
প্যারিস থেকে আমাদের পরবর্তী গন্তব্য অনিন্দ্যসুন্দর দেশ সুইজারল্যান্ড। এ দেশের জেনেভা ছিল আমাদের প্রথম গন্তব্য। আমরা যেহেতু আইন পেশায় জড়িত, তাই জেনেভা নানা কারণে আমাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ শহরে নানা আন্তর্জাতিক সংস্থা রয়েছে। বিশ্ব মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় এ শহরের আছে বিশেষ অবদান। বিশেষ করে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চুক্তি ও সনদ পাস হয়েছে এ শহরে। তাই আমাদের সবার জেনেভায় যাওয়ার ইচ্ছা ছিল।

প্যারিস থেকে ট্রেনে আমরা কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পৌঁছে যাই জেনেভায়। জেনেভা ফ্রান্সের সীমানাসংলগ্ন শহর, কাজেই বেশি একটা সময় লাগেনি। সেখানে পৌঁছে যে হোটেলে উঠেছিলাম, সেটা বাংলাদেশ থেকেই বুক করা ছিল। মজার বিষয় হলো আমরা জেনেভায় ঘুরলেও আমাদের হোটেলটির অবস্থান ছিল জেনেভা সীমানাসংলগ্ন ফ্রান্সের একটি শহরে। আমরা জেনেভায় নেমেই যেন আবার ফ্রান্সের হোটেলে উঠলাম আর ফ্রান্সের হোটেল থেকে বের হয়ে সুইজারল্যান্ডে যেতাম ঘুরতে। এ বিষয়টি আমাদের ভ্রমণকে বেশ রোমাঞ্চিত করে।
জেনেভা এমন এক শহর, যেখানে প্রকৃতি, ইতিহাস ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির অপূর্ব সমন্বয় দেখা যায়। সুইজারল্যান্ডের এই শহর শুধু পর্যটকদের জন্য নয়; বরং বিশ্ব কূটনীতির অন্যতম কেন্দ্র হিসেবেও সুপরিচিত। আমরা এই শহরের প্রাণকেন্দ্র ও মূল আকর্ষণ জেনেভা লেকের পাড়ে ঘুরতে যাই। এই লেক শহরকে দুই ভাগে ভাগ করেছে। এক পাশে আছে জেনেভার ওল্ড টাউন, অন্য পাশে আধুনিক সব স্থাপত্যের সমাহারে নতুন শহর। হ্রদের মাঝখানে আকাশ ছুঁয়ে ওঠা জেট দ’ও ফোয়ারাটি যেন জেনেভার পরিচয় নিয়ে ওপরের দিকে ছুটছে।

এককথায় অপূর্ব। প্রায় ১৪০ মিটার উঁচুতে পানির উঠে যাওয়া এই বিশাল ফোয়ারাটি দূর থেকেই চোখে পড়ে। পৃথিবীতে এটাই একমাত্র ফোয়ারা, যেখানে পানি সর্বোচ্চ গতিতে ওপরে উঠছে। এটা দেখে মনে হয়, ফেয়ারাটি যেন আকাশকে বিদীর্ণ করতে চাইছে। পানিতে সূর্যের আলোর ঝলক আর দূরে আল্পস পর্বতমালার দৃশ্য মিলিয়ে এখানে তৈরি হয় এক অপার্থিব আবহ। আমরা শিশুপার্কের রেলগাড়ির আদলে বানানো একটি মিনি ট্রাম ভাড়া নিয়ে পুরো জেনেভা শহর ঘুরতে বের হয়ে যাই।
জেনেভা লেক পার হয়ে আমরা চলে যাই ওল্ড টাউনে এবং পুরো শহর ধীরে ধীরে ঘুরতে থাকি। চালক একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ সব স্থাপনার সঙ্গে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিচ্ছিলেন। আমরা পথিমধ্যে মিনি ট্রাম থামিয়ে নেমে পড়ি কিছু জায়গা ভালোভাবে দেখার জন্য।

