
লন্ডন থেকে আস্তানা বদল করে কেমব্রিজে আসার পরে প্রায় বছরখানেক ধরেই ইচ্ছা ছিল কেমব্রিজের ঠিক পাশের ছোট শহর ইলির বিখ্যাত ইলি ক্যাথিড্রাল দেখতে যাব; কিন্তু সময় আর সুযোগ কিছুই হচ্ছিল না। কিছুদিন আগে বাংলাদেশ থেকে ফেরার পর আমার বড় মেয়ে আরুষি বায়না ধরে—ট্রেনে চড়বে। সুতরাং আরুষির বায়না মেটানোর জন্য ট্রেনস্টেশনে যাত্রা শুরু করে ভাবলাম, যেকোনো ট্রেনে উঠে কাছেপিঠে যেকোনো স্টেশনে নেমে পড়ব। ঠিক ওই সময়ে আমার স্ত্রী মৌনী বলল, চলো তাহলে ইলিতে যাই।

ব্যস, যেই কথা সেই কাজ। সেটা ছিল প্রারম্ভিক মার্চের সুন্দর এক সকাল। আমাদের যাত্রা শুরু হলো ইলি শহরের উদ্দেশে। বাড়ির কাছের কেমব্রিজ নর্থ স্টেশনের ভেন্ডিং মেশিনে টিকিট কিনতে গিয়ে দেখি—কেমব্রিজ থেকে ইলির টিকিটের মূল্য মাত্র সাড়ে তিন টাকা।
মনে হলো ঈশা খাঁর আমলে আছি। সাড়ে তিন টাকা মানে সাড়ে তিন পাউন্ড। ব্রিটেনে আমরা বাংলাদেশিরা অনেকেই পাউন্ডকে ভালোবেসে টাকা বলে থাকি। যাহোক এমন মুদ্রাস্ফীতির জমানায়ও যে সাড়ে তিন টাকায় ট্রেনের টিকিট পাওয়া যায় সেটিই বা কম কী!

ট্রেনে উঠে আরুষির আনন্দ তা ছিল অবর্ণনীয়। মিনিট ১৫ পরে আমরা ইলিতে নেমে হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছলাম ইলি টাউনের পাশ দিয়ে বয়ে চলা মেল্টিং নদীর ধারে। সাইজে কেমব্রিজের কেম নদীর থেকে খানিকটা বড়। মাত্র কদিন আগে পদ্মা নদী বেড়িয়ে আসা আমার মন কি এসব মেল্টিং নদীতে ভরে? তবুও পশ্চিমা বিশ্বের নদীগুলোর চলনে আলাদা একটা ছন্দ থাকে, সেই সঙ্গে থাকে একটা কাব্যিক গতি।

নদীর পাড় ধরে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ দেখি, ক্ষীণকায় সূর্য ঠিক মাথার ওপরে। ব্যস, ঢুকে পড়লাম ওয়েলউড নামের একটি ইতালিয়ান রেস্টুরেন্টে। আরুষির প্ররোচনায় পিৎজা, কোকাকোলা, রক্তবর্ণ দ্রাক্ষাসুধা আর শেষপাতে ফ্রেসলি গ্রাউন্ডেড কফি সহযোগে মধ্যাহ্নভোজ শেষ করে হাঁটা ধরলাম ইলির বিখ্যাত ক্যাথিড্রাল দর্শনের উদ্দেশে।
ইলি হচ্ছে স্যাক্সন আমলের ইস্ট এংলিয়া রাজ্যের একটি ছোট শহর। প্রাচীন অ্যাংলো-স্যাক্সন আমলে বর্তমান যুক্তরাজ্যের প্রতিটি রাজ্যের মধ্যে ইস্ট-এংলিয়া রাজ্য ছিল অন্যতম। বর্তমান কেমব্রিজশায়ার, সাফক, নরফোক ও অ্যাসেক্স কাউন্টি নিয়ে এই বৃহৎ রাজ্য দেখতে যেমন সুন্দর ছিল, তেমনি উজ্জ্বল ছিল জ্ঞানবিজ্ঞানের উৎকর্ষে। কেম, মেল্টিংস, চেলমারসহ অনেক নদীবিধৌত এই অঞ্চলকে রোমানদের গেটওয়েও বলা হয়ে থাকে।

প্রায় ১৪০০ বছর আগে স্যাক্সন কিং অ্যানের শাসনামলে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর এই গোটা ইস্ট এংলিয়ায় একটা উত্তাল অবস্থা বিরাজ করছিল। বিশেষ করে ডেইনস আর দখলদার স্যাক্সন আর্মিদের মধ্যে চলছিল চরম উত্তেজনা এবং যুদ্ধংদেহী অবস্থা। এমন উত্তাল সময়ে ৬৩৬ খ্রিষ্টাব্দে তৎকালীন ইস্ট এংলিয়া কিংডমের রাজা কিং অ্যানের ঘরে জন্ম হয় এক ফুটফুটে কন্যাসন্তানের। রাজা তাঁর রাজকন্যার নাম রাখেন এথেলড্রিয়া। ইংরেজিতে এথেলড্রিয়া নামের অর্থ হলো শক্তিমত্তা। সেই ফুটফুটে রাজকন্যা বড় হলে তাঁর রূপের বাহার ছড়িয়ে পড়ে চারপাশে। সেই সঙ্গে তাঁর বিদ্যা আর বুদ্ধির ছটাও। অন্তত এথেলড্রিয়ার ভাস্কর্য থেকে তাঁর রূপের কথা নিশ্চিত বলা যায়।
সেই প্রিন্সেস প্রাপ্তবয়স্ক হলে তাঁর হাতে পড়ে রাজ্যের অনেক দায়িত্ব। জানামতে, তৎকালীন গোটা ব্রিটেনের সবগুলো রাজ্যে খুব কম রাজকন্যা অথবা রানী ছিলেন যাঁরা সেন্ট উপাধি পেয়েছিলেন। রাজকন্যা এথেলড্রিয়া ছিলেন তাঁদের একজন। পরবর্তী সময়ে তিনি ফেনল্যান্ড ও নর্থামব্রিয়ার রানি হয়ে রাজকার্য পরিচালনা করেছিলেন।

