এই দুর্গের মতোই দীর্ঘ, বেদনাময় এবং নাটকীয়।
৫০০ বছর আগে আজকের ফিলিপাইন ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক ভূখণ্ড। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যান্য অঞ্চলের মতো এখানকার বহু দ্বীপও মুসলিম শাসনের অধীন ছিল। সেবু, মিন্দানাও, ম্যানিলা, সুলু, ব্রুনেই ও মালয় জগতের সঙ্গে তখন ছিল ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ। ম্যানিলার ওপর শাসন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন মুসলিম শাসক রাজা তৃতীয় সুলাইমান।
তবে দিগন্তের ওপার থেকে তখন এগিয়ে আসছিল আরেক শক্তি।
১৫৬৫ সালে স্প্যানিশ অভিযাত্রী মিগুয়েল লোপেজ দো লেগাজপি প্রথম সেবুতে উপনিবেশ স্থাপন করেন। এরপর মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে স্প্যানিশ বাহিনীর সম্মিলিত আক্রমণের মুখে ম্যানিলাও তাদের হাতে চলে যায়। রাজা সুলাইমান পিছু হটতে বাধ্য হন। একে একে পুরো দ্বীপপুঞ্জ স্পেনের নিয়ন্ত্রণে আসে। স্পেনের রাজা দ্বিতীয় ফিলিপের নাম অনুসারে নতুন ভূখণ্ডের নাম রাখা হয় ‘ফিলিপাইন’। দুর্গের একটি পুরোনো প্রাচীরের পাশে দাঁড়িয়ে আমি ভাবছিলাম, কত মানুষ হয়তো এই দেয়ালের ছায়ায় দাঁড়িয়ে নিজেদের হারানো স্বাধীনতার কথা ভেবেছে।

স্প্যানিশ শাসন টিকে ছিল তিন শতাব্দীর বেশি সময়; কিন্তু পরাধীনতার শৃঙ্খল কখনো চিরস্থায়ী হয় না। স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা ধীরে ধীরে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। উনিশ শতকের শেষভাগে সেই আগুন বিস্ফোরিত হয় বিপ্লবে। ১৮৯৮ সালে স্প্যানিশ শাসনের অবসান ঘটে; কিন্তু স্বাধীনতা আসে না। স্পেন ২০ মিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে ফিলিপাইনকে আমেরিকার হাতে তুলে দেয়, যেন একটি দেশের মানুষ নয়; বরং কোনো সম্পদই বিক্রি করা হচ্ছে।
ফিলিপিনোরা আবার অস্ত্র তুলে নেয়। শুরু হয় নতুন সংগ্রাম, নতুন যুদ্ধ। তিন বছর ধরে চলে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ। শেষ পর্যন্ত পরাজিত হলেও স্বাধীনতার স্বপ্ন নিভে যায়নি। ছাইয়ের নিচে চাপা আগুনের মতো তা জ্বলতেই থাকে।
তারপর আসে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। জাপানের দখলদারত্ব, যুদ্ধের ভয়াবহতা, অসংখ্য প্রাণহানি। কিন্তু যুদ্ধের শেষ প্রান্তে ফিলিপিনোরা আমেরিকান বাহিনীর সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করে। অবশেষে ১৯৪৬ সালে স্বাধীনতার সূর্য উদিত হয় ফিলিপাইনের আকাশে।

