সীমান্ত শহর বাটুমি: যেখানে একাকার সাগর, দুর্গ, প্রেমের কিংবদন্তি আর ইতিহাস
শেয়ার করুন
ফলো করুন

কৃষ্ণসাগরের তটরেখা ও তার জলরাশির প্রতি আমার এক অদ্ভুত এবং দুর্নিবার আকর্ষণ রয়েছে। ২০১৯ সালে তুরস্কের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর ট্রাবজোন ভ্রমণের সময় সেই ভালো লাগার সূত্রপাত। সামসুন থেকে অরদু, গিরেসুন হয়ে রিজে পর্যন্ত বিস্তৃত যাত্রাপথে প্রকৃতির যে অকৃপণ রূপ দেখেছি, সেদিন থেকেই কৃষ্ণসাগরের প্রেমে আমি আকণ্ঠ নিমজ্জিত। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কালজয়ী গান ‘কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি’—এর প্রকৃত মর্মার্থ যেন সেদিনই আমার হৃদয়ে ধরা দিয়েছিল।

কৃষ্ণসাগরের তীরে অবস্থিত বাটুমি জর্জিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম নগরী, জর্জিয়ার একমাত্র সমুদ্রবন্দর এই বাটুমিতেই
কৃষ্ণসাগরের তীরে অবস্থিত বাটুমি জর্জিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম নগরী, জর্জিয়ার একমাত্র সমুদ্রবন্দর এই বাটুমিতেই

সাগরের উত্তাল ঢেউ আর উপকূলীয় প্রকৃতির মিতালিতে যে স্বর্গীয় দৃশ্যপটের জন্ম হয়, তা স্মৃতিপটে চিরস্থায়ী হয়ে আছে। ট্রাবজোনের সেই সুখস্মৃতিকে সম্বল করেই ২০২১ সালে গন্তব্য ঠিক করি জর্জিয়ার বাটুমি। ইউরোপ ও এশিয়ার মোহনায় অবস্থিত ছোট্ট অথচ নান্দনিক দেশ জর্জিয়া। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসা এ দেশটি অপেক্ষাকৃত নবীন হলেও এর জনবসতির ইতিহাস সহস্রাব্দের পুরোনো।

বিজ্ঞাপন

স্লোভেনিয়ার রেসিডেন্স পারমিট থাকায় জর্জিয়া ভ্রমণে ভিসার ঝক্কি পোহাতে হয়নি, ইমিগ্রেশনে কেবল অ্যারাইভাল সিলই যথেষ্ট ছিল। স্লোভেনিয়া থেকে সরাসরি ফ্লাইট না থাকায় ভিয়েনা হয়ে জর্জিয়ার তৃতীয় বৃহত্তম শহর কুতাইসিতে পা রাখি।

ম্যাচাখেলা ন্যাশনাল পার্কের প্রবেশপথে জর্জিয়ার স্বাধীনতা আন্দোলনকে স্মরণ করে নির্মিত ভাস্কর্য
ম্যাচাখেলা ন্যাশনাল পার্কের প্রবেশপথে জর্জিয়ার স্বাধীনতা আন্দোলনকে স্মরণ করে নির্মিত ভাস্কর্য

ভৌগোলিক কারণে জর্জিয়ানদের অবয়বে ককেশীয়, তুর্কি ও রাশান ছাপ স্পষ্ট। বিশেষ করে জর্জিয়ান নারীরা অনিন্দ্যসুন্দর; তাঁদের রূপ–লাবণ্য ও শারীরিক গড়ন সত্যিই নজর কাড়ে। তবে নারীদের তুলনায় জর্জিয়ান পুরুষেরা খুব একটা সুঠাম দেহের অধিকারী নন। একটি বিষয় বেশ কৌতূহলোদ্দীপক—এখানকার অধিকাংশ প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের মাথায় চুলের ঘনত্ব বেশ কম এবং মুখাবয়ব খানিকটা গোলাকার।
ইমিগ্রেশনে বাংলাদেশি পাসপোর্ট দেখে খানিকটা বিপত্তি বাধলেও, হোটেল বুকিং, রিটার্ন টিকিট এবং মডার্নার ভ্যাকসিনেটেড সনদ প্রদর্শনের পর ঝটপট ছাড়া পাই।

