নীল জল, নীরবতা আর তুষারময় অন্তর্লীন সৌন্দর্যের সাইপ্রাস
শেয়ার করুন
ফলো করুন

গ্রীষ্মের কোলাহলে সাইপ্রাস এক উৎসবের নগরী, আর শীতে এক ধ্যানমগ্ন তাপস। গ্রীষ্মের গনগনে রোদে আয়া নাপা আর পারালিমনি যখন পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে আসা পর্যটকদের পদচারণে মুখরিত থাকে, তখন চারপাশের বাতাসে ভাসে কেবলই আনন্দ আর উন্মাদনার সুর। বিলাসবহুল রিসোর্ট, অত্যাধুনিক ওয়াটার পার্ক আর সমুদ্রসৈকতগুলো কানায় কানায় পূর্ণ থাকে। রাশিয়া, বেলারুশ, ইউক্রেন থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্যের দর্শনার্থীদের ভিড়ে সেখানে তিল ধারণের জায়গা থাকে না। অথচ শীতের রুক্ষতায় সেখানে নেমে আসে এক বিস্তীর্ণ নীরবতা, যেন সারা গ্রীষ্মের ক্লান্তির পর প্রকৃতি কিছুটা বিশ্রামের সুযোগ পেয়েছে।

সাইপ্রাসের রাজধানী নিকোশিয়াতে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের সাথে কেটেছে চমৎকার কিছু মুহূর্ত
সাইপ্রাসের রাজধানী নিকোশিয়াতে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের সাথে কেটেছে চমৎকার কিছু মুহূর্ত

অক্টোবরের মাঝামাঝি থেকে এপ্রিলের শুরু পর্যন্ত এখানকার বড় বড় হোটেল আর রেস্তোরাঁগুলো প্রায় জনশূন্য থাকে। কেবল দুচোখের তৃষ্ণা মেটানোর বাসনা নিয়ে, শীতের এই শান্ত আয়া নাপা আর তুষারশুভ্র ট্রুডোসের বৈপরীত্যকে এক সুতায় গাঁথতেই আমার এই যাত্রা। নিকোশিয়ার সেন্ট্রাল কোচ স্টেশনে মাহাফুজ ভাইয়ের কাছ থেকে বিদায় নেওয়ার সময় এক অদ্ভুত বিষণ্ণতা ভর করেছিল। প্রবাসের এই অচেনা পরিবেশে মাত্র কয়েক ঘণ্টার আলাপে কারও সঙ্গে এতটা টান তৈরি হতে পারে, তা আমার কল্পনাতীত ছিল।

বিজ্ঞাপন

কোচ যখন আপন গতিতে প্রায় ৫০ মাইল পথ পাড়ি দিয়ে আয়া নাপায় পৌঁছাল, গ্রিক সাইপ্রাসের এই পূর্ব প্রান্তের শেষ সীমানায় দাঁড়িয়ে দেখলাম যত দূর দৃষ্টি যায়, কেবল ভূমধ্যসাগরের অনন্ত নীল জলরাশি আর লেবানন বা ইসরায়েলের দিকে হারিয়ে যাওয়া দিগন্ত। আকাশের নীলের সঙ্গে সাগরের নীল মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। গ্রীষ্মের সেই উপচে পড়া ভিড় নেই, বিলাসবহুল রিসোর্টগুলোও যেন শীতের প্রগাঢ় ঘুমে আচ্ছন্ন। এই রিক্ততার মাঝেই কোচ থেকে স্টপে নামতেই এক মোহনীয় সুবাস আমাকে আচ্ছন্ন করল। চারপাশ ঘুরে দেখতে দেখতে দুপুর গড়িয়ে গিয়েছিল, পেটেও তখন ক্ষুধার মৃদু আনচান। চারপাশের সুনসান নীরবতা আর শীতের হিমেল হাওয়ার মাঝে খাবারের এই সুবাস যেন উচ্ছ্বাস নিয়ে এল।

