রাজসিক উরানিয়ায় ধ্রুপদি সিনেমা
শেয়ার করুন
ফলো করুন

সময়ের হেরফের হওয়ার কারণে দেহঘড়ি মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। বুদাপেস্টের সঙ্গে ঢাকার সময়ের পার্থক্য চার ঘণ্টার। ঢাকা এগিয়ে। এ জন্য বুদাপেস্টে মাঝরাতেই ঘুম ভেঙে বসে আছি। কী আর করা, উঠে লিখতে বসি। দুপুরের ভেতর এই অ্যাপার্টমেন্ট ছাড়তে হবে। আজ উঠব গিয়ে রুমবাখ হোটেলে। ভেবেছিলাম, ধীরেসুস্থে বের হব দুপুর দুইটার দিকে। কিন্তু অ্যাপার্টমেন্টের মালিক সিসিলা জানালেন, তাঁর আরেকজন গেস্ট আসছে, কাজেই দ্রুত ছাড়তে হবে অ্যাপার্টমেন্ট। ফিপ্রেসির বাহন সমন্বয়ককে জানালাম, যেন একটি গাড়ির ব্যবস্থা করে দেয়। বলতে যতটুকু দেরি হলো, দেখি ফিরতি বার্তায় ও বলছে, ছয় মিনিটের ভেতর তোমার অ্যাপার্টমেন্টের সামনে ট্যাক্সি এসে দাঁড়াবে। আমি বিদ্যুৎস্পৃষ্ট মানুষের মতো তিড়িং করে লাফিয়ে উঠে আক্ষরিক অর্থে পাঁচ মিনিটে সব গুছিয়ে ফেললাম। অ্যাপার্টমেন্ট থেকে বেরিয়ে দরজায় চাবি ঘোরাতে যাব, দেখি বাইরে এক ছোকরা বসে আছে। সে আমাকে দেখে পরিচয় দিল, সে সিসিলার ভাইপো। আমি বললাম, দেখো চাবিটাবি লাগানোর সময় নেই, তুমি হেল্প করো। নিচে ট্যাক্সি দাঁড়িয়ে আছে। ও সাহায্য করল। এলিভেটর পর্যন্ত পৌঁছে দিল। এরই ফাঁকে মনের ভেতর খচখচ করতে থাকা প্রশ্ন করে উত্তরটা জেনে নিলাম। ভবনটা কত পুরোনো বলো তো? ছোকরা জানাল, এটি তৈরি সম্পন্ন হয়েছে ১৯১৩ সালে। আর এখন তুমি যে এলিভেটরে উঠছ, সেটাও ১৯১৩ সালের। আমি ঢোঁক গিলতে গিলতে এলিভেটরে উঠলাম। প্রথম দিন আন্দাজে মজা করে ভেবেছিলাম এই উত্তোলনযন্ত্র এক শ বছরের পুরোনো না হয়ে যায় না। কিন্তু অনুমান এভাবে সত্যি হওয়ার পর তো গলা শুকিয়ে গেল। যাহোক এলিভেটরে ঢুকে বোতাম চেপে দিলাম। যেন অনন্তকাল ধরে নিচে নামছি। নিচতলায় নেমে দেখি মুরগির খাঁচা খুলছে না। আটকে গেছি। কী মুসিবত! এক শ বছরের পুরোনো লিফট, একটু বেয়াড়া তো হবেই। আমি ঠান্ডা মাথায় ভালো করে পর্যবেক্ষণ করে ঠিকমতো হাতল টেনে সজোরে ধাক্কা দিতেই খুলে গেল দরজা। যাক বাবা, বাঁচলাম। তাড়াতাড়ি লাগেজসহ আমি বেরিয়ে মূল ফটক খুলে দেখি হলুদ ট্যাক্সি দাঁড়িয়ে। হাঙ্গেরীয় উচ্চারণে চালক জিজ্ঞেস করছে, আমি বিধান কি না! হ্যাঁ সূচক মাথা নেড়ে বললাম, দাঁড়াও এই ১৯১৩ সালের ভবনটার একটা ছবি তুলে নিই। বলে রাস্তার ওপারে গিয়ে ছবি তুললাম (উপরের ছবি)। ভবনটি একেবারে দানিউব নদীর কোল ঘেঁষে। মন ভালো হয়ে যায় ওদের নদীর রক্ষণাবেক্ষণ আর সৌন্দর্য পরিচর্যা দেখে। একটা প্রশান্তিভাব ভর করে।