দুর্গের এক কোণে দাঁড়িয়ে দূরে ম্যানিলার আধুনিক অট্টালিকাগুলোর দিকে তাকালে ইতিহাস আর বর্তমানকে পাশাপাশি দেখা যায়; আর তখনই মনে হয়, স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে তাকে রক্ষা করা সম্ভবত আরও কঠিন। ফিলিপাইনের স্বাধীনতার পরও সে পরীক্ষার শেষ হয়নি।
ফার্দিনান্দ মার্কোসের দীর্ঘ শাসনামলে দেশ আবারও স্বৈরাচারের ছায়ায় ঢেকে যায়। সামরিক আইন, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন আর ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ জনগণের ক্ষোভ বাড়িয়ে তোলে। তাঁর স্ত্রী ইমেলদা মার্কোসের বিলাসী জীবনযাপন তখন বিশ্বজুড়ে আলোচনার বিষয়। হাজার হাজার জুতার গল্প যেন হয়ে ওঠে ক্ষমতার ঔদ্ধত্যের প্রতীক।
অবশেষে জনতার ঢেউ রুখে দাঁড়াতে পারেননি মার্কোস। দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন তিনি। নির্বাসনেই শেষ হয় তাঁর জীবন; কিন্তু ইতিহাস কখনো সরলরেখায় চলে না। বহু নাটকীয় বাঁক পেরিয়ে আজ সেই মার্কোস পরিবারেরই উত্তরসূরি প্রেসিডেন্টের আসনে বসেছেন। নিয়তি সত্যিই এক বিস্ময়কর গল্পকার।
পাসিগ নদী যেখানে ধীরলয়ে এসে মিশেছে ম্যানিলা উপসাগরের লোনাজলের সঙ্গে, ঠিক সেই সঙ্গমস্থলেই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে সান্তিয়াগো দুর্গ। প্রথম দেখাতেই বোঝা যায়, স্থান নির্বাচনটি নিছক কাকতালীয় ছিল না। নদী আর সাগরের এই মিলনবিন্দু যেন প্রকৃতির হাতে আঁকা এক কৌশলগত মানচিত্র, যার গুরুত্ব স্প্যানিশরা ৪০০ বছরের বেশি আগে বুঝে ফেলেছিল। তাই ম্যানিলা দখলের পর তারা এখানেই গড়ে তোলে তাদের ক্ষমতার কেন্দ্র, ঔপনিবেশিক শাসনের স্নায়ুকেন্দ্র।

কেবল স্প্যানিশরাই নয়, ইতিহাসের মঞ্চে পরপর আবির্ভূত হওয়া ব্রিটিশ, আমেরিকান এবং জাপানিরাও একই স্থানের গুরুত্ব উপলব্ধি করেছিল। ফলে সান্তিয়াগো দুর্গ বারবার পরিণত হয়েছে সংঘর্ষের কেন্দ্রবিন্দুতে। যুদ্ধ এসেছে, গোলাবর্ষণ হয়েছে, প্রাচীর ভেঙে পড়েছে; আবার ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে নতুন করে জন্ম নিয়েছে দুর্গটি। যেন ফিনিক্স পাখির মতো ছাই থেকে পুনর্জন্ম নিয়েছে বারবার। শুধু যুদ্ধই নয়, ১৬৪৫ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পও একসময় মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছিল এর বহু অংশ। আজ যে সান্তিয়াগো দুর্গকে আমরা দেখি, তার অধিকাংশই আসলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞের পর পুনর্নির্মিত ইতিহাস।
দুর্গের ভেতরে ঢুকতেই যেন পরিবেশ বদলে যায়। বাইরে যুদ্ধ, রাজনীতি আর রক্তাক্ত ইতিহাসের ছায়া, আর ভেতরে শান্ত, সবুজ, পরিপাটি এক উদ্যান। প্লাজা মরিয়নস। স্প্যানিশ গভর্নর জেনারেল ডমিঙ্গো মরিয়নসের নাম অনুসারে নামকরণ করা হয়েছে এ উদ্যানের। বিকেলের কোমল আলো তখন ঘাসের ওপর সোনালি চাদর বিছিয়ে দিয়েছে। সিমেন্টে বাঁধানো চত্বরের চারপাশে সারি সারি লোহার চেয়ার; কিন্তু বসার জন্য একটি আসনও খালি নেই। স্থানীয় মানুষ, বিদেশি পর্যটক, প্রেমিক যুগল, পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা দর্শনার্থী—সবাই যেন শেষ বিকেলের শান্তি আর সৌন্দর্যটুকু নিজেদের করে নিতে ব্যস্ত। কিছু যুবক সেগওয়ে (দুই চাকার স্বয়ং-ভারসাম্য রক্ষাকারী বৈদ্যুতিক ব্যক্তিগত যান) চালিয়ে এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়াচ্ছেন। তাঁদের হাসির শব্দ বাতাসে ভাসছে। অথচ এই একই প্রাঙ্গণের চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা স্থাপনাগুলো সাক্ষী হয়ে আছে এক অন্য সময়ের, এক ভয়ংকর অতীতের।

