চিলি: এক দেশ, বহু পৃথিবী ৪
শেয়ার করুন
ফলো করুন

আতাকামার আদি মানুষ
মরুর ঝড় দেখতে দেখতে আতাকামায় আমি ছয় দিন পার করে ফেললাম। আমার খাবার ফুরিয়ে গেছে। ভাবলাম, একবার বাজারে যাই। বাজার মানে এখানে একটা ছোট শপ আছে। বাজারের উদ্দেশে বেরিয়ে দেখি, আগের দিনের ঝড়ে রাস্তার নাকাল অবস্থা। কাদায় পা ফেলা মুশকিল। মরুভূমি বললেই আমাদের চোখে ভেসে উঠে মধ্যপ্রাচ্যের বালুর ধু ধু প্রান্তর। রবীন্দ্রনাথের মতো করে ভাবতে ইচ্ছা করে, ‘ইহার চেয়ে হতেম যদি আরব বেদুয়িন’—আতাকামা সে রকম নয়।

আতাকামায় আদিবাসী দোকানেরসাজানো গয়না ও পাথর
আতাকামায় আদিবাসী দোকানেরসাজানো গয়না ও পাথর

আতাকামায় আছে বালু, মাটি আর পাথরের নুড়ি। বেদুইন হওয়ার ইচ্ছাটা এখানে জাগে না। ভূমিতে বালুর চেয়ে মাটির পরিমাণ বেশি থাকায় ঝড়ের পানিতে মরুভূমি হয়ে ওঠে কাদাময়। কাদার ওপর হাঁটতে গিয়ে পিছলে পড়তে পড়তে শক্ত হয়ে উঠে দাঁড়ালাম। পরেছি রবারের স্লিপার। সেটা কাদার মধ্যে ডুবছে আবার উঠছে। আমি তাই নিয়ে হাঁটছি।

বিজ্ঞাপন

হোস্টেল থেকে বের হলেই রাস্তার দুপাশে গোটা পঞ্চাশেক ট্রাভেল এজেন্সির অফিস। খুব আগ্রহ নিয়ে দু–তিনটিতে গিয়ে জানতে চাইলাম পর্যটন স্থানের ওপর ভ্রমণ স্থগিতাদেশ ভেঙেছে কি না। উত্তর একটাই—‘না’।

রাস্তার দুই ধারের দোকানগুলো আদিবাসী ও অ-আদিবাসী  উভয় ঘরানার মানুষ চালান। আতাকামার আদিবাসীকে আতাকামেনো বলা হয়। তারা চিলি, আর্জেন্টিনা ও বলিভিয়ার উত্তরের আতাকামা মরুভূমি ও আলটিপ্লানো অঞ্চলের আদিবাসী মানুষ। আদিবাসীদের কিছু ঐতিহাসিক বসতি আজও আছে। তেমন একটি গুরুত্বপূর্ণ বসতি সান পেদ্রো দে আতাকামা, যেখানে আমি অবস্থান করছি। তাদের আদি ভাষা কুনজার। এখন এটি বিলুপ্ত ভাষা। বলা হয়ে থাকে আতাকামেনো সংস্কৃতির উৎস ৫০০ শতাব্দীতে। ১৫ শতকের শুরুতে ইনকা আধিপত্য বিস্তার হয় তাদের ভূখণ্ডে ও সংস্কৃতিতে। ১৫৩৬ সালে শুরু হয় স্প্যানিশ আগ্রাসন। এরপর স্প্যানিশ প্রভাব পড়ে তাদের ওপর।

আতাকামার আদিবাসী দোকানে ঝুলছে পোশাক; রাখা আছে গয়না
আতাকামার আদিবাসী দোকানে ঝুলছে পোশাক; রাখা আছে গয়না

হ্যালুসিনোজেনিক পদার্থ দিয়ে ধূমপান ছিল আতাকামেনোদের ধর্মীয় সংস্কৃতি। তারা মনে করত, ধূমপান তাদের দেবতার কাছে নিয়ে যাবে এবং অনেক শক্তিশালী করে তুলবে। তারা ভাবত, ধূমপানের মধ্য দিয়ে তারা পাখি, বিড়াল কিংবা সাপের ক্ষমতা পাবে। ইনকারা আসার পর তারা ইনকা প্রথা ‘সান কাল্ট’ দ্বারা প্রভাবিত হয়। তারা সূর্য দেবতা ইনতিকে দেবতা মানতে শুরু করে। সান কাল্ট ধারণাটি হলো, একদা পৃথিবী অন্ধকার ছিল, সূর্য দেবতা ইনতির জন্মের সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবী আলোকিত হয়েছে। এরপর ইনতিই পৃথিবীতে মানুষজনকে এনেছেন। তারা ইনকাদের মতো বিশ্বাস করতে শুরু করে, মৃত্যুর পর আরেক জীবন আছে। এ কারণেই তারা মৃতকে বিদায় দেওয়ার সময় প্রয়োজনীয় সব জিনিসপত্র দিয়ে কবর দিত।