রাজনৈতিক কারণে দুবার বিয়ে করা সত্ত্বেও কুইন এথেলড্রিয়া সতীত্বের ব্রত নেন এবং সন্ন্যাসিনী হওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরে ৬৭৩ সালে তাঁর জন্মস্থান ইলিতে এই ক্যাথিড্রাল প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেন। ক্যাথিড্রালটি স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে প্রায় দুই শ বছর ধরে খুব জনপ্রিয় ছিল। পরে ৮৭০ সালে, এটি ভাইকিংদের দ্বারা ধ্বংস হয়ে যায়। এথেলড্রিয়ার মূল স্থানটিও প্রায় ধ্বংস হয়ে যায় সব প্রমাণসহ। এর প্রায় এক শ বছর পরে ৯৭০ সালে, উইনচেস্টার এথেলওল্ডের বিশপ বর্তমান ভবনের কাছাকাছি একটি বেনেডিক্টিন অ্যাবে প্রতিষ্ঠা করেন। বর্তমানে যে ক্যাথেড্রাল বিদ্যমান রয়েছে, তার ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন সিমিওন (৯৯৩-১০৯৩), যিনি প্রথম নর্মান অ্যাবট এবং উইলিয়াম দ্য কনকাররের আত্মীয় হওয়ার জন্য বিখ্যাত।
হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন, সেই উইলিয়াম দ্য কনকার যিনি প্রায় হাজার বছর আগে টাওয়ার অব লন্ডন এবং বিখ্যাত উইন্ডসর ক্যাসল তৈরি করেছিলেন, যেখানে বর্তমানে বসবাস করেন গ্রেট ব্রিটেনের বর্তমান রাজা চতুর্থ কিং চার্লস। মোদ্দাকথা কুইন এথেলড্রিয়া যে ইলি ক্যাথেড্রালের সূচনা করেছিলেন, তা ধীরে ধীরে আজকের বিদ্যমান ঝাঁ চকচকে ক্যাথেড্রালে বিস্তৃতি লাভ করতে সময় লাগে প্রায় তিন শ বছর।

দেয়ালের গাঁ–জুড়ে দৃষ্টিনন্দন শিল্পকর্ম, কাচ আর বিভিন্ন রঙের পাথরের অসাধারণ শিল্পময় জানালা আর লাইম স্টোনে তৈরি বিশাল এই ক্যাথিড্রালের সঙ্গে অনেকটাই মিল পেলাম অক্সফোর্ডের সেন্ট মেরি ক্যাথিড্রাল, ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবে ও কেমব্রিজের কিংস কলেজ চ্যাপেলের সঙ্গে।
বিশাল এই চ্যাপেল ঘুরে দেখতে দেখতে ক্লান্তশ্রান্ত হয়ে বেরিয়ে সুনসান রাস্তায় আসার পরে মনের মধ্যে একধরনের শূন্যতা ভর করল। মনে হলো এই সেই পথ, এই সেই গলি, যেখানে হাজার বছর আগে বসত রঙের মেলা। গমগম করত হাজারো মানুষের পদচারণে। কুইন এথেলড্রিয়া তো ছিলেনই, এমন কোনো এক রোববারে হয়তো উইলিয়াম দ্য কনকারও উপস্থিত ছিলেন সাপ্তাহিক প্রার্থনায়।

অথচ কালের বিবর্তনে ইলির ক্যাথিড্রাল–জুড়ে আগের সেই রোশনাই আর নেই, নেই ইতিহাসের রাজা–রানি। শুধু ক্যাথিড্রাল জুড়ে স্তব্ধ নীরবতা নিয়ে আমার মতো দর্শনার্থীরা খুঁজে ফেরেন ইতিহাসের গল্পকথা। কুইন এথেলড্রিয়াও গত হয়েছেন ছয়শো উনআশি খ্রিষ্টাব্দে। তবে থেকে গেছে তাঁর তৈরি অপূর্ব এই শৈল্পিক ক্যাথিড্রাল যা এত বছর পরেও আধুনিক প্রকৌশলীদের কাছে এক অবাক বিস্ময়।
লেখক: ডক্টর অসীম চক্রবর্তী, গবেষক ও শিক্ষক, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড কম্পিউটিং, এংলিয়া রাসকিন বিশ্ববিদ্যালয়, কেমব্রিজ
ছবি: লেখক