বিজ্ঞাপন

ট্যাক্সিতে উঠে বসলাম। চালক শহরের মাঝখান দিয়ে যাচ্ছে আর আমি দেখছি কী সুন্দর ছবির মতো করে সাজানো শহর। দেখলাম আমাদের গাড়িটি উঠে যাচ্ছে বুদাপেস্টের সবচেয়ে বিখ্যাত চেইন ব্রিজের ওপর। সেতুটি বেশ রাজসিক কায়দায় বানানো। অনেক পর্যটক দেখলাম সেতুর দুই পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। দেড় শ বছর আগে বানানো সেতুকে কেমন করে রক্ষণাবেক্ষণ করতে হয় এবং পর্যটকদের আকর্ষণে পরিণত করতে হয়, তা এই চেইন ব্রিজ না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। ব্রিজ থেকে নেমে আমরা চলে গেলাম রুমবাখ অঞ্চলে, রুমবাখ হোটেলে।

ম্যারাথন থেকে দেওয়া ব্যাজ ও উপহার
ম্যারাথন থেকে দেওয়া ব্যাজ ও উপহার

আধুনিক হোটেল। লবিতে ঢুকেই দেখি ফ্রান্সের ইজাবেল দানেল। সেই ২০২২ সালে ফ্রান্সের কানে আমি যখন ক্রিটিক জুরি হয়েছিলাম, তখন এই ইজাবেল আমাদের জুরি সেক্রেটারি ছিলেন। ষাটোর্ধ্ব ইজাবেল আমাকে দেখে আনন্দিত হলেন। কুশলাদি বিনিময় চলল। এরপর আমি আমার রুমের চাবি বুঝে নিয়ে ওপরে চলে এলাম। রুমে ঢুকেই দেখি বুদাপেস্ট ক্লাসিকস ফিল্ম ম্যারাথনের পক্ষ থেকে আমার জন্য উপহার রাখা। আমার নামাঙ্কিত আইডি, টোট ব্যাগের ভেতর নানা উপহার। মন ভালো হয়ে গেল। বাক্সপ্যাটরা রেখে বের হলাম হোটেল থেকে, দুপুরের খাবার খেতে হবে। একদম পাশেই দুটি খাবারের দোকান। দেখি একটি দোকানের সামনে ফুটপাতে পেতে রাখা টেবিলে বসে তিনজন খাওয়াদাওয়া শেষ করেছে কেবল। চিনতে একদমই কোনো সমস্যা হলো না ওদের। ইতালির একজন ফিল্ম ক্রিটিক পাওলা কাসেলা, নর্থ ম্যাসেডোনিয়ার মারিনা কস্তোভা ও আরমেনিয়ার ডিয়ানা মারতিরোস্যান। পাওলা আমাকে স্নেহ করেন। অনেকটা আমার মায়ের মতোই দেখতে। প্রথমে দেখে চিনতে পারেনি, কিন্তু যখন চিনতে পারল চিৎকার করে উঠল। বিধান তুমি এসেছ?

