আজও জীবন্ত লুমিয়ের জাদু
শেয়ার করুন
ফলো করুন

প্রথম দিনের সভা শেষ হয় বিকেল চারটার আগেই। এরপর আমরা উরানিয়ার মূল মিলনায়তনে দেখতে যাব থিয়েরি ফ্রেম্যু সংকলিত লুমিয়ের ভাইদের অদেখা সব নির্বাকচিত্র, নাম: লুমিয়ের! দি অ্যাডভেঞ্চার কন্টিনিউজ। যেহেতু এর আগে একটি পর্ব রয়েছে, তাই এই পর্বের নামে রয়েছে ‘কন্টিনিউজ’। শোয়ের সময় সন্ধ্যা ছয়টা। আমার হাতে দেখলাম দুই ঘণ্টার মতো সময় আছে। আগের দিন দেখে রেখেছিলাম বইয়ের মোকাম কোথায়। উরানিয়া থিয়েটারের ঠিক উল্টো দিকের রাস্তায় এক সারিতেই তিনটি বড় বড় বইয়ের দোকান রয়েছে। কাজেই বৈঠক থেকে বেরিয়ে সোজা চলে গেলাম বইয়ের দোকানে। একটা একটা করে ঢুঁ মারলাম। অনেক বইয়ের সমাহার দেখে আনন্দ পেলাম। কিন্তু কিছুটা হতাশ হলাম ইংরেজি বইয়ের সংখ্যা অত্যন্ত কম রয়েছে দেখে।

চলচ্চিত্রের ওপর হাঙ্গেরীয় ভাষায় অনেক বই থাকলেও ইংরেজিতে একেবারেই নেই। তো ঘড়িতে হঠাৎ তাকিয়ে দেখি বই দেখতে দেখতে এক ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে। আমি দ্রুত হাঁটা দিলাম উরানিয়া থিয়েটারের দিকে। গিয়ে টিকিট সংগ্রহ করে ভেতরে গিয়ে বসলাম। দেখি আমার পাশে বসেছেন ফিপ্রেসির আইনি উপদেষ্টা ফিলিপ মারেক। ভদ্রলোক ফরাসি। উনার সঙ্গে টুকটাক আলাপ করতে করতেই স্ক্রিনিং শুরু হলো।

বিজ্ঞাপন

অন্ধকার হলঘরে আমরা হারিয়ে যেতে থাকলাম ১৩০ বছর আগে। প্রামাণ্যচিত্রটিতে সংকলিত হয়েছে লুমিয়ের ভাইদের তোলা শতাধিক ছবি। এগুলোর দুই একটি বাদে আমি আগে একটিও দেখিনি। সবারই আমার মতো অবস্থা। কারখানা থেকে শ্রমিকেরা বেরিয়ে আসছেন, সেটিই আসলে একাধিকার ক্যামেরায় ধরেছিলেন লুমিয়ের ভাইয়েরা। এরপর আমরা দেখতে পাই কারখানাটি এখন কেমন অবস্থায় আছে। লুমিয়ের ভাইদের ক্যামেরাকে আমরা যেতে দেখলাম এশিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন জায়গায়। সব জায়গাতেই মানুষ তাদের মূল বিষয়বস্তু।

থিয়েরি ফ্রেম্যু পরিচালিত প্রামাণ্যচিত্রে দেখানো হচ্ছে লুমিয়ের ভাইদের কাজ
থিয়েরি ফ্রেম্যু পরিচালিত প্রামাণ্যচিত্রে দেখানো হচ্ছে লুমিয়ের ভাইদের কাজ

প্রায় দেড় শতাধিক বছর পর যেভাবে ছবিগুলো আবিষ্কার ও ঝকঝকে করা হয়েছে, সে জন্য ফ্রেম্যু সত্যি সত্যি বড়সড় ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য। স্ক্রিনিংয়ের পর ফ্রেম্যু প্রশ্নোত্তর পর্বে অংশ নিলেন। বললেন তাঁর আত্মনিয়োগ ও পরিশ্রমের কথা। চলচ্চিত্রপ্রেমী শুধু নয়, ফ্রেম্যুর এই সংকলন যেকোনো মানুষকেই আন্দোলিত করবে। শত বছর আগের বিভিন্ন জনপদের জীবনযাপন এভাবে দৃশ্যমাধ্যমে ধরে রাখা এক মহতী কাজ নিঃসন্দেহে। যদিও এর পেছনে ব্যবসা ছিল, তারপরও আমি বলব, ব্যবসার ছলে হলেও, যে কাজটি তাঁরা করেছেন, তার গুরুত্ব অপরিসীম। ফ্রেম্যুর এই সান্ধ্য আলাপটি পরিচালনা করেন ম্যারাথনের ডিরেক্টর গিওর্গি রাডুলি।  

