এগার বছরের ছোট্ট মেয়ে আনার সাদা পাহাড় জয়ের গল্প
শেয়ার করুন
ফলো করুন

ট্র্যাক লিডার মাসুদ পারভেজ সুজনের সঙ্গে আবেগঘন কথোপোকথনের গল্পে উঠে আসলো মনছোঁয়া অভিযানের গল্প। তিনি বললেন, 'আনার সঙ্গে আমার পরিচয় অনেক আগের। ওর বয়স তখন মাত্র সাত। মা জোহরা সাজুকে নিয়ে রাঙামাটির ধুপ পানি ও ন কাঁটা ঝর্নায় এক্সপেডিশনে এসেছিল ওরা। আমি তখন ট্র্যাক লিডার হিসেবে দলের নেতৃত্ব দিচ্ছিলাম। তখনই প্রথম দেখেছিলাম আনাকে, চোখে ছিল অজানাকে জানার কৌতূহল, আর মুখে ছিল অবিচল হাসি। সাজু আপার বহুদিনের স্বপ্ন ছিল সাদা পাহাড় দেখা। তিনি বারবার বলতেন, “একদিন এভারেস্ট বেইজ ক্যাম্পে যেতে চাই।” আমি তাঁকে উৎসাহ দিয়েছিলাম ঠিকভাবে প্রস্তুতি নিলে, আনাকে নিয়েই আমরা হিমালয়ের সেই পাদদেশে পৌঁছাতে পারব।'

স্মৃতিচারণ করে চলেছেন সুজন।' ২০২৫ সালের অক্টোবরে আমরা পরিকল্পনা করি এভারেস্ট বেইজ ক্যাম্প অভিযানের। প্রস্তুতি শুরু হয় তিন মাস আগে থেকেই—শুধু শারীরিক নয়, মানসিক প্রস্তুতিও ছিল সমান জরুরি।পহেলা অক্টোবর আমরা কাঠমুন্ডু পৌঁছাই, পরদিন লুকলার পথে উড়াল দিই। সেখান থেকে শুরু হয় সত্যিকারের চ্যালেঞ্জ—প্রায় ৭০ কিলোমিটার দীর্ঘ, আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে ২,৮০০ মিটার থেকে ৫,৩৬৪ মিটার উচ্চতায় পৌঁছানো।ছোট্ট অভিযাত্রী, বিশাল মানসিক শক্তি।'

বিজ্ঞাপন

এই অভিযাত্রার চ্যালেঞ্জের কথা বলতে গিয়ে সুজন বলেন, '১১ বছরের একটি মেয়েকে এমন উচ্চতায় অভিযোজিত করা ছিল আমার ট্র্যাক লিডার জীবনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। কিন্তু আনা আশ্চর্যভাবে মানিয়ে নিয়েছে প্রতিটি প্রতিকূলতার সঙ্গে। মাইনাস ১০ থেকে ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় সকাল সকাল উঠে নাস্তা করে, সারাদিন নির্দিষ্ট গতিতে ট্রেকিং চালিয়ে গেছে—বিনা অভিযোগে, বিনা ক্লান্তিতে।তুষারপাতের দিনে, প্রবল হিমেল বাতাসেও ওর মুখে একফোঁটা হতাশা দেখিনি। আমি যখনই জিজ্ঞেস করেছি কেমন লাগছে, ওর একটাই উত্তর—“ভালো, মামা।” ৯ অক্টোবর, ২০২৫ সেই দিন আমরা পৌঁছাই এভারেস্ট বেইজ ক্যাম্পে।

'আনার মুখে তখন শুধুই হাসি, আর আমার চোখে জল। ২০১৮ সালে যখন প্রথম ৫৫২৫ মিটার উচ্চতার ইয়ালা পিক সামিট করেছিলাম, তখনও এমন আনন্দে কেঁদেছিলাম। আজ আবার কেঁদেছিলাম, কারণ মনে হচ্ছিল, আনার মাধ্যমে আমি যেন আবার নতুন করে এভারেস্ট জয় করলাম।'

