
গ্রেসমিয়ার, ক্যাসলরিগ স্টোন আর ডেরওয়েন্ট ওয়াটার ঘুরে কটেজে ফিরতে ফিরতে বিকেল গড়িয়ে গেছে। আমাদের ভ্রমণের একটা অলিখিত নিয়ম আছে—যেখানে যা পাওয়া যায়, তা–ই খাওয়া; কিন্তু এবার যেহেতু প্রায় জনমানবহীন পাহাড়ি এলাকায় চার দিন কাটানোর পরিকল্পনা, তাই আগেভাগেই কিছু রসদ সঙ্গে করে এনেছিলাম—চাল, ডাল, আলু, তেল, ডিম আর সুপারমার্কেটের ছোট ছোট কৌটোয় পাওয়া কিছু মসলা।

দুই দিন পর গরম ভাতের সঙ্গে ডিম–আলুর ঝোলকেই মনে হলো অমৃত।
পরদিন আবার পাখির কূজনে ঘুম ভাঙল। সকালের নাশতা শেষে কটেজের পেছনের ট্রেইল ধরে গিলপিন নদীর তীর বরাবর হাঁটতে বেরোলাম। ছোট ছোট পাহাড়ি উপত্যকা, হিমেল সকালের বাতাস, ঘাসের ওপর শিশির, সকালটা যেন হাঁটার জন্যই তৈরি হয়েছিল।
হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ মনে হলো, এমন সকাল তো আমি আগেও দেখেছি। অনেক দূরে, অন্য এক দেশে। সিলেটের সীমান্তবর্তী কানাইঘাটে মামাবাড়ির সেই দিনগুলো। বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হলে আমরা দুই ভাই মায়ের সঙ্গে চলে যেতাম মামাবাড়ি। মাসখানেকের সেই ছুটিতে নীল দিগন্ত গিয়ে মিশত খাসিয়া পাহাড়ের চূড়ায়। মেঘেরা ঘুমিয়ে থাকত পাহাড়ের খাঁজে; আর পাহাড়ি হিমেল বাতাসে প্রতিটি ভোর যেন শুরু হতো এক অদৃশ্য উৎসব দিয়ে। পাহাড়ের পাদদেশে পৌষের চরপড়া সুরমা নদী, তার হাঁটুজলের ওপর সকালের সূর্যের ঝিকিমিকি, আজ হঠাৎ গিলপিনের জলে এসে ফিরে এল।

কী আশ্চর্য এই জীবন! এক দেশের নদী আরেক দেশের নদীর সঙ্গে মিশে যায় স্মৃতির ভেতরে। কৈশোরের একটি সকাল, বহু দূরের কোনো পাহাড়, মায়ের হাত ধরে কাটানো ছুটি, সবকিছু যেন অন্য জন্মের কোনো উপন্যাসের পৃষ্ঠা। আর সেই পৃষ্ঠাই আজকের জীবনের মহাকাব্যের সঙ্গে এসে জুড়ে গেল। পাহাড়ের উপত্যকায় মৌনী ছবি আঁকতে বসে গেল; আর আরুষি ও আরিয়া গলা ছেড়ে গাইতে শুরু করল রবীন্দ্রনাথের—
‘ফাগুন হাওয়ায় হাওয়ায় করেছি যে দান…’
পাহাড়ের নৈঃশব্দ্য ভেঙে পেনসিলের খসখস শব্দ, শিশুকণ্ঠের রবীন্দ্রসংগীত আর গিলপিনের জলধারা, মুহূর্তটিকে বাস্তবের চেয়ে বেশি কোনো কিছুর মতো মনে হচ্ছিল। ধীরে ধীরে আমরা কটেজের দিকে ফিরলাম। দুপুরের খাবার খেয়ে আবার বেরোতে হবে। আজকের গন্তব্য অ্যাম্বলসাইড, উইন্ডারমেয়া এবং দিনের শেষে কেন্ডাল।
প্রায় দুই হাজার বছরের পুরোনো অ্যাম্বলসাইডের ইতিহাসে রোমানদের পদচিহ্ন রয়েছে। পরে এই অঞ্চলে এসেছিল ভাইকিংরাও। পাহাড়, হ্রদ আর প্রাচীন বসতির এই মেলবন্ধন শহরটিকে দিয়েছে এক অদ্ভুত চরিত্র। অ্যাম্বলসাইডের পরিচিত স্থাপনা ব্রিজ হাউসে কিছুক্ষণ থামলাম। সপ্তদশ শতাব্দীর এই ছোট্ট পাথরের বাড়িটি আজ যেন শহরের দীর্ঘ ইতিহাসের একটি ক্ষুদ্র স্মারক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

