
এলব্রুসের রয়েছে দুটি চূড়া, পশ্চিম চূড়ার উচ্চতা ৫ হাজার ৬৪২ মিটার এবং পূর্ব চূড়া ৫ হাজার ৬২১ মিটার। দুটিই সুপ্ত আগ্নেয়গিরির মুখ। তবে অধিকাংশ অভিযাত্রীর লক্ষ্য থাকে পশ্চিম চূড়া, যেটি দুই চূড়ার মধ্যে উঁচু।

পর্বতারোহণে বহুল পরিচিত একটি কৌশল হলো ‘ক্লাইম্ব হাই, স্লিপ লো’। দিনের বেলা তুলনামূলক বেশি উচ্চতায় উঠে আবার রাতে কিছুটা নিচে নেমে বিশ্রাম নেওয়াই এই পদ্ধতির মূল কথা। এতে ধীরে ধীরে শরীর পাতলা বাতাসের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সুযোগ পায়। শাকিলের এলব্রুস অভিযানের অ্যাক্লিমাটাইজেশনও চলছিল এই নিয়ম মেনে।

আগের দিন ট্র্যাকিং ও ক্লাইম্বিং করে তাঁরা প্রায় সাড়ে ৪ হাজার মিটার উচ্চতায় উঠেছিলেন। দ্বিতীয় দিনের শুরুতে আবহাওয়া ছিল মোটামুটি অনুকূল। কিন্তু উচ্চতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই বদলে যায় পাহাড়ের পরিস্থিতি। শুরু হয় তীব্র তুষারপাত ও ঝোড়ো বাতাস। এর সঙ্গে যুক্ত হয় ‘হোয়াইটআউট’।
হোয়াইটআউট হলো এমন একটি পরিস্থিতি, যখন তুষার, মেঘ ও কুয়াশা মিলে চারপাশে তৈরি করে ঘন সাদা আবরণ। তখন আকাশ ও মাটির পার্থক্য বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে, কমে যায় দৃশ্যমানতাও। ফলে পথ ও দিক ঠিক রাখাও হয়ে ওঠে কঠিন।

শাকিলের বর্ণনায়, বাতাসের ঝাপটা এতটাই তীব্র ছিল যে মনে হচ্ছিল তাঁকে উড়িয়ে নিয়ে যাবে। মুখে আছড়ে পড়ছিল তুষারকণা, যেন একের পর এক পিনের খোঁচা। তাঁর মতে, হিমালয়ের তুলনামূলক নিচু উচ্চতায়ও এমন কঠিন আবহাওয়ার মুখোমুখি খুব একটা হতে হয় না।

ককেশাস পর্বতমালার আবহাওয়া এমনিতেই দ্রুত পরিবর্তনশীল। কৃষ্ণসাগর থেকে আসা আর্দ্র বাতাস ও ইউরোপের ঠান্ডা বায়ুপ্রবাহের প্রভাবে এলব্রুসে মুহূর্তেই বদলে যেতে পারে আবহাওয়ার চিত্র। দ্বিতীয় দিনের অভিযানে তারই মুখোমুখি হতে হয় শাকিল ও তাঁর দলকে।

তারপরও থামেনি যাত্রা। প্রায় আড়াই থেকে তিন ঘণ্টার কঠিন প্রচেষ্টার পর তাঁরা পৌঁছে যান সাড়ে ৪ হাজার মিটার উচ্চতায়। সেখানে কিছুটা সময় কাটিয়ে আবার নেমে আসেন ছেগেতির দিকে। দুপুর ২টার মধ্যেই তাঁরা ফিরে আসেন লজে।

সামিট পুশের আগে এটাই ছিল তাঁদের চূড়ান্ত অ্যাক্লিমাটাইজেশন ডে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২৪ সেপ্টেম্বর রাতে সামিটের উদ্দেশ্যে রওনা দেওয়ার কথা ছিল।
লম্বা ও কঠিন অভিযানের এই পর্যায়ে তাই বিকেলটা কাটে বিশ্রামে। উচ্চতার সঙ্গে শরীরকে মানিয়ে নিতে এবং পরবর্তী ধাপের জন্য শক্তি সঞ্চয় করতে এই বিরতি ছিল গুরুত্বপূর্ণ। উচ্চতাজনিত অসুস্থতা এড়াতে পর্বতারোহণে ধৈর্য ও শরীরের সংকেতকে গুরুত্ব দেওয়াকে সবসময়ই অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।

এলব্রুসের পথে প্রতিটি দিনই যেন নতুন এক পরীক্ষা। আর সামিটের আগে এই দ্বিতীয় দিনটি শাকিল ও তাঁর দলের জন্য হয়ে থাকল কঠিন আবহাওয়ার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া এবং নিজেদের আরও এক ধাপ প্রস্তুত করার দিন।
ছবি: ইকরামুল হাসান শাকিল