
ইস্তাম্বুলের সুলতানাহমেত হাগিয়া সোফিয়ার উল্টো দিকে অবস্থিত এই স্থাপনা। বাইরে থেকে দেখে বোঝার কোনো উপায় নেই এই সাধারণ দরজার নিচেই লুকিয়ে আছে দেড় হাজার বছরের ইতিহাস, জল, ছায়া আর কিংবদন্তিতে মোড়া এক বিস্ময়কর জগৎ। এটি ব্যাসিলিকা সিস্ট্রান, তুর্কি ভাষায় যাকে বলা হয় ইয়্যারেবাতান সারনিজি।

ভূগর্ভের এক গোপন জগতে নামার প্রাচীন দরজা। বাইরে থেকে সাধারণ এক দরজার মতো, কিন্তু ভেতরে নামলেই খুলে যায় ইস্তাম্বুলের পাতালপুরীর সহস্র বছরের ইতিহাস।ইস্তাম্বুল ভ্রমণের দ্বিতীয় দিন সন্ধ্যায় গিয়েছিলাম ব্যাসিলিকা সিস্ট্রানে। ১৫০০ লিরার টিকিট কেটে প্রবেশ করে ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে নামতে শুরু করলাম। নামার সঙ্গে সঙ্গেই চারপাশের পরিবেশ বদলে যেতে থাকল।

ওপরে শহরের কোলাহল হারিয়ে গিয়ে এক শীতল, অন্ধকার শান্ত পরিবেশ দিল ভিন্ন অনুভূতি। আলো রং বদলাচ্ছে, পানির ওপর পড়ছে নরম আলো, তৈরি হচ্ছে প্রতিফলনের মায়াবী খেলা। ছাদের অন্ধকার থেকে টুপটাপ করে পানি পড়ার শব্দ সব মিলিয়ে অনুভূতিটা একদিকে গা ছমছমে, আবার অন্যদিকে অদ্ভুত রকমের মুগ্ধতা জাগানো।

কয়েকটি লাইনে ধরা এক বিশাল ইতিহাস। ছোট্ট এই ফলকই দর্শনার্থীকে প্রস্তুত করে ভূগর্ভের বিস্ময় দেখতে। হ্যাড্রিয়ানাসের জলপথ, থ্রেস অঞ্চলের নদী-নালা এবং বেলগ্রাদ অরণ্য থেকে আনা জল এখানে জমা হতো। সেখান থেকে পানি পৌঁছে যেত সম্রাটদের বাসভবন গ্রেট প্যালেস ও আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই জলাধারই শহরের প্রাণরক্ষা করেছে।

১৪৫৩ সালে অটোমানদের হাতে ইস্তাম্বুল বিজয়ের পরও ব্যাসিলিকা সিস্ট্রানের গুরুত্ব কমেনি। একসময় এটি টপকাপি প্রাসাদের পানির চাহিদা পূরণ করেছে। এমনকি এর ওপর গড়ে ওঠা এলাকার সাধারণ মানুষের জন্যও এটি ছিল একমাত্র পানির উৎস। সাম্রাজ্য বদলেছে, শাসক বদলেছে, কিন্তু এই জলাধারের প্রয়োজন ফুরায়নি।

১৬শ শতকে ফরাসি প্রকৃতিবিদ ও ভূগোলবিদ পেত্রুস গিলিয়াস প্রথমবারের মতো ব্যাসিলিকা সিস্ট্রানকে বৈজ্ঞানিকভাবে বিশ্লেষণ করেন। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, এটি দৈর্ঘ্যে প্রায় ৩৩৬ ফুট ও প্রস্থে ১৮২ ফুট। ভেতরে রয়েছে ৩৩৬টি বিশাল মার্বেল স্তম্ভ। ছাদের ওপরে ছিল একাধিক কূপ, যার মাধ্যমে উপরের শহরের সঙ্গে নিচের জলের জগতের যোগাযোগ বজায় থাকত।

আধুনিক কাঠের পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে মনে হয়, যেন সময়ের স্রোত উল্টো দিকে বইছে। পানির ওপর তৈরি বিশেষ পাটাতনের নিচে কেঁপে ওঠে আলো-ছায়ার খেলা। নির্দিষ্ট শব্দতরঙ্গে আলোড়িত হয় জলধারা। চারপাশের স্তম্ভগুলো কখনো স্পষ্ট, কখনো ঝাপসা—সব মিলিয়ে এক স্বপ্নিল, প্রায় অবাস্তব আবহ তৈরি করে।
সিস্ট্রানের শেষ প্রান্তে গিয়ে দেখা মেলে সবচেয়ে আলোচিত দৃশ্যটির—গ্রিক পুরাণের দানবী মেডুসার দুটি পাথরের মাথা। একটি উল্টো করে রাখা, আরেকটি পাশ ফিরিয়ে। কেন এমনভাবে রাখা হয়েছিল, তা আজও রহস্য। কেউ বলেন, মেডুসার অভিশপ্ত দৃষ্টি শক্তিকে নিষ্ক্রিয় করতেই এমন ব্যবস্থা। কেউ বলেন, এটি কেবল প্রাচীন ভাস্কর্যের পুনর্ব্যবহার। যে ব্যাখ্যাই ধরা হোক না কেন, এই মেডুসা মাথার সামনে দাঁড়ালে মিথ আর বাস্তবের সীমারেখা ঝাপসা হয়ে যায়।


দীর্ঘ সময় অবহেলায় পড়ে থাকলেও অটোমান আমলে সুলতান তৃতীয় আহমেদ ও দ্বিতীয় আবদুল হামিদের সময়ে ব্যাসিলিকা সিস্ট্রানে সংস্কারকাজ হয়। পরে ১৯৮৫ থেকে ১৯৮৭ সালের বড় সংস্কারের পর এটি ইস্তাম্বুল মহানগর পৌরসভার অধীনে জাদুঘর হিসেবে খুলে দেওয়া হয়। সর্বশেষ ২০১৯ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত যে ব্যাপক সংস্কারকাজ হয়েছে, সেটিই ছিল নির্মাণকাল থেকে এ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় সংরক্ষণ প্রকল্প।
ব্যাসিলিকা সিস্ট্রান শুধু ইতিহাসের পাতায় সীমাবদ্ধ নয়; আধুনিক সংস্কৃতিতেও এর উপস্থিতি চোখে পড়ে। একাধিক জনপ্রিয় সিনেমায় এই রহস্যময় স্থাপনাকে ব্যবহার করা হয়েছে, যা এর নাটকীয় আবহকে আরও বিশ্বজুড়ে পরিচিত করেছে।


পুরো জায়গাটি ঘুরে দেখতে সাধারণত আধা ঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টা সময় লাগে। সন্ধ্যার পর নির্দিষ্ট সময়ের ‘নাইট শিফট’-এ গেলে আলো-ছায়ার খেলা আরও গভীরভাবে উপভোগ করা যায়।
ব্যাসিলিকা সিস্ট্রান কেবল দেখার মতো একটি স্থান নয় এটি এক অনুভব। ইতিহাসপ্রেমী হোন বা নিছক ভ্রমণপিপাসু, ইস্তাম্বুলের এই পাতালপুরী আপনাকে থামতে বাধ্য করবে, নিয়ে যাবে হাজার বছরের পুরোনো এক সভ্যতার গভীরে। শহরের মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা এই জলভরা রাজপ্রাসাদ নিঃসন্দেহে ইস্তাম্বুল ভ্রমণের সবচেয়ে স্মরণীয় অভিজ্ঞতাগুলোর একটি।
ছবি: লেখক