
‘তুমি সেই দলের মানুষ, সারা আকাশ যাদের ঘরের ছাদ, সারা পৃথিবী যাদের পায়ে চলার পথ।’ –ডিয়েগো আলভারেজ
বিভূতিভূষণের চাঁদের পাহাড়-এর কাল্পনিক চরিত্র পর্তুগিজ অভিযাত্রী ও স্বর্ণসন্ধানী ডিয়েগো আলভারেজের এই কথাটা শঙ্করের মতো বাবরকেও সাদা পাহাড় চূড়ায় যেতে হাতছানি দিয়েছিল সেই ছেলেবেলায়। বইয়ের ভেতর বুঁদ হয়ে পথের পাঁচালীর অপুর মতো পাহাড় থেকে পাহাড়ে আর গভীর অরণ্যে ঘুরে বেড়াত তাঁর অভিযাত্রী মন। সমরেশ মজুমদারের গর্ভধারিণীর জয়িতা, কল্যাণ, আনন্দ এবং সুদীপের সঙ্গে কাঞ্চনজঙ্ঘা, সান্দাকফু হিমালয়ের পাদদেশে ভারত ও ভুটানের এক সীমান্তে সভ্যতার আলোর বাইরে সুবিধাবঞ্চিত একটি গ্রাম বাবরকে টেনেছে। নিয়ে গেছে প্রকৃতির কাছে, সাদা পাহাড়ে। এখনকার মতো সোশ্যাল মিডিয়া থেকে নয়, পাহাড় জয়ের স্বপ্ন তিনি দেখা শুরু করেছেন ছেলেবেলার উপন্যাস পড়তে গিয়েই।

এভাবেই বড় হয়ে শুরু হয় সাদা পাহাড়ের অভিযান। আর সে ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের ছেলে বাবর আলী জয় করলেন এভারেস্ট পর্বতশৃঙ্গ। সেই থেকে সবার উচ্ছ্বাস যেন বাঁধ ভেঙেছে চট্টগ্রাম নিবাসী এই অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমী চিকিৎসককে ঘিরে। পাহাড়ে অভিযান কেন করেন, জানতে চাইলে বাবর জানালেন, মনের আনন্দ আর ভালোবাসা থেকেই তাঁর ভালো লাগে পাহাড়ে চড়তে। ২০১৬ সাল থেকে কেয়াঞ্জিন রি, সারগো রি, সুরিয়া পিক, মাউন্ট ইয়ানাম, মাউন্ট ফাব্রাং, মাউন্ট সিসিকেএন, মাউন্ট শিবা, মাউন্ট রামজাক, আমা দাবলাম, চুলু ফারইস্ট, চুলু ইস্টের মতো দুর্গম পাহাড় চূড়া উতরে গেছেন মনের আনন্দে। সে নেশাই কাজ করেছে পরপর মাউন্ট এভারেস্ট আর মাউন্ট লোৎসে জয়ের ক্ষেত্রেও। স্বপ্নচারী বাবর জানালেন, পাহাড়ে যান তিনি আত্মিক ভালোবাসার টানে। হেসে বললেন, যেদিন মনে হবে পাহাড় আর আমাকে টানছে না, সেদিন থেকে আর পাহাড়ে যাব না।