আয়া নাপা
আয়া নাপা
সিপ্রিয়োটিক গাইরো
সিপ্রিয়োটিক গাইরো

দুপুরের খাবার হিসেবে এক প্রৌঢ়ার পরম মমতায় বানানো সিপ্রিয়োটিক গাইরো বেছে নিলাম। হালকা সেঁকা রুটির ভেতরে মোড়ানো প্রক্রিয়াজাত সুস্বাদু মাংস, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, সতেজ সালাদ আর বিশেষ সসের সেই অনন্য স্বাদ শীতের স্নিগ্ধ দুপুরে জাদুকরি পরশ বুলিয়ে দিল। গ্রিস ও সাইপ্রাসের এই ফাস্ট ফুডটির সঙ্গে শর্মার বেশ মিল থাকলেও, লেবানন থেকে আসা শর্মা আর এই সিপ্রিয়োটিক গাইরোর স্বাদে বিস্তর ফারাক। সিপ্রিয়োটিক গাইরো আকারে একটু লম্বা হয় আর এর রুটিটাও হয় বেশ পাতলা, এর প্রতিটি কামড়ে লুকিয়ে থাকে অব্যক্ত তৃপ্তি আর শীতের দুপুরে কাঙ্ক্ষিত উষ্ণতা।

বিজ্ঞাপন

সময়ের অভাবে পুরো আয়া নাপা আর পারালিমনি তন্ন তন্ন করে ঘুরে দেখার সুযোগ না থাকলেও, আমরা ছুঁয়ে গিয়েছিলাম এর কিছু প্রাচীন ও প্রাকৃতিক বিস্ময়। বাইজেন্টাইন আমলের প্রাচীন আয়া নাপা মনাস্টারি আজও কালের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, যার পাথুরে দেয়ালের পরতে পরতে মিশে আছে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে জমে থাকা ইতিহাসের দীর্ঘশ্বাস। ধর্মীয় উপাসনালয় ও আশ্রম হিসেবে তৈরি এ জায়গাটি আজ নীরব হলেও এর ঐতিহাসিক গাম্ভীর্য এতটুকু কমেনি।

আয়া নাপার শেষ সীমানা কাপে গ্রেসো
আয়া নাপার শেষ সীমানা কাপে গ্রেসো

সেখান থেকে ট্যাক্সি চেপে আরও ১১ কিলোমিটার ভেতরে পৌঁছালাম আয়া নাপার শেষ সীমানায়, কাপে গ্রেসোতে। সাগরের বুক চিরে প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা এই বিশাল পাথুরে গুহা বা সি-কেভ যেন প্রকৃতির আপন খেয়ালে গড়া অনবদ্য ভাস্কর্য। গুহার গায়ে আছড়ে পড়া ঢেউয়ের শব্দ অদ্ভুত ঐন্দ্রজালিক পরিবেশের সৃষ্টি করছিল, যা যেকোনো অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমী মানুষের জন্য এক স্বপ্নের জায়গা।

এরপর গেলাম লাভ ব্রিজে। ভূমধ্যসাগরের নীলাভ সবুজ জলরাশিকে পরম মমতায় আলিঙ্গন করে দাঁড়িয়ে থাকা এই পাথরের সেতুটি পৃথিবীর অন্যতম বিস্ময়। সাগরের ঢেউয়ের আঘাতে ক্ষয়ে যাওয়া পাথরগুলো এমন এক রোমান্টিক রূপ নিয়েছে যে আবেগের বশবর্তী হয়েই হয়তো মানুষ এর নাম দিয়েছে লাভ ব্রিজ। নবদম্পতিরা এখানে এসে স্মৃতি ধরে রাখতে ভোলেন না। শীতের ছোট হয়ে আসা দিন আর সীমিত যানবাহনের কারণে নিসি বা ম্যাক্রোনিসোস সৈকতে যাওয়ার প্রবল ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও একরাশ আক্ষেপ নিয়েই সেদিনের মতো আয়া নাপাকে বিদায় জানাতে হলো।