বিজ্ঞাপন

ওরা কী নিয়ে যেন আলাপ করছিল, আমি বললাম, তোমরা কথা বলো, আমি দুপুরের খাবার অর্ডার করি। খোয়াজোঁর ওপরে ডিম পোচ, সঙ্গে ঘাসলতাপাতা। কী এক অদ্ভুত নাম দিয়ে ওরা ব্রাঞ্চ বলে বিক্রি করছে। বোঝাই যাচ্ছে এটা হাঙ্গেরীয় খাবার নয়, ফরাসি খাবারের ফিউশন আরকি। খেলাম, মন্দ নয়। টুকটাক কথা চালিয়ে বিদায় নিলাম। সন্ধ্যা ছয়টায় সবার হোটেল লবিতে থাকার কথা। বুদাপেস্ট ক্ল্যাসিকস ফিল্ম ম্যারাথনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যেতে হবে। আমি হোটেল রুমে ফিরে কিছুটা গড়াগড়ি করে সাড়ে পাঁচটা নাগাদ তৈরি হয়ে নিলাম। নিচে গিয়ে দেখি একে একে জড়ো হচ্ছেন বিভিন্ন দেশের চলচ্চিত্র সমালোচকরা। আমাদের সবার লক্ষ্য হলো ফিপ্রেসির সাধারণ সভায় অংশগ্রহণ। কিন্তু উপলক্ষ হলো ফিল্ম ম্যারাথন। এই ফাঁকে বুদাপেস্টে আসা আমাদের সকলের নাম-পরিচয়টা দিয়ে দিই—
ডিয়ানা মারতিরোস্যান (আরমেনিয়া), বারবারা গ্যাসার (অস্ট্রিয়া), বিধান রিবেরু (বাংলাদেশ), কেভিন জিরাউড (বেলজিয়াম), বজিদার মানভ (বুলগেরিয়া), মারটিন হরিনা (চেক রিপাবলিক), আহমেদ শাওকি (মিসর), ইজাবেল ডানেল (ফ্রান্স), ফিলিপ মারেক (ফ্রান্স), ইনগ্রিড বিয়ারবম (জার্মানি), ইয়ুন-হুয়া চেন (জার্মানি), ভ্যাসিলিস কেশাগিয়াস (গ্রিস), গিয়োর্গি ব্যারন (হাঙ্গেরি), বিদ্যাশঙ্কর নীলকান্ত (ভারত), নামা রাক (ইসরায়েল), পাওলা কাসেলা (ইতালি), কুরিকো সাটো (জাপান), ক্লেমেন্টাইন ভ্যান উইজিনগার্ডেন (নেদারল্যান্ডস), মারিনা কস্তোভা (নর্থ ম্যাসেডোনিয়া), সোফিয়া আলভারেজ (পেরু), বারবারা হলান্দার (পোল্যান্ড), ডানা ড্যুমা (রোমানিয়া), মাশায়েল আবদুল্লাহ (সৌদি আরব), বজিদার জেচেভিচ (সার্বিয়া), মারিয়া রিডৎজনোভা ফেরেনচুহোভা (স্লোভাকিয়া), টোবিয়াস রাইডেন জোসট্রান্ড (সুইডেন), বিট গ্লুর (সুইজারল্যান্ড), এলেনা রুবাশেভস্কা (ইউক্রেন) ও রিটা ডি সান্টো (ইউনাটেড কিংডম)। এ ছাড়া এবারের জেনারেল অ্যাসেম্বলিতে অতিথি হিসেবে যুক্ত হয়েছিলেন ব্যক্তি হিসেবে সদ্য সদস্যপদ পাওয়া কিরগিস্তানের সুলতান ইয়ুসুবালিয়েভ।