বিজ্ঞাপন

শো শেষে আমরা যাব নৈশভোজে। সবার জন্য আগে থেকেই ঠিক করা রয়েছে রেস্তোরাঁ। হোরানস্কি এলাকায় অবস্থিত সেই রেস্তোরাঁর নাম লুমেন। আমরা পরস্পরের সঙ্গে কথা বলতে বলতে এগোচ্ছি। মোটামুটি ভালো ঠান্ডা লাগছে। বারো কি তেরো ডিগ্রি সেলসিয়াস। শীতল বাতাস বইছে। আমি হাঁটছি অন্যান্য চলচ্চিত্র সমালোচকদের সঙ্গে, নানা বিষয়ে আলাপ করছি আর রাতের বুদাপেস্টকে দেখছি। ঘড়িতে তখন রাত নয়টা প্রায়। লুমেন রেস্তোরাঁটিতে ঢুকে দেখলাম, অনেক বড় জায়গা, সজ্জায় কিছুটা আন্ডারগ্রাউন্ডের ছাপ। আলো কমিয়ে রাখা। হিপহপ মিউজিক বাজছে। আমাদের জন্য আলাদা কক্ষে ব্যবস্থা করা হয়েছে। সেই ঘরে ঢুকে দেখলাম, ঘরটি আসলে ছোট স্ক্রিনিং রুম। অনেকটা ক্লাবের মতো। সেখানে নাকি ছোট গ্রুপের নাটকও মঞ্চস্থ হয়।

প্রদর্শনী শেষে কথা বলছেন থিয়েরি ফ্রেম্যু
প্রদর্শনী শেষে কথা বলছেন থিয়েরি ফ্রেম্যু

আমার সঙ্গে বসলেন বিদ্যাশঙ্কর নীলকান্ত, তিনি দক্ষিণ ভারতের লোক। বেঙ্গালুরু ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভালের আর্টিস্টিক ডিরেক্টর তিনি। আমাদের টেবিলে আরও বসলেন ইতালির পাওলা কাসেলা ও  সুইজারল্যান্ডের বিট গ্লুর। বসার সঙ্গে সঙ্গেই আমাদের সামনে স্টার্টার দেওয়া হলো। সেটি খাচ্ছি আর আলাপ করছি। পাওলা ও বিটের আগ্রহ ভারতীয় ও বাংলাদেশের চলচ্চিত্র নিয়ে। সত্তরের কাছাকাছি বিদ্যাশঙ্কর নিজের দেশের চলচ্চিত্রের অবস্থা ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করলেন। আর বাংলাদেশি হওয়ার কারণে ভারত ও বাংলাদেশ—দুই দেশের ছবি নিয়েই আমার সম্যক ধারণা রয়েছে। ওদের তাই সাতচল্লিশ আর একাত্তর বোঝাতে হলো। কারণ, এই দুই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট না বুঝলে এ অঞ্চলের চলচ্চিত্রকে বোঝা একটু কঠিন বৈকি।

ওদিকে খাবারের জন্য সবাই অপেক্ষা করতে করতে অধৈর্য হয়ে উঠছে। আমরা কিন্তু সেই সময়টা উপভোগ করলাম। দুর্দান্ত আলাপ হলো। বিদ্যাশঙ্কর আমার কাছ থেকে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থা জানলেন। পাওলা ও বিটও আগ্রহভরে শুনলেন। যাক, শেষ পর্যন্ত খাবার পরিবেশিত হলো। বাংলাদেশ থেকে যা খাব বলে মেইল করেছিলাম, সেটিই পরিবেশিত হলো টেবিলে। আমার জন্য এসেছে স্লোভাকিয়ান নোচ্চি উইদ ইয়ুই চিজ অ্যান্ড বেকন। আমার কাছে খুবই মজার লাগল। মিষ্টি খাবারের পর্বে এল চিজ কেক উইদ ক্যারামেল অ্যান্ড সলটেড পিনাটস। অন্যরা অবশ্য অন্য খাবার নিলেন। বিট ও বিদ্যাশঙ্কর নিলেন বিয়ার। খেতে খেতে আমাদের আলোচনা প্রবেশ করে বিশ্বরাজনীতিতে। খাওয়াদাওয়া শেষ হতে হতে রাত এগারোটা প্রায়।