লাভ ব্রিজ
লাভ ব্রিজ

পরদিন আমার গন্তব্য ছিল সাইপ্রাসের সর্বোচ্চ পর্বতমালা ট্রুডোস। ভূমধ্যসাগরীয় এই দ্বীপরাষ্ট্রে তুষারপাতের দেখা মেলা ভার, সমুদ্রের কাছাকাছি এলাকায় সারা বছরই একধরনের সমভাবাপন্ন আবহাওয়া বিরাজ করে। কিন্তু শীতের ট্রুডোস এক সম্পূর্ণ ভিন্ন জগৎ, যেন সাইপ্রাসের বুকেই একটুকরা অন্য মহাদেশ। সাইপ্রাসের একমাত্র স্কি রিসোর্টও এই পাহাড়ে অবস্থিত। পাফোস থেকে ট্রুডোস যাওয়ার পথে পাহাড়ের আঁকাবাঁকা রাস্তায় চোখে পড়ল স্থানীয় ওপেন মার্কেট; আমাদের গ্রামবাংলার চিরচেনা হাটের মতোই কোলাহলমুখর, কেবল রূপ আর মানুষগুলো সিপ্রিয়োটিক। সুপারশপের চেয়ে অনেক কম দামে সতেজ তরিতরকারি, আস্ত মাছ, প্রক্রিয়াজাত মাংস থেকে শুরু করে নানা রকম স্থানীয় পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসেছেন বিক্রেতারা।

ট্রুডোসে পা রাখতেই এক ঘোরলাগা বিস্ময় আমাকে গ্রাস করল। চারপাশের আর কোনো পাহাড়ে বরফের ছিটেফোঁটাও নেই, ধূসর আর সবুজের মিশেল, অথচ প্রায় সাড়ে ছয় হাজার ফুট উঁচু মাউন্ট অলিম্পাসকে বুকে ধারণ করা এই ট্রুডোস কয়েক ইঞ্চি পুরু শুভ্র তুষারের চাদরে নিজেকে সযত্নে মুড়িয়ে রেখেছে!

ট্রুডোসকে ঘিরে রাখা এই ছোট গ্রামগুলো ওয়াইন উৎপাদনের জন্য বেশ বিখ্যাত। বাইজেন্টাইন শাসনামলে এই গ্রামগুলোকে ঘিরেই গড়ে উঠেছিল একাধিক অর্থোডক্স মনাস্টারি
ট্রুডোসকে ঘিরে রাখা এই ছোট গ্রামগুলো ওয়াইন উৎপাদনের জন্য বেশ বিখ্যাত। বাইজেন্টাইন শাসনামলে এই গ্রামগুলোকে ঘিরেই গড়ে উঠেছিল একাধিক অর্থোডক্স মনাস্টারি

দুপুরের মিষ্টি রোদ যখন সেই তুষারকণার ওপর ঠিকরে পড়ছিল, মনে হচ্ছিল মাটির বুক ফুঁড়ে হাজারো তরল সোনার কণা বেরিয়ে আসছে। চারপাশের এই সীমাহীন শুভ্রতা বারবার ডিজনির অ্যানিমেশন মুভি ফ্রোজেনের মায়াবী ফ্রেমের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছিল। বৃষ্টিপাতের মতো তুষারপাত হয়তো শিল্প-সাহিত্যে ততটা রোমান্টিসিজম তৈরি করতে পারেনি, কিন্তু বাস্তবে এর মায়াবী রূপ অকল্পনীয়।

বরফের এই শান্ত ও স্নিগ্ধ রাজ্যে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর বেজক্যাম্পের সামনে ডিউটিরত এক সেনাসদস্যের সঙ্গে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ নিয়ে ছোট্ট এক আড্ডা হলো। আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড নাকি লিভারপুল, তিনি হাসিমুখে ভি চিহ্ন দেখিয়ে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের কথা বললেন। পাশ থেকে আরেক সেনা বলে উঠলেন, শুধু আর্সেনালই সেরা। ফুটবল যে কতটা সর্বজনীন ভাষা, তা সেদিন বুঝলাম। মুহূর্তের জন্যই যেন দুটো সম্পূর্ণ ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষকে একবিন্দুতে মিলিয়ে দিল ওই সামান্য কথোপকথন।

আশ্চর্যের বিষয় হলো, ট্রুডোস পর্বতমালা কয়েক ইঞ্চি পুরু বরফে ঢেকে থাকলেও আশেপাশের পাহাড়গুলোতে তুষারের বিন্দুমাত্র চিহ্ন নেই
আশ্চর্যের বিষয় হলো, ট্রুডোস পর্বতমালা কয়েক ইঞ্চি পুরু বরফে ঢেকে থাকলেও আশেপাশের পাহাড়গুলোতে তুষারের বিন্দুমাত্র চিহ্ন নেই