হাঙ্গেরির সুপরিচিত ফিল্ম ক্রিটিক কাটা গিয়ুরকে আমাদের সবার সমন্বয়কারী হিসেবে কাজ করছেন। তিনিই পথ দেখিয়ে আমাদের নিয়ে গেলেন উরানিয়া সিনেমা থিয়েটারে। হোটেল রুমবাখ থেকে মিনিট দশকের হাঁটাপথ। আমরা সকলেই হাঁটছি বুদাপেস্টের পরিষ্কার–পরিচ্ছন্ন রাস্তা ধরে। আমার পাশে হাঁটছেন জার্মানি থেকে আসা ইয়ুন, তিনি মূলত তাইওয়ানের, কিন্তু জার্মানিতে পড়াশোনা করে বসবাস করছেন সেখানেই, তারই সুবাদে সদস্য হয়েছেন জার্মানির ফিপ্রেসি চ্যাপ্টার ভিডেএফকে নামের চলচ্চিত্র সমালোচক সংস্থার। ওর সঙ্গে নানা বিষয়ে কথা বলতে বলতে আমরা পৌঁছে যাই উরানিয়াতে।

ম্যারাথনের মূল ভেন্যুর সামনে লেখক
ম্যারাথনের মূল ভেন্যুর সামনে লেখক

বেশ রাজসিক ভঙ্গি আছে প্রেক্ষাগৃহটির। আর দেখেই বোঝা যাচ্ছে ভবনটি বেশ পুরোনো। ভেতরে শানশওকত বজায় রাখা হয়েছে। মেঝে থেকে ছাদ সর্বত্র রাজকীয় সজ্জা। ভেনেশিয়ান গোথিক আর ইতালিয়ান রেনেসাঁরীতির মিশেল ঘটিয়ে ভবনটি তৈরি হয়েছে। আরব-মুরীয় স্থাপত্যকলার ছাপও চোখে পড়ে এদিক-সেদিক। উরানিয়া ন্যাশনাল ফিল্ম থিয়েটার নির্মিত হয়েছিল ১৮৯৬ সালে। চলচ্চিত্রের বয়সের সমসাময়িক। শুরুর দিকে সংগীতানুষ্ঠান হতো এখানে। ঐতিহ্যবাহী এই থিয়েটারে ঢুকে দেখি অনেক মানুষের ভিড়। সকলে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের প্রবেশপত্র সংগ্রহ করছে।

আগে থেকেই নিবন্ধিত অতিথিদের সারিতে গিয়ে দাঁড়ালাম। একঝাঁক হাঙ্গেরীয় তরুণী নিবন্ধন মিলিয়ে উপহারসামগ্রী সমেত একটি থলে, অধুনায় যা টোট ব্যাগ নামে পরিচিত, আর সঙ্গে হাত বন্ধনী ও প্রথম শো দেখার টিকিট ধরিয়ে দিচ্ছে। টিকিটে আসন বিন্যাস দেওয়া। ঢোকার মুখেই অনুবাদের যন্ত্র নিয়ে আরো এক তরুণী দাঁড়িয়ে। আমার ব্যাজ দেখে নাম লিখে একখানা যন্ত্র দিল। ইংরেজি অনুবাদের চ্যানেলটি সেট করে দিল। আমি গলায় ঝুলিয়ে ঢুকে গেলাম ভেতরে। রাজসিক দৃশ্য। গম্বুজাকৃতির ছাদে বিশাল ঝাড়বাতি। চারদিকে মখমলের পর্দা। সে এক এলাহি ব্যাপার। আমি আসন খুঁজে বের করে বসে পড়লাম।