বিজ্ঞাপন

করোনার সময় হওয়ায় স্বাস্থ্যবিধি মানার কড়াকড়ি ছিল। প্রথম রাতটা কুতাইসিতেই কাটে। পরদিন মিনিবাসে চড়ে বাটুমির উদ্দেশে যাত্রা। স্বীকার করতেই হবে, জর্জিয়ার অবকাঠামো এখনো পুরোপুরি ইউরোপীয় মানের হয়ে ওঠেনি। কুতাইসি থেকে বাটুমির তিন ঘণ্টার যাত্রাপথ ছিল বেশ ক্লান্তিকর। কুতাইসি শহরটিতে এখনো যেন সোভিয়েত আমলের জরাজীর্ণতার ছাপ লেগে আছে। তবে বাটুমি পৌঁছানোর পর দৃশ্যপট পাল্টে যায়—সেখানে আধুনিকতা ও পরিচ্ছন্নতার ছাপ স্পষ্ট।

লেখকের সঙ্গে গাইড জিওর্জি
লেখকের সঙ্গে গাইড জিওর্জি

বাটুমিতে থাকার জন্য কেটি নামের এক ভদ্রমহিলার বাড়িতে রুম ভাড়া নিই। জর্জিয়ায় পর্যটন ব্যবস্থাপনা এখনো বেশ অপেশাদার। নামী ওয়েবসাইটের ছবির সঙ্গে বাস্তবের মিল পাওয়া দুষ্কর; কাঙ্ক্ষিত লোকেশন খুঁজে পেতেও অনেক সময় বেগ পেতে হয়। যাহোক, কেটির সহায়তায় পরিচয় হলো জিওর্জি নামের এক ট্যাক্সিচালকের সঙ্গে। ২২০ জর্জিয়ান লারির বিনিময়ে তিনি আমাকে বাটুমির প্রধান পাঁচটি দর্শনীয় স্থান ঘুরিয়ে দেখাতে রাজি হলেন। ইংরেজি না জানায় গুগল ট্রান্সলেটরই হলো আমাদের ভাব বিনিময়ের মাধ্যম।

বাটুমির প্রধান আকর্ষণই হলো কৃষ্ণসাগর। হাইড্রোজেন সালফাইডসহ সালফারের বিভিন্ন যৌগের উপস্থিতির কারণে কৃষ্ণসাগরের জলরাশি কালচে নীল বর্ণ ধারণ করে, মাঝেমধ্যে সাগরের তট বরাবর হাঁটলে সালফারের মৃদু গন্ধ পাওয়া যায়। তবে কৃষ্ণসাগরের তীরবিধৌত অঞ্চলগুলো বিভিন্ন ধরনের জীববৈচিত্র্যে পরিপূর্ণ; বিশেষ করে বসন্তের শেষে ও গ্রীষ্মের শুরুতে এসব অঞ্চল সবুজে ছেয়ে যায়। কৃষ্ণসাগরের পাড় বরাবর হেঁটে গেলে আমার ভেতর এক বিস্ময়কর অনুভূতি হয়। নদীর পরিষ্কার কাদা গায়ে মাখলে যে ধরনের অনুভূতির সৃষ্টি হয়, কৃষ্ণসাগরের পাড় দিয়ে হেঁটে গেলে আমিও ঠিক একই ধরনের অনুভূতি খুঁজে পাই। এক অজানা উন্মাদনায় নিজেকে হারিয়ে ফেলি এবং আমার কাছে এ ধরনের অনুভূতির স্বাদ নিতে বেশ ভালো লাগে।