বিজ্ঞাপন

বাড়িঘর তেমন নেই বললেই চলে আতাকামায়। চারদিকে ধু ধু প্রান্তর। পর্যটকের আধিক্য আছে। স্থানীয় আদিবাসীদের যাতায়াত আছে। সুভেনিরের দোকানগুলোতে আদিবাসীদের কাজকর্ম, ব্যবসাপাতি বেশ সরব। পৃথিবীর সব আদিবাসীর গড়ন আমার এক মনে হয়। শরীরের রং, উচ্চতা সব এক রকম। মনে হয় সবাই এক মায়ের সন্তান।
চাল আর ডিম কিনে ডানে-বাঁয়ে না তাকিয়ে হোস্টেলে ফিয়ে এলাম। এ হোস্টেলে এক আদিবাসী নারী পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার দায়িত্বে আছেন। তাঁর আছে এক কন্যাশিশু। আমি মনে মনে তার নাম দিয়েছি ইনতি। ইনতি হলো ইনকাদের সূর্য দেবতা। আমি আমার পেরু ভ্রমণ থেকে ধার করেছি এ নাম। মনে মনে ভাবলাম, ইনতির মাকে নাম জিজ্ঞেস করে ফায়দা হবে না, উনি আমার ভাষা বুঝবেন না।

আতাকামায় আদিবাসীদের দোকানে নেটসার্ফিংয়ে ব্যস্ত কিশোরী
আতাকামায় আদিবাসীদের দোকানে নেটসার্ফিংয়ে ব্যস্ত কিশোরী

 আমি নিজেই নিজের আরামের জন্য শিশুটির একটা  নাম রেখেছি। ইনতির বয়স দুই বছরের বেশি হবে না। আমি চুলায় অল্প ভাত চাপিয়ে দিয়ে হোস্টেল চত্বরে পেতে দেওয়া টেবিলে বসেছি আমার ল্যাপটপ নিয়ে। কিছু লেখালেখির চেষ্টা করা যাক। ইনতি বারবার আমার কাছে আসছে। আমার মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা করছে। আমার কাগজ, ফোন, চার্জার সব একটা একটা করে টেবিল থেকে ফেলে দিয়ে আমার কিছু কাজকর্ম বাড়িয়ে দিচ্ছে। এটাই তার খেলা, আমি না দেখার ভান করছি, প্রশ্রয় দিচ্ছি—সূর্য দেবতা বলে কথা!

পাশের টেবিলে এক প্রফেসর সাহেব অনলাইনে অফিস করেই যাচ্ছেন, করেই যাচ্ছেন। কাছে গিয়ে বললাম, ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞায় তোমার খুব আরাম হলো মনে হচ্ছে। প্রফেসর হাসলেন। বললেন, এ সময়টা উত্তর আমেরিকায় যেহেতু বেশি শীত পড়ে তাই আমরা এদিকটায় চলে আসি। আরামও হলো, কাজও হলো, বেড়ানোও হলো। প্রফেসর সাহেব তো এক ঢিলে তিন পাখি মারছেন। আর আমি মরছি ভেবে প্লেনের টিকিট পাঁচ দিন যে পিছিয়ে দিলাম, তাতে আমার কত ডলার বাড়তি গুনতে হবে।

আতাকামায় আদিবাসীদের দোকানের সামনে লেখক
আতাকামায় আদিবাসীদের দোকানের সামনে লেখক

খিদে পেয়েছে আমার। ইনতি অন্য টেবিলে অন্য পর্যটকদের বিরক্ত করতে ব্যস্ত এখন। আমি দেখছি, কোনো ভিনদেশি এই শিশুর আচরণে বিরক্ত নয়। ইনতির মা-ও বিব্রত নয়। ইশারায় ডাকলাম, এল না কাছে। ইনতিরাই এই পৃথিবীর আদি মানব। পৃথিবীটা তাদের হাতে যত দিন ছিল, নিরাপদে ছিল। ভূরাজনীতি, বাণিজ্য, দখলদারত্ব, পরিবেশ বিপর্যয়—এসব ছিল না তাদের জীবনচর্চায়। আমরা কেবল সভ্যতা বিনির্মাণের নাম করে পৃথিবীকে অস্থির করেছি।

শুষ্ক ও কঠোর ভৌগোলিক অবস্থা সত্ত্বেও হাজার হাজার বছর ধরে আদিবাসীদের আবাসস্থল এ মরুভূমি। আহা, একটা আতাকামেনো আদিবাসী পরিবারের সঙ্গে যদি দুই দিন থাকা যেত! দেখতে পেতাম যদি তাদের ঐতিহ্য চাষ। কেমন করে ফলায় ভুট্টা আর আলু। ওরা চরম শুষ্ক অবস্থার সঙ্গে অভিযোজিত একটি সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য গড়ে তুলেছিল শত শত বছর ধরে। ফসল চাষের জন্য উদ্ভাবন করেছিল সেচ কৌশল। তাদের আধ্যাত্মিক কিংবা ধর্মীয় বিশ্বাসগুলো প্রকৃতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ। তাদের স্বর্গীয় বস্তু মাটি, প্রকৃতি আর পর্বত।
ছবি: লেখক

প্রকাশ: ০৬ মার্চ ২০২৬, ০৫: ৫৩
বিজ্ঞাপন