চিলি: এক দেশ, বহু পৃথিবী ৩
শেয়ার করুন
ফলো করুন

মরু ঝড়, আমি আর ম্যাক্সি

চিলির আতাকামা মরুভূমিতে এসে যে স্বল্পমূল্যের হোস্টেলে উঠেছি তার মালিক একজন নারী। তিনি মরুভূমির বিস্ময় নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, এই প্রথম আমি কোনো বাংলাদেশিকে সামনাসামনি দেখছি। তুমি বাংলাদেশ থেকে পৃথিবীর দক্ষিণের শেষ দেশে চলে এসেছো। আর ইউ হিউমান, গার্ল? আমি হেসে বললাম, নো, আই এম এলিয়েন।

আমি কোনো পূণ্যের কাজ না করেই ভদ্রমহিলার খুব আপন হয়ে উঠলাম। শুধুমাত্র আমার ভৌগোলিক পরিচয়ের কারণে। যে রুম ভাড়া নিয়েছি সে রুমে আটটা খাট। আমার জন্য বরাদ্দ তার একটা। এক রাতের জন্য গুণতে হবে দশ ডলারের কিছু বেশি অর্থ। ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। ঘুম ভেঙে শুনি ঘূর্ণিঝড় হয়েছে। রুমের জানালা দিয়ে পানির ঝাপটা এসে আমার একমাত্র শীতের জ্যাকেট ভিজে গেছে। সাথে আমার বিছানার পায়ের দিকের সামান্য অংশ। এই আমার দূর্ভোগ্যের শুরু। এখানে দিনে তীব্র গরম, রাতে শীত। টয়লেট বাইরে, গোসলের ঘর বাইরে, রান্নাঘর বাইরে। এই তীব্র শীতে আমি প্রায় অসহায়। খুব অল্প কাপড় নিয়ে আতাকামায় এসেছি। বাকিগুলি সান্তিয়াগোতে রাখা আছে।

বিজ্ঞাপন

ভদ্রমহিলা আমায় বললেন, “আমাদের আর একটা বেডও খালি নেই। তুমি আমার বাসায় গিয়ে থাকবে প্লিজ? রাতে পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যাবে। আমার একটা মেয়ে আছে আর আমার একটা চার বছরের ছেলে। সেখানে ঘরের সাথে বাথরুম, তোমাকে বাইরে যেতে হবে না। যতই ঝড়-বাদল হোক এখানকার আবহাওয়া শুষ্ক। রাতে তোমার জ্যাকেট শুকিয়ে যাবে। আমার ছেলে কিছু হইহুল্লোড় করে তাতে তোমার সামান্য অসুবিধে হতে পারে।"
আমি সম্মতি দিলাম।

ম্যাক্সির আঁকা মনযোগ দিয়ে দেখছেন লেখক
ম্যাক্সির আঁকা মনযোগ দিয়ে দেখছেন লেখক

চার বছরের চিলিয়ান শিশুটির নাম ম্যাক্সি। সারাক্ষণ ছবি আঁকে আর আমার সাথে খিলখিল করে হাসে। তার আর কোনো কাজ নেই। মার্চের মাঝামাঝি পর্যন্ত ম্যাক্সির স্কুল বন্ধ। ম্যাক্সির অফুরন্ত অবসরের মাঝেই তার সাথে আমার ক্ষণিকের ভাব-ভালোবাসা।
ম্যাক্সির পরিবার যে অভিজাত তা সহজেই অনুমেয়। ম্যাক্সির বোনের বয়স তেরো কি চৌদ্দ হবে। স্নিগ্ধ, সুন্দর, শান্ত কিন্তু চপল নয়। ভাইয়ের প্রতি তার খেয়াল গভীর। ওদের গায়ের রং ফর্সা। এমন রং দেখে বোঝা যায় ওরা চিলিয়ান আদিবাসী নয়। একটি বড়োসড়ো কক্ষে দুটি খাট; একটা ডাবল, একটি সিঙ্গেল। আমার সাথে ওদের ভাষা ভিন্ন। আমাদের ভালোবাসা অভিন্ন। আতাকামায় আদিবাসী আর অ–আদিবাসী দু রকমের মানুষের বাস। কথা বলে স্প্যানিশে। ওর জীবনচর্চা আধুনিক। ওর মা ওকে নিয়মের মধ্যে রাখে। আতাকামায় আটকে পড়ে আমার রাত কেটে যায় এই দুই ভিনদেশি শিশুর সাথে।