খুবই সাদামাটাভাবে শুরু হলো ফিল্ম ম্যারাথন। হাঙ্গেরির জাতীয় চলচ্চিত্র মহাফেজখানা কীভাবে কাজ করছে, ভবিষ্যতে কোন পথে হাঁটতে চায়, তার বিশদ বিবরণ দিলেন চলচ্চিত্র বিশারদ, আর্কাইভের কর্তাব্যক্তি ও ম্যারাথনের ডিরেক্টর গিওর্গি রাডুলি। এরপর মঞ্চে আমন্ত্রণ জানানো হয় ফ্রান্সের লুমিয়ের ইনস্টিটিউট প্রধান ও কান ফিল্ম ফেস্টিভালের জেনারেল ডেলিগেট থিয়েরি ফ্রেম্যুকে। তিনি কয়েক বছর ধরে লুমিয়ের ভ্রাতৃদ্বয়ের হারিয়ে যাওয়া ফুটেজ সংগ্রহ ও মেরামতের গুরু দায়িত্ব পালন করছেন। তৎসংক্রান্ত ‘লাইট! দ্য অ্যাডভেঞ্চার বিগিনস’ নামের একটি প্রামাণ্যচিত্র বানিয়েছিলেন ২০১৬ সালে। এরই ধারাবাহিকতায় এ বছর বুদাপেস্টে নিয়ে এসেছেন পরবর্তী প্রামাণ্যচিত্রটি নিয়ে: ‘লাইট, দ্য অ্যাডভেঞ্চার কন্টিনিউজ’। দ্বিতীয় প্রামাণ্যচিত্রটি আমাদের দেখানো হবে দ্বিতীয় দিন। তবে প্রথম দিন উদ্বোধনী সন্ধ্যায় সেই ছবির বাইরে থেকে যাওয়া কিছু খণ্ডচিত্র দেখালেন, যেগুলো অগাস্ত ও লুই ভাইয়েরা তুলেছিলেন বা তুলিয়ে ছিলেন। তাদের ক্যামেরা কোথায় পাঠানো হয়নি?

উরানিয়া ন্যাশনাল ফিল্ম থিয়েটার
উরানিয়া ন্যাশনাল ফিল্ম থিয়েটার

এশিয়ায় চীনাদের জীবনযাপন থেকে শুরু করে ইউরোপে হাঙ্গেরির চেইন ব্রিজের ওপর লোকেদের যাতায়াত ও ভ্রমণ—সবই তাঁরা ক্যামেরাবন্দী করেছেন। এসব ছবি দেখছি আর ভাবছি, এরা কত সযতনে নিজেদের কাজ সংরক্ষণ করে। শুধু তা–ই নয়, এর মাধ্যমে তারা আসলে বিশ্ববাসীর কাছেই ধন্যবাদার্হ। কারণ বিংশ শতকের গোড়ায় জনজীবনের যে চিত্র তারা ধারণ করে রেখেছেন, তাতে করে সে সময়কে এখনকার মানুষ অবলোকন করতে পারছেন। চাক্ষুষ করতে পারছেন। সময়কে পরিভ্রমণ করতে পারছেন। চলচ্চিত্র তো আসলে টাইমমেশিন। যাতে চড়ে মানুষ ঘুরে আসতে পারেন উভয়ত্র—অতীত ও ভবিষ্যতে।