উদ্যান ঘিরে থাকা ভবনগুলোর মধ্যে সবচেয়ে দৃষ্টি কাড়ে পুরোনো আমেরিকান ব্যারাক। একসময় সৈনিকদের আবাসস্থল ছিল, এখন তা পরিণত হয়েছে প্রদর্শনী কেন্দ্রে। ছাদ খুলে দেওয়া হয়েছে, যাতে আকাশের আলো সরাসরি প্রবেশ করতে পারে। দেয়ালের গায়ে এখনো স্পষ্ট দেখা যায় জাপানি বুলেটের ক্ষতচিহ্ন। সময় অনেক কিছু মুছে দিয়েছে; কিন্তু যুদ্ধের এই দাগগুলো মুছে দিতে পারেনি।
জিন জানাল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ফিলিপাইনের সাবেক প্রেসিডেন্ট এলপিডিও কুইরিনোকে এই ভবনে টানা ১৬ দিন বন্দী করে রেখেছিল জাপানি বাহিনী। আমি দেয়ালের গায়ে হাত রেখে দাঁড়িয়ে থাকি কিছুক্ষণ। শীতল পাথরের গায়ে যেন এখনো জমাট বেঁধে আছে সেই দিনগুলোর আতঙ্ক। এরপর আমরা এগিয়ে যাই দুর্গের আদি প্রবেশপথের দিকে।

প্রবেশদ্বারে পৌঁছাতে হলে পেরোতে হয় একটি খাল। মানুষ খনন করেছিল এই জলপথ, কিন্তু এর ভূমিকা ছিল বহুমাত্রিক। এটি যেমন পাসিগ নদীকে ম্যানিলা উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে, তেমনি দুর্গটিকে রূপ দিয়েছে এক বিচ্ছিন্ন দ্বীপে। দূর থেকে দাঁড়িয়ে ভাবছিলাম, কয়েক শতাব্দী আগে যদি কেউ এই দুর্গ আক্রমণ করতে আসত, তবে কী ভয়ংকর চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হতো তাকে! খাল পেরিয়ে, কামানের মুখোমুখি হয়ে, সশস্ত্র সৈন্যদের বাধা অতিক্রম করে ভেতরে ঢোকা প্রায় অসম্ভব ছিল।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে প্রবেশদ্বারটিও ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। পরে পুরোনো নকশা অনুসরণ করে আবার নির্মাণ করা হয়। বিশাল কাঠের দরজার ওপর খোদাই করা আছে দুর্গের নামদাতা স্প্যানিশ সাধু সান্তিয়াগোর যুদ্ধরত প্রতিকৃতি; ঘোড়ার পিঠে আরোহী, হাতে অস্ত্র, যেন যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে প্রস্তুত। এই ছবি কেবল ম্যানিলাতেই সীমাবদ্ধ নয়।
স্প্যানিশ সাম্রাজ্য একসময় যেখানে যেখানে তাদের পতাকা উড়িয়েছিল—চিলি থেকে মেক্সিকো পর্যন্ত, সেখানকার বহু স্থাপনাতেও দেখা মেলে এই একই সাধুর। তবে তাঁকে কেবল সাধু বললেই পুরো পরিচয় দেওয়া হয় না। ইতিহাসের পাতায় তিনি মুসলিমবিরোধী যুদ্ধের প্রতীক হিসেবেও পরিচিত। তাই তাঁর সাধুত্ব আর সামরিক পরিচয়ের মধ্যে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য লুকিয়ে আছে।