তারপর মিনিট বিশেকের পথ পেরিয়ে পৌঁছলাম লেক উইন্ডারমেয়ারে। লেক ডিস্ট্রিক্টের এই বিশাল হ্রদটির সামনে দাঁড়ালে মনে হয়, কোনো হ্রদ নয়, পাহাড়ের মাঝখানে নীল কোনো সমুদ্র এসে থেমে আছে। তিন দিকের পাহাড় নেমে এসে জলের সঙ্গে মিশেছে। দূরের পাহাড়ের প্রতিবিম্ব জলে এসে ভেঙে যাচ্ছে, আবার তৈরি হচ্ছে। কখনো মনে হলো স্কটল্যান্ডের লচ লমন্ডের কথা, কখনো ওয়েলসের হ্রদ লিন পাডানের কথা; কিন্তু উইন্ডারমেয়ারের নিজস্ব সৌন্দর্য আলাদা—শান্ত, বিস্তৃত ও গভীর।
ততক্ষণে বিকেল প্রায় পাঁচটা। আরুষির উত্তেজনা তখন তুঙ্গে। কারণ, আজকের দিনের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ এখনও বাকি—সূর্যগ্রহণ। ডক্টর বিয়াংকার কাছ থেকে সে আগেই জেনে নিয়েছে, চাঁদ, সূর্য আর পৃথিবী আজ প্রায় একই সরলরেখায় আসবে। পৃথিবী থেকে দেখলে মনে হবে, চাঁদ এসে সূর্যের মুখ ঢেকে দিয়েছে।

তার প্রস্তুতিও কম নয়। খালি চোখে তাকানো যাবে না, সাধারণ সানগ্লাসেও নয়। তাই আমাদের সঙ্গে তিন জোড়া সোলার একলিপ্স চশমা। আমরা এবার রওনা দিলাম কেন্ডালের দিকে। কেন্ডাল ক্যাসলের উঁচু প্রাঙ্গণে তখন মানুষের ভিড়। সবাই আকাশের দিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করছে। অবশেষে সেই মুহূর্ত এল। চাঁদের ছায়া ধীরে ধীরে সূর্যের ওপর এসে পড়ল।
চারপাশের আলো বদলে গেল। দিনের মাঝখানে যেন সন্ধ্যার আভা। সূর্যের উজ্জ্বল মুখ ক্রমে আড়াল হয়ে গেল পৃথিবীর একমাত্র প্রাকৃতিক উপগ্রহের পেছনে। মানুষ নিঃশব্দে তাকিয়ে রইল, আমিও। ভাবছিলাম— প্রায় সাড়ে চার বিলিয়ন বছর আগে পৃথিবীর সঙ্গে থিয়া নামের মঙ্গল গ্রহ আকারের এক মহাজাগতিক বস্তুর সংঘর্ষের পর ছিটকে যাওয়া পদার্থ থেকে ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছিল চাঁদ। তারপর পৃথিবীর মহাকর্ষ তাকে নিজের কক্ষপথে ধরে রেখেছে। সেই চাঁদই আজ সূর্য আর পৃথিবীর মাঝখানে এসে কয়েক মুহূর্তের জন্য সূর্যের আলো আটকে দিল।


আসলে মহাবিশ্বের বিশালতার সামনে মানুষের অস্তিত্ব কত ক্ষুদ্র! আমরা যে পৃথিবী নিয়ে এত অহংকার করি, যে পৃথিবীর সীমানা নিয়ে এত যুদ্ধ করি, এত বিভাজন করি, এত দম্ভ করি, সেটি আসলে মহাকাশের অসীমতায় এক ক্ষুদ্র গ্রহ মাত্র। মহাকাশযান ভয়েজার ওয়ান যখন বহুদূর থেকে পৃথিবীর ছবি তুলেছিল, জ্যোতির্বিজ্ঞানী কার্ল সাগান সেই ছবির দিকে তাকিয়ে পৃথিবীকে বলেছিলেন, ‘a pale blue dot’—একটি ফ্যাকাশে নীল বিন্দু। সেই বিন্দুর ওপর দাঁড়িয়েই আমাদের এত অহংকার! অথচ সূর্য, চাঁদ, পৃথিবী—এই তিন মহাজাগতিক শরীরের সামান্য অবস্থানগত পরিবর্তনই আমাদের দিনের আলো বদলে দিতে পারে।
তবু ভয় পাওয়ার কারণ নেই। চাঁদ সূর্যের সামনে স্থির হয়ে থাকে না। তার কক্ষপথে সে চলতে থাকে। তাই সূর্যগ্রহণ সাময়িক, পৃথিবী চিরকাল অন্ধকারে ডুবে যাবে না। অবশেষে চাঁদের ছায়া ধীরে ধীরে সরে গেল। সূর্য আবার তার স্বাভাবিক আলো ফিরে পেল। সন্ধ্যার আকাশে দিনমণি তখন আরও গাঢ় লাল আভা ছড়িয়ে অস্ত যেতে শুরু করেছে। আমরাও ফিরলাম গিলপিন ভিউয়ের পথে।