থিয়েরি ফ্রেম্যুর প্রেজেন্টেশন শেষ হলে চালানো হয় হাঙ্গেরির প্রখ্যাত ইস্তভান জাবো পরিচালিত ‘বিয়িং জুলিয়া’ (২০০৪)। ছবিটি ২১ বছর আগের হলেও এরই মধ্যে অর্জন করে নিয়েছে আধুনিক ধ্রুপদির তকমা। কমেডি ড্রামা জনরার ছবিটি হলভর্তি মানুষ মন্ত্রমুগ্ধের মতো দেখলেন। জুলিয়ার চরিত্রে অভিনয় করা অ্যানেত বেনিং এই ছবির প্রাণভোমরা। মঞ্চাভিনেত্রীর মধ্যবয়সী জীবনের সংকট, অন্তর্দ্বন্দ্ব, আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলা এবং পরবর্তীকালে স্বপ্নভঙ্গ ও নিজেকে ফিরে পাওয়ার এক অপূর্ব চলচ্চিত্র এটি। অনেকে হল থেকে বেরিয়ে আমাকে বলছিলেন, এত সিরিয়াস একটা গল্প অথচ কেমন ট্রিটমেন্ট। আমি বললাম, ওটাই তো পরিচালকের অভীপ্সা। তিনি চেয়েছেন সিরিয়াস ইস্যুকে যেন দর্শক অতটা সিরিয়াসলি না নেন। তাঁরা যেন জীবনকে, জীবনের সংকটকে তুচ্ছজ্ঞান করে। তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেয়। চলচ্চিত্রটি যখন শেষ হয়, তখন পুরো হলের দর্শক হাততালি দিতে শুরু করলেন। মাইকে ঘোষণা এল, পরিচালক এই প্রেক্ষাগৃহেই রয়েছেন। এটা শুনে তো হাততালির শব্দ আরও বেড়ে গেল আর সবার চোখ পরিচালককে খুঁজতে লাগল।
সবাই যখন খুঁজেই পাচ্ছে না পরিচালককে, তখন দেখি তিনি আমার পেছনের সারি থেকে উঠে দাঁড়ালেন। এবার সবাই উঠে দাঁড়িয়ে হাততালি দিতে শুরু করলেন এবং ছন্দে ছন্দে। এই হাততালি কানের চেয়ে আলাদা, বার্লিনের চেয়ে আলাদা, টরন্টো থেকে আলাদা। আমার ভালো লেগেছে। কিন্তু ফরাসিরা একটু নাক উঁচু স্বভাবের কি না, সে জন্য পরে আমাকে ফ্রান্স থেকে আসা ইজাবেল অনেকটা ভেংচি কেটে বলছিলেন, ওভাবে কেউ হাততালি দেয় নাকি? আর ছবিটাও বিশেষ ভালো না। আমি ভাবলাম, ফরাসি ছবির যা ছিরি হয়েছে আজকাল, এলজিবিটিকিউ ইস্যুতেই ঘুরপাক খাচ্ছে। তবে মুখে বললাম, দেখো, ভূখণ্ড পরিবর্তন হলে তার উদ্‌যাপনও ভিন্ন হয়। এটাই তো সৌন্দর্য। এটাকে তোমার তারিফ করতে শিখতে হবে। দেখলাম মুখটা বেজার হয়ে গেল।

যাহোক, পরিচালক ইস্তভান জাবোকে এত কাছে দেখে আমি পুলকিত। তিনি অত্যন্ত সুপরিচিত ও জনপ্রিয় নির্মাতা। আমি তাঁর ছবি তুললাম। পরে ম্যারাথন থেকে দেওয়া পুস্তিকাতে তাঁর হস্তাক্ষর সংগ্রহ করলাম। আমি একটু পুরোনো ইশকুলের, তাই ফটোগ্রাফের বদলে অটোগ্রাফ নিলাম। বাংলাদেশ থেকে এসেছি শুনে একটু অবাক হলেন। ছবিটি সম্পর্কে আমার ভালো লাগা জানিয়ে হল থেকে বেরিয়ে এসে দেখি মোটামুটি নিচের তলা খালি হয়ে গেছে। সবাই গেছে দোতলায় রাতের খাবার খেতে। আমার কলিগদের দুয়েকজন তাড়া দিল আসার জন্য।

বিশ্বখ্যাত হাঙ্গেরিয়ার চলচ্চিত্র পরিচালক ইস্তভান জাবো
বিশ্বখ্যাত হাঙ্গেরিয়ার চলচ্চিত্র পরিচালক ইস্তভান জাবো

আমি ওপরে গিয়ে দেখি সব অতিথি এরই মধ্যে খাওয়াদাওয়া শুরু করে দিয়েছেন। বিশাল হলরুমে, ভাগ ভাগ করে টেবিল ভর্তি হাঙ্গেরিয়ান ওপেন স্যান্ডউইচ। একেকটা একেক স্বাদ ও বর্ণের। কোনোটার ওপর হাঙ্গেরিয়ান সালামি, নানা পদের। কোনোটার ওপর চিজ ও সালাদ। কোনোটার ওপর হ্যাম আর টমেটো। ডেজার্ট শাখায় কত রকম যে কেক আর পুডিং। পানীয় পরিবেশনের জায়গায় কোমল ও কঠোর দুটিই রয়েছে। আমি লাল দ্রাক্ষারস নিলাম। কারণ, সন্ধ্যায় ওটা নেওয়াই রীতি। সঙ্গে তিনখানা খোলা স্যান্ডউইচ। পরে নিয়েছিলাম ব্লুবেরি ক্রিম স্লাইস, হাঙ্গেরীয় ভাষায় যাকে বলে ‘আফোনাইয়াস টেৎজিন্স জেলেট’, কী খটোমটো নাম রে বাবা!    