রেস্তোরাঁ থেকে বেরোতেই ঠান্ডা হাওয়ার ঝাপটা লাগল গায়ে। পেরু থেকে আসা সোফিয়া আলভারেজ জিজ্ঞেস করল, বিধান, আমার কথা তোমার মনে আছে? অনধিক ত্রিশের এই লাতিনো সুন্দরীর সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল ২০২৪ সালে সৌদি আরবের সমালোচকদের সম্মেলনে। বললাম, সোফিয়া নামের অর্থ তো জ্ঞান, তো জ্ঞানী নারীকে ভোলার কোনো কারণ নেই। সোফিয়া মিষ্টি করে হাসল। বলল, যাক, মনে আছে তাহলে। জিজ্ঞেস করলাম, কী করা হচ্ছে এখন? সোফিয়া জানাল, ও সুইজারল্যান্ডে আছে এখন, ওখানে পিএইচডি করছে। দৃশ্যমাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার ও প্রভাবসংক্রান্ত। সোফিয়ার বিষয় শুনে বললাম, দুনিয়াজোড়া এখন এই বিষয় তো গরম পিঠা। যদিও বাংলাদেশের চলচ্চিত্র কারখানা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে অতটা চিন্তিত নয়। কথায় কথায় সোফিয়া জানাল ও লিখতে চায় ছবি নিয়ে। কাট টু সিনেমা পত্রিকায় লেখার কথা জানালে ও খুবই আনন্দিত হলো। তা ছাড়া এক কপি ও আগেই পেয়েছিল সকালের সভায়। সোফিয়া বলল, পেরুতে এ ধরনের একটা পত্রিকা করার কথা চিন্তা করা যেতে পারে।

সোফিয়ার সঙ্গে কথা বলতে বলতে হোটেল চলে এল। আমরা পরস্পরকে শুভরাত্রি জানিয়ে যার যার রুমে ঢুকে গেলাম। রুমে গিয়ে ফ্রেশ হওয়ার পর ভাবলাম, বেশ ফ্রুটফুল হলো দিনটি। পরদিন সভার দ্বিতীয় দিন। সকাল সকাল শুরু হবে। যদিও বেশ ক্লান্ত লাগছে, কিন্তু স্নান না করে আমি বিছানায় যাই না। কাজেই স্নানাগারে ঢুকলাম। ভাবছি হাঙ্গেরি বিখ্যাত থার্মাল বাথের জন্য। লোকে বুদাপেস্টকে আদর করে নাম দিয়েছে ‘সিটি অব বাথস’, স্নানের শহর। ঠান্ডা-গরম নিয়ন্ত্রিত পুলে সবাই মিলে স্নানটাকে উপভোগ করে এখানকার মানুষ। বিশাল বিশাল সব পুল। স্পার জন্যও বুদাপেস্ট বিখ্যাত।

তবে সেসব আমোদ করার সুযোগ আমার নেই। আমার সফরকাল খুবই সংক্ষিপ্ত, তার ওপর পরিবার ছাড়া এসে এসব বিনোদনের কোনো মানে নেই আমার কাছে। আমার কাছে বিনোদন মানে পরিবারের অন্য মানুষগুলোর মুখের হাসি। তো একা একা আনন্দ উপভোগে সেই হাসি আমি কোথায় পাব? হোটেলের বাথরুমে শাওয়ার শেষ করার সঙ্গে সঙ্গেই রাজ্যের ঘুম এসে জড়ো হলো চোখে। বাংলাদেশে তখন সময় ভোরের দিকে এগোচ্ছে।

ছবি: লেখক

প্রকাশ: ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৬: ০০
বিজ্ঞাপন