বিজ্ঞাপন

একদিনে আমি এক অদ্ভুদ বিষয় খেয়াল করলাম। মরুঝড় শুরু হয় দুপুরের পর পর। পাক্কা তিন ঘণ্টা দাপট দেখায়। সকাল এখানে ঠাণ্ডা ও শান্ত। দুপুর ১২টার পর থেকে সূর্য মাথার ওপর। তাপে মাটি অত্যধিক গরম হয়। গরম মাটি আশপাশের বাতাসকে হঠাৎ ওপরে ঠেলে দেয়। পাশেই আন্দিজ। আন্দিজ পর্বতমালা থেকে ঠান্ডা পাহাড়ি বাতাস নেমে আসে নিচে।

সান পেদ্রো দে আতাকামা শহর
সান পেদ্রো দে আতাকামা শহর

গরম বাতাস ওপরে উঠলে আর পাহাড় থেকে শীতল বাতাস নিচে নামলে তৈরি হয় চাপের সংঘর্ষ, বাতাসের গতি বেড়ে যায়। জানালার পাল্লা খুলে ঝড় দেখা দুষ্কর এখানে। আতাকামা পৃথিবীর সবচেয়ে শুষ্ক মরুভূমিগুলোর একটি। এদের মাটিতে নেই আর্দ্রতা, নেই ঘাস বা গাছ, মাটি আলগা ও লবণে ভরা। ঝড়ের মাটি, বালি, লবণের কণা আকাশে উড়তে থাকে। ঘরে বসে থাকলে এ সময়টা বিপদজনক নয় কিন্তু বিরক্তিকর। আতাকামায় দুপুর মানে শুধু রোদ নয়, এ সময় হাওয়া রেগে ওঠে। মরুভূমির বুকে তার উপস্থিতি জানিয়ে দেয়।

রান্না ঘরে সবে দুপুরে খাবার জন্য পাস্তা বানিয়েছি। এমন ঝড়ের আলামত আকাশে, রান্নাঘর থেকে দৌড়ে আমার থাকার কক্ষে এলাম। আমার কক্ষ থেকে রান্নাঘর খানিক দূরে বিচ্ছিন্ন। ঘরে ম্যাক্সি ছবি আঁকছে। ঝড়ে তার ভ্রুক্ষেপ নেই। এ ঝড় তার কাছে নিত্য আসা–যাওয়া। ম্যাক্সি গভীর মনোযোগে এঁকেই যাচ্ছে। মাথা তুলছে না।

ম্যাক্সি ও লেখক
ম্যাক্সি ও লেখক

ম্যাক্সি একটা ঘোড়ার মাথা আঁকলো। ছবিখানা আমায় দেখাতে এলো। আমি আমার অকৃত্রিম হাসি দিয়ে তাকে প্রশংসা করলাম। ওর ভাবনা গভীর কারণ ও খোলা আকাশ, ধুলো, পাহাড়ের মাঝে বেড়ে উঠছে। ওর আঁকা ঘোড়ায় মরু ঝড়ের তীব্রতা পেয়েছি আমি। ম্যাক্সি আমায় যেভাবে আপন করেছে তাতে আমার মনে হয়েছে সে আত্মীয়তার মূল্য বোঝে, তার কাছে অচেনা মানেই বিপজ্জনক নয়।  

ভোর হয়েছে। আমার জ্যাকেট শুকিয়েছে। সবকিছু স্বাভাবিক হয় একসময়। শুধু সময়কে সময় দিতে হয়। দু’রাত পার হবার পর আমার জায়গা হয়েছে হোস্টেলের অন্য রুমে। সেটা ম্যাক্সিদের রুমের কাছে। ঘর থেকে বের হলে ম্যাক্সির সাথে দেখা হয় কিন্তু দিনে ঘরের বাইরে এত গরম সেটা সহ্য করা মুশকিল।

এখানকার স্থানীয় সরকার ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল বৈরি আবহাওয়ার জন্য। ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা উঠল না। জিদ হলো আমার। আতাকামা এসেছিলাম পাঁচ দিনের জন্য সেটা বাড়িয়ে দশ দিন করলাম। সান্তিয়াগোতে ফেরার ফ্লাইট ছিল পাঁচ দিন পর, সেটা পিছিয়ে দিলাম। আমি না দেখে ফিরছি না মরুর যতো বিস্ময়।

ছবি: লেখক

প্রকাশ: ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৬: ০০
বিজ্ঞাপন