তো আমি আপনমনে খাচ্ছি। বুঝতে পারছি পেটের ভেতর ভালোই ইঁদুর দৌড়াচ্ছিল। যেহেতু আমি একটু দেরিতে এসেছি, তাই টেবিলের গুচ্ছ আলাপে শামিল হতে পারিনি। একটু দূরে একা টেবিলে বসে খাচ্ছি আর লোকজন পর্যবেক্ষণ করছি। দেখলাম থিয়েরি ফ্রেম্যু ঘুরে ঘুরে আলাপ করছেন, হাতে শ্যাম্পেনের গ্লাস। হঠাৎ দেখি সৌদি আরব থেকে জেনারেল অ্যাসেম্বলিতে আসা মাশায়েল একা একা ঘুরছেন। বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো। চুল খোলা। সুন্দর করে সেজেছেন। আমাকে দেখতেই এগিয়ে এলেন। টেবিলের অন্য প্রান্তে বসলেন। তাঁর সঙ্গে আমার ২০২৪ সালে রিয়াদে ফিল্ম ক্রিটিকস কনফারেন্সে আলাপ হয়েছিল। খাবার নিতে বললাম, বললেন, খাবেন না। বুঝলাম খাবার গ্রহণে তিনি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছেন না। তাই নিছক ফলের রস নিতে বললাম। সেটাও তিনি নিলেন না। খালি মুখেই আলাপ শুরু করলেন। জানলাম, করোনার পর থেকে তাঁর চলচ্চিত্র সম্পর্কে আগ্রহ জন্মাতে থাকে। সেই সুবাদে যুক্ত হয়েছেন সৌদি ফিল্ম কমিশনের সঙ্গে।

কথা বলছি মাশায়েলের সঙ্গে। দেখি আমাদের দিকে এগিয়ে এলেন ইজাবেল। আমি বললাম, তোমাকে একটা কথা বলি, আমাদের ঠাকুরমার নাম ছিল ইস্তেফানি। তোমার নামের সঙ্গে খুব মিল। ইজাবেল হেসে বলল, আমি তোমার ঠাকুরমা হতে পারি নিঃসন্দেহে। সত্তরের কাছাকাছি ইজাবেল হেসে বিদায় নিলেন।
ঢাকায় তখন রাত দুইটা। আমার মাথা যথেষ্ট ধরে আছে। সবাই নড়াচড়া শুরু করলে আমিও যাব তাদের সঙ্গে। বুলগেরিয়ার বজিদার মানোভ এলেন আমার সামনে।