শহরের ঐতিহাসিক অংশ ওল্ড টাউন পর্যটকদের ফিরিয়ে নেয় অতীতে। সরু পাথুরে রাস্তা, পুরোনো বাড়িঘর ও ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্য যেন জীবন্ত ইতিহাস। এখানকার অন্যতম আকর্ষণ সেন্ট পিয়েরে ক্যাথিড্রাল, যেখানে দাঁড়িয়ে পুরো শহরের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য উপভোগ করা যায়।
আমরা ওল্ড টাউন ঘুরে চলে যাই জাতিসংঘের ইউরোপীয় সদর দপ্তরে। এটা বোধকরি বৈশ্বিক কূটনৈতিক কার্যক্রমের একটি প্রধান কেন্দ্র। এর সামনেই আছে জেনেভার প্রতীকী নিদর্শনগুলোর মধ্যে অন্যতম ব্রোকেন চেয়ার নামে কাঠের বিশাল ভাস্কর্য।

১৯৯৭ সালে শিল্পী ড্যানিয়েল বারসের নকশায় নির্মিত এই ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়। প্রায় ১২ মিটার উঁচু এই চেয়ারের একটি পা ভাঙা, যা যুদ্ধ ও সহিংসতায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। ‘ব্রোকেন চেয়ার’ মূলত ভূমিমাইন ও ক্লাস্টার বোমার বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরির উদ্দেশ্যে নির্মিত। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি শুধু একটি শিল্পকর্ম নয়; বরং মানবাধিকার ও শান্তির প্রতীক হয়ে উঠেছে।
জাতিসংঘের সদর দপ্তর ও ব্রোকেন চেয়ার পরিদর্শন শেষে আমরা যাই রেডক্রসের সদর দপ্তরে। সেখানে রেডক্রস মিউজিয়ামও অবস্থিত। এখান থেকে যাই বিশ্ববিখ্যাত আরিয়ানা মিউজিয়ামে। এটি ‘গ্লাস মিউজিয়াম’ নামেও সর্বাধিক পরিচিত।


এই জাদুঘর মূলত কাচ ও সিরামিকশিল্পের জন্য বিখ্যাত। এখানে প্রায় ২৫ হাজারের বেশি শিল্পকর্ম সংরক্ষিত আছে, যা ইউরোপসহ বিশ্বের নানা প্রান্তের প্রাচীন কাচশিল্পের ইতিহাস তুলে ধরে। ১৯ শতকের শেষ দিকে নির্মিত এই জাদুঘরের স্থাপত্যই যেন নিজেই এক শিল্পকর্ম। এটি অবস্থিত পার্ক দে আরিয়ানার মনোরম পরিবেশে, যা ভ্রমণকে আরও উপভোগ্য করে তোলে।
আমরা এসব ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো দেখে জেনেভায় খাবারের সন্ধানে ছুটি। জেনেভা সিটি সেন্টারেই রয়েছে ফুড কোর্ট। খাদ্যরসিকদের জন্য জেনেভা স্বর্গ। সুইস চকলেট, চিজ ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক খাবারের সমাহার এখানে সহজেই পাওয়া যায়। আমরা সুইস খাবারের পাশাপশি লেবানিজ খাবারের স্বাদ নিয়েছিলাম। এ শহরে আছে বিখ্যাত সব সুইস চকলেট ও ঘড়ি। আমরা রোলেক্সসহ কয়েকটি নামীদামি ব্র্যান্ডের শোরুমেও ঢুঁ মারি।

সব মিলিয়ে জেনেভা শুধু একটি শহর নয়, আমাদের কাছে মনোমুগ্ধকর অভিজ্ঞতাও। আল্পসের কোলে জেগে থাকা এই শহর ভ্রমণে পেয়েছি স্মরণীয় সব মুহূর্ত। এরপরের গন্তব্য সুইজারল্যান্ডের সবচেয়ে ধনী একটি গ্রামে। সে গল্প শোনাব পরের পর্বে।
লেখক: আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট।
ছবি: লেখক