দরজার দুই পাশে বর্শা ও ঢাল হাতে খোদাই করা দুই সৈনিকের প্রতিমূর্তি দাঁড়িয়ে আছে শতাব্দীর প্রহরী হয়ে; কিন্তু বিস্ময়ের বিষয়, পুরো প্রবেশপথ নতুনের মতো সংস্কার করা হলেও এই দুই সৈনিকের মুখমণ্ডল এখনো ক্ষয়িষ্ণু, সময়ের আঘাতে বিবর্ণ। কৌতূহল সামলাতে না পেরে জিনকে প্রশ্ন করলাম, ‘সবকিছু এত সুন্দর করে মেরামত করা হয়েছে, অথচ এই দুই সৈনিকের চেহারা আগের মতোই কেন রাখা হয়েছে?’
জিন একমুহূর্ত দেরি না করে উত্তর দিল, ‘কারণ আদি প্রবেশপথের একমাত্র অবশিষ্ট অংশ ছিল এই দুটি মূর্তি। যুদ্ধ আর ধ্বংসযজ্ঞের পর যখন সবকিছু নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল, তখন কেবল ওরাই টিকে ছিল। তাই কর্তৃপক্ষ এগুলোতে হাত দেয়নি।’
কথাটা শুনে আমার চোখ আবার ফিরে গেল সেই ক্ষয়িষ্ণু মুখগুলোর দিকে। একমুহূর্তে মনে হলো তারা আর পাথরের মূর্তি নয়। তারা যেন ইতিহাসের জীবন্ত সাক্ষী। ৪০০ বছরের ঝড়, যুদ্ধ, ভূমিকম্প, সাম্রাজ্যের উত্থান-পতন, মানুষের লোভ আর মৃত্যুর নৃশংসতা নীরবে দেখে যাওয়া দুজন প্রহরী। সান্তিয়াগো দুর্গের দেয়াল যতটা ইতিহাস বহন করে, হয়তো এই ভাঙাচোরা মুখ দুটির ভেতর লুকিয়ে আছে তারও বেশি গল্প।
দুর্গের পাথুরে ফটক পেরিয়ে ভেতরে ঢুকতেই যেন ইতিহাসের আরেকটি স্তর খুলে গেল।

সামনে বিস্তৃত একটি শান্ত উদ্যান। তারই মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন ফিলিপাইনের জাতীয় বীর হোসে রিজাল, ব্রোঞ্জের দণ্ডায়মান ভাস্কর্যে বন্দী এক অমর উপস্থিতি। জায়গাটির নাম প্লাজা দে আরমাস। একসময় এখানে স্প্যানিশ সৈন্যরা অস্ত্র ও গোলাবারুদ মজুত রাখত বলেই এমন নাম। কল্পনায় দেখতে পাচ্ছিলাম, সবুজ ঘাসের গালিচাঘেরা ইটের পথ ধরে সকালের মার্চ শেষ করে সৈনিকেরা পাশের ব্যারাকে ফিরে যাচ্ছে। অথচ সেই ব্যারাক, সেই সামরিক কোয়ার্টার ১৯৪৫ সালের ম্যানিলার রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল।
ইতিহাসের স্বভাবই বোধ হয় এ রকম। ধ্বংসের বুক থেকে নতুন পরিচয় জন্ম দেয়। ১৯৬৭ সালে ধ্বংসাবশেষ মেরামত করে এখানে গড়ে তোলা হয় রাজা সুলাইমান ওপেন-এয়ার থিয়েটার। বহু বছর ধরে নাটকের সংলাপ, করতালি আর আলোর ঝলকানিতে মুখর ছিল এই প্রাঙ্গণ। এখন নাট্যমঞ্চের জায়গায় পর্যটকদের পদচারণ; কিন্তু বাতাসে যেন এখনো ভেসে বেড়ায় অতীতের প্রতিধ্বনি।