অভিযানে যাওয়ার আগে মনের ভেতর কী চলছিল জানতে চাওয়া হলো। বাবর বললেন, ‘আমি আত্মবিশ্বাসী ছিলাম মানসিক ও শারীরিকভাবে। ভেবেছি প্রকৃতি যদি কোনো বিপত্তি না ঘটায়, তবে আমি চূড়া জয় করবই। ভয় বিষয়টা আসলেই কাজ করেনি একদম। স্বয়ং প্রকৃতি যার সঙ্গে আছে, সেই অদম্য অভিযাত্রীকে আসলেই আটকানো যায় না। বাবর তার প্রমাণ।’
বাবরের সঙ্গে গল্প করতে করতে মনে হচ্ছিল পাহাড়ের সংকীর্ণ খাদগুলোর কাছাকাছি যেন আমিও ঘুরে বেড়াচ্ছি। তাঁর বয়ানে জানা গেল, এভারেস্টের চেয়ে মাউন্ট লোৎসে আসলে হিসাব করলে বেশ কঠিন। এভারেস্ট যাওয়ার পথে একটা অংশ মাউন্ট লোৎসে হয়ে যেতে হয়। এভারেস্টের পথে ক্যাম্প ৩ থেকে ৪-এ যাওয়ার পথটা সবচেয়ে কঠিন মনে হয়েছে তাঁর কাছে। সেখানে অক্সিজেন মাস্ক পরতে হয়েছিল। কথার ছলে বাবর জানালেন, অক্সিজেন আগে কখনো ব্যবহার করা হয়নি। পেশাগত কারণে চিকিৎসক হিসেবে রোগীর প্রেসক্রিপশনে লিখেছেন। এই প্রথম নিজেকে ব্যবহার করতে হয়েছে। সেটা এক অন্য রকম অভিজ্ঞতা। কারণ শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল, গল্পের ধারাবাহিকতায় জানালেন, মাউন্ট লোৎসে যাওয়ার পথে ফেস ক্লাইম্বিং করার প্রয়োজন হয় ও কুলোয়া বা সংকীর্ণ গিরিখাতে একদম পাহাড়ের গা ঘেঁষে হেঁটে যেতে হয়। সেখানে তুষার ঝড় হতে পারে। আবার হুট করেই অ্যাভালাঞ্চ বা তুষার ধস হতে পারে। সেই শঙ্কা মাথায় নিয়েই একটা রোমাঞ্চ নিয়ে এগিয়ে চলা। বাবর বললেন, সবচেয়ে দারুণ বিষয় ছিল মাউন্ট লোৎসেতে পরের দিন পূর্ণিমা। তাই চাঁদের আলোয় সব মায়াময় লাগছিল। হেড লাইটের আলো কমিয়ে সেই আলোয় পাহাড়চূড়ায় আরোহণ খুব বেশি উপভোগ করেছি বললেন বাবর।


কথা প্রসঙ্গে জানা গেল, এভারেস্টের শেষ ধাপ পার করার আগে খুব কম মানুষের সঙ্গেই যোগাযোগ হচ্ছিল। পরিবারের সদস্য আর খুব কাছের কিছু মানুষ ছাড়া কারও সঙ্গে কথা হয়নি। দেশে যে এত মানুষ এভাবে অপেক্ষা করছেন উত্তেজনা নিয়ে, সে বিষয়ে একেবারেই ধারণা ছিল না বাবরের। বললেন, আসলে পর্বতারোহণ একধরনের ব্যক্তিগত স্পোর্টস বলা যায়। অনেকেই এতে আগ্রহী নয় বা বিষয়টা বুঝতে পারে না। পৃথিবীর কোন প্রান্তে কে দুর্গম পাহাড়ে উঠল, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের আগ্রহ কম, কারণ এটা ফুটবল বা ক্রিকেটের মতো ওপেন স্পোর্টস না। সবাই দেখতে পায় না। কিন্তু যারা বোঝে তারা জানে বিষয়টি কতখানি ঝুঁকিপূর্ণ। বাবরের এই অভিযানের পর নতুন করে আগ্রহ তৈরি হয়েছে সবার এ নিয়ে।
.jpeg?w=640&auto=format%2Ccompress&fmt=webp)
কেউ যদি এভারেস্টে যেতে চায়, পাহাড়ে অভিযানে যেতে চায় তাদের জন্য পরামর্শ চাইলে বাবর বললেন, পর্বতারোহী হওয়ার প্রাথমিক মূলমন্ত্র হচ্ছে থ্রি এম। এর অর্থ হলো মাইন্ড বা মন, মাসল ইন্ডিউরেন্স বা পেশির সহিষ্ণুতা আর মানি বা অর্থায়ন। এই তিনটি বিষয় ঠিক থাকলে পাহাড়ে যাওয়া সম্ভব। বাবর বললেন, মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকলেন, অর্থের জোগান হলো। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ইন্ডিউরেন্স বা সহিষ্ণুতা। বাবরের বয়ানে, ইন্ডিউরেন্স বাড়ানোর জন্য প্রস্তুতি অনেক গুরুত্বপূর্ণ। আমি যা যা করেছি, তা হলো দৌড়, ক্রস ট্রেনিং হিসেবে সাইক্লিং, প্রাণায়াম, হিট ওয়ার্ক আউট, কার্ডিও, কোর মাসল এক্সারসাইজ। এগুলো যদি ঠিকমতো করা যায়, তাহলে পাহাড়ে ওঠা অনেক বেশি সহজ হয়ে যায়। এভাবে আপনি তা উপভোগ করতে পারবেন।