বিজ্ঞাপন

সবুজ পাহাড় থেকে সাদা পাহাড়ে

সুজনের বয়ানে, 'সাত বছর ধরে ট্র্যাক লিডার হিসেবে কাজ করছি। শুরুটা ছিল বান্দরবানের পাহাড় থেকে। সেখানেই শিখেছি, জীবন শুধু কমফোর্ট জোনে থাকার নাম নয়। প্রতিকূলতার মাঝে আত্মিক আনন্দ খুঁজে নেওয়াই জীবনের আসল স্বাদ।সাদা পাহাড়, অর্থাৎ হিমালয় এ যেন এক অন্য জগত। যেখানে প্রকৃতি একদিকে ভয় দেখায়, অন্যদিকে আপন করে নেয়। তাই তো পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে অভিযাত্রীরা ছুটে আসেন এখানে—নিজেকে নতুন করে আবিষ্কারের আশায়।'

একজন গাইডের অভিজ্ঞতা

আমার ট্র্যাক লিডার জীবনে অন্নপূর্ণা, নর্থ বেইজ ক্যাম্প, মাদ্রি হিমাল সব জায়গাতেই গিয়েছি। তবে সবচেয়ে রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা ছিল ২০২৪ সালের আমাদাবলাম এক্সপেডিশন। যদিও ক্যাম্প টু থেকে ফিরে আসতে হয়েছিল, তবু সেই অভিযানে আমি শিখেছিলাম ব্যর্থতা কখনো শেষ নয়, বরং শেখার নতুন শুরু।

নতুনদের জন্য কিছু পরামর্শ

সুজন বললেন, 'যাঁরা প্রথমবার সাদা পাহাড়ে যেতে চান, তাঁদের জন্য বলব প্রস্তুতি হলো সাফল্যের অর্ধেক।আপনি কোন রুটে যাচ্ছেন, তা ভালোভাবে জেনে নিন।উচ্চতায় মানিয়ে নেওয়ার জন্য ধৈর্য ধরুন।ট্র্যাক লিডার বা গাইডের পরামর্শ মনোযোগ দিয়ে শুনুন।মানসিক দৃঢ়তা, ফিটনেস, আর সঠিক পোশাক—এই তিনটাই আপনার সঙ্গী।পাহাড় সবসময় শেখায়—“সারভাইভাল ফর দ্য ফিটেস্ট”। আনা শুধু এভারেস্ট বেইজ ক্যাম্প জয় করেনি, জয় করেছে ভয়, ঠাণ্ডা, ক্লান্তি আর নিজেকে। সাদা পাহাড়ে ওঠা মানে কেবল চূড়ায় পৌঁছানো নয়, বরঞ্চ নিজের ভেতরের সীমা ভেঙে নতুন এক নিজেকে আবিষ্কার করা। আনা সেই সীমা ভেঙে দিয়েছে।একজন গাইড হিসেবে আমি গর্বিত এমন এক ছোট্ট অভিযাত্রীর পাশে থেকে, যে বিশ্বাস করে, “জয় মানেই নিজের ভেতরের ভয়কে পরাজিত করা।”

সুজন এক স্বপ্নদ্রষ্টা। তাঁরা হ্যামিলনের বাশিওয়ালার মতো মানুষকে নিয়ে যান দুর্গম লক্ষ্যে। প্রতিকূলতার মাঝে জয়ের আনন্দ তাদের বানায় অপরাজেয়। এটাই তো বেঁচে থাকার আনন্দ, যা জিইয়ে রাখে আনার মতো তরুণ প্রাণেরা। জয়তু নিজেকে জয়ের গল্পের।

ছবি: মাসুদ পারভেজ সুজন

প্রকাশ: ১৩ অক্টোবর ২০২৫, ১৬: ১৪
বিজ্ঞাপন