এই প্রাঙ্গণের সঙ্গে হোসে রিজালের স্মৃতিও গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। বন্দিজীবনের দীর্ঘ সময় তিনি এখানে কাটিয়েছেন। এমনকি তাঁর জীবনের সবচেয়ে মানবিক মুহূর্তগুলোর একটি, জোসেফিন ব্র্যাকেনের সঙ্গে বিয়ের অনুষ্ঠানও এখানেই সম্পন্ন হয়েছিল। চার বছরের বন্দিদশায় জোসেফিন তাঁর পাশে ছিলেন অবিচল ছায়ার মতো। ইতিহাসে যুদ্ধের গল্প অনেক আছে; কিন্তু ভালোবাসার এমন নীরব অধ্যায়ই হয়তো মানুষকে সবচেয়ে বেশি স্পর্শ করে।

দুর্গের সবচেয়ে ভয়াল অধ্যায়টি লুকিয়ে আছে তার পাতাল জেলখানায়। আজ যে স্থানটি অন্ধকার ও নীরব, সেটি একসময় ছিল গোলাবারুদের গুদামঘর। নদীর স্যাঁতসেঁতে বাতাসে বারুদ নষ্ট হওয়ায় পরে এটি কারাগারে রূপান্তরিত হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানি বাহিনী এই জায়গাকে নির্যাতনকেন্দ্রে পরিণত করেছিল।
আমেরিকান সৈন্য, ফিলিপিনো গেরিলা ও রাজনৈতিক বন্দীদের এখানে আটকে রেখে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হতো। কারাগারের দেয়ালে ঝোলানো আলোকচিত্র আর ভাস্কর্যগুলো সেই অন্ধকার সময়ের নির্বাক সাক্ষী। ভেতরে হাঁটতে হাঁটতে মনে হচ্ছিল, ইতিহাসের পৃষ্ঠাগুলো কেবল কাগজে লেখা নয়; কখনো কখনো তা দেয়ালের ভেজা গায়ে, মেঝের ধুলায় কিংবা বাতাসের গন্ধেও লেপ্টে থাকে।

১৯৪৫ সালের ‘ম্যানিলা ম্যাসাকার’ ছিল মানবসভ্যতার এক কলঙ্কিত অধ্যায়। যুদ্ধ মানুষকে কতটা নিষ্ঠুর করতে পারে, সেই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে সেই গণহত্যার প্রতিটি স্মৃতিতে। ম্যানিলা দখলের যুদ্ধে জাপানিরা এক লাখের বেশি ফিলিপিনোকে হত্যা করে। ধর্ষণ করে অগণিত মেয়েদের, যাদের মধ্যে কিশোরীর সংখ্যা ছিল বেশি।ধর্ষণের স্থান হিসেবে স্কুল, হাসপাতাল এমনকি চার্চও বাদ যায়নি। জাপানিদের নিয়ে আমার এই এক বিস্ময় কাজ করে। যাদের এত ভদ্র জাতি হিসেবে আমরা বর্তমানে জানি, তাঁদের অতীত এত নৃশংস হয় কী করে?
নানকিং গণহত্যা নিয়ে ‘ফ্লাওয়ারস অব ওয়ার’ নামের একটা দারুণ সিনেমা আছে। ক্রিস্টিয়ান বেল অভিনীত সিনেমাটিতেও জাপানিদের নৃশংসতার কিছু নমুনা পাওয়া যায়। তা–ও ভালো যে জাপানিরা নিজেদের শুধরেছে। নিজেদের অপরাধের জন্য ক্ষমা চেয়েছে। ইউরোপিয়ানরা তো তাদের ঔপনিবেশিক নৃশংসতা নিয়ে কোনো কথাই বলতে চায় না। এখনো বিভিন্ন উপায়ে বিভিন্ন দেশের রাজনীতিতে নাক গলায়। আবার নিজেদের মানবতার ধ্বজাধারী হিসেবেও দাবি করে। চরম ভণ্ডামি যাকে বলে আর কি!