৫০০০ মিটার পাহাড় দিয়ে একজন অভিলাষী পর্বতারোহী শুরু করতে পারেন নিজের অভিযাত্রা। বাবর আরও বললেন, নো মাউন্টেন ইজ টু হাই অর্থাৎ কোনো পাহাড়ই সাধ্যের বাইরে উঁচু নয়, এই কথাটা আমি খুব মানি ও বিশ্বাস করি। সঠিক প্রস্তুতি থাকলে যেকোনো পাহাড়ে আরোহণ করা সম্ভব। এই প্রসঙ্গে বিখ্যাত জাপানি সাহিত্যিক হারুকি মুরাকামির বিখ্যাত বই হোয়েন আই টক অ্যাবাউট রানিং-এর একটা কথা যেকোনো পর্বতারোহীর প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে মূলমন্ত্র হিসেবে কাজ করতে পারে। এটি হচ্ছে পেইন ইজ ইনেভিটেবল অ্যান্ড সাফারিং ইজ অপশনাল। অর্থাৎ ব্যথা তো হবেই, কিন্তু ব্যথায় কাতর হওয়া না-হওয়া নিজের কাছে। এই কথাটি পুরো সময়ে বাবর আলী সব সময় মাথায় রেখেছেন।
এভারেস্ট পর্বতশৃঙ্গ আরোহণ করতে যাওয়া খুব ব্যয়বহুল। এ ক্ষেত্রে পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়া দুরূহ হয়ে যায়। এ জন্য সবার মানসিকতার আমূল পরিবর্তন করতে কী করা যায়, এ প্রশ্নে বাবর জানালেন, বিগত সব অভিযান তিনি নিজের জমানো অর্থেই করেছেন। এই প্রথম স্পনসর নিয়েছেন। এটা করতে গিয়ে তাঁর মনে হয়েছে যাঁরা পৃষ্ঠপোষক আছেন, তাঁরা যেমন এই ক্ষেত্রে অর্থ ব্যয় করতে চান না, তেমনি যিনি পর্বতারোহী আছেন, তিনি সঠিকভাবে প্রপোজালটা তৈরি করছেন কি না, সেটাও একটা বিষয়।

সঠিকভাবে প্রপোজাল তৈরি করে অর্থলগ্নি ও পৃষ্ঠপোষকতাকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছে যদি পৌঁছানো যায়, তবে অর্থ পাওয়া সম্ভব। এই অভিযানেই বাবর শিখেছেন কীভাবে প্রেজেন্টেশন বানাতে হয়। তিনি বলেন, এটা আসলে একটা আর্ট, যেটা পর্বতারোহীদের শিখে নেওয়া খুব দরকার। যাঁরা আউটডোর অ্যাক্টিভিটি করছেন বা আয়রনম্যান, সাইক্লিং, রানিং, এক্সট্রিম স্পোর্টস করছেন, সবার শিখতে হবে এগুলো।
.jpeg?w=640&auto=format%2Ccompress&fmt=webp)
পরবর্তী গন্তব্য কোথায় ঠিক করেননি বাবর, তবে আরও আট হাজার মিটারের পাহাড়ে তিনি চড়বেন, সে আশাবাদ ব্যক্ত করেন। ডাক্তার বাবর আলী কি তাহলে রোগী দেখা ছেড়ে একেবারে পাহাড়বাসী হয়ে গেলেন কি না, এ প্রশ্নে বাবর হেসে বললেন, জীবিকার একমাত্র উপায় যেহেতু এটা, তাই অবশ্যই চিকিৎসক পেশায় থাকছেন। মানুষের কল্পনাতীত ভালোবাসা নিয়ে এভারেস্ট চূড়ায় উঠেছেন বাবর। তাঁর হাতের প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল, সব মানুষের ভালোবাসা নিয়ে তাঁদের সঙ্গে করেই এখানে এসেছেন। কারণ ২৫ টাকা থেকে শুরু করে ১ লাখ টাকা, সবাই কিছু না কিছু দিয়েছেন। তাই তাঁরা সবাই এই অভিযানের অংশ বলে মনে করেন বাবর। পরবর্তী অভিযানে এই নির্ভীক পর্বতারোহী চান, শুধু অর্থ দিয়ে নয়, ভালোবাসা দিয়ে সবাই তাঁর পাশে থাকুক আর পৃথিবীর সুউচ্চ দুর্গম প্রান্তে উড়ুক লাল-সবুজের পতাকা।