রাতের দীর্ঘ ঘুম শেষে সকালে আর কোনো নতুন গন্তব্যের প্রস্তুতি নেই। এবার সত্যিই ঘরে ফেরার পালা। গাড়িতে লাগেজ তোলা হলো। শেষবারের মতো তাকালাম গিলপিন নদীর দিকে। কত অল্প সময়ে একটি জায়গা কীভাবে মানুষের আপন হয়ে যায়! যে নদীকে প্রথম দিন শুধু একটি পাহাড়ি জলধারা মনে হয়েছিল, বিদায়ের দিনে তার শব্দের মধ্যেও যেন পরিচিত কারও কণ্ঠ শুনতে পেলাম। ফেরার পথে প্রথম যাত্রাবিরতি টিবে–তে। তারপর আরও দুটি বিরতি। পথ দীর্ঘ, কিন্তু মন তখন আর ক্লান্ত নয়। কারণ, সামনে অপেক্ষা করছে প্রিয় মানুষদের সঙ্গে দেখা।
দুপুরে পৌঁছালাম লেস্টারে নাজমুল আলবাব অপুর বাসভবনে। অপু ভাইয়ের সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজন, তুলি ভাবির হাতের স্যামন পাতুরি, কোরমা, পোলাওসহ প্রতিটি রান্না ছিল অসাধারণ। গল্প আর আড্ডায় কেটে গেল কিছুটা সময়। ভ্রমণের পথে হঠাৎ পাওয়া এমন আপনজনের উষ্ণতা কখনো কোনো দর্শনীয় স্থানের চেয়ে কম আনন্দের নয়।

তারপর আবার গাড়িতে উঠলাম। শেষ গন্তব্য—কেমব্রিজ নর্থ।
পাঁচ দিনে প্রায় এক হাজার মাইল গাড়ি চালানো হলো। আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ, প্রতি ঘণ্টায় বদলে যাওয়া দৃশ্যপট, নীল হ্রদ, সবুজ পাহাড়, প্রাচীন পাথর, নদীর শব্দ, সূর্যগ্রহণ, পুরোনো বন্ধুত্ব, নতুন কিছু মানুষের সঙ্গে পরিচয় আর অসংখ্য ছোট-বড় স্মৃতি—সব মিলিয়ে এই যাত্রা হয়ে রইল জীবনের আরেকটি সম্পূর্ণ অধ্যায়। সবচেয়ে বড় কথা, বাচ্চাদের নিয়ে নিরাপদে বাড়ি ফিরেছি।
. . . . অতঃপর, একসময় মোটরওয়ের পাশে চোখে পড়ল সেই পরিচিত সাইনবোর্ড— কেমব্রিজ।
আমরা সবাই গলা ছেড়ে গেয়ে উঠলাম জন ডেনভারের প্রিয় গান—
‘Country roads, take me home…’
আসলে মানুষ যত দূরেই যাক, যত পাহাড়-পর্বত পেরিয়ে আসুক, যত নতুন শহর, নদী আর হ্রদ আবিষ্কার করুক, ফিরে আসার আনন্দের সঙ্গে অন্য কোনো আনন্দের তুলনা চলে না। দূরে গেলে পৃথিবীটা বড় হয়ে ওঠে, দিগন্ত প্রসারিত হয়, অচেনা পথ পরিচিত হয়ে যায় আর নিজের পৃথিবীটাও নতুন করে দেখা হয়। তবে দিন শেষে, দীর্ঘ পথ পেরিয়ে যখন পরিচিত শহরের নাম চোখে পড়ে, তখন ছোট্ট পৃথিবীটাই সবচেয়ে আপন হয়ে ওঠে।
কেমব্রিজ।
আমাদের ঘর। আবার ফিরে এলাম। আর পেছনে পড়ে রইল উত্তরের সেই পাহাড়, গিলপিনের ক্ষীণ জলধারা, ডারওয়েন্টওয়াটারের নীল জল, ক্রাসলরিগের পাঁচ হাজার বছরের নীরবতা আর অসংখ্য পথের স্মৃতি।
ভ্রমণ শেষ হয়েছে; কিন্তু পথ?
পথ কখনো শেষ হয় না।
কোনো এক ভোরে আবার হয়তো কোনো অচেনা নদীর শব্দে ঘুম ভাঙবে, আবার মনে হবে, চলো, বেরিয়ে পড়ি।
লেখক: ড. অসীম চক্রবর্তী, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও বায়োমেডিক্যাল ইনফরমেটিকস বিষয়ের শিক্ষক ও গবেষক, এংলিয়া রাসকিন বিশ্ববিদ্যালয়, কেমব্রিজ, যুক্তরাজ্য।
ছবি: লেখক