মাখুন্টসেটি ওয়াটারফল
মাখুন্টসেটি ওয়াটারফল

আমাদের প্রথম গন্তব্য ছিল ম্যাচাখেলা ন্যাশনাল পার্ক। বাটুমি শহর থেকে প্রায় ২৫ মাইল দূরের এই পার্ক পাহাড়, হ্রদ আর নদীর এক অপূর্ব সংমিশ্রণ। পার্কের প্রবেশমুখে স্বাধীনতার স্মারক ভাস্কর্য পেরিয়ে আমরা এগিয়ে যাই। সময়স্বল্পতায় পুরোটা দেখা সম্ভব না হলেও মাখুন্টসেটি ও মিরভেটি জলপ্রপাত এবং স্খালটা নদীর ওপর ৯০০ বছরের পুরোনো পাথুরে সেতু দর্শনই ছিল চোখের আরাম। জর্জিয়া ওয়াইন ও মধুর জন্য বিখ্যাত; ওক ব্যারেল ছাড়া নিজস্ব পদ্ধতিতে তৈরি ওয়াইন এবং হাজার বছরের পুরোনো মধু চাষের ঐতিহ্য এখানকার গ্রামীণ অর্থনীতির প্রাণ।

এরপর আমরা ছুটি গোনিও ফোরট্রেসের দিকে। রোমান সম্রাট নিরোর আমল থেকে শুরু করে বিভিন্ন সময়ে এই দুর্গ ব্যবহৃত হয়েছে। এর প্রাচীন প্রকোষ্ঠগুলোতে কান পাতলে যেন ইতিহাসের ফিসফিসানি শোনা যায়। একসময় রোমান সৈন্যরা এ দুর্গের ভেতর নিজেদের আবাস গেড়েছিল।

জর্জিয়াসহ গোটা ককেশাস অঞ্চলে রোমান সাম্রাজ্যের যে কয়েকটি নিদর্শন রয়েছে তার মধ্যে এ গোনিও ফোরট্রেস অন্যতম
জর্জিয়াসহ গোটা ককেশাস অঞ্চলে রোমান সাম্রাজ্যের যে কয়েকটি নিদর্শন রয়েছে তার মধ্যে এ গোনিও ফোরট্রেস অন্যতম

দুর্গের ভেতরে প্রাচীন শস্যভান্ডার আর হাম্মামখানার ধ্বংসাবশেষ আজও সংরক্ষিত আছে। সেখান থেকে আরও দক্ষিণে, তুরস্ক সীমান্তের একদম গা ঘেঁষে অবস্থিত সারপি। চেকপোস্টের ওপারে উঁকি দিচ্ছে তুরস্কের মসজিদ আর পাহাড়। দুই দেশের সীমানায় দাঁড়িয়ে এক ফ্রেমে দুই পতাকার ছবি তোলার লোভ সামলানো দায়।

দুপুরের খাবারের জন্য জিওর্জির পরামর্শে চেখে দেখি ঐতিহ্যবাহী ‘আচারিয়ান খাচাপুরি’। খাচাপুরিকে অনেকে ভালোবেসে ‘জর্জিয়ান পিৎজা’ বলে ডাকেন। যদিও পিৎজার মতো এতে বাড়তি টপিং থাকে না, শুধু ময়দার খামির আর পনিরের মেলবন্ধনেই এটি তৈরি। জর্জিয়ার একেক অঞ্চলে খাচাপুরি তৈরির পদ্ধতি একেক রকম। আচারিয়ান খাচাপুরি অন্য সব খাচাপুরি থেকে বেশ আলাদা। এর দুই প্রান্ত কিছুটা সুচালো, যা দেখতে অনেকটা মাকুর মতো বা ছোট নৌকার মতো মনে হয়।

দুপুরের খাবার ছিল আচারিয়ান খাচাপুরি
দুপুরের খাবার ছিল আচারিয়ান খাচাপুরি

এ নৌকাকৃতি পাউরুটির ঠিক মাঝখানে থাকে পনিরের এক সমুদ্র, আর তার ওপর বসিয়ে দেওয়া হয় একটি আধসিদ্ধ ডিমের কুসুম। সস বা মেয়োনেজের পরিবর্তে এর সঙ্গে পরিবেশন করা হয় মাখন আর ক্রিম চিজ। গরম থাকতেই মাখন, চিজ আর ডিমের কুসুমকে চামচ দিয়ে ভালো করে মিশিয়ে নিতে হয়। অনেক সময় ওয়েটার নিজেই বাটার ব্রাশ করে দেন। এরপর খাচাপুরির এক পাশের অংশ থেকে শুরু করে পাউরুটি ছিঁড়ে সেই মিশ্রণে ডুবিয়ে মুখে পুরতেই এক অপার্থিব স্বাদ পাওয়া যায়। খাচাপুরির এই স্বাদ যেমন অনন্য, তেমনি এর চিজের ঘ্রাণে আমি বারবার আমাদের দেশের ঢাকাই পনির কিংবা অষ্টগ্রামের পনিরের সেই চিরচেনা স্বাদ খুঁজে পাচ্ছিলাম।