যুদ্ধ শেষে পাতাল জেলের আশপাশে প্রায় ৬০০ মানুষের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল। ফিলিপিনোদের পাশাপাশি ছিলেন আমেরিকান সেনারাও। সেই সব অচেনা মানুষের সম্মিলিত কবরের ওপর আজ একটি সাদা ক্রস দাঁড়িয়ে আছে। লোহার গ্রিলঘেরা সেই স্মৃতিচিহ্নের সামনে এখনো কেউ কেউ এসে নীরবে দাঁড়ান, প্রার্থনা করেন। হয়তো তারা পরিচিত কাউকে স্মরণ করেন, হয়তো শুধু মানুষের প্রতি মানুষের দায়বদ্ধতাটুকু পালন করেন।
কারাগারের অন্ধকার থেকে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতেই যেন এক অন্য জগতে এসে পৌঁছালাম। নিচের গুমোট পরিবেশ মুহূর্তে মিলিয়ে গেল পাসিগ নদীর শীতল বাতাসে। সামনে নদী, তার ওপারে ম্যানিলা শহর আর আকাশজুড়ে বিকেলের আলো। অর্ধচন্দ্রাকৃতির প্রতিরক্ষাব্যবস্থাটির নাম মিডিয়া নারাঞ্জা, অর্থাৎ ‘অর্ধেক কমলা’। নামের মধ্যেও যেন স্প্যানিশ শাসনের একটি রোমান্টিক ছাপ রয়ে গেছে।
ইতিমধ্যে সূর্য পশ্চিমে হেলে পড়েছে। জিন বারবার তাড়া দিচ্ছিল; আর দেরি করলে ম্যানিলা উপসাগরের সূর্যাস্ত মিস হয়ে যাবে; কিন্তু দুর্গ থেকে বেরিয়ে আসার সময় মনটা অদ্ভুত এক বিষণ্ণতায় ভরে উঠল। ছোট্ট এই দুর্গকে ঘিরে কতশত গল্প, কত স্বপ্নভঙ্গ, কত কান্না আর কত রক্তের ইতিহাস। এখানে যাঁরা মারা গেছেন, তাঁদের প্রত্যেকেরই ছিল আলাদা জীবন, আপন মানুষ, অসমাপ্ত আশা। সময় তাঁদের নাম ভুলে গেছে; কিন্তু মাটি এখনো তাঁদের স্মৃতি বহন করে চলেছে। দুর্গের প্রাচীরের দিকে শেষবারের মতো তাকিয়ে মনে হলো, হয়তো ইতিহাস কখনো পুরোপুরি অতীত হয়ে যায় না। কিছু কিছু জায়গায় সে এখনো নিঃশব্দে বেঁচে থাকে।

ডলোমাইট সৈকতে পৌঁছেও সেই অনুভূতি আমাকে ছাড়ল না; বরং সৈকতটি দেখে কিছুটা হতাশই হলাম। এক কিলোমিটারের কম দৈর্ঘ্যের কৃত্রিম উপকূল, মাত্র কয়েক বছর আগে তৈরি। কক্সবাজারের অনন্ত বিস্তৃত বালুকাবেলায় মুগ্ধ হওয়া চোখে এ সৌন্দর্য খুব একটা ধরা পড়ল না। তবু সূর্যাস্তের সময় জায়গাটির আলাদা এক আবহ ছিল।
অস্তগামী সূর্য যখন আকাশকে রাঙিয়ে তুলছিল লাল ও কমলার আবিরে, আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম সৈকতের কিনারে। সামনে ম্যানিলা উপসাগর, অথচ মন পড়ে আছে সান্তিয়াগো দুর্গে। বারবার মনে হচ্ছিল, ইতিহাসের সেই তীর্থভূমিতে যদি আরেকটু সময় কাটানো যেত! কিছু জায়গা শুধু দেখা হয় না, অনুভব করা হয়। সান্তিয়াগো দুর্গ আমার কাছে তেমনই এক জায়গা, যেখানে পাথরের দেয়ালগুলোও যেন মানুষের গল্প বলে।
ছবি: লেখক