ট্রুডোসের শুভ্রতা পেছনে ফেলে লিমাসলের হাইওয়ে ধরে পাফোসে পৌঁছানোর প্রবেশপথে আমাদের সামনে উন্মোচিত হলো এক রূপকথার জগৎ। ছোটবেলায় ড্রয়িংরুমের দেয়ালে টাঙানো একটি পোস্টারে দেখতাম, সাগরের অথৈ নীল জলরাশিকে বিদীর্ণ করে সগর্বে দাঁড়িয়ে আছে এক বিশাল পাথুরে উচ্চভূমি। কে জানত, কল্পনার সেই ক্যানভাসটিই বাস্তবে এই জায়গাটি! গ্রিক পুরাণ মতে, এখানেই সমুদ্রের শুভ্র ফেনা থেকে জন্ম নিয়েছিলেন ভালোবাসা ও সৌন্দর্যের দেবী আফ্রোদিতি। আছড়ে পড়া ঢেউয়ের গর্জন আর শত শত বছর ধরে দাঁড়িয়ে থাকা পাথরের মিতালির এই স্বর্গীয় সৌন্দর্যকে পৃথিবীর কোনো জাগতিক ব্যাকরণের উপমায় বাঁধা অসম্ভব। প্রকৃতির এই অভাবনীয় রূপের মাঝেই তৈরি হলো এক অদ্ভুত রোমান্টিক আখ্যান।

পাথরের উচ্চভূমিতে দাঁড়িয়ে যখন সাগরের অনন্ত বিস্তৃতির দিকে তাকিয়ে প্রকৃতির রূপসুধা পান করছিলাম, আচমকা এক রূপবতী রাশিয়ান তরুণী এসে তাঁর কয়েকটি ছবি তুলে দেওয়ার অনুরোধ করলেন। জিন্‌সের প্যান্ট পরা সোনালি চুলের সেই অপ্সরীকে ক্যামেরার লেন্সে নিখুঁতভাবে বন্দী করার পর খুশিমনে চলে গেলেন। বাতাসে উড়ে যাওয়া তাঁর সেই হাসির রেশ আমাকে বেশ কিছুক্ষণ মোহাবিষ্ট করে রাখল। আমি তাঁকে মুখফুটে কিছু বলতে পারিনি।

পেট্রা টু রোমিও; অথৈ নীল জলরাশি চিরে সগর্বে দাঁড়িয়ে থাকা দেবী অ্যাফ্রোডাইটির এই পৌরাণিক জন্মস্থান যেন কল্পনার ক্যানভাসে আঁকা এক বাস্তব ছবি
পেট্রা টু রোমিও; অথৈ নীল জলরাশি চিরে সগর্বে দাঁড়িয়ে থাকা দেবী অ্যাফ্রোডাইটির এই পৌরাণিক জন্মস্থান যেন কল্পনার ক্যানভাসে আঁকা এক বাস্তব ছবি
লিমাসল প্রবাসী অয়ন শাহের (ডানে) আন্তরিকতায় ট্রুডোস ঘুরে দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল
লিমাসল প্রবাসী অয়ন শাহের (ডানে) আন্তরিকতায় ট্রুডোস ঘুরে দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল

আফ্রোদিতির জন্মস্থানে দাঁড়িয়েও প্রেমের দেবী হয়তো আমার প্রতি সহায় হলেন না। পরিশেষে একরাশ অপূর্ণ তৃষ্ণা, অব্যক্ত অনুভূতি আর পাহাড়সম সুন্দর স্মৃতি নিয়ে আমরা ফিরে চললাম পাফোসে। শীতের সাইপ্রাস হয়তো গ্রীষ্মের মতো উৎসবের রঙে রঙিন নয়, কিন্তু এর এই রিক্ততা, নীরবতা আর স্নিগ্ধতা মনের গহিনে প্রশান্তির যে পরশ বুলিয়ে যায়, তা এক জীবনের অমূল্য সঞ্চয় হয়েই থেকে যাবে।

লেখক: শিক্ষার্থী, ইউনিভার্সিটি অব নোভা গোরিছা, স্লোভেনিয়া।
ছবি: লেখক

প্রকাশ: ১৫ মে ২০২৬, ০৬: ০০
বিজ্ঞাপন