বিকেলে হাজির হই বাটুমি বোটানিক্যাল গার্ডেনে। ছয়টি মহাদেশের উদ্ভিদের বিশাল সংগ্রহশালা এই উদ্যান। শীতের রুক্ষতা সত্ত্বেও গাছগুলোর সজীব থাকার আপ্রাণ চেষ্টা চোখে পড়ার মতো। পাহাড়ের ওপর অবস্থিত এই গার্ডেন থেকে নিচে তাকালে দেখা যায় রেললাইন আর তার পাশেই কৃষ্ণসাগরের কালচে নীল জলরাশি—এক কথায় অনির্বচনীয়।

বোটানিক্যাল গার্ডেন থেকে এক অসাধারণ রূপে কৃষ্ণসাগর দেখা যায়
বোটানিক্যাল গার্ডেন থেকে এক অসাধারণ রূপে কৃষ্ণসাগর দেখা যায়
বাটুমিতে অবস্থিত একমাত্র জামে মসজিদের ভেতরের দৃশ্য;
বাটুমিতে অবস্থিত একমাত্র জামে মসজিদের ভেতরের দৃশ্য;

দিনের শেষটা কাটে বাটুমি বুলেভার্ডে। আধুনিক অট্টালিকা, লাইটহাউস আর বিশাল নাগরদোলায় সাজানো এই প্রাঙ্গণ। তবে কক্সবাজারের অবারিত বালুকাবেলার তুলনায় এখানকার পাথুরে সৈকত আমাকে কিছুটা হতাশই করেছে। কিন্তু সব আক্ষেপ ঘুচে যায় ‘আলী অ্যান্ড নিনো’র ভাস্কর্য দেখলে।

আজও আছে আলী ও নিনোর অমর ভালোবাসার এই প্রতীকী ভাষ্কর্য
আজও আছে আলী ও নিনোর অমর ভালোবাসার এই প্রতীকী ভাষ্কর্য

আজারবাইজানের মুসলিম যুবক আলী আর জর্জিয়ান রাজকুমারী নিনোর বিয়োগান্ত প্রেমের প্রতীক এই ভাস্কর্য। সাগরতীরে দাঁড়িয়ে তাঁদের একে অপরের সঙ্গে লীন হয়ে যাওয়ার দৃশ্য এক গভীর বিষাদ ও ভালোবাসার অনুভূতি জাগায়। ফেরার পথে দেখে নিই ১৮৮৬ সালে নির্মিত বাটুমির একমাত্র জামে মসজিদটি।

ছয় দিনের এই সফরে জর্জিয়ানদের খুব একটা বন্ধুসুলভ মনে হয়নি, বরং পর্যটকদের প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গি কিছুটা সুযোগসন্ধানী। অনেক ক্ষেত্রে পর্যটকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় বা আর্থিকভাবে প্রতারিত করার প্রচেষ্টাও চোখে পড়ে।

আধুনিক স্থাপত্যশৈলীর বিভিন্ন দালানকোঠায় সুসজ্জিত বাটুমি বুলেভার্ড
আধুনিক স্থাপত্যশৈলীর বিভিন্ন দালানকোঠায় সুসজ্জিত বাটুমি বুলেভার্ড

তবু বাটুমির প্রতি আমার ভালোবাসা ফিকে হয়নি। এর মূল কারণ, সেই কৃষ্ণসাগর। প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সখ্য চিরন্তন। নভোগর্ডের রাজকুমার জ্যাঙ্কোর মতো আমারও ইচ্ছা করে এই সাগরের তীরে বারবার ফিরে আসি, এর বিশালতার মাঝে নিজেকে হারিয়ে ফেলি।
লেখক: পর্যটক
ছবি: লেখক

প্রকাশ: ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৬: ০০
বিজ্ঞাপন