সত্তরের কাছাকাছি ছোটখাটো এই চলচ্চিত্র পণ্ডিতের সঙ্গে আমার গত ফেব্রুয়ারির বার্লিনালেও দেখা হয়েছিল। বেশ মজার মানুষ বজিদার। আমাকে পছন্দ করেন। তিনি বুলগেরিয়ার সবচেয়ে বড় উৎসব সোফিয়া ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের সঙ্গে যুক্ত। কথায় কথায় জানালেন, একবার ঢাকার ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে আসার সুযোগ তৈরি হয়েছিল। চিফ ডিরেক্টর আহমেদ মুজতবা জামাল তাঁকে আমন্ত্রণ করেছিলেন, কিন্তু কি এক ঝামেলার কারণে আর ঢাকা দর্শন হয়নি। তবে তিনি বাংলাদেশে আসতে চান। আমি বললাম, নিশ্চয় আসবেন। এরপর বিচ্ছিন্নভাবে এর-তার সঙ্গে গপ্পোসপ্পো হলো।
মোটামুটি খাওয়াদাওয়া শেষ হলে পরে সবাই ফিরতে শুরু করেছে। কিরগিস্তানের সুলতান বলল, বিধান আমাকে ফেলে চলে যেও না যেন! আমাকে অপেক্ষা করতে বলে সে গেল থিয়েরির সঙ্গে দেখা করতে, কী কথা বলবে। ফিরে এলে আমরা বের হলাম। সঙ্গে আরও অনেকেই। পথে চলতে চলতে জিজ্ঞেস করলাম কিরগিস্তানের চলচ্চিত্রের কি হালহকিকত? বলল, বাণিজ্যিক ছবির পাশাপাশি আর্টফিল্মও তৈরি হচ্ছে। তা ছাড়া সরকারের পক্ষ থেকেও সহযোগিতা আছে। তৃতীয়বারের মতো তারা বিশকেক ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল করল এ বছর। সেখানে আহমেদ মুজতবা জামাল গিয়েছিলেন। সুলতান বেশ আনন্দ নিয়ে বলল, সে এখন বাংলাদেশের দুজনকে চেনে, এক জামাল ও আরেক বিধান। আমি বললাম, তোমার এই জানাশোনা আরও বৃদ্ধি হোক।

মাঝরাতে বুদাপেস্টের রাস্তায় আলাপ করতে করতে রুমবাখ হোটেলে চলে এলাম। হোটেলের কাছেই দেখি রাস্তা আটকে রাতের শুটিং হচ্ছে। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে দেখলাম। ধোঁয়ায় ভর্তি চারদিক। আলোর প্রক্ষেপণ। ক্যামেরার সামনে অভিনেত্রী গাড়ি থেকে বেরিয়ে কী যেন সংলাপ দেওয়ার চেষ্টা করছেন। হবে কোনো ফিল্ম নোয়া! অথবা বিজ্ঞাপন! হোটেলে ফিরতে ফিরতেই ইতালির ফিল্ম ক্রিটিক পাওলা আমার কনিষ্ঠপুত্র জেনোর কথা জিজ্ঞেস করলেন। বললেন, তোমার এই পিচ্চিটার চোখ বড্ড সুন্দর! আমি বললাম, হ্যাঁ, ও খুব এক্সপ্রেসিভ। আমার স্ত্রী ও বড় ছেলে মনেকে নিয়েও গল্প করলাম। পাওলা বললেন, তুমি রোম এলে অবশ্যই আমার বাসায় আসবে। পাওলার স্বামী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ান, সেখানে নাকি গোটা কয়েক বাংলাদেশি ছাত্রও আছে। আমি বললাম, রোম যাব আর তোমার সঙ্গে দেখা হবে না, তাই কি হয়? অবশ্যই দেখা করব। পাওলার বয়স পঁয়ষট্টির কাছাকাছি হবে। নরম স্বভাবের মানুষ। কথাও বলেন বেশ মিষ্টি করে।
হোটেল লবি থেকে বিদায় নিয়ে রুমে ফিরলাম। পরদিন শুরু হবে আমাদের ফিপ্রেসির সাধারণ সভা। ঘুমাতে যাওয়ার আগে ঢাকায় ডাক পাঠালাম। দেখি সাড়া নেই। ঘুমের দেশে সবাই। আমি সুদূর এই রুবিক’স কিউব আবিষ্কার করা দেশে একা ঘুমাতে যাই, মাথার ভেতর চলতে থাকে ভাবনার কিউব।
(চলবে)
ছবি: লেখক
লেখক: সাংবাদিক ও চলচ্চিত্র সমালোচক

প্রকাশ: ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ০৬: ০০
বিজ্ঞাপন